ফাইজারের করোনা ভ্যাকসিন নিয়ে হালাল-হারাম বির্তক! কোন পথে যাবো?

2013

শামছুল আলম মেহেদী: করোনাভাইরাসে ইতোমধ্যে বিশ্বে ১৫ লাখ ৭৫ হাজার মানুষ মারা গেছেন। আর আক্রান্ত হয়েছেন, ৭কোটি ৯৮ লাখ মানুষ। প্রতিদিনই বাড়ছে আক্রান্তের সংখ্যা সেই সাথে বাড়ছে মৃত্যুরও সংখ্যা। করোনাভাইরাস যে আজ শুধু মানুষে-মানুষে সংক্রমণে সীমাবদ্ধ তা নয়। করোনাভাইরাসের ভয়ানক ছোবল বিশ্বে অর্থনীতিকে আজ তছনছ করে দিয়েছে। অনেকসময় অনেক প্রতিকূলতার মুখোমুখি হতে হয়েছ বিশ্ব অথ্নীতিকে, সেগুলো সামলিয়ে আবার দ্রতগামী হয়েছে অর্থনীতি। কিন্তু এবার করোনাভাইরাস যে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে বিশ্ব অর্থনীতিকে,তা কাটিয়ে উঠতে অতিতের মতো এতোটা সহজ হবেনা এমনটাই বলছেন বিশ্বের অর্থনীতিবিদরা। শিক্ষা স্বাস্থ্য ও কৃষি থেকে শুরু করে একজন মানুষের জীবনে যতগুলো অতি গুরুত্বপূর্ণ এবং প্রয়োজনীয় বিষয় রয়েছে, তার সবগুলোতেই করোনাভাইরাসে প্রভাব পড়েছে।

করোনাভাইরাসের কারণে দেশে দেশে চাকুরী হারাচ্ছে মানুষ, দীর্ঘ হচ্ছে কর্মহীন মানুষের লাইন। কোনো মানুষকে যদি (দু’টি রাস্তা দেখিয়ে বলা হয়, এক রাস্তায় বাঘ আছে আর অন্য রাস্তায় করোনাভাইরাস আছে, আপনি কোন রাস্তা দিয়ে যাবেন?) প্রশ্ন করা হয়, তাহলে আমার মনে হয় বাঘ যে রাস্তায় সে রাস্তাই বেঁচে নেবে। করোনাভাইরাস এতোটাই আতংকিত করেছে আমাদের। সেই করোনাভাইরাস থেকে কবে আমরা মুক্তি পাবো আর মুক্তির পথইবা কতদূর? মনের মাঝে এমন সব প্রশ্ন নিয়েই আমাদের প্রতিটা সকাল শুর হয়। কখনো শুনি ভ্যাকসিন আসছে আবার কখনো শুনি ভ্যাকসিন আসতে বহুু বছর লেগে যাবে। এমন আশা আর নৈরাশার মাঝেই আমরা যখন ছিলাম, তখন সত্যি সত্যি আমাদের আশার আলো দেখালো ফাইজারের টিকা। গত ৮ নভেম্বর করোনাভাইরাসের প্রথম (ফাইজারের) টিকাটি নেন বৃটেনের ৯০ বছর বয়সী মার্গারেট কেনান। বলা হয়েছে, টিকাটি প্রথমে বয়স্কদের এবং তাঁর পাশাপাশি যারা ডাক্তার এবং নার্স তাদেরকেই দেয়া হবে। এর পরে পর্যায়ক্রমে সবাইকে দেয়া হবে। সরকারের এই উদ্যোগ কে সাধুবাদ জানাচ্ছে সবাই। কিন্তু আমাদের এশিয়ান কমিউনিটির অনেকেই ফাইজারের টিকাকে হালাল-হারামের সাথে নিয়ে গেছেন। সেই সাথে অনেকেই সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচার করছেন ফাইজারের টিকাটি হারাম! এতে হারাম কাঁচামাল ব্যবহার করা হয়েছে। ওষুধ কিভাবে হারাম হয় অবশ্য তার ব্যখ্যা দিতে পারছেন না। আমি ডাঃ নই কিন্তু যতোটুকু জানি, আমাদের খাবারের তালিকায় অনেক বৃক্ষ নেই, কিন্তু ওইসব বৃক্ষ দিয়ে ওষুধ তৈরি করা হয়, আমরা সে ওষুধ খেয়ে রোগ নিরাময় করে থাকি।

আবার অনেক পশু-পাখিও যেমন আমাদের খেতে মানা করা হয়েছে, কিন্তু বহুু কঠিন রোগের ওষুধও আবার এসব পশু-পাখি থেকে তৈরি হয়ে থাকে এবং আমরা তা সেবন করে থাকি। আমরা যখন রোগ নিরাময়ের জন্য ওষুধ সেবন করি তখন কি দেখি, ওষুধটি কি কি কাচামালের তৈরি? দেখিনা, কারণ যিনি অসুস্থ তিনি বুঝেন রোগের কি কষ্ট! সৃষ্টি কর্তার মেহেরবানি আর ওষুধের উছিলায় তখন তিনি কেবল সুস্থ হওয়ার প্রার্থনায় থাকেন।

আজ পৃথিবীতে মানুষের এই কঠিন সময়ে যখন ওষুধ বিজ্ঞানীরা আমাদের আশার আলো দেখালেন, পরীক্ষা-নীরিক্ষার করে জানালেন করোনাভাইরাসের টিকা আবিষ্কার করেছেন। তখন আমরা তাদের এই আবিস্কারের প্রতি কৃতজ্ঞতা না জানিয়ে উল্টো এর সমালোচনায় ব্যস্ত!

আমি যেহেতু কোন ইসলামিক স্কলার নই তাই এখানে আমি অনভিজ্ঞ। ওষুধে হারাম-হালালের ব্যবহার নিয়ে ধর্মীয় কোনো বিধিনিষেধ আছে কিনা এবং করোনাভাইরাস থেকে মানুষকে বাঁচাতে ফাইজারের এই টিকা নিয়ে হালাল হারামের এমন প্রশ্ন কেন, জানতে চেয়েছিলাম যুক্তরাজ্য প্রবাসী ইসলামিক চিন্তাবিদ ড. খায়রুজ্জামান নোমানের কাছে। তিনি বললেন, ফাইজারের করোনা ভ্যাকসিন নিয়ে আমি যতটুকু তথ্য সংগ্রহ করেছি, তাতে আমি দেখেছি এই ভ্যাকসিনে কোন পশুর চর্বি নেই। অহেতুক বির্তক হচ্ছে। তারপরও যদি থেকে থাকে আর আমাদের জীবন বাঁচানোর তাগিদে বিকল্প কিছু না থাকে তাহলে এটি জায়েজ।

ফাইজার টিকা নিবেন কি নিবেন না সিদ্ধান্তহীনতায় রয়েছেন এমন দু’জনের সাথে আমার কথা হলো। প্রথমজনের বয়স ৫১ বছর থাকেন পূর্ব লন্ডনে। তিনি আমাকে জানালেন, সোশ্যাল মিডিয়াতে তিনি দেখেছেন ‘ফাইজার’ টিকা হারাম। এখন তিনি কি করবেন তাঁর সিদ্ধান্ত নিতে পারছেন না। আর অপরজনের বয়স ৪৪বছর থাকেন ওয়েলসে। তিনি জানালেন, ফাইজার টিকা নিয়ে তার আরো বুঝার দরকার আছে। কি বিষয়ে কার সাথে বুঝবেন জানতে চাইলে, বললেন হালাল-হারাম এ বিষয়ে তিনি কোনো অভিজ্ঞ হুজুরের সাথে কথা বলে সিদ্ধান্ত নিবেন।

ফাইজারের করোনা ভ্যকসিন নিয়ে সবচেয়ে বেশি বির্তক হচ্ছে বাংলাদেশি ও পাকিস্তানি কমিউনিটির লোকজনের মধ্যে এমনটাই জানালেন যুক্তরাজ্য প্রবাসী তরুণ বাংলাদেশী আমিনুল ইসলাম। যিনি পেশায় একজন ব্যাবসাহী। ব্রিটেনে একখন্ড বাংলাদেশ খ্যাত ‘ব্রিকলেনে’ হেটে হেটে কথা হলো তাঁর সাথে। জানতে চাইলাম, ভ্যাকসিন নিয়ে কেন এই বির্তক। তিনি জানালেন, ভ্যাকসিনের সাথে ধর্মকে জড়ানোর ফলে অনেকের মধ্যে হালাল-হারাম নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। আসলে ওষুধ তো ওষুধই, রোগ নিরাময়ের জন্য আমরা ভ্যাকসিন নিতে পারি। সেখানে হালাল না হারাম এমন প্রশ্ন অবান্তর।

তিনি জানালেন, এই অপপ্রচারের বিরুদ্ধে বিলেতের সাংবাদিক এবং কমিউনিটির ব্যক্তিবর্গরা ক্যাম্পেন শুরু করেছেন। তার কথার সূত্র ধরে আমি যোগাযোগকরলাম, বিলেতের প্রবীণ সাংবাদিক এবং ব্রিটিশ বাংলা প্রেসক্লাবের সভাপতি কে এম আবুতাহের চৌধুরীর সাথে, যিনি বিলেতের বহু সামাজিক সংগঠনের সাথে যুক্ত। আমি তাঁর কাছে জানতে চাইলাম, ফাইজারের করোনা ভ্যাকসিন নিয়ে যে ভুল তথ্য দেওয়া হচ্ছে মানুষকে, সেখানে সঠিক তথ্য দিয়ে কমিউনিটির মানুষকে সচেতন করতে বিলেতের বাংলা মিডিয়া গুলো কি অবদান রাখছে?

তিনি জানালেন, বিলেতের বাংলাদেশী কমিউনিটির সাথে বাংলা মিডিয়া গুলোর সম্পর্ক সবসময়ছিলো বর্তমানে আছে আগামীতে থাকবে। কমিউনিটির মানুষের সুখে-দুঃখে বাংলা মিডিয়ার যে সেতুবন্ধন তা বহুকালের। বর্তমান সময়ে ফাইজারের করোনা ভ্যাকসিন নিয়ে আমাদের কমিউনিটির মানুষকে যারা ভুল তথ্য দিয়ে বিভ্রান্তি করছেন, আমরা তার বিরুদ্ধে সঠিক তথ্য দিয়ে সচেতন করার চেষ্টা করছি। পাশাপাশি আমাদের যেসব কমিউনিটি সংগঠন রয়েছে সেখান থেকেও আমরা সচেতনতা তৈরিতে ক্যাম্পেইন চালিয়ে যাচ্ছি।

ফাইজারের করোনা ভ্যাকসিনে হারাম পশুর চর্বি রয়েছে এমন বার্তা অনেকেই দিচ্ছেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। যার ফলে
বিশেষ করে মুসলমানদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছ। এবিষয়ে কে এম আবুতাহের চৌধুরী জানালেন, এটি সম্পন্ন মিথ্যা এবং অপপ্রচার। ফাইজারের করোনা ভ্যাকসিন নিয়ে আমি যেটুকু তথ্য সংগ্রহ করেছি তাঁর কোথাও ‘হারাম পশুর চর্বি ‘ রয়েছে এমন দাবির সত্যতা পাইনি। তিনি জানালেন, ফাইজারের করোনা ভ্যাকসিন নিয়ে যে মিথ্যা অপপ্রচার করা হচ্ছে, তা আরো পরিস্কারভাবে সঠিক তথ্য গুলো তোলে ধরছে, British Islamic medical Association. যারা ভ্যাকসিন নিয়ে বিভ্রান্তি মধ্যে আছেন, তারা যে কোনো সময় এই সংগঠনের ওয়েবসাইটে গিয়ে নিজের সন্দেহটা দূর করতে পারেন।
করোনাভাইরাসে আমরা অনেকে আমাদের প্রিয়জনকে হারিয়েছি, হারিয়েছি বহুু পরিচিত মুখ। এখনো অনেকে আক্রান্ত। আমাদের এমন দুঃসময়ে যারা মিথ্যা অপপ্রচার করছেন তা সত্যি দুঃখজনক। এমন বিভ্রান্তিকর তথ্যের আদান-প্রদান থেকে বিরত থাকার আহবান জানান তিনি।

এখানে আমার কৃতজ্ঞতা না জানালেই নয় বিশেষ করে যারা এই অপপ্রচারের বিরুদ্ধে সচেতনতা তৈরিতে ক্যাম্পেইন করে যাচ্ছেন তাদের প্রতি।
এখানে পাঠকের অবগতির জন্য জানাচ্ছি আমার লেখাটি যখন প্রায় শেষের দিকে চলে আসছিলো তখন জানতে পারলাম, ফাইজারের করোনা ভ্যাকসিন গ্রহণের পর দু’জনের শরীরে অ্যালার্জিজনিত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া দেখা দেওয়ার পরই কিছু সতর্কবার্তা জারি করা হয়েছে। সতর্ক বার্তায় বলা হয়েছে, যাদের গুরুতর অ্যালার্জি রয়েছে তাদের ফাইজার-বায়োএনটেকের টিকা গ্রহণ করা উচিত হবে না।
তবে এ বিষয়ে ফাইজারের বক্তব্য হচ্ছ, ‘যারা টিকা পেয়েছেন, তাদের মধ্যে দু’জনের অ্যালার্জির মতো প্রতিক্রিয়া হয়েছে। কেন তা হয়েছে, তা জানতে এনএইচএস’র তদন্তে আমরা সব রকম সাহায্য করব। তবে আমরা ৪২ হাজার স্বেচ্ছাসেবককে দুটি করে পরীক্ষামূলক ডোজ দিয়েছিলাম। তাদের কারোরই কোনও বিপজ্জনক প্রতিক্রিয়া হয়নি।

তবে আমার মনে, অ্যালার্জিজনিত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নিয়ে তেমন বিচলিত হবার কেছু নেই আমাদের। এর কারণ হলো, অ্যালার্জিজনিত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আমাদের বহু কারণে হতে পার। যেমন অ্যালার্জিজনিত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া কারণে আমরা বহুু খাবার থেকেও বিরত থাকতে হয়। আমরা যখন অসুস্থ হয়ে ডাক্তারের কাছে যাই, তখন অ্যালার্জিজনিত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া আছে কিনা তা জিজ্ঞেস করেই ডাক্তার আমাদের ওষুধ দিয়ে থাকেন। কেননা অ্যালার্জিজনিত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কারণে একজন অসুস্থ রোগীর
মৃত্যুও হতে পারে।

আমাদের জন্য করোনা ভ্যাকসিন যেহেতু তারা আবিষ্কার করতে পেরেছেন, তাই আশা করতে পারি অ্যালার্জিজনিত পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার সমাধানও তাঁরা বের করতে পারবেন।
যাইহোক ফিরে আসি মূল প্রসঙ্গে। ফাইজারের করোনা ভ্যাকসিন নিয়ে এতো মিথ্যাচার কেন? কেনইবা ওষুধের মতো এমন একটি স্পর্শকাতর বিষয় নিয়ে সোস্যাল মিডিয়াতে এই অপপ্রচার?
আরো কিছু জানার আগ্রহ থেকে কথা বলেছিলাম, University of the West of England UWE এ আইন তৃতীয় বর্ষে অধ্যায়নরত বাংলাদেশী আনোয়ার হোসেন এর সাথে। তিনি বললেন, বর্তমান সময়ে করোনা ভ্যাকসিন অপরিহার্য একটি আবিষ্কার। আমার মনে হয় যারা এর বিপরীতে সোস্যাল মিডিয়াতে অপপ্রচার করছেন তারা শুধুমাত্র তাদের পোস্টে লাইক ফলো বাড়াতেই এটি করছেন। এছাড়া অজ্ঞতাপ্রসূত কারণে ও তা হতে পারে। যেমন আমাদের সমাজে কিছু কিছু মানুষ আছেন, যারা গুজব ছড়িয়ে মজা পান। আবার দেখবেন, ফাইজারের এই করোনা ভ্যাকসিন একসময় অপপ্রচাকারীরাও নিবে।

তার যুক্তি শুনে আমি না হেঁসে আর পারলাম না, যেসকল বুদ্ধিমানরা লক্ষ লক্ষ লাইক আর শেয়ার পাওয়ার আশায় মিথ্যা অপপ্রচার করছেন তাদের বিবেকের কাছে কোনো প্রশ্ন রাখতে আমার বিবেক সায় দিলোনা। বরং যারা বিবেকবান আজ মিথ্যা অপপ্রচারের কাছে বিভ্রান্ত হচ্ছেন তাদেরকে বলবো, নিজের বুদ্ধি নিজের বিবেক কাটিয়ে চিন্তা করুণ, লাইক আর শেয়ার পাগলদের পাল্লায় যেন আমরা না পড়ি। আমাদের সিদ্ধান্ত আমাদেরকেই নিতে হবে আমরা ‘কোন পথে যাবো’

শামছুল আলম মেহেদী
যুক্তরাজ্য প্রবাসী সাংবাদিক ও সংবাদ বিশ্লেষক
samsulmehedi@hotmail.com