ওয়ানবাংলানিউজ ডেস্ক: টাওয়ার হ্যামলেটসের বাজেট প্রণয়নে এবার গণতান্ত্রিক চর্চা উপেক্ষা করা হয়েছে বলে অভিযোগ তুলেছেন বারার ক্ষমতাসীন লেবার দলের কাউন্সিলারদের একটি গ্রুপ। ১২ জন লেবার কাউন্সিলর মেয়র জন বিগসের উদ্দেশ্যে লেখা এক খোলা চিঠিতে অভিযোগ করেন- বাজেট প্রণয়নে যথাযত গণতান্ত্রিক নিয়ম মানা হয়নি। কাউন্সিলরদের মতামতকে কোনো শুনানী ছাড়াই নাকচ করা হয়েছে। কাউন্সিল পরিচালনায় মেয়র বিগসের এমন কর্তৃত্ববাদী সিদ্ধান্তের বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন কাউন্সিলাররা।
গত ১৫ ফেব্রুয়ারি লেবার গ্রুপের বৈঠকের পর এমন খোলা চিঠি লেখেন কাউন্সিলাররা।
কাউন্সিলারদের মতামতকে আমল না দিয়ে বাজেট প্রণয়নের ঘটনা বিরল। তার চেয়েও বেশি বিরল নিজ দলের মেয়রের কাছে কাউন্সিলরদের খোলা চিঠি লিখে উদ্বেগ জানানোর ঘটনা।
তবে লেবার দলেরই একজন কাউন্সিলার নাম প্রকাশ না করার শর্তে পত্রিকাকে বলেন, বাজেট নিয়ে আপত্তি তুলে ১২ জন লেবার কাউন্সিলার যে খোলা চিঠি লিখেছেন তা আসলে একটি রাজনৈতিক ভেলকি (পলিটিক্যাল স্ট্যান্ট)। বাজেটের বিষয়টি গত ডিসেম্বরে সুরাহা করেছে লেবার গ্রুপ। তখনই জানা গিয়েছিলো যে, ২০২০-২১ অর্থ বছরে কাউন্সিলের প্রায় সাড়ে ৭ মিলিয়ন পাউন্ড উদ্বৃত্ত রয়েছে। অথচ খরচ বাঁচানোর নামে মেয়র বিগস বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ সেবাখাতের বাজেট কর্তন করেছেন। এসব কাউন্সিলার ঠিকই সবকিছুতে মেয়রকে সায় দিয়ে এসেছেন এবং বাজেটে সমর্থন দিয়েছেন। এখন খোলা চিঠি লিখে ভোটারদের দেখাতে চাইছেন যে, তাঁরা জন বিগসের কথায় উঠবস করেন না। প্রয়োজনে প্রতিবাদও করেন। নির্বাচন আর বেশি দূরে নেই। তাঁর মতে, তাই কেবল ভোটারদের কাছে নিজেদের গ্রহণযোগ্য করে তুলতে এমন স্ট্যান্ট করেছেন ওই ১২ কাউন্সিলার। লেবার গ্রুপের মধ্যে সমঝোতা করেই এমনটি করা
হয়েছে মন্তব্য করে ওই সূত্র বলে, স্বাক্ষরকারী কাউন্সিলারদের মাঠে অবস্থান খুব একটা ভাল নেই।
একাধিক কাউন্সিলার বলেছেন, চ্যান্সেলর ঋষী সুনাক ৩ মার্চ জাতীয় বাজেট ঘোষণা করবেন। এদিন নিশ্চিত হবে কাউন্সিল সরকারের কাছ থেকে কি সুবিধা পাচ্ছে। ফলে ৪ মার্চ মেয়র বিগস যে বাজেট ঘোষণা করবেন তাতে জাতীয় বাজেটে পাওয়া সুবিধা-অসুবিধাগুলো সংযুক্ত করা সম্ভব নয়। এছাড়া করোনার চলমান অনিশ্চয়তার বিষয়টিও মাথায় রাখতে হবে। তাই অবশ্যই ৬ মাসের মাথায় বাজেট পুনঃমূল্যায়নের সুযোগ রাখতে হবে।
ইস্টঅ্যান্ড এনকয়ার ১২ কাউন্সিলারের চিঠির বিষয়টি নিয়ে প্রতিবেদন প্রকাশের পাশাপাশি চিঠিটি হুবহু প্রকাশ করেছে। এই চিঠির উল্লেখযোগ্য বিষয়ের মধ্যে আছে- বাজেট প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় গণতান্ত্রিক চর্চার অভাবের নজির দেখে সংশ্লিষ্ট কাউন্সিলাররা উদ্বিগ্ন। এসব কাউন্সিলর মনে করেন, লেবারের ব্যাকবেঞ্চ কাউন্সিলারদের আনা বাজেট সংশোধনী প্রস্তাবগুলো শুনানী ছাড়াই বাদ দেয়ার ঘটনা কাউন্সিলরদের দ্বায়িত্ব পালনের সক্ষমতার সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক। বিষয়টি শুধু বাজেট প্রণয়ণ প্রক্রিয়ায় গণতান্ত্রিক চর্চার রীতি নয়; বৃহত্তর লেবার গ্রুপের গণতান্ত্রিক চর্চার রীতিতে খারাপ নজির যোগ করে দিয়েছে। এছাড়া চিঠিতে তাঁরা ঐতিহাসিক পপলার রেইট রেবেলিয়নের কথাও উল্লেখ করেন। এ প্রসঙ্গে তাঁরা বলেন, এ বছর পপলার রেইট রেবেলিয়নের শত বর্ষ পূর্ণ হয়েছে। বাসিন্দাদের ওপর অন্যায় করের বোঝার বিরুদ্ধে সেই বিদ্রোহ বা রেবেলিয়ন হয়েছিলো। প্রসঙ্গত, রেইট রেবেলিয়ন হলো কাউন্সিল ট্যাক্স বাড়ানোর বিরুদ্ধে একটি আন্দোলন। ২০২১ ততকালীন পপলার বারা কাউন্সিলে ট্যাক্স বাড়ানোর সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে এ আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন লেবার দলীয় জর্জ ল্যান্সবারি। তিনি আগের বছর এই কাউন্সিলের মেয়র ছিলেন। আন্দোলনের সফলতার পর ল্যান্সবারি পরবর্তীতে লেবার দলের নেতা নির্বাচিত হয়েছিলেন।
খোলা চিঠিতে সাক্ষরকারী ১২ জন কাউন্সিলার হলেন- আব্দুল মুকিত চুন্নু, আয়াছ মিয়া, এহতেশাম হক, গেব্রিয়েলা সালভা মাকাল্যান, জেমস কিং, লেমা কুরেশি, মার্ক ফ্রাঞ্চিস, মোহাম্মদ পাপ্পু, শাদ চৌধুরী, শাহ আমিন, তারিক খান এবং ভিক্টোরিয়া ওবাজা।
বাজেটে এসব কাউন্সিলার যেসব সংশোধনী প্রস্তাব করেছেন তার মধ্যে আছে- আইডিয়া স্টোর এবং লাইব্রেরি সার্ভিস থেকে ১৬ লাখ পাউন্ড সাশ্রয়ের পরিকল্পনা বাতিল করা, বিদ্যমান ডে সেন্টারগুলো থেকে প্রস্তাবিত ৫ লাখ ৬৯ লাখ পাউন্ডের সাশ্রয় কমিয়ে অর্ধেক করা। হেইট ক্রাইম এবং কমিউনিটি সেইফটি সার্ভিসের প্রস্তাবিত বাজেট কর্তন ২ লাখ ২৬ হাজার পাউন্ড থেকে কমিয়ে অর্ধেক করা। যাতে কমিউনিটি সার্ভিসগুলো মোটামুটি ভালভাবে টিকে থাকতে পারে। কমিউনিটি সেইফটি রেসপন্ড টিম বাতিল করার সিদ্ধান্ত পিছিয়ে দেয়া এবং এ খাতে আগামী দুই বছরের জন্য ৫ লাখ ১২ হাজার পাউন্ড বরাদ্দ রাখা। ৪ লাখ ৫০ হাজার পাউন্ড বাজেটের সাবস্ট্যান্ড মিসইউজ সার্ভিস অন্তত আরও এক বছরের জন্য চালু রাখা-যাতে এর প্রভাব মূল্যায়ন করে পূর্ণাঙ্গ একটি প্রতিবেদন তৈরির সময় পাওয়া যায়। ৭১ হাজার পাউন্ডের রিভিউ টেলিকেয়ার মডেল সেভিং বাতিল করা। হেলথ ই১ ড্রাগ অ্যান্ড অ্যালকোহল সার্ভিস থেকে ১ লাখ ২ হাজার পাউন্ড সাশ্রয়ের সিদ্ধান্ত বাতিল করা। লার্নিং সার্ভিস এবং শিশুদের বিশেষ সেবাখাত থেকে প্রস্তাবিত ৬ লাখ ৫০ হাজার পাউন্ড খরচ বাচানো থেকে সরে আসা।
টাওয়ার হ্যামলেটসে যে কোনো একটি ফুড ব্যাংক পরিচালনাকারী চ্যারিটিকে এককালীন ১ লাখ পাউন্ড অনুদান দেয়া যাতে তারা বারার ক্ষধার্র্ত মানুষের মাঝে প্রয়োজনীয় খাবার বিলি করতে পারে। বারার সবচেয়ে দরিদ্র জনগোষ্ঠীকে বিল পরিশোধ কিংবা ঋণ থেকে উদ্ধারের জন্য ১ লাখ ৫০ হাজার পাউন্ডের রেসিডেন্ট সাপোর্ট স্কিম গড়ে তোলা। এবং ২০২১-২২ অর্থ বছরে কাউন্সিলর ট্যাক্স ২ শতাংশ বাড়ানোর বদলে ১ দশমিক ৫ শতাংশ বাড়ানো।
লিবডেম দলীয় কাউন্সিলার রাবিনা খান পত্রিকাকে বলেন, ১২ জন কাউন্সিলর যেসব সংশোধনীর কথা বলেছেন তার প্রায় সবগুলোই তাঁর সংশোধনী প্রস্তাবের মধ্যে রয়েছে। তিনি বলেন, জন বিগস যে বাজেট দিচ্ছেন সেখানে করোনার কারণে যে অনিশ্চিত পরিস্থিতি সেটিকে বিবেচনায় নেয়া হয়নি। আমার বাজেট প্রস্তাবে করোনা পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে কমিউনিটির এবং অর্থনৈতিক চাহিদার বিষয়টি গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। তিনি বলেন, চলতি অর্থ বছরে (২০২০-২১) কাউন্সিল কোভিডের জন্য সরকারের কাছ থেকে ৬৬ মিয়িলন পাউন্ড পেয়েছে। আগামী অর্থ বছরে ২০২১-২২) আরও ১৩০ মিলিয়ন পাউন্ড পাওয়ার কথা। এছাড়া বিজনেস গ্রান্ট হিসেবে ইতিমধ্যে পেয়েছে ১৯৪ মিলিয়ন পাউন্ড। কিন্তু তারপরও মেয়র শুধু বলেন অর্থ নেই।
১২ জন কাউন্সিলরের খোলা চিঠি সম্পর্কে রাবিনা খান বলেন, ৪ মার্চ বৃহস্পতিবার বাজেট অধিবেশনে তিনি তাঁর সংশোধনী প্রস্তাবগুলো পেশ করবেন। এসব লেবার কাউন্সিলর সত্যিই সংশোধনীগুলো চাইলে নিশ্চয়ই তারা আমার প্রস্তাবের পক্ষে ভোট দেবেন। আর যদি না দেন তাহলে বুঝতে হবে আসলে তারা সংশোধনী চান না অথবা তাদের সাহস নেই।
সূত্র: সাপ্তাহিক পত্রিকা















