কামরানুল হক চৌধুরী জাফরি: আমরা লন্ডনে থেকে বাংলাদেশের সব কিছুকে খুঁজে বেড়াই। দাম যাই হোক বাংলাদেশের সব্জি-পণ্য সব কিছুতে মন পড়ে থাকে। দেশে ফেরার সময় আমাদের প্রবাসীদের অনেকেরই পছন্দের বিমান বাংলাদেশ বিমান। কিন্তু বাংলাদেশ বিমানে চড়েন এমন সবারই অভিযোগ থেকে গেছে এবং যাচ্ছে। বাংলাদেশ বিমানের অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির কারণে দেশি এ পণ্যটির সেবা গ্রহণে আমাদের প্রবাসীদের মনে শংকা থেকেই গেছে।
গত ১১ জুন রোববার এ বাংলাদেশ বিমান আবারো দেশে বিদেশে সংবাদের শিরোনাম হয়েছে। শিরোনামটি ছিল এরকম ‘বৈমানিকের দক্ষতায় বড় ধরনের দুর্ঘটনা থেকে রক্ষা পেল বাংলাদেশ বিমানের একটি উড়োজাহাজ’। সংবাদের বিবরণ ছিল, “রোববার ঢাকার হজরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে উড়োজাহাজটি জরুরি অবতরণ করে। বিমানবন্দর সূত্রে জানা যায়, গতকাল (রোববার) বেলা ২টা ১৭ মিনিটে ৭২ জন যাত্রী নিয়ে ঢাকা থেকে উড্ডয়ন করে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের রাজশাহীর ফ্লাইট (ডিজি-৪৯১)। আকাশের ওড়ার পরপর বিমানবন্দরের নিয়ন্ত্রণকক্ষ থেকে বৈমানিককে জানানো হয় যে উড়োজাহাজটির ডান দিকের চাকা ফেটে গেছে। এরপর বেলা ২টা ৫০ মিনিটের দিকে ৮৪ আসনের ড্যাশ-৮ উড়োজাহাজটি শাহজালাল বিমানবন্দরে জরুরি অবতরণ করে। এ কারণে শাহজালাল বিমানবন্দরের রানওয়ে উড্ডয়ন-অবতরণ কিছুক্ষণ বন্ধ রাখতে হয়। বিমানের একটি সূত্র জানায়, নিয়ন্ত্রণকক্ষ থেকে না জানানো হলে ওই বিমানটি স্বাভাবিক অবতরণ করতে গেলে বড় দুর্ঘটনায় পড়ার আশঙ্কা ছিল। ডান দিকের চাকা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ায় ক্যাপ্টেন দক্ষতার সঙ্গে বাঁ দিকের চাকার ওপর ভর করিয়ে বিমানটি অবতরণ করান।“
বাংলাদেশ বিমানের কথা মনে আসলেই মনে পড়ে যায় আমার মায়ের লন্ডন থেকে বাংলাদেশে শেষ সফরের কথা, অনেক ভোগান্তি আর চোখের পানি। যার একমাত্র দায় ছিল বাংলাদেশ বিমান কর্তৃপক্ষের। আমার বাবার নাম আব্দুর রউফ চৌধুরী। আমরা ছোট্ট থাকতেই বাবা মৃত্যুবরণ করেন। আমার ১৩ বছর বয়সে বাবা হজ পালন শেষে বাংলাদেশে মারা যান। তাঁর মৃত্যুর পর আমাদের মা আমাদের সবকিছু।
আমার মায়ের নাম সৈয়দা রহমতুন্নেছা। একদিন হঠাৎ ১৯৯৮ সালে হ্যামস্ট্রীটের রয়েল ফ্রি হসপিটালে তিনিও আমাদের এতিম করে মৃত্যুবরণ করেন। স্ট্রোক হয়েছিল তার। ইস্ট লন্ডন মসজিদে জানাযা হয়েছিল। মায়ের মৃত্যুর ১ সপ্তাহ পরে তাঁর লাশ নিয়ে বাংলাদেশ বিমানে করে দেশে যাচ্ছি।
আমাদের মোট ৫ ভাইয়ের মধ্যে ৪ ভাই লন্ডনে ছিলাম। ১ বোন ছিল লন্ডনে আর ৫ বোন ছিলেন দেশে। মোট ১১ ভাই-বোনের বিশাল পরিবার। দেশে থাকা ভাই বোনদের ও আত্মীয়স্বজনদের শেষবারের মতো মাকে বিদায় জানাতে দেশে নিয়ে আসছি।
যখন আমি মায়ের লাশ নিয়ে দেশে আসি তখন আমার বয়স ২৮ ও ২৯ বছরের মাঝামাঝি ছিল। অবিবাহিত ছিলাম। হাসপাতালে আমার মা মারা গেলেও আমার কোলে মাথা রেখে মা মৃত্যুবরণ করেন। মৃত্যুর আগে মায়ের কয়েকটি কথা আমার এখনো কানে বাজে। তিনি আমাদের জন্য দোয়া করে যান। আমার বউ দেখে যেতে না পারার আফসোস করেছিলেন। শেষ ওসিয়ত ছিল মৃত্যু হলে দেশে স্বামীর কবরের পাশে যেন ওনার কবর দেয়া হয়।
ঐ সময় বাংলাদেশ বিমান ছাড়া অন্য কোন বিমান মৃতদেহ নিয়ে বাংলাদেশে আসত না। হাই কমিশনের যাবতীয় ঝামেলা শেষ করেছিলেন আমার বড় ভাইয়েরা। বাংলাদেশ বিমানে আমার সিটের ও মায়ের মৃতদেহের জন্য লন্ডন-সিলেট টিকেট করেছিলাম। ইস্ট লন্ডন মসজিদে জানাজার ২দিন পরে বিমানে করে দেশের পথে রওয়ানা দেই।
হিথ্রো বিমান বন্দরে প্রথম ঝামেলা করল বাংলাদেশ বিমান। লন্ডন আসার পথে দুবাইয়ে বিমানটি নষ্ট হয়ে যায়। তাই ৮ ঘন্টা দেরিতে হিথ্রোতে এসে পৌছায় বিমানটি। ফলে মায়ের লাশ নিয়ে নির্ধারিত সময়ের ৮ ঘন্টা পর বাংলাদেশ বিমানে উঠে যাত্রা করি। যখন ঢাকায় পৌছাই তখন রাত্র ৮টা বাজে। ঢাকা থেকে সিলেটে ফ্লাইট করার কথা ছিল রাত ৮টা ৩০ মিনিটে। অনেক অনিশ্চয়তার পর সেই ফ্লাইট রাত্র সাড়ে ৯টায় পাই। যাত্রী কম থাকায় বিমান ছাড়তে চাইছিল না বিমান কর্তৃপক্ষ। আমাদের যথাসম্ভব ছোট্ট বিমান দেয়া হল ঢাকা টু সিলেটের পথে। সেই বিমানের ভেতরই যাত্রী সিট উঠিয়ে মায়ের লাশ রাখা হল। পাশাপাশি রাখা হয়েছিল বিশ্বনাথ প্রবাসীর আরেকটি লাশ। ভোগান্তি ছিল বাংলাদেশ বিমানের এ ফ্লাইটটিতেও। ছোট বিমানটি মাঝ আকাশে উঠার কিছুক্ষণ পর হঠাৎ করেই এক ঝটকায় ৩০ থেকে ৪০ ফুট নীচে নেমে যায়।
বিমানের পেছনের সিটগুলোতে বেধে রাখা মায়ের কফিন ও অন্য কফিনটি স্থানচ্যত না হলেও ভেতরের যাত্রীরা সিট বেল্ট খোলা রাখায় সবাই লাফিয়ে হঠাৎ উপরে উঠেন যান। এ সময় ৮ বছর বয়সী এক বালক উড়ে গিয়ে বিমানের ভেতরের ছাদের শক্তা জায়গায় তার মাথা আঘাত করে। তার মাথা ফেটে রক্ত ঝরতে থাকে। এসব নিয়ে বিমানের ভেতরেই হুলস্থুল ব্যপার।
লন্ডন থেকে দীর্ঘ ঝামেলা সংগ্রামের পর এভাবে মায়ের লাশ নিয়ে সিলেট বিমানবন্দরে ল্যান্ড করি। সেখান থেকে এ্যম্বুলেন্সে করে মৌলভীবাজার যাই। এরপর আত্মীয়স্বজনদের নিয়ে জানাযা শেষে চোখের পানিতে পিতার কবরের পাশে জান্নাতী মাকে চির দাফন সম্পন্ন করি।
১৯৬৭ সালে লন্ডনের কেমডেনের হ্যামস্ট্রীট এলাকায় আমার জন্ম হয়। এখনো এ এলাকায় বসবাস করি। ৫ বছর বয়সে পরিবারের সাথে বাংলাদেশে চলে আসি। দেশে এসে মৌলভীবাজার স্কুল শেষ করে সিলেট এমসি কলেজ অধ্যয়ন করি। এরপর ১৯৮২ সালে ১৮ বছর বয়সে আবার লন্ডন চলে যাই। প্রথমে কাজে যুক্ত হই। এর ২ বছর পর থেকে ব্যবসা শুরু করি।
আমার মায়ের সেই শেষ বাংলাদেশ সফরে যে ভোগান্তি তা আমার পরিবারের কেউ এখনো ভোলেনি। এরপর থেকে বাংলাদেশ বিমানে চড়তে গেলে আমাদের দু’বার করে ভাবতে হচ্ছে। বাংলাদেশ বিমানে কেউ ফ্রি চড়েন না। কম টাকায়ও টিকেট মিলে না। বিমানে যাত্রীর কোন কমতি নেই। তবে কেন দীর্ঘ সময় ধরে বাংলাদেশ বিমানের সেবা এতটা নিন্মমানের। সেই দিনটা কবে আসছে যে দিন কোন অবস্থাতেই বাংলাদেশি এ পণ্যটির সেবা গ্রহণের জন্য সবকিছু ছেড়ে উন্মূখ হয়ে থাকব। সে দিন থেকে ক্রমাগতভাবে আমি কামরানুল হক চৌধুরী জাফরি বাংলাদেশ বিমানের পক্ষে ভলান্টারি কাজ করে যাব। এ আমার ওয়াদা রইল। এশুধু আমার বাংলাদেশি পণ্য বলেই আমার এ প্রতিশ্রুতি। আমরা শুধু বাংলাদেশ বিমানের গুণগত পরিবর্তনটি চাই। (অনুলিখন: আশরাফ খান)















