আমাজন এর বনে না, বা হিমালয়ের কোনো গুহায় না , খোদ ব্রিটেনে বিদ্যুৎ পানির লাইন ছাড়াই জীবনের প্রায় চল্লিশ টি বছর সম্পূর্ণ একা একা নির্জন জঙ্গল আর লেকের পাশে কাটিয়ে সবাইকে অবাক করে দিয়েছেন কেন স্মিথ নামের এক ব্রিটিশ নাগরিক। কেন স্মিথ এর ভাষায় এটা ছিল চমৎকার এক জীবন , আমাদের অনেকেই এরকম একটা চমৎকার জীবন কাটাতে স্বপ্ন দেখে কিন্তু কেউ আজ পর্যন্ত এরকম করতে পারে নাই।
যেখানে তিনি বসবাস করেন তার আসে পাশে কোনো মানুষ থাকে না। ৭৪ বছর বয়সী কেন এর নিজের তৈরী কাঠের লগ কেবিন থেকে অন্তত দুইঘন্টা জঙ্গল আর পাহাড়ের মধ্যে দিয়ে হেটে গেলে রাস্তার দেখা মেলে। ব্রিটেনের স্কটল্যান্ডের মানুষজন বিহীন নির্জন জঙ্গলে আবৃত ট্রেইগ নামে একটি লেকের পাশে তিনি আধুনিক সভ্যতার কোনো রকম উপাদান ছাড়াই জীবনের চল্লিশ টি বছর নীরবে নিঃসঙ্গ ভাবে কাটিয়ে দিয়েছেন।
ব্রিটেনের ডার্বিশায়ার এর বাসিন্দা কেন স্মিথ ১৫ বছর বয়সে ফায়ার স্টেশন বানানোর কাজ দিয়ে জীবন শুরু করেন। তার জীবন ছিল আর পাঁচজনের মত বন্ধুবান্ধব নিয়ে। তার বয়স যখন ২৬ বছর তখন এক রাতে একদল ডাকাত তাকে বেধড়ক মারপিট করে অজ্ঞান করে ফেলে রেখে যায়। ফলে তার ব্রেন হেমারেজ হয়ে অজ্ঞান অবস্থায় হাসপাতালে কাটাতে হয়। এই সময় টানা ২৩ দিন তার কোনো জ্ঞান ছিল না। ডাক্তার রা বলেছিল সে কোনোদিন আর হাটতে বা কথা বলতে পারবে না। জ্ঞান ফেরার পর তিনি সিদ্ধান্ত নেন নিজের উপর নির্ভরশীল হওয়ার। এর পর কেন, ভ্রমণ করতে শুরু করলেন এবং বনে জঙ্গলে কাটানোর চিন্তা শুরু করলেন। প্রথমে তিনি কানাডা আর আমেরিকার আলাস্কার সীমান্তের পাহাড়ে আর জঙ্গলে যেদিকে দু চোখ যায় সেইভাবে বাইশ হাজার মাইল ঘুরে বেড়ালেন। এরপর ব্রিটেনে ফিরে দেখলেন তার বাবা মা মারা গেছেন। দেশে ফিরে স্কটল্যান্ডের রানচ নামের উঁচু পাহাড় জঙ্গলে উদ্দেশ্য বিহীন ভাবে ঘুরে বেড়ানোর সময় তার মৃত বাবা মায়ের কথা মনে পরে যায়। তার ভাষায় সেই সময় তিনি শুধু হাঁটতেন আর বাবা মায়ের কথা চিন্তা করে কাঁদতেন। এই সময় তার মাথায় আসে ব্রিটেনের সমচেয়ে নির্জন মানুষ্য বিহীন জায়গায় একা থাকার চিন্তা। এই জন্য তিনি হেটে হেটে নির্জন সমুদ্রের ধার দিয়ে , পাহাড়ের আর জঙ্গলের মধ্যে নির্জন জায়গা খুঁজতে থাকলেন। যেখানে মানুষের কোনো বাড়িঘর নেই এইরকম জায়গার সন্ধানে। শত শত মাইল হাঁটার পরে তিনি গহীন জঙ্গলে আর পাহাড়ে ঘেরা এমন একটা জায়গা তিনি খুঁজে পেলেন ১৯৮০ সালে। তার ভাষায় এরপর তার বাবা মায়ের জন্য অনবরত কান্না থামে এবং তিনি সেখানে নিজে গাছ কেটে গাছের গুড়ি দিয়ে একটা ঘর তৈরী করেন। এর পর গ্যাস , বিদ্যুৎ, পানি , মোবাইল ছাড়াই নির্জনে প্রায় ৩৬ বছর সেখানে কাটিয়ে দেন। এইসময় তিনি নিজের খাবারের শাকসবজি নিজেই উৎপন্ন করে নিতেন এবং মূল খাবার হিসেবে বড়শিতে লেকের মাছ ধরে খেতেন। তার ভাষায় কেউ যদি স্বাধীন জীবন যাপন করতে চায় তাহলে আগে তাকে মাছধরা শিখতে হবে। তার এই নিঃসঙ্গ সন্ন্যাসী জীবন যাপনের কথা জনসমুক্ষে আনেন বিবিসি স্কটল্যান্ডের একজন ফিল্ম মেকার লিজি মাককেঞ্জি। এরপর সারা বিশ্বে এটি নিয়ে হৈ চৈ পরে যায় , সরকারি ভাবে তাকে শহরে থাকার সুন্দর বাসা দেয়ার চেষ্টা করা হলেও তিনি সেটা গ্রহণ না করে তার সেই পুরাতন লগ কেবিনে একা একাই থাকতেন। এইসময় ৭৪ বছর বয়সী কেন কে আমেরিকান স্যাটেলাইট এর সাহায্যে চলে এমন মানুষের জীবন রক্ষার সিগন্যাল দেয়ার একটি যন্ত্র দেয়া হয়। ২০১৯ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে তার স্ট্রোক হয় এবং তার সিগন্যাল পেয়ে আমেরিকা থেকে ব্রিটেনের উদ্ধারকারীদের জানানো হয়। দুর্গম জায়গায় এম্বুলেন্স না যাওয়ায় হেলিকপ্টারে করে তাকে অজ্ঞান অবস্থায় উদ্ধার করে ফোর্ট উইলিয়াম হাসপাতালে আনা হয়। সেখানে ৪৯ দিন চিকিৎসার পরে তিনি একটু সুস্থ হলে ডাক্তারেরা তাকে শহরে আরামের জীবনে থাকার পরামর্শ দেন। সরকার ও নানান ভাবে তাকে বোঝানোর চেষ্টা করেন কিন্তু কেন আবার ফিরে গেছেন তার নির্জন জীবনে। কেন কিন্তু এখনো সেই মানুষ বিহীন গহীন জঙ্গলে একা একাই থাকেন , তার পেনশনের টাকায় ঐ বনের হেড স্টোকার কয়েক সপ্তাহ পরে পরে তাকে কিছু খাবার কিনে দিয়ে আসেন। তিনি আশা করেন সেখানেই তিনি একশো বছরের মত বাঁচবেন। তার কথা আমরা কেউ এই পৃথিবীতে থাকতে পারবো না। আমি আমার মৃত্যুর দিন পর্যন্ত এই নির্জনেই কাটিয়ে দিতে চাই।
বিবিসি অবলম্বনে : লিখেছেন মিলন মাহমুদ (ওয়ান বাংলা নিউজের সিনিয়র রিপোর্টার ) ।















