মাটির পিঞ্জরার মাঝে বন্দি হইয়ারে’

662

ডক্টর এম মুজিবুর রহমান: এক: যাদের মন নাই তাদের চেনা সহজ। তাই মানুষ চেনা খুব কঠিন। অনেকে ভাবতে শুরু করেছেন করোনা ভাইরাসের মন আছে নাকি? সহজে ধরা দিচ্ছে না যে! এই ভাইরাস নাকি ইতিমধ্যে কয়েকবার চেহারা বদল করে ফেলেছে। রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি সবকিছুকে উলোট পালট করে দিয়েছে করোনা। গোটা বিশ্ব করোনা জ্বরে আক্রান্ত। বুকারজয়ী ভারতীয় ঔপন্যাসিক ও লেখক অরুন্ধতী রায় সম্প্রতি লিখেছেন, ‘আতঙ্কিত না হয়ে এখন কার পক্ষে লাফিয়ে বাসে চড়া বা বাচ্চাকে স্কুলে পাঠানোর মতো বিষয়গুলো নিয়ে চিন্তা করা সম্ভব? ঝুঁকির কথা না ভেবে কে ভাবতে পারে মামুলি আনন্দের কথা? এমন কোনো বিজ্ঞানী বা চিকিৎসক কি আছেন, যিনি গোপনে অলৌকিক কিছুর আশা করছেন না? কোন ধর্মীয় গুরু আছেন, যিনি অন্তত গোপনে বিজ্ঞানের কাছে আত্মসমর্পণ করেন নি?’

ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস বা অন্যান্য রোগে প্রতিনিয়ত মানুষ আক্রান্ত হয় এবং মৃত্যুও হয় । কিন্তু আধুনিক যুগে সারা দুনিয়াকে একসাথে এমনভাবে মৃত্যু ভয় আগে কখনো পেয়ে বসে নি । এখনো ক্ষুধার যন্ত্রনা সইতে না পেরে পৃথিবীর বিভিন্ন প্রান্তে হাজার হাজার মানুষ প্রতিদিন মৃত্যুমুখে পতিত হচ্ছে। রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্যের কারণে বিশ্বের অনেক দেশে প্রতিনিয়ত অস্বাভাবিক মৃত্যুর ঘটনা ঘটছে। বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, শ্রীলংকা, ইন্দোনেশিয়া, ইরাক, সিরিয়া, ইয়েমেন, আফগানিস্তান, ফিলিস্তিন, চীন (উইগুর মুসলমান), রাশিয়া (চেচনিয়া), বার্মার রোহিঙ্গাদের আহাজারি বিশ্ব মোড়লদের মনে এতটুকু নাড়া দিতে পারে নি। কিন্তু করোনা পেরেছে। কারণ বোধকরি একটাই, আধুনিক দুনিয়ার কলকব্জা যাদের হাতে তাদের স্বাভাবিক মৃত্যুর মোটামোটি একটা গ্যারান্টি ছিল। তাই বাকিদের নিয়ে এতো মাথা ঘামানোর সময় কোথায়। কিন্তু করোনা এই গ্যারান্টির জায়গায় হাত দিয়েছে।

শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম ব্যাচের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের তৎকালীন চেয়ারম্যান প্রফেসর শামসুল হক স্যার একটি বিষয়ের অবতারণা করেছিলেন যা আজ কানে বাজে। তিনি বলেছিলেন ঢাকা শেরাটন হোটেলের (নতুন নাম হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টাল) ধারে যেসব বস্তিবাসি থাকেন উপযুক্ত স্যানিটেশনের অভাবে যেখানে সেখানে তাদের মলমূত্র ত্যাগের কারণে সৃষ্ট জীবাণু থেকে হোটেলের মধ্যে অবস্থানকারী বড় সাহেবরাও রক্ষা পান না। তাই তাদের নিজ স্বার্থেই পরিবেশকে জীবাণুমুক্ত করা জরুরি । তিনি বলেন, বর্তমান পুঁজিবাদী কর্পোরেট দুনিয়া গড় দিয়ে অর্থনীতি ও সমাজনীতি পরিচালিত করে থাকে। অর্থাৎ একজনের আয় দশ লক্ষ টাকা আর অন্য জনের কোনো আয় নেই। কিন্তু গড় আয় হলো পাঁচ লক্ষ টাকা। যার কোনো আয়ই নেই তার ভাগের পাঁচ লক্ষ টাকা কোথায়? বক্তব্যটি সমাজতান্ত্রিক চিন্তাচেতনার মনে হলেও এটাই বাস্তবতা। সেসময় বক্তব্যটির মর্মার্থ ভালোভাবে উপলব্দি করতে কষ্ট হলেও প্রাণঘাতী করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব তা বুঝতে সহায়তা করছে । তবে পশ্চিমা বিশ্ব শিল্প বিপ্লব এবং বিশেষ করে রাশিয়ায় সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের পর থেকে পুঁজিবাদী চিন্তাধারা মধ্যে থেকেও ক্রমান্বয়ে ওয়েলফেয়ার রাষ্ট্র গঠনের মাধ্যমে নাগরিকদের মৌলিক সুবিধাদি নিশ্চিত করার চেষ্টা করেছে । বাকিদের অবস্থা এখনো মাইট ইজ রাইট। বিশ্বে অর্থিনীতি ও শক্তির ভারসাম্য তৈরী না হলে করোনা পরবর্তী আরো বৈষম্য বাড়বে যার ফলশ্রুতিতে সাময়িকভাবে কেউ কীয় ফায়দা নিলেও করণের ভয়ঙ্কর ভার্সনের জন্য তাদের তৈরী হতে হব।

দুই:

মহাবিশ্বের তুলনায় পৃথিবী নামক গ্রহটি খুবই ছোট তবে তাৎপর্যমন্ডিত। বিলিয়ন বিলিয়ন বছরের পথ পরিক্রমায় প্রকৃতি তার আপন মহিমায় (ল’জ অব নেচার) পৃথিবীকে মানুষের বাসযোগ্য করে তৈরী করেছে। কিন্তু এই মানুষরাই প্রকৃতির নিয়মবিরুদ্ব কর্মকান্ডের মাধ্যমে এই বাসযোগ্য পৃথিবীকে করছে অভিশপ্ত। জ্ঞান বিজ্ঞানের উৎকর্ষতাকে প্রকৃতির নিয়মের বাচবিচারের বালাই নেই । মানুষের কল্যাণে ব্যবহার না করে চলছে তার অপপ্রয়োগ। সৃষ্টির সেরা মানুষদের নিয়ে চলছে সাপ লুডুর খেলা। প্রকৃতির নিয়মের বিরুদ্বে চলছে উগ্র উন্মাদনা। পৃথিবীতে মানুষ একে অন্যকে দমিয়ে রাখার জন্য বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার অর্থ ব্যয় করে যেসব মরণাস্ত্র তৈরী করছে তার বিরুদ্বে করোনা ভাইরাস এক বিশেষ বার্তা। করোনা ভাইরাস অনেক শাসকের ফাঁকা বুলির ঝুলি সবার সামনে ঊনকোচন করে দিচ্ছে। এ ক্ষেত্রে করোনা শাসকগোষ্ঠীর জন্য এক ধরণের অ্যাসিড টেস্ট। জিডিপি আর উন্নয়নের ফাঁকা বুলি করোনার কাছে বড়ই বেমানান । স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া নাগরিকের মৌলিক অধিকার। এদিক দিয়ে কে, কি পরিমান সুবিধাদি তৈরী করেছেন আর কে কত দ্রুত নাগরিকের সমস্যা সমাধানের দ্রুত কার্যকরী ব্যবস্থা নিতে পারেন তারও একটি পরীক্ষা হয়ে যাচ্ছে।

বিশ্ব ভ্রমান্ডে পৃথিবী নামক ছোট সবুজ গ্রহটিকে বাঁচিয়ে রাখার স্বার্থে প্রত্যেককেই এর যত্ন নিতে হবে এবং জলবায়ু পরিবর্তন প্রতিরোধ ও অন্যান্য ধ্বংসাত্মক শক্তি থেকে সুরক্ষায় কাজ করতে হবে। করোনা ভাইরাস চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিলো যে, এ পৃথিবী নামক গ্রহে কেউ নিরাপদ নন অর্থাৎ ক্ষতি থেকে মুক্ত নন। যাদের বাড়িঘর নেই, সম্পদ ও পরিবার নেই তাদের দিকে আমাদের সাহায্যের হাত প্রসারিত করতে হবে। এই করোনা সংকট আমাদের দেখিয়েছে যে আমরা বিভিন্ন দেশে ধর্ম ও বর্ণে ভিন্নভাবে বসবাস করলেও একে অপর থেকে পৃথক নই। শরীরে যেমন একটি অঙ্গে সমস্যা দেখা দিলে পুরো শরীর অবস করে দেয়। ঠিক তেমনি পৃথিবীর গোটা মানুষ জাতি একই শরীরের অংশ। এজন্য আমাদের প্রত্যেকের নিজের স্বার্থেই একে অন্যের প্রতি সাহায্য ও সহযোগিতা চর্চা করার করার দায়িত্ব রয়েছে।

কোরোনার কারণে যে মৃত্যু ভয় এসেছে তাতে একটা বিষয় পরিষ্কার তাহলো মানুষ অন্তত ঝাড় ফুঁকের চিন্তা না করে আধুনিক চিকিৎসার কথা ভাবছে। আজ থেকে চারশত বছর পূর্বে বিজ্ঞানের সাথে রোমান চার্চের ধর্ম বিশ্বাসের ফারাক হওয়াতে আধুনিক বিজ্ঞানের জনক হিসেবে পরিচিত গ্যালিলিওকে স্বগৃহে বন্দী (হাউস এরেস্ট) করে রাখা হয়। পরবর্তীতে পশ্চিমা বিশ্বে রাষ্ট্র থেকে ধর্মকে ক্রমান্বয়ে পৃথক করে স্বতন্ত্র অবস্থানে রাখা হয়। অনেক সময় কুসংস্কারের বিরুদ্বেও বিজ্ঞানীদের অনেক কাঠখড় পোহাতে হয়েছে। কিন্তু সময় বদল হয়েছে। প্রতিনিয়ত অনেকেই খোঁজ নিচ্ছেন কবে ভ্যাকসিন বের হবে? অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ল্যাব থেকে পরীক্ষামূলকভাবে কোরোনা প্রতিরোধে ভ্যাকসিন মানবদেহে ট্রায়ালের খবরে সবার মধ্যে কিছুটা হলেও আশার সঞ্চার করেছে । যদিও বিশ্বের অন্যান্য দেশ বিশেষ করে জাপান, অস্ট্রেলিয়া, ইউএসএ ও চীন এ ব্যাপারে রাউন্ড দি ক্লক কাজ করছে।

তিন:

জ্ঞান বিজ্ঞানের উৎকর্ষতা মানুষের জীবনকে স্বাচ্ছন্দ্যময় ও স্বাভাবিক মৃত্যুর গ্যারান্টির জন্য কাজ করার পাশাপাশি অতিমাত্রায় প্রযুক্তি নির্ভরতাও প্রকৃতির নিয়মের ভারসাম্য নষ্ট করছে। তাই বিজ্ঞানের সকল আবিষ্কারকে এতো সহজলভ্য করার ক্ষেত্রে হয়তো এখনই চিন্তা করার সময় এসেছে। লক্ষ্য লক্ষ্য মানুষকে বেকারত্বের দিকে ঠেলে দিয়ে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স এর ব্যবহার যে হারে বাড়ছে তাতে দিনশেষে ক্ষতির পাল্লাই ভারী হচ্ছে মনে হয়। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ইতিমধ্যেই সামাজিক হানাহানি আর আত্মপ্রচারণার এক সামাজিক রোগে পরিণত হওয়ার পথে। তাই ক্লোনিংসহ কিছু প্রযুক্তিকে যেমন এথিক্স ও ইথোস এর কারণে সব দেশ অনুমতি দেয় না, এমনিভাবে আরো কিছু প্রযুক্তির ব্যবহার নিয়ে বোধ হয় ভাবতে হবে । মানব কল্যানে সৃষ্ট প্রযুক্তির ব্যবহার মানুষের অকল্যাণ ডেকে আনুক তা কাম্য হতে পারে না। অনেকেই জানেন একটা সন্দেহ আর ভুল পার্সেপশনের কারণে অভিশপ্ত আণবিক বোমার সৃষ্টি। বিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইন যদি জানতেন যে, হিটলার বাহিনী জার্মানিতে আণবিক বোমা তৈরী করতে পারবে না, তাহলে আমেরিকা হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে মানব ইতিহাসের বীভৎসতা ঘটাতে পারতো না। যার জন্য আইনস্টাইন জীবনের শেষদিন পর্যন্ত আক্ষেপ করে কাটিয়েছেন। তাঁর বিখ্যাত সূত্র থেকে আণবিক বোমার সৃষ্টি হলেও এর মাধ্যমে বিজ্ঞানের অনেক উৎকর্ষতাও সাধিত হয়েছে বা এখনো হচ্ছে। তাই বিজ্ঞানের আবিষ্কারকে নয় বরং নিয়ন্ত্রণে করতে হবে এর প্রয়োগকে।

অনেকের আবার বিজ্ঞানের প্রতি কিছুটা অভিমান রয়েছে। তাদের বিশ্বাস ছিল জ্ঞান বিজ্ঞানের চরম উৎকর্ষের জামানায় এরকম একটি ক্ষুদ্র ও অদৃশ্য ভাইরাস এভাবে গোটা দুনিয়ার মানুষ ও শাসকগোষ্টিকে কাবু করে ফেলবে তা কল্পনার অতীত। এরকম ভাবার যথেষ্ট কারণও রয়েছে। আজ থেকে প্রায় অর্ধ শতাব্দী আগে আজকের দুনিয়ার স্মার্ট ফোনে যে ইন্টারনেট সুবিধা রয়েছে তার থেকে কম ইন্টারনেট সুবিধা দিয়ে মানুষ চন্দ্র জয় করেছে । অনেক ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র বস্তু (সাব অ্যাটমিক পার্টিকেলস) থেকে শুরু করে মহাবিশ্বের অনেক অজানা রহস্য আজ মানুষের হাতের নাগালের মধ্যে। কসমিক ব্যাকগ্রাউন্ড রেডিয়েশনের মাধ্যমে মহাবিশ্ব সৃষ্টিকালের অনেক রহস্য উদ্ঘাটিত। শুধু তাই নয়, গ্যালিলিও, আইজাক নিউটন, আইনস্টাইন, সত্যেন্দ্রনাথ বোস, ফাইনম্যান, ম্যাক্সওয়েল, ডিরাক, আব্দুস সালাম, ওয়েনমেনসহ অনেক বিজ্ঞানীদের কয়েকশতকের গবেষণালব্দ ফলাফল থেকে প্রায় ৫৫ বছর পূর্বে গাণিতিক ইকুয়েশনের মাধ্যমে ব্রিটিশ বিজ্ঞানী পিটার হিগ্স বস্তুর ভর (হিগ্স-বোসন) সৃষ্টির যে ফর্মুলা দিয়েছিলেন তা ২০১২ সালে ফ্রান্সের বর্ডার সংলগ্ন সুইজারল্যান্ডর সার্নে অবস্থিত বিশ্বের সবচেয়ে বৃহৎ গবেষণাগার (যার দৈর্ঘ ২৭ কিলোমিটার) লার্জ হ্যাড্রন কোলাইডারে (এলএইচসি) এক্সপেরিমেন্টালি প্রমাণিত হয়েছে। ঐ সময় মিডিয়াতে অনেকে একে গড’স পার্টিকল হিসেবেও আখ্যায়িত করেন। যদিও এর পূর্বে বিজ্ঞানী আইজ্যাক নিউটন ওজনের সাথে শক্তির সম্পর্ক (W-ওয়েট এন্ড E -এনার্জি) এবং আলবার্ট আইনস্টাইন ভরের সাথে শক্তির সম্পর্ক (m-মাস এন্ড E -এনার্জি) নিয়ে গাণিতিক ইকুয়েশন দিয়েছেন। এমনকি ভারতের বাঙালি বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বোস আলবার্ট আইনস্টাইনের সঙ্গে যৌথভাবে বোস-আইনস্টাইন পরিসংখ্যান প্রদান করেন। কিন্তু ২০১২ সালে হিগ্স-বোসনের আবিষ্কার (যার স্থায়িত্ব এক সেকেন্ডের মিলিয়ন ভাগেরও কম) আধুনিক মহাকাশ গবেষণা ও অতি ক্ষুদ্র পার্টিকল গবেষণায় বিজ্ঞানকে অন্য মাত্রায় নিয়ে যায়। এখানে বিশেষভাবে উল্লেখ্য যে, মহাবিশ্বে শুধু পৃথিবী নামক গ্রহ নয় পৃথিবীর চেয়ে মিলিয়ন মিলিয়ন বৃহৎ সূর্য এবং তার চাইতেও মিলিয়ন মিলিয়ন বৃহৎ বিলিয়ন বিলিয়ন নক্ষত্র ও গ্যালাক্সির গঠন ও অবস্থানের জন্য যে বল/শক্তি ও প্রকৃতির সূত্র বিদ্যমান তা কিন্তু ন্যানো মিটারের চেয়েও ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র একটি পরমাণুর গঠনের মধ্যে অবিকল সাদৃশ্য রয়েছে। যা প্রকৃতির রহস্য উন্মোচনে বিজ্ঞানের এক অভাবনীয় বিজয়।

এমনিভাবে কোনো বস্তুর পরমাণুর গঠন ও বৈশিষ্ট (চরিত্র) থেকে ঐ বস্তুর বৈশিষ্ট সম্পর্কে একটা পরিষ্কার ধারণা পাওয়া যায়। জাগতিক জগতের বিজ্ঞানের এই ব্যখ্যার সাথে আধ্যাত্মিক বা ধর্মেরও একটা মিল দেখা যায়। হাদিসে রয়েছে কোনো জনগোষ্ঠীকে দেখে বুঝা যায় তাদের শাসক কেমন .অন্যদিকে শাসক বা সমাজ ও কমিউনিটির নেতৃত্ব দেখে ঐ এলাকার জনগণ তথা কমিউনিটি সম্পর্কেও একটা সম্যক ধারণা পাওয়া যায়। পপুলিস্টের জামানায় যে যেভাবে পারে ধান্দা নিয়ে ব্যস্ত থাকতে দেখা যায়। এর সাথে যোগ হয়েছে কট্টরপন্থী চিন্তা চেতনা। এটা শুধু রাষ্ট্রের করতে ব্যক্তিদের ক্ষেত্রেই যে দেখা যায় তা নয়। প্রতিটি পেশাতেই একটি বলয় সৃষ্টির মাধ্যমে ধান্দাবাজি ও চাটুকারিতার ব্যবসা এখন জমজমাট। এখানে কারো পক্ষে থাকতে হবে আর না হয় আপনি হয়ে যাবেন উল্টোপক্ষের লোক। অনেকে জেনে আবার অনেকে অবচেতন মনে উপরে উপরে ভালো মানুষের আলখেল্লা দিয়ে ভেতরে পোষে রাখেন অহমিকা, হিংসা আর ব্যক্তিকেন্দ্রিক আত্মপ্রচারণা। এসবই প্রকৃতির নিয়ম ও রীতি বিরুদ্ব। সমাজ, কমিউনিটি ও রাষ্ট্রে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক ভারসাম্যের ব্যাঘাতও প্রকৃতির ইকো সিস্টেমের বিরুদ্ব নীতি। যা প্রকারান্তরে প্রকৃতির ভারসাম্য নষ্ট করছে।

চার:

মহাবিশ্ব সৃষ্টির আদি পরিবেশ তৈরী করে প্রায় আলোর সমান গতি দিয়ে পরমাণুর কলিশন এবং এর থেকে হিগ্স-বোসনের অস্তিত্ব (বস্তুর ভরের উৎস) প্রমাণ করার পর বিজ্ঞানের প্রতি মানুষের একটু বাড়তি আশা থাকতেই পারে। তবে করোনার প্রাদুর্ভাবের পর সম্প্রতি জার্মানির একজন প্রখ্যাত বিজ্ঞানী মন্তব্য করেছেন যে, বিশ্ব নেতৃত্ব বিজ্ঞানকে অগ্রসর করতে যতোটা সহযোগিতা করা দরকার ছিল তা থেকে অনেক দূরে । আজ-কাল মেসি, রোনাল্ডোরা দুনিয়ার ক্রেজ, বিজ্ঞান নয়। তাই তিনি কিছুটা ক্ষোভের সাথে বলেন, মেসি বা রোনাল্ডোদের বলো কোরোনার ভ্যাকসিন তৈরী করে দিতে ? তাঁর মন্তব্য নিঃসন্দেহে বিজ্ঞানের প্রতি দুনিয়ার প্রভাবশালী শাসকগোষ্ঠীর অনাগ্রহের ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ ।

বাস্তবেও তাই। আজকাল পিওর সায়েন্সে পড়ালেখার জন্য ভালো ছাত্ররা আসতে চায় না। কারণ তাদের চেয়ে মেধায় পিছিয়ে পরা ছাত্র যখন কমার্শিয়ালি লাভজনক সাবজেক্টে পড়ালেখা করে আলিশান বাড়ি-গাড়ি হাঁকিয়ে বেড়ায় তখন পিওর সায়েন্সে ভালো ছাত্ররা পড়তে আসবে কোন দুঃখ্যে। আর পিওর সায়েন্স ছাড়া বিজ্ঞানের ভালো আবিষ্কারের সম্ভাবনা খুব কম। বিভিন্ন দেশের সরকার এগিয়ে না আসলে কর্পোরেট ব্যবসায়ীরা তাদের স্বার্থ বাদ দিয়ে এতে এগিয়ে আসবে না। এর পরে মরার উপর খোঁড়ার ঘা দেখা দিয়েছে স্বল্পমেয়াদি রাজনীতির পপুলিস্ট ধান্দা। এই ধান্দা পূর্বে উন্নয়নশীল দেশগুলোতে থাকলেও উন্নত বিশ্বে ইদানিং এর প্রকোপ বাড়ছে বিধায় আমেরিকায় আজ ট্রাম্পের মতো এক বর্ণবাদী শাসক, ভারতে কট্টর হিন্দত্ববাদী মোদী ক্ষমতায়। ইউরোপেও আজকাল কট্টরপন্থী দলের নেতারা হয় ক্ষমতায় আর নয় ক্ষমতার একেবারে ধারপ্রান্তে বড় স্টেক হোল্ডার। এসব পপুলিস্ট শাসকগোষ্ঠীদের কারণেই সম্প্রতি অক্সফোর্ড ডিক্শনারিতে পোস্ট ট্রুথ (সত্যের বাইরে) নামে একটি শব্দের নতুন সংযোজন গঠেছে। আর এই অবস্থা শুধু রাষ্ট্রের শাসকগোষ্ঠির মধ্যেই সীমাবদ্ব নেই। তা আজ সমাজ ও কমিউনিটির রন্দ্রে রন্দ্রে বহমান। সবাই যার যার ধান্দা কায়েমে সমাজ ও কমিউনিটিকে এলোমেলো করে দিয়ে লুটে পুটে খাওয়া আর কেউ কেউ তথাকথিত সমাজ ও কমিউনিটি দরদী সাজার ভণ্ডামি মত্ত। কিন্তু এরা এতদিন জানলেও মানতে রাজি হয় নাই যে, ‘নগরে আগুন লাগলে দেবালয় এড়ায় না’ । তাই সমাজের বেবাকবান মানুষদের এদেরকে ‘না’ বলে এখনো সমাজ, কমিউনিটি, রাষ্ট্র তথা গোটা বিশ্বকে নিরাপদ করা সম্ভব। অন্যথায় মৃত্যুভয়ে কুপোকাত হয়ে গোটা বিশ্ব ডারউইনের ন্যাচারাল সিলেকশনে নিঃশেষ হতেও সময় লাগবে না। মরণঘাতী করোনা অভিশাপ না হয়ে আশীর্বাদ হতে পারে, যদি এর উপলব্দিকে কাজে লাগানো যায়।

১০০ বছরেরও বেশি সময়ের মধ্যে মানুষ যেসব হুমকির মুখোমুখি হয়েছে, এর মধ্যে সবচেয়ে বড় হুমকি এই করোনা ভাইরাস। জীবন আর আগের মতো খুব তাড়াতাড়ি সহজ হবে বলে মনে হয় না। বিষয়টি আমাদের অবশ্যই ভাবিয়ে তুলছে । একে অন্যের প্রতি সহনশীল হয়ে সাহসের সঙ্গে একে মোকাবিলা করতে হবে। প্রকৃতির নিয়মের মধ্যে থেকে দুনিয়াটাকে মানুষের উপযোগী করে সাজাতে করোনা, সবার মনে উগ্রতা ও হিংস্রতার পরিবর্তে জাগ্রত করুক মানবিকতা। হিংসা, হানাহানি, অহমিকা আর অবসান হোক অস্ত্রের ঝনঝনানি । জীবনটা শুধু চাওয়া-পাওয়া আর না পাওয়ার বেদনায় হিংস্র হয়ে উঠা নয়। গোটা দুনিয়া সজ্জিত হোক একের প্রতি অন্যের মানবিকতা ও মায়া-মমতায় আবদ্ব এক শান্তির কুঠির ।