ঢাকা সংবাদদাতা: পেঁয়াজ সিন্ডিকেট ও লবণ নিয়ে গুজবের পর চালের দাম বাড়ায় উদ্বিগ্ন খাদ্য মন্ত্রণালয়। পেঁয়াজ ও লবণের মতো চাল নিয়েও ‘চালবাজি’র শঙ্কায় মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার ও কর্তাব্যক্তিরা।
এ অবস্থায় চালকল মালিক ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠক করে দাম না বাড়ানোর আহ্বান জানাচ্ছেন খাদ্যমন্ত্রী। সবাইকে আশ্বস্ত করছেন দেশে চালের পর্যাপ্ত মজুদ আছে। ১০ দিন ধরে পরিবহন ধর্মঘট চললেও দাম বাড়বে না। এরপরও যদি কেউ কারসাজি করে দাম বাড়ায় তবে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে বলে হুশিয়ারি দেন তিনি।
দলীয় অনুষ্ঠান যোগদান শেষে বুধবার নওগাঁ থেকে ঢাকায় ফিরে মিলারদের সঙ্গে বৈঠকে বসেন খাদ্যমন্ত্রী। বৈঠকের শুরুতেই সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলেন। এসময় বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, চাল নিয়ে কেউ চালবাজির চেষ্টা করলে তাদের ছাড় দেয়া হবে না। কঠোর হাতে দমন করা হবে।
প্রশ্নের উত্তরে বাংলাদেশ অটো, মেজর ও হাস্কিং মিল ওনার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আবদুর রশিদ বলেন, ‘মিল মালিকদের পক্ষ থেকে চ্যালেঞ্জ করলাম, কোনো কারসাজি করে দাম বাড়ানো হয়নি। প্রাকৃতিক দুর্যোগের কারণে ধানের আমদানি কম হওয়ায় দাম বেড়েছে। তবে বাজার এখন স্থির হয়ে আসছে। আমন ধান উঠলে এ রকম হতো না।
মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, খাদ্যমন্ত্রী তার নির্বাচনী এলাকায় নওগাঁয় গিয়ে কয়েক দিন থাকার কথা। এজন্য ১৭ নভেম্বর চালকল মালিক ও ব্যবসায়ীদের সঙ্গে বৈঠক করেন। কিন্তু মঙ্গলবারের লবণ নিয়ে গুজব ও অঘোষিত পরিবহন ধর্মঘটের কারণে তিনি তড়িঘড়ি ঢাকায় ফেরেন।
বুধবারই জরুরিভিত্তিতে চালকল মালিকদের সঙ্গে বৈঠকে বসেন। দুই মিটিংয়ে তিনি চালের দাম না বাড়ানোর জন্য ব্যবসায়ীদের আহ্বান জানান। বৈঠকে ভারপ্রাপ্ত খাদ্য সচিব ওমর ফারুক ও খাদ্য অধিদফতরের মহাপরিচালক মোছাম্মৎ নাজমানারা খানমসহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
সভার শুরুতেই সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের উত্তরে খাদ্যমন্ত্রী সাধন চন্দ্র মজুমদার বলেন, সড়ক পরিবহন আইন সংশোধনের দাবিতে পরিবহন মালিক-শ্রমিকরা ধর্মঘট করছেন। তিনি বলেন, ‘সাত দিনও যদি পরিবহন ধর্মঘট থাকে, ১০ দিনও যদি থাকে তাতে কোনো সমস্যা হবে না। বাবুবাজারে যে স্টক থাকে, বড় বড় বাজারে যে স্টক আছে, ঢাকার বাজারে বিন্দুমাত্র প্রভাব পড়বে না। যদি কেউ কারসাজি না করে তবে ৩-৪ দিন কেন, ১০ দিন পরিবহন বন্ধ থাকলেও প্রভাব পড়বে না।’
পরিবহন শ্রমিকদের ‘স্বেচ্ছাকর্মবিরতি’তে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল ও উত্তরের বেশ কিছু জেলায় গত দু’দিন ধরেই বাস চলাচল বন্ধ ছিল। বুধবার সকাল থেকে ঢাকা-চট্টগ্রাম, ঢাকা-সিলেট ও ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কেও দূরপাল্লার বাস চলাচলে বাধা দেয়া হচ্ছে। এর মধ্যেই সারা দেশে শুরু হয়েছে ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান ধর্মঘট। ফলে পণ্য পরিবহনে বড় ধরনের সমস্যায় পড়তে হচ্ছে ব্যবসায়ীদের।
ধর্মঘটের পর খুচরা বাজারে মিনিকেট চালের দাম ৩ থেকে ৪ টাকা বেড়েছে। বিষয়টি স্বীকার করে খাদ্যমন্ত্রী বলেন, ‘এই দাম বৃদ্ধির যৌক্তিক কোনো কারণ নেই। কারণ মজুদের কোনো ঘাটতি নেই, আমদানির কোনো প্রয়োজন নেই, বরং রফতানি করা জন্য আমরা প্রস্তুত।’ দাম না বাড়ানোর জন্য কি ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে- এমন প্রশ্নের উত্তরে সাধন মজুমদার বলেন, ‘কেউ যেন চালের দাম বাড়ানোর চেষ্টা করতে না পারে, সেজন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে চিঠি দেয়া হয়েছে।
ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদফতর ও বাণিজ্য মন্ত্রণালয়কেও বলা হয়েছে। যদি অনাহূত কেউ চালের দাম বাড়াতে চায়, তাহলে কোনো ক্রমেই সহ্য করা হবে না। প্রশ্রয়ও দেয়া হবে না। সময় বলে দেবে, আর কী কী ব্যবস্থা নেব।’ তার মতে, ২৬-২৭ টাকার মোটা চাল খুচরা বাজারে ৪ থেকে ৫ টাকা বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। এতে ভোক্তাদের ‘আঁতে ঘা’ লেগেছে। সরকার এটা চলতে দেবে না।
চাল ব্যবসায়ীদের উদ্দেশে খাদ্যমন্ত্রী বলেন, পাইকাররা প্রতি কেজি চালে ৫০ পয়সার বেশি লাভ করতে পারেন না। এর বেশি করলে দেশ ও জনগণকে শোষণ করা হবে। এটাও সহ্য করা হবে না। খুচরা বাজার আপনাদের কন্ট্রোল করতে হবে, মনিটরিং করতে হবে। সরকারি গুদামে ১১ লাখ ১২ হাজার ৬৭৪ টন চাল মজুদ আছে এবং চাল ও গম মিলিয়ে মজুদের পরিমাণ ১৪ লাখ ৫৯ হাজার টন। ‘চালের দাম আর বাড়বে না’- এমন শপথ নিতে ব্যবসায়ীদের আহ্বান জানান সাধন চন্দ্র মজুমদার; যিনি নিজেও পারিবারিক সূত্রে ধান-চালের ব্যবসায় জড়িত।
এ সময় এক সাংবাদিক খাদ্যমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করে বলেন, মন্ত্রী কথা বললে পরদিন দাম আরও বাড়ে- এমন একটি কথা প্রচলিত আছে। জবাবে খাদ্যমন্ত্রী বলেন, ‘গতবারের চেয়ে ধানের দাম কম, তাই চালের দামও কম হবে- এটাই কথা। কৃষক দাম পাবে না, মধ্যস্বত্বভোগী বেনিফিট বেশি নেবে- এটা চলতে দেয়া যাবে না।’ দাম যতটা বেড়েছে তা কমতে কতদিন লাগবে এমন প্রশ্নে মন্ত্রী বলেন, ‘এখন থেকে যেন না বাড়ে সেজন্য মিটিং করা হচ্ছে।’














