মিলন মাহমুদ: বাংলাদেশে সরকারের জন্য এখন বেশ কঠিন একটা প্রশ্ন সামনে এসেছে যে সরকার কি ভারতের দিকে থাকবে না চীনের দিকে ঝুকে পড়বে? দুই নৌকায় পা দিয়ে যেমন চলা যায় না তেমনি বর্তমান ও ভবিষ্যতে দুই দেশের সাথেই সমান সম্পর্ক রেখে দেশের উন্নয়ন ও সরকারের টিকে থাকা অসম্ভব হয়ে দাঁড়াবে।
অর্থনৈতিক দিক দিয়ে যদি আমরা ভারত বাংলাদেশের ব্যাবসার অবস্থা দেখি আমরা দেখতে পাই ২০১৮-২০১৯ অর্থ বছরে ভারত আমাদের দেশে রপ্তানি করেছে ৯.২১ বিলিয়ন ডলারের পণ্য যার বেশির ভাগই কৃষি পণ্য। ওপর দিকে আমাদের দেশ থেকে আমদানি করেছে মাত্র ১.০৪ বিলিয়ন ডলারের পণ্য। অর্থাৎ প্রায় নয় ভাগের একভাগ।
অন্যদিকে চীন আমাদের দেশে রপ্তানি করেছে ১৩৬৩৮ মিলিয়ন ডলারের পণ্য যার অধিকাংশই গার্মেন্টস এর কাঁচামাল ,ইলেক্রনিক্স ও যন্ত্র পাতি আর বাংলাদেশ থেকে আমদানি করেছে ৫৬৮ মিলিয়ন ডলারের পণ্য। এদিক দিয়ে বাংলাদেশ বাণিজ্যে ভারতের সাথে বাণিজ্যের চাইতে চীনের সাথে বাণিজ্যে বেশ ভালো অবস্থানে আছে। সম্প্রতি চীন তার বাজারে ৫১৬১ টি পণ্যের শুল্ক মুক্ত বাণিজ্যের যে সুযোগ দিয়েছে এর ফলে বাংলাদেশের রপ্তানি কারকেরা শতকরা ৯৭ ভাগ পণ্য বিনা শুল্কে চিনে রপ্তানির সুযোগ পাবেন । ফলে বাংলাদেশ দারুন ভাবে লাভবান হবে। ভারত এইধরনের এত বেশি সুযোগ কখনোই বাংলাদেশ কে দিবে না কারণ ভারতের বাণিজ্য নীতি মূলত সংরক্ষণ বাদী ও বাংলাদেশের পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে তারা নানা রকম কর আরোপ করে থাকে।
অতীত অর্থনৈতিক সাহায্য ও উন্নয়নের হিসাব করলে দেখা যাবে সরকার যদি নেপাল ও পাকিস্তানের মত সরাসরি চীনের দিকে ঝুকে পরে তাহলে অর্থনৈতিক ভাবে অনেক বেশি লাভবান হবে। বেকার সমস্যা সমাধান, শিল্প ও বাণিজ্য সুযোগ সহ সবকিছুতেই ভালো অবস্থানে থাকবে। যেমন পদ্মা সেতু , তিস্তা বাঁধ সহ অনেক বড় বড় উন্নয়নে চীনের সহায়তা পাবে। তবে ঋণের ক্ষেত্রে সরকারকে অর্থের সঠিক ব্যাবহার নিশ্চিত করতে হবে । উন্নয়নের মূল বাধা এখন সীমাহীন দুর্নীতি বিশেষ করে সরকারি ভাবে নির্মাণ ও কেনাকাটার ক্ষেত্রে । চীনের সাহায্য নিয়ে সরকারের সঠিক ব্যাবস্থাপনায় দেশে বেকারত্ব ,ও দুর্নীতি কমে গেলে সাধারণ মানুষ ও চাইবে এই সরকার ক্ষমতায় থাকুক।
ওপর দিকে ভারতের প্রতি জনগণের বিশাল এক অংশের মানুষের মনভাব নেগেটিভ । বিরোধী দলগুলো এই বিশাল ভারতবিরোধী জনসমর্থন তাদের মূল শক্তি হিসাবে দেখেন । বিতর্কিত নাগরিকত্ব সংশোধন আইন (CAA ) মুসলমানদের উপর অত্যাচার, সামান্য কারণে সীমান্ত হত্যা, তিস্তার পানি বন্টনে অনীহা , ফারাক্কার বিরূপ প্রভাব সহ নানা কারণে জনমত ভারতের বিরুদ্ধে তাই সুযোগ পেলেই ভারত নিয়ন্ত্রিত সরকারবাবস্থার বা ক্ষমতার রদবদল তারা দেখতে বা করতে চাইবে। সেই ক্ষেত্রে বিরোধী দল বা সেনাবাহিনী চীনের সহযোগিতা পেলে সরকারের শুধুমাত্র ভারত ও প্রশাসন নির্ভরতা দিয়ে টিকে থাকা মুশকিল হবে ।
অপরদিকে সরকার চীনের দিকে ঝুকে গেলে ভারতবিরোধী বিশাল একটা জন গোষ্ঠী এই সরকারকে সমর্থন দেবে। দেশের অর্থনীতি বদলে যাবে। বাংলাদেশের বন্ধুত্ত্ব ও সহযোগিতা করবে বলে ভারত মুখে বললেও কার্যত কখনোই সেরকম নীতি দেখায় নাই । যার জন্য দেশের উন্নয়নের জন্য বঙ্গ বন্ধু স্বাধীনতার পর ভারত এর থেকে চীনের দিকে ঝুকে পড়তে চেয়েছিলেন এবং চীনের অনুসরণে একদলীয় শাসন ব্যাবস্থা কায়েম করতে চেয়েছিলেন।
ইতমধ্যে ভারত চীনের দেয়া বাংলাদেশের জন্য ঋণ ও অর্থনৈতিক সুবিধা কে ঋণের ফাঁদ বলে প্রচার করতে শুরু করেছে এবং আমাদের দেশের এক শ্রেণীর পত্রিকা তাদের সেই প্রচারের কাজ চালিয়ে যাচ্ছে । অথচ ইন্ডিয়ার নিজেরই বর্তমান বৈদেশিক ঋণের পরিমান ৫৬৫ বিলিয়ন ডলার আর বাংলাদেশের মাত্র ৩৭ বিলিয়ন ডলার। ইন্ডিয়া নিজেও আমাদের ঋণ দিচ্ছে এবং সেটা শর্ত সাপেক্ষে যেখানে তারাই সেই ঋণের কাজ বা ব্যাবহার করবে । এটাকে তারা অবকাঠামো উন্নয়নের কথা বলছে কিন্তু স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার ক্ষেত্রে তাদের নিজেদের নীতি অনুযায়ী চলছে । এক্ষেত্রে চীন কিন্তু অনেক এগিয়ে ,পদ্মা সেতু, বিভিন্ন রাস্তা ও ব্রিজ নির্মাণে চীনের ঋণ ও অবকাঠামো নির্মাণের জন্য অনুদান সরকারের জন্য অনেক সুফল বয়ে এনেছে ।
রাজনৈতিক দিকে যদি আমরা দেখি তাহলে দেখতে পাই ,ভারত এর সাথে বর্তমান সরকার তাদের অতি ঘনিষ্ট সম্পর্ক টিকিয়ে রাখলে মূলত ক্ষমতায় থাকার জন্য ভারতের একধরণের অলিখিত নিশ্চয়তা ও সমর্থন অব্যাহত ভাবে পাবে । ইন্ডিয়া বাংলাদেশের জনগণের বন্ধু এই কথা খুব কম সংখ্যাক বাংলাদেশী এখন বিশ্বাস করেনা। কিন্তু চীনের দিকে ঝুকে গেলে তখন বন্ধু ভারত রাতারাতি শত্রূ তে রূপ নিয়ে নানা ধরণের সমস্যা ও প্রোপাগান্ডার সৃষ্টি করবে ফলে সরকারের ক্ষমতা ছাড়তে হব। মনে রাখতে হবে ভারত শুধু সরকার প্রধানের উপর নির্ভর করে নেই তারা বিভিন্ন বাহিনী ও পোস্ট এ তাদের মনোনীত লোকদের বসিয়ে রেখেছে। এবং যে কোনো মূল্যে তাদের দেশের জন্য বিশাল বাজারের এই দেশের নিয়ন্ত্রণ তারা বজায় রাখার শেষ চেষ্টা করবে।তাই শেখ হাসিনা ইচ্ছা করলেই ভারত ছেড়ে চট করে চীন পন্থী হাতে পারবেন ন। তিনি যদিও সেটা করতে চেষ্টা করেন তাহলে ভারতের কাছে শত্রূ হয়ে যাবেন । এ ছাড়া ভারত সরকারের পরীক্ষিত বন্ধু , যারা যে কোন পরিস্থিতে এই সরকারকে টিকিয়ে রাখতে কাজ করে যাচ্ছে সেই বিষয়টাও সরকারের মাথায় আছে।
অপরদিকে চীনের সাথে সম্পর্ক কমিয়ে ভারত মুখী নীতি বজায় রাখলে চীন অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক ভাবে সরকারের উপর চাপ সৃষ্টি করবে। সেনাবাহিনীতে চীনের প্রভাব এবং বিরোধী দলকে মৌন সমর্থন দিয়ে চীন তখন সরকার পরিবর্তন করে তার দেশের স্বার্থ ও ভারত পরবর্তী ক্ষমতা গ্রহণকারী অনুসারীদের ক্ষমতায় দেখতে চাইবে। ভারত বিরোধী জনগণের বড় একটা অংশে বিদেশী সমর্থন পেলে সরকারের ক্ষমতায় বেশিদিন থাকা সম্ভব হবে না।
সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনা করলে বাংলাদেশ চীনের সাথে গেলেই উন্নতি করবে। সেই ক্ষেত্রে চীন বাংলাদেশ এর সরকারের স্থিতিশীলতার গ্যারান্টি দিতে হবে এবং বিপুল বিনিয়োগের ব্যবস্থা করতে হবে । বর্তমান সরকার উন্নয়নের স্বার্থে চীনের সাথে যাওয়া মানে ভারতের সাথে শত্রু হয়ে যাওয়া। কিন্তু ভারতের সাথে বন্ধু হয়ে সরকার দেশের উন্নতি করতে পারবে সে আশা কম
কারন ভারত তার দেশের স্বার্থের বেলায় প্রতিবেশীকে কোন ছাড় দেয় না ।
সরকারের জন্য কিন্তু এখনই সময় এসেছে সঠিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের যা সরকারকে দীর্ঘ মেয়াদে স্থিতিশীল, জনপ্রিয় ও বেকার সমস্যা সমাধানের সুবর্ন সুযোগ এনে দেবে । এবং সেটা হবে চীনের দিকে সরাসরি ঝুকে পড়া যেমনটি করেছে ভারতের পাশের দেশ নেপাল ও পাকিস্তান ।















