এ লেভেল’র গ্রেড নির্ণয়ে জগাখিচুড়ি পদ্বতি ও টোরি’র অভিজাত প্রীতি

713

ডক্টর এম মুজিবুর রহমান: এক: বিলেতের রাষ্ট্র ও সমাজে বিদ্যমান আইনের শাসন ও প্রাতিষ্ঠানিক গণতন্ত্র বিশ্বের অনেক দেশের জন্য অনুকরণীয়। পুরো সমাজ বা রাষ্ট্র ব্যবস্থা বর্ণবাদ ও বৈষম্যকে উৎসাহিত না করলেও এসব দেশের বিভিন্ন সেক্টরে প্রাতিষ্ঠানিক বর্ণবাদ বা বৈষম্যের সম্মুখীন হতে হয় অনেককে। বিশ্বব্যাপী করোনা দূর্যোগে অনেকেই অকালে হারিয়েছেন তাদের আপনজন। করোনাতে ইউরোপ ও আমেরিকায় BAME (ব্ল্যাক, এশিয়ান, মাইনোরিটি এথনিক) গ্রূপের উপর এর প্রভাব বেশি লক্ষ্য করা যায়। করোনাতে ভয়াবহ মন্দার কবলে পড়তে পারে অনেক দেশের অর্থনৈতিক কাঠামো। এর সাথে এখন যোগ হয়েছে শিক্ষাক্ষেত্রে এ লেভেলে’র ফল বিশৃঙ্খলা। বিভিন্ন মিডিয়াতে এই ফল বিশৃঙ্খলা নিয়ে ধারাবাহিক রিপোর্ট ও বিশেষজ্ঞদের মতামত প্রকাশিত হচ্ছে। করোনার মতো এক্ষেত্রেও সুবিধাবঞ্চিত একটা প্রজন্মকে অনেক দূর পিছিয়ে দিবে বলে মনে করা হয় । করোনার ক্ষেত্রে বৈজ্ঞানিক কিছু যুক্তি দাঁড় করানো গেলেও শিক্ষায় বৈষম্যমূলক প্রভাবের কারণ কি ? তাই লন্ডনে সিক্সথ ফর্ম ও কলেজে পড়ানোর অভিজ্ঞতা থেকে এই ফল বিশৃঙ্খলা ও বিপর্যয় নিয়ে কিছু আলোকপাত করার প্রয়োজনীয়তা অনুভব করি। ফল বিশৃঙ্খলা ও বিপর্যয় নিয়ে পর্যালোচনার পূর্বে বিলেতের অভিজাত শ্রেণী ও পারিপার্শ্বিক অবস্থা নিয়ে কিছুটা আলোচনার প্রয়োজন রয়েছে ।

ক্ষমতাসীন টোরিদের (কনজারভেটিভ) সব সময় অভিজাত শ্রেণীর স্বার্থ রক্ষাকারী আর বিরোধী লেবারকে সংখ্যালঘু ও সুবিধাবঞ্চিত মানুষের পক্ষের দল হিসেবে সাধারণ একটা উপলব্দি রয়েছে। ঐতিহাসিকভাবে এর কারণও রয়েছে। তবে টোরি সরকার ও দলে এখন সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের অনেকেই বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করছেন । অন্যদিকে লেবারে বিশ্বখ্যাত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান থেকে ডিগ্রিধারীরাও দায়িত্ব পালন করছেন। ইউরোপসহ বিভিন্ন দেশে হাজার বছরের অধিক সময় ধরে রাজতান্ত্রিক শাসন কাঠামোতে রাজা/রাণীর সহযোগী যুদ্ববাজরা পর্যায়ক্রমে সমাজ ও রাষ্ট্র ব্যবস্থায় একটা অভিজাত শ্রেণী হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছে । প্রজাতান্ত্রিক গণতান্ত্রিক শাসন ব্যবস্থার পূর্বে রাজা/রাণী কর্তৃক অন্য দেশ দখলের পর তাদের সহযোগী যুদ্ববাজদের একেকটি অঞ্চল ভাগ করে শাসনের দায়িত্ব দেয়া হতো । কালের পরিক্রমায় তারাই লর্ড বা অভিজাত শ্রেণী হিসেবে রাষ্ট্র ও সমাজে নীতি নির্ধারকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয় । আধুনিক বিশ্বে মধ্যপ্রাচ্যের আরবের কিছু দেশ ব্যাতিত সেই অর্থে এখন আর রাজতান্ত্রিক শাসন কাঠামো বিদ্যমান নেই। তবে হাজার বছরের অধিক সময়ের লিগাসিকে পুঁজিবাদী শাসন কাঠামো সফলভাবে বহন করে চলছে । রাজতান্ত্রিক শাসন কাঠামোর অংশীদার যুদ্ববাজ গোষ্ঠী সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে আধুনিক শিক্ষা ও ব্যবসাতে সুদৃঢ় অবস্থান ধরে রাখায় বংশ পরম্পরায় রাষ্ট্রের শাসন কাঠামোতে স্থায়ী আসন গেড়ে বসেছে।

ডারউইনের তত্ত্ব মতে যোগ্যতমেরাই ঠিকে থাকে (সার্ভাইভ্যাল অফ দি ফিটেস্ট)। বিলেতের খ্যাতনামা প্রাইভেট শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো এখনো সেই তথাকথিত অভিজাত বা এলিটদের দখলে। শিক্ষা সরঞ্জাম, শিক্ষক/ছাত্র অনুপাত, মেধাবী ছাত্র ও শিক্ষকের সান্নিধ্য ইত্যাদি কারণে প্রাইভেট স্কুল বা কলেজের শিক্ষার্থীরা অনেক ক্ষেত্রে রাষ্ট্রচালিত শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের চেয়ে মেধা ও ফলাফলে এগিয়ে থাকে। স্বাভাবিক কারণেই বিলেতের বিশ্বসেরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে ইটোনিয়ানদের দাপুটে অন্যরা তেমন ভিড়তে পারে না। অর্থ, বিত্ত ও সামাজিক অবস্থানের কারণে সুবিধাপ্রাপ্ত অভিজাত শ্রেণীর সাথে টেক্কা দিয়ে ইটনসহ প্রাইভেট স্কুল বা কলেজে সুবিধাবঞ্চিতরা খুব কমই সুযোগ পান। টাকা দিয়ে জ্ঞান অর্জন হয় না কথাটি সত্য হলেও, মেধাকে বিকশিত করার সমান সুযোগ সবাই পায় না। অবস্থাসম্পন্ন মানুষেরা যদি তাদের ফর্চুনকে জ্ঞান বিজ্ঞানের আলোয় আলোকিত করার কাজে ব্যবহার করে তাহলে তাদের সাথে পেরে উঠা এতো সহজ নয়। বিলেতে এ যাবৎ যতো প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হয়েছেন তার অর্ধেকই ইটনের ছাত্র ছিলেন । তাই সময়ের পরিবর্তনের সাথে মেধা ও জ্ঞানভিত্তিক সমাজ কাঠামোতেও অভিজাত বা এলিটদের অবস্থান এখনো অনেক সুসংহত।

সুবিধাবঞ্চিত গোষ্ঠীটি দীর্ঘকাল মেধার পরিপূর্ণ বিকাশে পিছিয়ে থাকার কারণে বিলেতের এলিটদের চেয়ে পিছিয়ে রয়েছে । মেধার অসম প্রতিযোগিতার সাথে রয়েছে প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্য। কিছুদিন পূর্বেও বিশ্বসেরা অক্সফোর্ড, ক্যামব্রিজে শুধু মেধা দিয়ে সুবিধাবঞ্চিতরা অকপটে পড়তে পারবে সেই সুযোগ ছিল না। অভিজাত বা এলিটদের স্বার্থরক্ষায় অঘোষিত কিছু নিয়ম সেখানে মেনে চলা হতো । সময়ের ব্যবধানে অবস্থার পরিবর্তন হচ্ছে। বহু বর্ণ ও বহুসংস্কৃতির সহাবস্থান দিনকে দিন ব্রিটেনকে শক্তিশালী ও মর্যাদার আসনে আসীন করছে। পুঁজিবাদী শাসন কাঠামো শ্রেণী বৈষম্য ঠিকিয়ে রাখতে সহায়ক হলেও বিলেতে তুলনামূলকভাবে অভ্যন্তরীণ সুশাসন ও কল্যাণকর রাষ্ট্র কাঠামো বিদ্যমান থাকায় সংখ্যালঘু ও সুবিধাবঞ্চিত নতুন প্রজন্ম মেধার প্রতিযোগিতায় অধিক সুবিধাপ্রাপ্ত এলিটদের সাথে ব্যবধান কমিয়ে আনছে । যদিও এখনো অনেক পথ পাড়ি দিতে হবে।

দুই:

বিলেতে করোনা মহামারীর প্রাদুর্ভাবের কারণে গত মার্চ মাসে সকল শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের ক্লাস ও পরীক্ষা বন্দ্ব করে দেশব্যাপী লকডাউন ঘোষণা করা হয়। তাই এবারের জিসিএসই ও এ লেভেলের ছাত্র/ছাত্রীদের পরীক্ষা ছাড়াই গ্রেড নির্ধারণের সিদ্ধান্ত হয়। এই গ্রেড নির্ধারণে রেগুলেটরি বডি (অফকুয়েল) একটা নীতিমালা প্রণয়ন করে। ক্লাস শিক্ষকের মূল্যায়ন ও ক্রম তালিকা অনুসরণ করে স্কুল/কলেজের বিগত পরীক্ষার ফলাফল দিয়ে কম্পিউটারে এলগোরিদম মডেলের মাধ্যমে গ্রেড নির্ণয় করা হয় বলে জানানো হয়। কিন্তু স্কটল্যান্ডে ফলাফল ঘোষণার পর এই মডেলের ব্যর্থতা ধরা পরে। প্রচন্ড সমালোচনার মুখে তাৎক্ষণিকভাবে শিক্ষকদের মূল্যায়নকে প্রাধান্য দিতে বাধ্য হোন সেখানকার ফার্স্ট মিনিস্টার।

এর পর গত ১৩ আগস্ট বৃহস্পতিবার ইংল্যান্ড, ওয়েলস এবং নর্দার্ন আয়ারল্যান্ডে এ লেভেলের ত্রূটিযুক্ত ফলাফল ঘোষণার মাধ্যমে সুবিধাবঞ্চিত জাতিগত সংখ্যালঘু একটি প্রজন্মকে উন্নততর জ্ঞানচর্চা থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন । আগামী ২০ আগস্ট জিসিএসই’র ফলাফল ঘোষণা করা হবে। একই পদ্বতি অনুসরণ করে গ্রেড নির্ধারণ করা হবে বিধায় সেখানেও ফল বিপর্যয় ও বিশৃঙ্খলা যে দেখা দিবে তাতে কোনো সন্দেহ নাই। বিবিসি, গার্ডিয়ানসহ বিশ্বস্বীকৃত বিভিন্ন গণমাধ্যম, শিক্ষাবিদ এবং অভিজ্ঞ শিক্ষকদের বিশেষ পর্যালোচনায় পরীক্ষার পরিবর্তে রেগুলেটরি বডি কর্তৃক গ্রেড নির্ণয়ে ‘অ্যালগরিদম মডেলের’ বিভিন্ন ক্রটি চিহ্নিত করা হয়েছে। পরীক্ষা ছাড়া অ্যালগরিদম মডেলে ফলাফল নির্ণয়ের মানদন্ড দেখে তথ্য প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ হোয়াই ডুয়াং ফলাফল ঘোষণার আগেই গার্ডিয়ানে লিখেছিলেন যে, ৩৯ শতাংশ শিক্ষার্থীর ফলাফল শিক্ষকদের মূল্যায়ন থেকে ডাউনগ্রেডেড হবে। তার নিবন্দ্বে সুবিধাবঞ্চিত শিক্ষার্থীরা সবচেয়ে বেশি ক্ষতির সম্মুখীন হবে বলেও আগাম সতর্ক করে দেন । রেগুলেটরি বডি অফকুয়েল দৃঢ়ভাবে জানিয়েছিল যে, হোয়াই ডুয়াং এর হিসেব ভুল। কিন্তু এ লেভেলের ফলাফল ঘোষণার পর দেখা গেলো রেগুলেটরি বডি বরং ভুল। অ্যালগরিদম’র যে পদ্বতিতে ফলাফল নির্ণয় করা হয়েছে সেখানে এলাকাভিত্তিক পোস্টকোডকে ব্যক্তিগত মেধা ও সম্ভাবনার চেয়ে বেশি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। ডাউনগ্রেডের প্যাটার্ন (নমুনা) দেখে রাষ্ট্র ও সমাজের প্রাতিষ্ঠানিক বৈষম্যকে সুকৌশলে এ লেভেলের ফলাফলে বাস্তবায়ন করা হয়েছে বলে অনেকের ধারণা পোষণ করছেন । যেখানে শতকরা ২৫ ভাগেরও বেশি সংখ্যক স্টেট স্কুলের ছাত্র/ছাত্রীকে ডাউনগ্রেডেড করা হয়েছে সেখানে প্রাইভেট স্কুলের করা হয়েছে মাত্র ১০ শতাংশ । শুধু তাই নয় অনেক ইন্ডিপেন্ডেন্ট/প্রাইভেট স্কুলের শিক্ষার্থীদের ফলাফল আগের বছরগুলোর চেয়ে ভাল হয়েছে । যতসব ফন্দি ফিকির বা পদ্বতি অবলম্বন করা হয়েছে তাতে স্টেট স্কুল/কলেজের সুবিধাবঞ্চিত ছাত্র/ছাত্রীরা ভুক্তভোগী ও বলির শিকার হয়েছে । বিভিন্ন স্কুল/কলেজের হেড টিচাররা এই ফলাফল দেখে তাদের ক্ষোভ ও হতাশা ব্যক্ত করছেন।

রেগুলেটরি বডি (অফকুয়েল) যে পদ্বতিতে গ্রেড নির্ণয় করেছে তাতে বিগত কয়েক বছরের ফলাফলকে হিসেবে আনলেও বাৎসরিক অগ্রগতির সূচক সঠিকভাবে মূল্যায়ন করা হয় নাই বলে বিশেষজ্ঞরা বলছেন। এই ফলাফল থেকে এটা পরিষ্কার যে, ক্লাস শিক্ষকের মূল্যায়নকে বিবেচনায় নেয়া হয় নাই এবং প্রতিটি শিক্ষার্থীর ফলাফলকে স্বতন্ত্রভাবে না দেখে স্কুল/কলেজের এলাকাভিত্তিক পোস্টকোড বিবেচনায় এনে গণহারে ডাউনগ্রেডেড করা হয়েছে বলে মনে করছেন অনেকে। তথাকথিত ভাল স্কুল/কলেজে ভর্তি হলেই ভাল ফলাফল হবে তা সত্য নয়। টোরি সরকার বিষয়টি ভালোভাবে তদারকি করতে পারে নাই তার প্রমাণ হলো, ফল ঘোষণার আগের রাত্রে সেক্রেটারি অব স্টেট ফর এডুকেশন গ্যাভিন উইলিয়ামসন ফলাফলের বিশৃঙ্খলা ও বিপর্যয়কে কেন্দ্র করে তাৎক্ষণিক ক্ষোভ প্রশমনে ‘ট্রিপল লক’ নামে একটি নতুন ব্যবস্থার ঘোষণা দেন। রেগুলেটরি বডি কর্তৃক প্রেরিত গ্রেড, স্কুল/কলেজের মক টেস্টের ফল অথবা আগামীতে পরীক্ষা দিয়ে প্রাপ্ত গ্রেডের তিনটির মধ্যে সর্বোচ্চ গ্রেডকে গ্রহণ করার বিধান রেখে ‘ট্রিপল লক’ নামে একটি বিভ্রান্তিমূলক নতুন ব্যবস্থার ঘোষণা দেয়া হয় । এতে করে লাভের চেয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি হয়েছে বেশি। কারণ মক টেস্টের রেজাল্ট পেতে হলে আপিল প্রক্রিয়ার লাল ফিতার দৌরাত্ম এবং রি-সিট গ্রেড বাস্তবিক অর্থে খুব একটা কাজে আসবে না। কারণ ভালো মানের কলেজ বা ইউনিভার্সিটি পরবর্তী গ্রেডের জন্য কারো ভর্তি ঝুলিয়ে রাখবে না। তাই প্রতিবাদ ও বিক্ষোভের মুখে ঘোষণার মাত্র দুই দিনের মাথায় গত ১৪ আগস্ট মক টেস্ট নিয়ে আরো পর্যালোচনা করা হবে বলে আগের দেয়া সিদ্ধান্ত স্থগিত করা হয়েছে। এতে করেই সরকার ও দায়িত্বশীলদের সিদ্বান্তহীনতার বিষয়টি ফোটে উঠেছে । ইতিমধ্যে বিলেতের প্রখ্যাত আইনজীবীরা রেগুলেটরি বডিকে আইনিভাবে চ্যালেঞ্জ করার ঘোষণা দিয়েছেন। লক্ষ লক্ষ ছাত্র/ছাত্রীদের এক অনিশ্চয়তায় ভেতর দিয়ে সময় কাটছে। জীবন যুদ্বের এই সন্ধিক্ষণে এসে এ ধরণের অনিশ্চয়তা তাদের ভবিষ্যৎ জীবনে বিরাট নেগেটিভ প্রভাব ফেলবে বলে মনে করা হচ্ছে।

তিন:

উল্লেখ্য যে, জিসিএসই/এ লেভেলের পরীক্ষার পূর্বে প্রতিটি প্রতিষ্ঠান থেকে ক্লাস শিক্ষকের মূল্যায়নের উপর ভিত্তি করে প্রত্যেক শিক্ষার্থীর প্রেডিক্টেড গ্রেড প্রদান করা হয়। এই গ্রেডের উপর ভিত্তি করেই পরবর্তী কোর্সের জন্য কলেজ বা বিশ্ববিদ্যালয়ে কন্ডিশনাল অফার প্রদান করা হয়। মূল পরীক্ষা যেহেতু কয়েক মাস পরে অনুষ্ঠিত হয়, তাই শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতির কারণে অনেকেই প্রেডিক্টেড গ্রেডের চেয়ে ভাল ফলাফল করে থাকে। অল্প কিছু ক্ষেত্রে দু’একটি বিষয়ে ডাউনগ্রেডেড হলেও তা বিচ্ছিন্ন ঘটনা । কিন্তু গণহারে ডাউনগ্রেডেড হয় না। ক্লাস শিক্ষকের মূল্যায়নে এতো হেরফের হলে কলেজ বা বিশ্ববিদ্যলয়ের ভর্তি কাঠামোই ভেঙে পড়তো। রেগুলেটরি বডির যুক্তি হচ্ছে ক্লাস শিক্ষকের মূল্যায়নের ভিত্তিতে ফলাফল ঘোষণা করা হলে অন্যান্য বছর থেকে ফলফলে ১২ শতাংশ ইনফ্লেশন হতো। প্রশ্ন হলো শতকরা ১২ শতাংশ কমাতে গিয়ে ৩৯ শতাংশকে ডাউনগ্রেডেড করা হলো কোন যুক্তিতে? আর ক্লাস শিক্ষকের মূল্যায়নকে উপেক্ষা করে দুই গ্রেড নীচে নামে কি করে? স্কুল/কলেজের পূর্বের ফলাফলের সাথে সামঞ্জস্য করতে গিয়ে যদি কিছু শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রে তাদের প্রেরিত ক্রম তালিকা অনুসারে গ্রেড কমানো হতো তাতে সমস্যা ছিল না। কিন্তু পোস্টকোডের উপর ভিত্তি করে গণহারে গ্রেড কমানো কি সুবিধাবঞ্চিত একটি প্রজন্মকে মেধার প্রতিযোগিতা থেকে সরিয়ে দেয়ার কারণ কি? নিজেদের সুবিধামতো ডাটা ইনপুট করে কম্পিউটার প্রোগ্রামিংয়ের ‘এলগোরিদম’ দিয়ে একটা প্রজন্মকে অন্দ্বকারের দিকে ঠেলে দেয়ার অধিকার কারো নাই। এটা পরিসংখ্যান দিয়ে শাস্তি বৈ কিছু নয়। হাজার হাজার শিক্ষার্থীকে বিশেষ করে সুবিধাবঞ্চিত একটা প্রজন্মকে মেধা ও জ্ঞানভিত্তিক প্রতিযোগিতা থেকে পরিকল্পিতভাবে সরিয়ে দেয়া হয়েছে বলা হলে অত্যুক্তি হবে কি ?

ক্লাস শিক্ষকের মূল্যায়নকে উপেক্ষা করে কিসের ভিত্তিতে গ্রেড আপ করা হয় তাও বোধগম্য নয়। যে শিক্ষক ক্লাসে পড়ালেন তিনি বুঝলেন না। কিন্তু কোনো পরীক্ষা ছাড়াই কম্পিউটার সৃষ্ট এলগোরিদম বুঝে নিলো ! তবে হ্যাঁ, পরীক্ষা দিয়ে অনেকেই ক্লাস শিক্ষকের দেয়া প্রেডিক্টেড গ্রেডের চেয়ে আপার গ্রেড পেতে পারে। কিন্তু এলগরিদম দিয়ে তা বুঝা সম্ভব নয়, যদি না এরকম ইনপুট সেটআপ করে রাখা হয় । তাই এলগরিদম দিয়ে যে গ্রেড নির্ণয় করা হয়েছে তা পক্ষপাতযুক্ত ও ত্রূটিপূর্ণ বিধায় অনতিবিলম্বে এই ফল বাতিল করে ক্লাস শিক্ষকের মূল্যায়নকে প্রাধান্য দিয়ে এ লেভেল ও জিসিএসই শিক্ষার্থীদের গ্রেড নির্ণয় করা সময়ের দাবি । এলগোরিদম আর পরিসংখ্যান দিয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জীবন নিয়ে খেলা করতে দেয়া হলে এই প্রজন্ম আমাদেরকে কোনোদিন ক্ষমা করবে না। গার্ডিয়ান, বিবিসিসহ বিভিন্ন মিডিয়াতে একেকজন শিক্ষার্থীর বুকফাঁটা আর্তনাদ দেখে পাথর হৃদয়ের মানুষের পক্ষে স্থির থাকা সম্ভব নয়। পরীক্ষা দিয়ে শিক্ষার্থীরা আরো খারাপ ফল করলে কারো কথা বলার দরকার ছিল না। পরীক্ষা যেহেতু হয় নাই, তাহলে এক মাস পূর্বে ফলাফল ঘোষণা করা হলে প্রয়োজনে এখন রি-সিট পরীক্ষা দিয়ে শিক্ষার্থীরা তাদের মেধা যাচাই করতে পারতো। দুই সপ্তাহ পরে কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্লাস শুরু হবে। এখন আপিল বা রি-সিট নিয়ে চিন্তা করবে নাকি পরবর্তী কোর্সের ক্লাস নিয়ে ব্যস্ত থাকবে। দুটি করতে গিয়ে শিক্ষার্থীরা সব কূল হারাতে হবে। এই বোধটুকু দায়িত্বশীলদের নাই এটা অন্তত ব্রিটেনে মানা যায় না। এই ফলাফল ত্রূটিযুক্ত ও পূর্ব পরিকল্পিত।

বিলেতের স্কুল/কলেজ পর্যবেক্ষণ সংস্থা অফস্টেড এর সাবেক প্রধান গার্ডিয়ানকে দেয়া অভিমতে ক্লাস শিক্ষকের মূল্যায়নকে আস্থায় না নিয়ে গ্রেড নির্ণয়ে পরিসংখ্যানভিত্তিক এলগোরিদম পদ্বতিকে বিশাল জগাখিচুড়ি আখ্যা দিয়ে এটি শিক্ষাখাতকে অবিচার ও বৈষম্যের দিকে ধাবিত করবে বলে উল্লেখ করেন । তাই আগামী প্রজন্মকে সময়ের সাথে পাল্লা দিয়ে মেধা ও জ্ঞানে সক্ষম করে তুলতে ভুক্তভোগী শিক্ষার্থী ও পিতামাতার পাশাপাশি কমিউনিটির সকল পর্যায় থেকে এই ফল বিশৃঙ্খলার সুষ্ঠূ সুরাহার জন্য সোচ্চার হওয়া জরুরি।

লন্ডন, ১৭ অগস্ট ২০২০।

লেখক: ডক্টর এম মুজিবুর রহমান।

সংবাদ বিশ্লেষক। সাবেক সহকারী অধ্যাপক, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় সিলেট।