১৫০ বছর পর স্নাতক ডিগ্রি পেলেন ‘এডিনবার্গ সেভেন’ খ্যাত ৭ নারী

422

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ১৮৬৯ সালে প্রথমবারের মতো এডিনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে মেডিসিনে ভর্তি হয়েছিলেন ৭ নারী। তবে পুরুষ সহপাঠীদের বাধার মুখে স্নাতক সম্পন্ন করতে ব্যর্থ হন তারা। এক পর্যায়ে প্রতিবাদী হয়ে ওঠেন তারা। বিশ্ববিদ্যালয়ে নারী শিক্ষার্থীদের অধিকার প্রতিষ্ঠায় শুরু করেন প্রচারণা। সেই উদ্যোগ সফল হলেও চিকিৎসক হিসেবে তাদের ভাগ্যে সনদ জোটেনি তখন। ঘটনার ১৫০ বছর পর তাদের মরণোত্তর ব্যাচেলর অব মেডিসিন ডিগ্রি প্রদান করলো বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ। ‘এডিনবার্গ সেভেন’ খ্যাত ওই ৭ নারীর পক্ষে বিশ্ববিদ্যালয়ের এখনকার ৭ শিক্ষার্থী স্নাতক সম্মাননা গ্রহণ করেছেন।

এডিনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ওই সাত নারী শিক্ষার্থী হলেন-ম্যারি অ্যান্ডারসন, এমিলি বোভেল, মাটিল্ডা চ্যাপলিন, হেলেন ইভান্স, সোফিয়া জেক্স ব্লেক, এডিথ পেচি ও ইসাবেল থোর্নে। মূলত সোফিয়া জেক্স ব্লেকের নেতৃত্বেই নারী শিক্ষার অধিকার আদায়ে সোচ্চার হয়েছিলেন তারা। জেক্স ব্লেক এমন এক সময়ে চিকিৎসক হতে চেয়েছিলেন যখন ব্রিটেনে নারীদের ক্ষেত্রে তা চিন্তাই করা যেতো না। নারী শিক্ষা নিয়ে আরও বেশি করে জানার আগ্রহ থেকে ১৮৬৫ সালে যুক্তরাষ্ট্র গিয়েছিলেন তিনি। চিকিৎসক হওয়ার স্বপ্ন লালনকারী ব্লেক লৈঙ্গিক বৈষম্যের জায়গা থেকে হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশের অনুমতি পাননি। তার আবেদন প্রত্যাখ্যান করে এক চিঠিতে বলা হয়েছিল: ‘এ বিশ্ববিদ্যালয়ের কোনও বিভাগে নারী শিক্ষার ব্যবস্থা নেই।’

এরপর শিক্ষার দিক থেকে তুলনামূলকভাবে আলোকিত জায়গা স্কটল্যান্ডের দিকে নজর ফেরান। ১৮৬৯ সালের মার্চে এডিনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয় ব্লেকের আবেদন অনুমোদন করে। তবে ‘একজন মাত্র নারীর আগ্রহের’ জায়গা প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে না বলে উল্লেখ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের আদালত। দ্য স্কটসম্যান পত্রিকার মাধ্যমে তিনি ক্যাম্পেইন শুরু করেন এবং তাতে অন্য নারীদের যোগ দেওয়ার আহ্বান জানান। তার আহ্বানে সাড়া দেন ৬ নারী। এডিনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ে মেডিসিন বিভাগে ভর্তি হওয়ার সুযোগ চেয়ে আন্দোলন চালাতে থাকেন তারা।

১৮৬৯ সালের নভেম্বরে ওই নারীরা মেট্রিকুলেশন পরীক্ষায় পাস করেন এবং এডিনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিক্যাল স্কুলে ভর্তি হন। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাদের জন্য উচ্চ ফি নির্ধারণ করে। শিক্ষার প্রতিবেশও ছিল নারীদের জন্য প্রতিকূল। শিক্ষকরা নারী শিক্ষার্থীদের পাঠদানে বাধ্য ছিলেন না। আর এটাই ছিল এডিনবার্গ সেভেনের জন্য মূল সমস্যা। শিক্ষকরা তাদের পাঠদান করতেন না। ওই সাত নারী নিজেরাই লেকচার সংগ্রহ করে পড়াশোনা করতে থাকলেন। পুরুষ শিক্ষক ও সহপাঠীরা তাদের গ্রাজুয়েশনের বিরোধিতা করে যেতে লাগলো। তারা এনাটমি পরীক্ষা দিতে গেলে পুরুষরা তাদের দিকে কাদা ছুড়ে মেরেছিল।

এক পর্যায়ে সহপাঠীদের এমন আচরণের বিরুদ্ধে ক্যাম্পেইন শুরু করেন এ সাত নারী। তাদের এ উদ্যোগ জাতীয়ভাবে মানুষের মনোযোগ আকর্ষণ করতে সমর্থ হয়। চার্লস ডারউইনসহ স্বনামধন্য ব্যক্তিরা তাদেরকে সমর্থন জানান। নারীরা যেন বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে পারে তা নিশ্চিত করার জন্য ১৮৭৭ সালে একটি আইন প্রণয়ন হয়।

পুরুষ সহপাঠীদের রোষানলে পড়ে থমকে যেতে বাধ্য হওয়া সাত নারী শিক্ষার্থীকে অবশেষে ওই বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা শুরুর ১৫০ বছর পর স্বীকৃতি দেওয়া হলো। এডিনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের ম্যাকইওয়ান হলে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে তাদেরকে মরণোত্তর অনারারি ব্যাচেলর অব মেডিসিন ডিগ্রি প্রদান করা হয়। এডিনবার্গ মেডিক্যাল স্কুলের সাত নারী শিক্ষার্থী সাবেক ওই শিক্ষার্থীদের পক্ষে সনদ গ্রহণ করেন। সেভেন এডিনবার্গের এ সম্মাননা অর্জন উপলক্ষে বিশ্ববিদ্যালয়টি বেশ কয়েকটি অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে।

জেক্স ব্লেকের পক্ষ থেকে পুরস্কার গ্রহণ করেছেন তৃতীয় বর্ষের মেডিক্যাল শিক্ষার্থী সিমরান পায়া। তিনি বলেন, ‘আমাদের পূর্বসূরীদের পক্ষে এ পুরস্কারগুলো গ্রহণ করতে পেরে আমরা নিজেদেরকে সম্মানিত বোধ করছি। আমাদের সবার কাছে তারা এক অনুপ্রেরণার নাম।’

এডিনবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য, অধ্যাপক পিটার ম্যাথিসন বলেন, ‘অসাধারণ এ নারী দলটিকে তাদের প্রাপ্য ডিগ্রি প্রদান করতে পেরে আমরা আনন্দিত। এডিনবার্গ সেভেন যে ধরনের পৃথকীকরণ ও বৈষম্যের শিকার হয়েছেন তা এখন ইতিহাস। তবে এখনও প্রতিবন্ধকতাগুলো থেকে গেছে। আর তাতে বিশ্ববিদ্যালয়ে সফলভাবে পাঠ চুকাতে গিয়ে বাধাগ্রস্ত হচ্ছে অনেক মেধাবী শিক্ষার্থী। এ নারীদের কাছ থেকে আমাদের শিক্ষা নিতে হবে এবং যাদের সফল হওয়ার সম্ভাবনা আছে তাদের জন্য সুযোগ প্রসারিত করতে সংগ্রাম করতে হবে।’