সিলেটে আলিশান বাড়ি পুলিশি নজরদারিতে

4050

প্রবাসী অধ্যুষিত জেলা হিসাবে সিলেট সর্বত্র পরিচিত। এই অঞ্চলে প্রবাসীদের অর্থায়নে নির্মিত বিলাসবহুল বাড়িগুলো পুলিশি নজরদারিতে রাখা হয়েছে। প্রবাসীদের নির্মিত বিলাসবহুল বাড়িগুলো ফাঁকা পড়ে আছে। এসব বাড়ির অধিকাংশই এক-দুজন তত্ত্বাবধায়কের অধীনে রয়েছে। আর এরই সুযোগ নিচ্ছে অপরাধীরা। বিশেষত জঙ্গিসহ বড় বড় অপরাধের সঙ্গে জড়িতরা গোপন আস্তানা হিসেবে সিলেটের এসব ফাঁকা বাড়ি বেছে নিচ্ছে। মালিকের অনুপস্থিতিতে তত্ত্বাবধায়ক নিয়ন্ত্রিত এসব বাড়িকে নিরাপদ ঘাঁটি হিসেবে ব্যবহার করছে বড় অপরাধীরা। এ অবস্থায় সিলেট নগরী ও গ্রামাঞ্চলে ছড়িয়ে থাকা এসব বাড়ি নজরদারির আওতায় আনছে পুলিশ।

সিলেটের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (মিডিয়া) সুজ্ঞান চাকমা বলেন, গ্রামাঞ্চলে প্রবাসীদের আলিশান বাড়িগুলো অনেকটা জনহীন স্থানে নির্মিত। ফলে এসব বাড়িতে কারা আসা-যাওয়া করে, প্রতিবেশীরাও তা জানতে পারে না। এজন্য এসব বাড়ির ব্যাপারে আমরা অনুসন্ধান করছি।
জানা গেছে, গত বুধবার রাতে নিজের মামা মাসুম বিল্লাহর মাধ্যমে পাঠানটুলার রশীদ মঞ্জিলে ওঠে সাফাত আহমদ ও তার বন্ধু সাদমান সাকিফ। মাসুম বিল্লাহ প্রবাসী মামুনুর রশীদের বন্ধু। বাড়ির মালিক না থাকায় তত্ত্বাবধায়ককে বলে সাফাত ও সাদমানকে ওই বাসার দুই তলার একটি ফ্ল্যাটে তোলেন মাসুম।
এ বিষয়ে রশীদ মঞ্জিলের তত্ত্বাবধায়ক নুরুন্নবী বলেন, মাসুম বিল্লাহ বাসার মালিকের বন্ধু। গত বুধবার রাতে তিনি নিজের বাসায় জায়গা নেই জানিয়ে আত্মীয় পরিচয়ে দুই যুবককে এনে এখানে রাখেন। মালিকের বন্ধু হওয়ায় আমরা তাকে না করতে পারিনি।

পুলিশ প্রশাসন বলছে, ঘটনা যা-ই হোক না কেন, শেষ পর্যন্ত সিলেটের প্রবাসীদের ফাঁকা পড়ে থাকা বিলাসবহুল বাড়িগুলোকেই অপরাধীরা আশ্রয়স্থল হিসেবে ব্যবহার করছে। সাম্প্রতিক এ ঘটনার আগে বিভিন্ন সময় জঙ্গিসংশ্লিষ্টতা রয়েছে, এমন ব্যক্তিদেরও এ ধরনের বাড়িতে ঘাঁটি স্থাপন করতে দেখা গেছে। এক্ষেত্রে অপরাধীরা বাড়ির মালিকের অনুপস্থিতির সুযোগ নিচ্ছে। সর্বশেষ মৌলভীবাজারের দুই প্রবাসীর বাড়ি ভাড়া নেয়ার ক্ষেত্রেও এমনটি দেখা গেছে। ওই বাড়ি দুটিও জঙ্গিরা তত্ত্বাবধায়কের কাছ থেকে ভাড়া নিয়েছিল।

সিলেটের প্রবাসীদের সেবাদানকারী সংস্থা সিলেট ওভারসিজ সেন্টারের হিসাবমতে, সিলেট বিভাগের চার জেলার প্রায় ২০ লাখ মানুষ মধ্যপ্রাচ্য, ইউরোপ ও আমেরিকার বিভিন্ন দেশে বাস করেন। বিপুল অর্থবিত্তের মালিক এসব প্রবাসী কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে নিজ গ্রাম কিংবা শহরে বিশাল এলাকাজুড়ে তৈরি করেন বিলাসবহুল বাড়ি। সিলেটে এ ধরনের বাড়ির সংখ্যা পাঁচ হাজারেরও বেশি, যার নির্মাণ ব্যয় ১ কোটি থেকে ৩০ কোটি টাকা পর্যন্ত। এ অঞ্চলের প্রবাসীদের অধিকাংশ যুক্তরাজ্যে বসবাস করায় স্থানীয়ভাবে এ বাড়িগুলো ‘লন্ডনি বাড়ি’ নামে পরিচিত। সিলেটের বিয়ানীবাজার, বিশ্বনাথ, বালাগঞ্জ ও ওসমানীনগর, সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর এবং মৌলভীবাজারের প্রবাসীবহুল এলাকায় এসব বাড়ির সংখ্যা বেশি। বিপুল অর্থ ব্যয়ে এসব বাড়ি নির্মাণ করা হলেও বছরের বেশির ভাগ সময়ই তা ফাঁকা পড়ে থাকে। বাড়িগুলো দেখভালের জন্য সাধারণত একজন তত্ত্বাবধায়ক নিয়োগ করা হয়। আর এ সুযোগ নিয়েই এসব ফাঁকা বাড়িতে আশ্রয় নিচ্ছে জঙ্গিসহ বড় অপরাধীরা।
প্রতিষ্ঠানটির নির্বাহী কর্মকর্তা সামসুল আলম বলেন, সিলেটে প্রবাসীদের মধ্যে বিলাসবহুল বাড়ি নির্মাণ নিয়ে এক ধরনের প্রতিযোগিতা রয়েছে। প্রায় দুই দশক ধরে এমন প্রতিযোগিতা চলে আসছে। বিপুল অর্থ ব্যয়ে এসব বাড়ি নির্মাণ হলেও প্রায় সারা বছরই এসব আক্ষরিক অর্থে ফাঁকা থাকে।

সাধারণের কাছে অগম্য এসব বাড়ি ফাঁকা পড়ে থাকার কারণেই তা কাজে লাগায় অপরাধীরা। ফলে তত্ত্বাবধায়কের মাধ্যমে এসব বাড়িতে আশ্রয় নিয়ে অনেকটা নির্বিঘ্নে কাজ করতে পারে অপরাধীরা।

এসব বাড়ির ব্যাপারে অনুসন্ধানের পাশাপাশি বাড়িগুলোর ভাড়াটিয়া ও তত্ত্বাবধায়কদের ব্যাপারেও তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে বলে জানিয়েছে সিলেট মহানগর ও জেলা পুলিশ। এ বিষয়ে সিলেট মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত উপকমিশনার (মিডিয়া) জেদান আল মুসা বলেন, প্রবাসীদের বাড়িগুলো বছরের অধিকাংশ সময় ফাঁকা পড়ে থাকে। কেয়ারটেকার বাড়িগুলো দেখভাল করে।
আর বিভিন্ন পরিচয়ে জঙ্গিসহ বড় বড় অপরাধীরা বাড়িগুলো ভাড়া নিয়ে তাদের কর্মকা- চালায়। সাম্প্রতিক কিছু ঘটনায় এর প্রমাণ পাওয়া গেছে। এখন এসব বাড়ির ওপর আমরা নজরদারি বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছি। পাশাপাশি বাড়িগুলোর কেয়ারটেকার ও ভাড়াটিয়াদের তথ্যও সংগ্রহ করা হচ্ছে
সূত্র: নয়াদিগন্ত