রাসেল মোল্লা, উডল্যান্ড, সিঙ্গাপুর থেকে: সিঙ্গাপুরে প্রায় দেড় লাখ প্রবাসী বাংলাদেশির বসবাস। দেশটিতে বাংলাদেশি করোনা আক্রান্তের সংখ্যা ২৮ মে পর্যন্ত ১৭ হাজার ছাড়িয়েছে। তথ্যসূত্র:সিঙ্গাপুরস্থ বাংলাদেশ মিশন। তবে বিপুল সংখ্যক আক্রান্ত হলেও আল্লাহর কৃপায় একজন বাংলাদেশিও মারা যাওয়ার ঘটনা নেই দেশটিতে যা মিরাকল। করোনা আক্রান্ত প্রথম বাংলাদেশি প্রায় দু’মাস কোমায় ছিলেন। তিনি সুস্থ হয়ে উঠেছেন। এখন তার কণ্ঠস্বর ফেরানোর চিকিতসা অর্থাৎ স্পীচ থেরাপি চলছে।
দু’সপ্তাহ আগে সিঙ্গাপুরে এক বাংলাদেশি করোনার উপসর্গ নিয়ে মারা যান। ঘটনাটি নিয়ে রীতিমত হৈ চৈ পড়ে যায় সিঙ্গাপুর সিটিতে। মৃত ব্যক্তির করোনার টেস্টের রিপোর্ট পজেটিভ এলে তদন্ত শুরু হয়। অবশেষে রিপোর্ট আসে করোনায় নয়, ওই বাংলাদেশির মৃত্যু হয়েছে হার্ট অ্যাটাকে।
সিঙ্গাপুরে অধিকাংশই প্রবাসী শ্রমিক। ডরমিটরিতেই তাদের বসবাস। একসঙ্গে বহু মানুষ থাকার কারণেই অন্যান্য প্রবাসীদের মতোই বাংলাদেশীদের মধ্যে দ্রুত ছড়াচ্ছিল করোনাভাইরাস।
দেশটির আইন অনুযায়ী অভিবাসী শ্রমিকদের থাকতে হয় নির্ধারিত ডরেমটরিতে যেখানে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখা প্রায় অসম্ভব। বেসরকারি এসব আবাসনে একটা ঘরে থাকেন কয়েজন। বাথরুম, রান্নাঘর ও অতিথিরুম তাদের শেয়ার করতে হয়। তাই সিঙ্গাপুরে বাংলাদেশিদের মধ্যে ভাইরাস সংক্রমণ ছিল বেশী। আর সিঙ্গাপুরে আক্রান্ত অভিবাসী শ্রমিকদের মধ্যে মোট ৪০ শতাংশই বাংলাদেশি শ্রমিক।
সিঙ্গাপুরে বিগত ২০ এপ্রিলের পূর্বেই প্রায় সাড়ে ৪ হাজার বাংলাদেশি শ্রমিক করোনায় আক্রান্ত হয়েছিলেন। এরপর সংখ্যাটা দ্রুতই বেড়েছে। যা এখন ১৭ হাজারের উপরে।
ছোট্ট দেশটিতে প্রতি বর্গকিলোমিটারে প্রায় ৮ হাজার মানুষের বসবাস। তাই সিঙ্গাপুর বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ দেশগুলোর একটি। এরকম জায়গায় করোনা ভাইরাসের মতো রোগ দ্রুত ছড়ানোর সম্ভাবনা ছিল। যা চীনের উহান, ইতালি ও আমেরিকার চেয়েও খারাপ পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারতো।
ফলে অর্থনীতি ও স্বাস্থ্য ব্যবস্থার ওপর যে ধরণের চাপ তৈরি হতে পারে তা অকল্পনীয়। তাই ঝুঁকিতে থাকা প্রত্যেককে খুঁজে বের করে বিচ্ছিন্ন করা ছাড়া সিঙ্গাপুরের হাতে তেমন কোনো পথও খোলা ছিল না।
প্রথমদিকে সিঙ্গাপুর স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় থেকে জানানো তথ্যে বাংলাদেশিদের মধ্যে করোনা ভাইরাসের আক্রান্ত হওয়ার খবরে বেশ আতঙ্কিত হয়ে পড়েছিলেন বাংলাদেশি শ্রমিকরা। অবস্থার অবনতি হওয়ায় সিঙ্গাপুর সরকার কয়েকদফা লকডাউন ঘোষণা করেছে।
এই লকডাউনের কারণে প্রবাসীদের কাজ থাকবে না এবং এই সময় বেতনও না পাওয়ার শঙ্কা ছিল। তাই বেশিরভাগ প্রবাসী দেশে ফেরত আসার মতো অনিশ্চয়তার মধ্যে ছিলেন। তবে সব ধারণা ভেঙ্গে সিঙ্গাপুর সরকার যেসব পদক্ষেপ নিয়েছে তা বিশ্ব ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।
প্রথমে এক সেমিনারে সিঙ্গাপুরে প্রবাসী শ্রমিকদের লকডাউন সময়কার পূর্ণ বেসিক বেতন দেওয়ার বিষয়ে আশ্বস্ত করে সিঙ্গাপুর সরকার। এপ্রিলের ৭ তারিখ থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত শ্রমিকরা লকডাউনে আবদ্ধ। এই সময় লকডাউনে আবদ্ধ লক্ষ লক্ষ প্রবাসী শ্রমিকদের প্রতি সিঙ্গাপুর সরকার বদান্যতা দেখিয়ে আসছে।
কাজ না করা সত্ত্বেও প্রতিজন শ্রমিকের সম্পূর্ণ বেসিক বেতন তাদের ব্যাংক একাউন্টে সরকার কর্তৃক দেয়া হচ্ছে। যাদের ব্যাংক একাউন্ট ছিল না তাদের নতুন একাউন্ট করে সেখানে বেতন দেয়া হয়েছে।
কোয়ারেন্টাইনে থাকা প্রত্যেক শ্রমিককে আলাদা করে হ্যন্ডস্যানিটাইজার, এন ৯৫ মাস্ক, জ্বর মাপার ডিজিটাল থার্মোমিটার, সাবান, শ্যাম্পু, টুথপেস্ট, ব্রাশ, বডিওয়াশ, জুতা, লুঙ্গি, শেভিং রেজার, মগ, বালতি, টাওয়াল ফ্রি দেয়া হয়।
শ্রমিকদের মধ্যে যারা করোনায় আক্রান্ত ছিলেন তাদেরকে দ্রুত আইসোলেশনে নিয়ে প্রত্যেকটি জিনিস ফ্রি দেওয়া হয়। সিঙ্গাপুর ন্যাশনাল হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়ার পরে বিভিন্ন ফাইভস্টার হোটেলে সুস্থ্য হওয়ার আগ পর্যন্ত থাকার ব্যবস্থা করা হয়েছে। এমনকি তাদের আর্মিক্যাম্প ও বিভিন্ন শিপে অতিথিদের মতো সুন্দর ব্যবস্থায় রাখা হয়। তাদের যত্ন-আত্তি কোন অংশে কম ছিল না। চিকিৎসা ব্যবস্থা লকডাউনে সম্পূর্ণ ফ্রি। যার ব্যায়ভার আগে কোম্পানী বহন করত। সমস্ত ডরমেটরি বা লজে ডাক্তার ২৪ ঘন্টা স্ট্যানবাই থাকছে।
কোয়ারেন্টাইনে থাকা মুসলমান শ্রমিকদের সরকারের পক্ষ থেকে ১০০% হালাল খাবার পরিবেশন করা হচ্ছে। প্রত্যেকটা খাবার দামী। যা সাধারণত শ্রমিকরা কোন উপলক্ষ ছাড়া খায়না এমন সব খাবার। প্রতিদিন ৩ বেলা ফ্রি খাবার দিয়ে যাচ্ছে সরকারি কর্মীরা। রমজান মাসে সেহরী রাত ৩টায় দিয়ে যেত। আর ইফতারে খেজুর রুটি, পাউরুটিসহ আরও বিভিন্ন জাতের ফল দেয়া হয়।
প্রত্যেকটা রুমে মুসলমান শ্রমিকরা সালাত আদায় করছেন। ঈদের নামাজও অনলাইনে বিভিন্ন আলেমদের বক্তব্যশুনে সেই মতো আদায় করেছেন। করোনাকালে ধর্ম পালনে উৎসাহ কাজ করছে সব শ্রমিকদের মধ্যে। যার পূর্ণ স্বাধীনতা আছে এই সিঙ্গাপুরে।

সরকারের পক্ষ থেকে শ্রমিকদের ঈদুল ফিতরে ঈদ উপহারও প্রদান করা হয়। এতে পাঞ্জাবী, টুপি জায়নামাজ, চকলেট, জুস, রুটি, কেক, সুইট ইত্যাদি প্রদান করা হয়।
শ্রমিকদের জন্য ওয়াইফাই নেট সম্পূর্ণ ফ্রি করে দেয়া হয় এবং আলাদা একটা সিমকার্ড ফ্রি দেয়া হয় যার মধ্যে ১২ সিঙ্গাপুরি ডলার রিচার্জ ও ৫০ জিবি ডাটা লোড করা ছিল। মোবাইল ব্যাংকিং ব্যবস্থা করে দেয়া হয়েছে প্রত্যেক শ্রমিককে। এমনকি ক্রেডিট কার্ড থেকে মোবাইলে টপআপ করার ব্যবস্থাও আছে। দেশে টাকা পাঠানোরও সুব্যবস্থা করে দেয়ে হয়েছে।

কর্মব্যস্ত শ্রমিদের যেন এমন একটা ব্রেক দরকার ছিল। আর সেখানে তাদেরকে যেন জামাই আদর করেছে স্বয়ং সিঙ্গাপুর সরকার।
করোনায় আক্রান্ত হয়ে প্রথমে বলা সেই বাংলাদেশি প্রায় ২ মাস আইসিওতে ছিলেন। হাসপাতালে তার কোটি টাকা বিল হয়েছিল। যার সম্পূর্ণ সরকার বহন করেছে। তিনি সুস্থ্য হয়েছেন। এমনকি তার পরিবারকে ১০ লাখ টাকাও প্রদান করেছে সরকার।
হৃদরোগে আক্রান্ত এক বাংলাদেশি শ্রমিককে সম্প্রতি এয়ার এম্বুলেন্সে করে বাংলাদেশে পাঠিয়ে তার শেষ ইচ্ছে পূরণ করে সিঙ্গাপুর। তার পরিবারকেও অর্থিক সহায়তা প্রদান করা হয়।
এভাবে সাধারণ শ্রমিকদের প্রতিও দৃষ্টান্তের পর দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে সিঙ্গাপুর সরকার। যা বিশ্ব ইতিহাসে বিরল। তাদের কাছে দেশের উন্নয়ন যতটুকু গুরুত্বপূর্ণ ঠিক তেমনি সাধারণ একজন শ্রমিকের মূল্যও ততোটুকু গুরুত্বপূর্ণ। সিঙ্গাপুর নিজে সিঙ্গাপুর হয়ে উঠেছে মানুষ ও শ্রমের ঘামের মূল্যায়ন করে। কোন চাপাবাজিতে নয়, কর্ম ও মেধার সমণ্বয়ে তারা আজ এই পর্যায়ে। তাই বিশ্ব যেদিকেই যাক সিঙ্গাপুর আছে এবং থাকবে। স্বর্ণক্ষরে খোদাই করে লেখা থাকবে তাদের নাম।














