ফরীদ আহমদ রেজা : টাওয়ার হ্যামলেটস’র বাঙালি ভোটারগণ খুব বিপদে আছেন। তারা জেরমি করবিনকে ভালোবাসেন। করবিনকে নিয়ে তারা অনেক স্বপ্ন দেখেন। তারা চান, আগামী নির্বাচনে করবিন বিজয়ী হোন। করবিন মানে করবিনের নেতৃত্বে পরিচালিত লেবার পার্টি। করবিনহীন লেবার পার্টির কথা তারা ভাবতে পারেন না। কিন্তু তারা কি জানেন, নির্বাচনে লেবার পার্টি বিজয়ী হলেও করবিন যাতে প্রধানমন্ত্রী হতে না পারেন সে ষড়যন্ত্র অনেক আগে থেকেই শুরু হয়েছে? তারা কি জানেন, তাদের ভোট পেয়ে যারা ক্ষমতায় যান তারা করবিনকে কতটুকু পছন্দ করেন? তাদের নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা যদি করবিনকে টেনে-হেঁচড়ে নেতৃত্ব থেকে সরিয়ে দেন তা হলে কী হবে? অতীতে তারা সে চেষ্টা কম করেননি। আগামীতেও তারা সে চেষ্টা চালিয়ে যাবেন, এতে কোন সন্দেহ নেই।
থেরেসা মে হঠাৎ করে ৮ই জুন নির্বাচনের তারিখ ঘোষণা করে সবাইকে চমকে দিয়েছেন। রাজনৈতিক অঙ্গন হতচকিত অবস্থা কাটিয়ে আস্তে আস্তে জেগে ওঠছে। নির্বাচনের আর মাত্র সাত দিন বাকি আছে। বিলাতের রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের কেউ এখনো নিশ্চিত নয়, নির্বাচনোত্তর বৃটেনের মানচিত্র কি রকম হবে। মতামত জরিপ হচ্ছে এবং আরো হবে। নির্বাচন ঘোষণার কারণ নিয়ে কথামালা কম রচিত হচ্ছে না। সবার মুখে এক কথা। ব্রেক্সিট, ব্রেক্সিট এবং ব্রেক্সিট। কান টানলে মাথা আসে। কিন্তু মাথা নিয়ে খুব কম কথা হচ্ছে। ব্রেক্সিট নিয়ে যারা খুব উৎসাহী ছিলেন তারাও এখন ‘হায় হায়’ করছেন। টোরি সরকারের ব্যয়-সংকোচন নীতির কারণে বিলাতের শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা, নিরাপত্তা, উন্নয়ন, বেনিফিট, চাকরি, বিনিয়োগ প্রভৃতিসহ সকল ক্ষেত্রে চরম নৈরাজ্য বিরাজ করছে। দোষ শুধু ব্রেক্সিট’র নয়। ব্রেক্সিট শুধু কাটা ঘায়ে ‘নুনের ছিটা’ দিয়েছে মাত্র।
মানুষের পেটে লাথি দিয়ে ক্ষমতায় থাকা যায় না। কিন্তু টোরি সরকার পারছে। কেন পারছে, সেটা নিয়ে ভাবা দরকার। টোরি পার্টির রাজনৈতিক কৌশল চমৎকার। ব্যাপারটা এ রকম। এক লোক রাস্তায় হোঁচট খেয়ে পড়ে গেছে। কেউ দেখার আগে গড়াগড়ি দিয়ে সে রাস্তার এক পাশে গিয়ে বসে পড়ে। তারপর ফ্লাক্স বের করে ধীরেসুস্থে চা পান করতে থাকে। ভাবখানা এমন, সে হোঁচট খায়নি, বরং চা খাওয়ার জন্যে বসেছে।
বিলাতের রাজনৈতিক ইতিহাসে জেরমি করবিন এক ব্যতিক্রমধর্মী নেতা। করবিন যাতে লেবার পার্টির নেতা না হতে পারেন সে জন্যে তাঁর বিরুদ্ধে চতুর্মুখি আক্রমণ হয়েছে। কারণ জেরমি করবিন রাজনীতির কারণে বা ক্ষমতায় যাওয়ার জন্যে রাজনীতি করেন না। সদ্য-ঘোষিত নির্বাচনী ইশতেহার পাঠ করলে আমরা বুঝতে পারি, কেন করবিন চরম ডান, মধ্য ডান এবং ভূয়া বামদের চক্ষুশূল। ইশতেহারে তিনি টনি ব্লেয়ার প্রবর্তিত টিউশন ফি বাতিল, গুরুত্বপূর্ণ সেবামূলক প্রতিষ্ঠান সরকারীকরণ এবং যুদ্ধনীতি পরিহারের ঘোষণা দিয়ে বিশ্বব্যাপী আলোড়ন সৃষ্টি করেছেন। তবে দলের জন্যে সবচেয়ে মারাত্মক হচ্ছে আস্তিনের ভেতর বসবাসকারী সাপ। কেন্দ্র থেকে সাধারণ পর্যায় পর্যন্ত লেবার পার্টির অভ্যন্তরে এমন অনেক আছেন যারা করবিনকে মোটেই পছন্দ করেন না। তারা কেউ টনি ব্লেয়ারের অনুসারী, কেউ দিবাস্বপ্নে বিভোর। কেউ কেউ যে গাছের আশ্রয়ে এবং ফল খেয়ে বেঁচে আছেন সে গাছটিকে তারা কেটে ফেলতে চান। লেবার পার্টির গণমুখি নীতি যদি তাদের পছন্দ না হয় তা হলে তারা টোরি পার্টিতে চলে যেতে পারেন।
নির্বাচনী আমেজ বাঙালি পাড়ায়ও দেখ যাচ্ছে। লন্ডনের টাওয়ার হ্যামলেটস এলাকা বাঙালি পাড়া হিসেবে খ্যাত। জেনে রাখা ভালো, টাওয়ার হ্যামলেটস বরা বাঙালি অধ্যুষিত হলেও বাঙালি জনগোষ্ঠী এখানে সংখ্যাগুরু নয়। এখানে দুটো নির্বাচনী এলাকা। একটি পপলার এন্ড লাইম হাউস এলাকা এবং অপরটি বেথনালগ্রিন এন্ড বো। ২০১১ সালের আদমশুমারী অনুসারে বেথনালগ্রিন এন্ড বো নির্বাচনী এলাকার বাসিন্দাদের শতকরা ৪১.৯ ভাগ সাদা এবং দ্বিতীয় সংখ্যাগরিষ্ঠ এথনিক কমিউনিটি বাংলাদেশী। বাঙালি ভোটারদের সংখ্যা সেখানে শতকরা ৩৩.৬ ভাগ মাত্র। এ আসনে একজন বাঙালি এমপি পাওয়ার স্বপ্ন আমরা অনেক দিন দেখেছি। পিটার শোর, উনা কিং, জর্জ গ্যালওয়ে পার হয়ে শেষ পর্যন্ত ২০১০ সালে এসে রুশনারা আলী বৃটিশ পার্লামেন্টে প্রথম বাঙালি এমপি হিসেবে নির্বাচিত হন।
২০১৫ সালের নির্বাচনে পূনরায় রুশনারা আলী বিপুল ভোটাধিক্যে নির্বাচিত হন। সে সময় রুশনারা আলী পান শতকরা ৬১ ভাগ ভোট। আর তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী টোরি পার্টির ম্যাট স্মিথ’র ভোট ছিল মাত্র শতকরা ১৫ ভাগ। এ কথা বলা যায়, ২০১৫ সালের নির্বাচনে রুশনারা আলীকে কোন প্রকার প্রতিরোধের মুখোমুখি হতে হয়নি। কিন্তু আসন্ন ৮ই জুনের নির্বাচন রুশনারা আলীর জন্যে কঠিন চ্যালেঞ্জ নিয়ে এসেছে। কারণ ২০১৫ সালে রুশনারা আলীর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী আজমল মাসরুর একই আসনে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নিজের নাম ঘোষণা করেছেন। দুটো সাংবাদিক সম্মেলন, সাধারণ সভা, গণসংযোগ, প্রিন্ট-ইলেকট্রনিক প্রচারণা ইত্যাদির মাধ্যমে আজমল মাসরুর ইতোমধ্যে ভোটারদের সামনে চলে এসেছেন।
প্রথম বাঙালি এমপি এবং দু দু বার নির্বাচিত হবার কারণে নির্বাচনী মাঠে রুশনারা আলীর অবস্থান মোটেই দুর্বল নয়। সাধারণ মানুষের জন্যে তাঁর কাছে পৌঁছা কঠিন হলেও মানুষ তাঁর নাম জানে এবং টেলিভিশনে তাঁকে দেখা যায়। পার্লামেন্টে বাজেট এবং হিজাব নিয়ে দেয়া তাঁর বক্তব্য মানুষ পছন্দ করেছে। কিন্তু এলাকার বাসিন্দাদের প্রয়োজন মেটাতে তাঁর সাফল্য কতটুকু? সাধারণ মানুষ কী তাঁর সাথে দেখা করতে পারে? গত দু নির্বাচনী সেশনে মোট কতজন লোক তাঁর সেবা পেয়েছে? বেথনালগ্রীন ও বো এলাকায় তাঁর কয়টা সার্জারি আছে? মাসে কয়দিন তিনি সেখানে উপস্থিত থাকেন? একজন নির্বাচিত এমপিকে ভোটারদের এ সকল প্রশ্ন করার অধিকার আছে।
টাওয়ার হ্যামলেটস বরার নির্বাচিত মেয়র ছিলেন লুৎফুর রহমান। জনগণ ভোট দিয়ে তাঁকে নির্বাচিত করেছিল। ডানপন্থী মিডিয়া তাঁর বিরুদ্ধে অব্যাহত কুৎসা রচনা করেও নির্বাচনে তাঁকে আটকাতে পারেনি। শেষ পর্যন্ত আদালতের খড়গ দিয়ে তাঁকে অপসারণ করা হয়েছে। লুৎফুর রহমান মেয়র থাকলে টাওয়ার হ্যামলেটস ‘ইসলামিক স্টেইট’ হয়ে যায় আর জন বিগস হলে সেকুলার চরিত্র বজায় থাকে – এ ধরণের কেচ্ছা মানুষকে গিলানো হয়েছে। জনগণের নির্বাচিত এমপি হিসেবে রুশনারা আলী তখন একটা বলিষ্ঠ ভূমিকা রাখতে পারতেন। তিনি তখন নিরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেছেন। টাওয়ার হ্যামলেটস এলাকার যারা লুৎফুর রহমানের নিকট থেকে সেবা ও সহযোগিতা পেয়েছে তারা রুশনারা আলীর তখনকার ভূমিকা অবশ্যই মনে রেখেছে।
আজমল মাসরুরের পরিচিতি টাওয়ার হ্যামলেটসে সীমাবদ্ধ নয়। লেখক, ইমাম, বক্তা, সংগঠক এবং টেলিভিশন ব্যক্তিত্ব হিসেবে তিনি দেশে-বিদেশে সুপরিচিত। ২০১০ সালের নির্বাচনে তিনি দশ হাজারের চেয়ে বেশি ভোট পেয়েছেন। সে সময় একই এথনিক কমিউনিটির আরো দু জন প্রার্থী থাকায় ভোট ভাগাভাগি হয়েছে। এবার লড়াই হবে সরাসরি রুশনারা আলী এবং আজমল মাসরুর – এ দু জনের মধ্যে। দু জনই বাঙালি এবং মুসলমান। তাই ভোটারদের এ নিয়ে কোন দ্বন্দ্বে পড়তে হবে না।
রুশনারা আলীকে ভোট না দিয়ে ভোটাররা কেন আপনাকে ভোট দেবে, সাংবাদিকদের এ প্রশ্নের জবাবে আজমল মাসরুর বলেন, ‘আমাকে এ কারণে ভোট দেয়া উচিত যে আমার সাথে মানুষ সহজেই দেখা করতে পারবে। রুশনারা আলী মাসে দুটো অনিয়মিত সার্জারি করেন, প্রায়ই তা বাতিল হয়ে যায়। আমার মাসে ৪টি সার্জারি থাকবে। এর সাথে থাকবে মোবাইল ও পপ-আপ সার্জারি।’
আজমল মাসরুর আরো বলেন, ‘রুশনারা আলী জেরমি করবিনের লেবার পার্টিকে সমর্থন করেন না। রুশনারা জেরমি করবিনের বিরুদ্ধে ‘নো কনফিডেন্স মোশনে’ স্বাক্ষর দিয়েছেন। এ এলাকার জন্য এমন এমপি দরকার যিনি সামাজিক সাম্য, ন্যায়বিচার, মানবাধিকার, সম্পদের সুসমবন্টন, কল্যাণরাষ্ট্রে বিশ্বাস করেন। চিকিৎসা-সেবা রক্ষা করতে চান এবং শিক্ষাখাতে ন্যায়সঙ্গত ফান্ডিং নিশ্চিত করতে চান।’
টাওয়ার হ্যামলেটস মেয়র প্রসঙ্গে আজমল মাসরুর বলেন, ‘একজন স্বতন্ত্র এমপি হিসেবে আমি মেয়রের জনস্বার্থ বিরোধী পদক্ষেপের সমালোচনা বলিষ্ঠভাবে করতে পারবো, যা করা দলীয় এমপি হবার কারণে রুশনারা আলীর পক্ষে সম্ভব হচ্ছে না।’
আজমল মাসরুর দাবি করেন, এ বরায় আমি গত ২০ বছর থেকে আছি এবং কাজ করছি। শেডওয়েল এলাকায় আমি ২০ বছর বাস করেছি। এখানকার প্রাইমারী এবং সেকেন্ডারী স্কুলে আমি পড়েছি। এখানে আমার ব্যবসা এবং কমিউনিটি প্রজেক্ট ছিল। এলাকার সুখ-দুঃখ এবং সুবিধা-অসুবিধার কথা আমি ভালো ভাবেই অবহিত আছি।
বিভিন্ন জনমত জরিপে এটা ক্রমেই স্পষ্ট হয়ে উঠছে, ৮ই জুনের নির্বাচনে টোরি বা লেবার কোন পার্টি সরকার গঠনের মতো সংখ্যা গরিষ্ঠতা লাভ করতে পারবে না। সুতরাং লেবার পার্টি সরকার গঠন করবে, এটা ভাবা যায় না। তবে তাদের আসন সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে।
আজমল মাসরুর ইতোমধ্যে প্রচারণার দিক থেকে রুশনারা আলীর চেয়ে এগিয়ে আছেন। শোষণ- নির্যাতন এবং ইসলামোফবিয়ার বিরুদ্ধে অবস্থানের কারণে ভোটারদের কাছে তাঁর গ্রহণযোগ্যতা রয়েছে। প্রশ্ন হচ্ছে, বাঙালি এমপি আমরা কেন চাই? এটা কি নিছক গর্ব বা অহঙ্কারের বিষয়? আমরা জানি বাঙালি অধ্যুষিত ইস্ট লন্ডন এলাকা হাজারো সমস্যায় জর্জরিত। আমাদের ছেলেরা এমন সব স্কুলে যায় যেখানে পর্যাপ্ত শিক্ষাসামগ্রী পাওয়া যায়না, আমরা নিম্নমানের ঘরে গাঁদাগাদি করে বসবাস করি, আমাদের চাকরির সুযোগ-সুবিধা পর্যাপ্ত নয়, আমরা চিকিৎসার ইমার্জেন্সী সুযোগ থেকেও বঞ্চিত। অনেকে মনে করেন বাঙালীর ভোট আমাদের রিজার্ভ ভোট, এখানে কেউ ভাগ বসাতে পারবেনা।
আমাদের নিজেদের প্রয়োজনেই আসন্ন নির্বাচনে আমাদের প্রমাণ করতে হবে যে আমরা কোন দলের নয়, বরং কমিউনিটির স্বার্থই আমাদের কাছে বড় প্রশ্ন। কাউকে ভোট প্রদানের অঙ্গীকার দেয়ার আগে আমাদের সামাজিক, অর্থনৈতিক এবং শিক্ষাক্ষেত্রে বিরাজমান সমস্যাবলী সমাধানের অঙ্গীকার আদায় করা প্রয়োজন। বাঙালী এবং বৃহত্তর মুসলিম কমিউনিটির স্বার্থের কথা চিন্তা করে আমাদের কর্মকৌশল নির্ধারণ করা দরকার। আমাদের স্বার্থ যারা দেখেনা, আমাদের মতামতের যারা তোয়াক্কা করেনা আমরা কেন তাদের ভোট দেব?
শুধু বাঙালি বা মুসলমান হবার কারণে কাউকে বাছাই করলে চলবে না। যোগ্যতার বিচার করতে হবে। আমরা এমন প্রার্থী বাছাই করবো যিনি আমাদের কথা পার্লামেন্টে বলিষ্ঠ ভাবে তুলে ধরতে পারবেন। আমরা এমন একজন এমপি চাই যার ব্যাপারে আমরা গর্ব করতে পারব। আমরা এমন এমপি চাই যিনি বিলাতে বসবাসরত বাঙালি কমিউনিটির সাথে চলাফেরা করেন, যার আমাদের সমস্যার ব্যাপারে বাস্তব অভিজ্ঞতা রয়েছে এবং যার মধ্যে কমিউনিটির অধিকার আদায়ের যোগ্যতা এবং দক্ষতা রয়েছে। আমার ভোট আমি দেব, তবে যোগ্য প্রার্থীকে দেব। আমরা দেখবো রুশনারা আলী না আজমল, যোগ্যতার বিচারে কে এগিয়ে? আমরা এমন প্রার্থীকে ভোট দেব যিনি বৃটিশ পার্লামেন্টে কথা বলে আমাদের অধিকার আদায় করার সাথে সাথে বিশ্বসভায় বাঙালির মুখ উজ্জল করতে পারেন।
ফরীদ আহমদ রেজা :
লন্ডন, ৩১ মে ২০১৭
সূত্র: জনাব ফরীদ আহমদ রেজা’র ফেইসবুক থেকে নেয়া হয়েছে।















