রেজা আহমদ ফয়ছল চৌধুরী সুয়েব: ইউকে এন্ড আয়ারল্যন্ডের বিমানের কান্ট্রি ম্যানেজার মোহাম্মদ শফিকুল ইসলাম। লন্ডনের বাঙালী কমিউনিটির বিভিন্ন প্রগ্রামে তাকে দেখা যায়। মানুষের সাথে সহজভাবে মিশেন। এক সময় লন্ডনে হাইকমিশন, বিমান, সোনালী ব্যংকের কর্মকর্তারা কমিউনিটির মানুষের সাথে খুবই কম মেলামেশা করতেন। তা ছাড়া বিবিসি বাংলা সার্ভিসে যারা কাজ করেন তারা ও মেশেন কম। সিরাজুর রহমান সাহেব নেই। মারা গেছেন বছর কয়েক আগে।
কমিউনিটির প্রগ্রামে তিনি কম আসতেন। আমার সাথে মোটামুটি পরিচয় ছিল। স্মৃতি যদি আমার সাথে প্রতারনা না করে তাহলে ২০১১-১২ সালের দিকে “লন্ডন একাত্তর“ নামে চ্যানেল আই লন্ডন ষ্টুডিওতে একটি প্রোগ্রম করেছিলেন বাংলা টিভির সাবেক “ডাইরেক্টার অব নিউজ“ জনাব শামসুল আলম লিটন। উপস্থাপনা করেছিলেন এক সময়কার চ্যানেল এসের জনপ্রিয় নিউজ প্রেজান্টার শেখ সাদি।
ধারাবাহিক ঐ প্রোগ্রামের অংশ হিসেবে বিবিসি খ্যত সেই সাংবাদিক সিরাজুর রহমান সাহেব এসেছিলেন চ্যানেল আইর লন্ডন ষ্টুডিওতে। কথা হয়েছিল সিরাজ ভাইর সাথে। একটু মনোক্ষুন্ন মনে হয়েছিল তাকে। কারন আমি তখন সাহিত্যিক সাংবাদিক আব্দুল গাফফার চৌধুরীর ৮০ তম জন্মদিন পালন করেছিলাম লাইভ চ্যানেল আই তে। সিরাজ ভাই যদিও প্রকাশ্যে কিছু বলেননি তবে আকারে ইঙ্গিতে বুঝিয়ে ছিলেন গাফফার ভাইর জন্মদিন পালন করলাম আর কারো করিনি। আমি ব্যপারটি বুঝতে পেরে লিটন ভাইকে বলেছিলাম সিরাজ ভাইর জন্মদিন পালন করবো। সে রকম কথা হয়েছিল, লিটন ভাই সিরাজ ভাইকে নিয়ে আসবেন চ্যানেল আইর লন্ডন ষ্টুডিওতে। কিন্তু তা আর হলোনা, লিটন ভাই ভীষন ব্যস্ত মানুষ। আজ মালয়েশিয়া গেলে কাল ঢাকা, পরশু স্পেইন। এরই মধ্যে সিরাজ ভাই চলে গেলেন।
সিরাজ ভাইর মৃত্যুর পর গাফফার ভাইকে বলেছিলাম একটি নাগরিক শোক সভা করা দরকার। গাফফার ভাই রাজী হননি। বুঝলাম গাফফার ভাইর মনে অনেক দুঃখ দিয়েছেন সিরাজ ভাই। তা ছাড়া সিরাজ ভাই বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে বেশ কথা বলেছেন। তিন লক্ষ না ত্রিরিশ লক্ষ শহীদ হয়েছেন মুক্তিযুদ্ধে সে বিতর্কটা সিরাজ ভাইই বেশী উস্কে দিয়েছিলেন। আমি জানিনা পৃথিবীর আর কোনো দেশে স্বাধীনতার স্থপতিকে নিয়ে মুক্তিযুদ্ধকে নিয়ে এ রকম বিতর্ক হয় কি-না? বঙ্গবন্ধু তো বঙ্গব বন্ধুই। তিনি দেশের স্বাধীনতায় নেতৃত্ব দিয়েছেন। জিয়াউর রহমান সাহেব স্বাধীনতার ঘোষনা পত্র পাঠ করেছেন বিহাফ অব বঙ্গবন্ধু। এখানে ইতিহাস বিকৃত করার মধ্যে কি যুক্তি থাকতে পারে আমার মত মানুষের মাথায় তা ধরে না।
তো শফিকুল ইসলাম সাহেব আমাকে যেখানে যখনই পান তখনই তার জিজ্ঞাসা আমি বিভিন্ন প্রোগ্রামে কেন যাইনা। শফিক ভাইকে বুঝাতে পারিনা আমি কোনো প্রোগ্রামে গেলেই সমস্যা বাধে। চামড়ার মুখ যা সত্য তা বলে ফেলি। আসলে সব কথা সব জায়গায় যে বলতে নেই এটা আমি যে বুঝিনা তা না, কিন্তু ঐ যে খাছিলত। ঐ যে বলে “ইজ্জত যায়না ধুইলে আর খাছিলত যায়না মুয়লে“। তো আমার অবস্থা অনেকটা তাই। সেদিন শফিক ভাই আমাদের চ্যানেল আই লন্ডন অফিসের সামন দিয়ে যাচ্ছিলেন হঠাৎই তার সাথে দেখা, আমি জোর করে তাকে অফিসে নিয়ে আসি। সেই একই কথা আপনি বিভিন্ন প্রোগ্রামে কেন যাননা।
শফিক ভাইকে বললাম শফিক ভাই আমি যাইনা গেলেই যে ঝগড়া বাধে। বললেন রুশনা-আরা আলীর নির্বাচন উত্তর ধন্যবাদ প্রোগ্রামে যাননি। ঢাকায় নতুন বৃটিশ হাইকমিশনারের সম্বর্ধনায় ক্যনারীওয়ার্ফে যাননি। শফিক ভাইকে বললাম এসবে গিয়ে লাভ কি? এচিভম্যন্ট কি? শফিক ভাই বললেন সব জায়গায় এচিভম্যন্ট খুজলে তো চলবেনা।
রুশনারা আলীর ধন্যবাদ পার্টিতে গিয়ে যদি বলি রুশ আপনি হাউস অব পার্লামেন্টে কি করেছেন গত কিছুদিন ধরে যে এসিড এটাক হচ্ছে মানুষ যে আতংকিত! তাহলে তো প্যচ লেগে যাবে। অতএব না যাওয়াই ভালো। সাংবাদিক সৈয়দ আনাস পাশা ও একদিন বলেছন, উনি সব জায়গায় এখন যাননা। আনাস ভাই বুঝাতে চেয়েছেন আমার এখন দাম বেড়ে গেছে। আসলে আমি যাইনা ঝগড়া এড়ানোর জন্য। সারাটা জীবনই আমি ঝগড়া করেছি। কি লাভ হয়েছে? শত্রু বেড়েছে। মানুষ সামনে না বললে পিছনে ঠিকই বলে “উনি বেশী বুঝেন“। আর আমাদের কমিউনিটির বেশীরভাগ মানুষই পিছনে কথা বলে। সামনে সমাদর।
আসলে লিখতে বসেছি হাউস অব লর্ডস নিয়ে কিন্তু কথার পিঠে কথা চলে আসে। কয়েক বছর আগে হাউস অব লর্ডসে লর্ড এভবারীর এক প্রোগ্রামে গিয়েছিলাম। আমি কোথা ও গেলে আগে একটু পেপারওয়ার্ক করে নেই, যার প্রোগ্রামে যাব তিনি কে? কি তার বংশ পরিচয়। তো লর্ড এভবারী কে জানার জন্য এক বৃটিশ পলিটিশীয়ানকে জিজ্ঞাস করলাম তিনি গার্ডিয়ানের এক পেপার কাটিং আমাকে ধরিয়ে দিলেন। পড়লাম তার রাজনৈতিক জীবন ।
১৯৬২ সালে লর্ড এভবারী এমপি হয়েছিলেন লন্ডনের পাশেই কেন্টের অরপিংটন থেকে। সেটি ছিল বিখ্যাত উপনির্বাচন। তবে মাগুরা মার্কা নির্বাচন না প্রিয় পাঠক। সেই থেকে লর্ড এভবারীর পথ চলা। তিনি নির্বাচনে জয়লাভ করে ১৯৬২ সালে বলেছিলেন “ইন নাইনটিন সিক্সিটি টু (১৯৬২) দ্য ওয়াইজ ফার সিং পিপুল অব অরপিংটন ইলেকটেড মি এজ দ্যয়ার মেম্বার অব পার্লামেন্ট, ইন নাইনটিন সেভেন্টি (১৯৭০) দ্য ফুলস থ্রো মি আউট। “অর্থাৎ ১৯৬২ সালে নির্বাচনে জয়লাভ করে লর্ড এভবারী বলেছিলেন অরপিংটনের জ্ঞানী বিজ্ঞ দুরদৃষ্টি সম্পন্ন মানুষরা আমাকে নির্বাচিত করেছেন তাদের এমপি হিসেবে, আর ১৯৭০ সালে পরাজিত হয়ে বলেছিলেন বুর্বকরা আহমক্করা আমাকে বের করে দিল ছুড়ে ফেলে দিল“ এটা ছিল পরাজয়ের পর তার মতামত।
আমি তার কমেন্টস পড়ে ভাবছিলাম যাব কিনা প্রোগ্রামে? কারন নির্বাচনে জিতে বলে এক কথা, হেরে গেলে বাংলাদেশী ষ্টাইলে বলে আরেক কথা! মনে মনে সিদ্বান্ত নিলাম যাবো, এবং গিয়ে দেখবো তিনি কি বলেন। গেলাম গিয়ে দেখলাম আওয়ামীলীগ এবং বিএনপি ঝগড়া করছে, সভাপতির চেয়ারে বসে আছেন লর্ড এভাবেরী, তিনি কিছুটা বিরক্ত। রাগ করছেন তাদের প্রতি। থামানোর চেষ্টা করছেন। সেদিনের আমার অভিজ্ঞতা মোটেই সুখকর ছিলনা। কিছুক্ষন বসে চলে আসি। আসতে আসতে মনে মনে বলি কোনোদিন লর্ড এভাবেরীকে পেলে জিজ্ঞাসা করবো তিনি নির্বাচনে জিতে- হেরে কি বলেছিলেন। এর মধ্যে অনেকদিন চলে যায়। প্রায় বছর খানেক পরে কোথায় যেন পেয়েছিলাম তাকে, জিজ্ঞাস করেছিলাম তুমি কি নির্বাচনে পরাজয় বরন করে এসব কথা বলেছিলে? এবাবেরী হেসে বলেছিলেন এসব পুরোনো কথা তুলে কি লাভ?
প্রিয় পাঠক সম্প্রতি দেশ যখন বন্যার পানিতে ভাসছে আমাদের বিএনপি এবং আওয়ামীলীগের রাজনীতিবীদরা লন্ডনে এসেছেন হাউস অব লর্ডসে, এখন অবশ্য লর্ড এভাবেরী আর নেই তিনি গত বছর এ পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন। এবার এটির আয়োজন করেছিলেন লর্ড আলেক্সজেন্ডার কার্লাইল। আওয়ামীলীগ নাকি শেষ পর্যন্ত অংশ নেয়নি। এ নিয়ে বিএনপির আমীর খসরু চৌধুরী বলেছেন হাউস অব লর্ডসে আওয়ামীলীগের অংশগ্রহন না করা ছিল রহস্যজনক। এবং আওয়ামীলীগের মশিউর রহমান সাহেব বলেছেন এটি ছিল ব্যাক্তিগত পর্যায়ে, তাই তারা যাননি।
অনেকে বলে,জামাত ছিল বলে যান নি তারা। কিন্তু জামাত যে থাকবে আওয়ামীলীগ আগ থেকে জানত এমনটা বলছেন আয়োজকরা। আওয়ামীলীগ বৈঠক বর্জন করলেও ঐ দিন ই আওয়ামীলীগ বিএনপির ঐ এক টেবিলে বসে খাবার খেয়েছেন শুনলাম।
আমার প্রশ্ন হচ্ছে দেশ তো ভাসছে বন্যায়। মানুষ পানির নীচে, বাড়ী ঘর সব হারিয়ে নিঃশ্ব হয়ে পড়েছে। যেখানে বন্য সেখানে কিসের গনতন্ত্র নামের বৈঠক? সেখানে কিসের এনজিওর হিউম্যন রাইটস? এমন বৈঠক করার জন্য বছর বছর কেন দেশের নেতাদের বিদেশ আসতে হয়। দেশে কেন এমন বৈঠক হয় না?
বেচে থাকার সংগ্রামেই তো মানুষের দিন যায়। যেখানে বন্যার্ত মানুষের পাশে দাড়াবেন নেতা নেত্রীরা সেখানে তারা লন্ডনে এসেছেন কথিত গনতন্ত্র হিউম্যান রাইটস খুজতে। খুজলেন তো অনেক, লন্ডন আমেরিকা গনতন্ত্রের জ্ঞান দান করলো, রাশিয়া সমাজতন্ত্রের, চীন দিল লাল সমাজতন্ত্র, কেউ বা দিল চারু মজুমদারের শ্রেনী শত্রু খতমের সমাজতন্ত্র। কেউ বা সিরাজ সিকদারের কেউ বা জাসদের বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র।
কি ডেমক্রেসী কি অটোক্রেসী কি ন্যাশনালিজম কি সোসালিজম কি ইন্টারন্যশনালিজম কি ক্যাপেটিলজম কোনো ইজমই তো কাজ করলোনা, সব তন্ত্রের সব সমাজ- বিপ্লবের রোমান্টিক ধারনার বিপক্ষে রায় দিয়ে চলছে মানুষ। উগ্র জাতীয়তাবাদই এখন প্রতিষ্টিত হতে চলছে। তাই বলছিলাম কি মাননীয় নেতা নেত্রীরা বিদেশ আসা একটু কমিয়ে দেশের মানুষের কল্যানের জন্য কাজ করুন। ভুকা নাঙা অসহায় মানুষগুলির দিকে তাকালে নাড়ী ছেড়া আর্তনাদ বেরিয়ে আসে। দেশটা অর্থনৈতীকভাবে সাবলম্বী হলে মানুষের কষ্ট লাঘব হতো। অর্থনীতির সাথে রাজনীতির সম্পর্কটা খুবই কুৎসিত। অর্থনীতির সাথে মানুষের হাতের সম্পর্ক। হাত যত শক্তশালী অর্থনীতি ততটাই শক্ত। হাত যত দুর্বল অর্থনীতিও সেখানে দুর্বল। সুষ্ট রাজনীতি যখন থাকেনা তখন গনতন্ত্র দুর্বল হয়।
বাংলাদেশে আওয়ামীলীগের চেতনার রাজনীতি আর বিএনপির স্বাধীনতা বিরোধী রাজনীতি থেকে বেরিয়ে আসতে হবে। দেশে গনতন্ত্র না খুজে ওয়েষ্টমিনিষ্টারে এসে টেমসের পারে দেশের গনতন্ত্র খোজে পাওয়া যাবেনা। লর্ড এভাবেরী অথবা লর্ড কার্লাইল আমাদেরকে গনতন্ত্র হিউম্যন রাইটস শিখাতে পারবেননা। আমাদেরকে পদ্মা মেঘনা, যমুনা বুড়িগংঙ্গার তীর ঘেসেই গনতন্ত্র খুজতে হবে, সেখানেই গনতন্ত্র শিখতে হবে। ওষ্টেমিনিষ্টার ষ্টাইলের গনতন্ত্র না দেখে শেরে বাংলা নগর ষ্টাইলের গনতন্ত্র প্রতিষ্টিত করতে হবে।















