করোনার পরিচয়: এক ধরনের আরএনএ ভাইরাস যা খুবই সংক্রামক বা কমিউনিকেবল। প্রথম ১৯৬০ দশকের শেষের দিকে তাদের আবির্ভাব নিশ্চিত করা হয় l
করোনা পরিবারের অন্য সদস্যরা উদাহরণস্বরূপ SARS-CoV ২০০২ এর শেষের দিকে আসলেও পরিবারের নতুন সদস্য Covid-19 এর আগমন চীনের উহানে ডিসেম্বর ২০১৯ -এ।
COVID 19 এর মত SARS-CoV বা অন্যরা এত ভয়ানক ছিল না বা এত প্রাণহানী ঘটায় নাই l পরিসংখ্যান অনুযায়ী (SARS-CoV))- এ সর্বমোট মৃতের সংখ্যা ছিল ৭৭৪I বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুসারে আজ ২১ মার্চ ২০২০ সন্ধ্যে ৬. ৩০ পর্যন্ত COVID -19 এ মৃতের সংখ্যা ১২,৮৩৬ এবং সারা পৃথিবীতে আক্রান্তের সঙ্খ্যা ২৯৮,৩০৫ যা হৃদয় বিদারক বিজ্ঞানীদের ধারনা বন্য বা সামুদ্রিক প্রানী থেকে এর উৎস আবার কারো কারো ধারণা এটা ব্যবহার করা হচ্ছে Bioweapon হিসাবে যা হয়তো বা কোনো ল্যাব থেকে বেরিয়ে এসেছে। এটা একটা বহুরুপি নতুন ভাইরাস এবং বিজ্ঞানীরা নিরন্তর প্রচেষ্ঠা চালিয়ে যাচ্ছেন এই ভাইরাস সম্মন্ধে আরো জানতে ।
ব্রিটিশ গভর্নমেন্ট ৬০ মিলিওন পাউন্ড বরাদ্ধ করেছেন, এর প্রতিষেধক তৈরী করতে। যুক্ত রাজ্য, যুক্তরাষ্ট্র জাপান চীনসহ পৃথিবীর সব দেশই সাধ্যমত চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
তাই আতংকিত না হয়ে সতর্ক হওয়া, ধৈর্যসহকারে অপেক্ষা করা এবং শক্ত মনোবল এর বিকল্প নাই এ মুহুর্তে l কারন আমরা যারা বিশ্বাসী তারা তো জানি ‘আল্লাহ তায়ালা এমন কোনো রোগ অবতীর্ণ করেননি। যার নিরাময়ের উপকরণ তিনি সৃষ্টি করেননি।’ (বোখারি: ৫২৭৬)।
কি করে করোনা:
শুষ্ক কাশি, সর্দি, শ্বাসকষ্ঠ আর ভাইরাল নিউমোনিয়া । বমি এবং ডায়ারিয়াও হতে পারে l কোন কোনো ক্ষেত্রে অর্গান ফেইলর বা জীবনাবসান ও ঘটতে পারে তবে এর সংখ্যা এখনো শতকরা চার জনের কোঠায় । বাকী শতকরা ছিয়ান্নব্বই জন সুস্থ হচ্ছেন l যেহেতু এন্টিবায়োটিক এখানে কাজ করবে না তাই রেস্ট, প্রচুর পানি এবং স্বাস্থ্যসম্মত খাবার আর মনোবাল অত্যন্ত প্রয়োজন ।
কে কতটুকু ঝুঁকিতে:
ষাট বছরের ওপরে যাদের বয়স এবং যাদের হাঁপানী বা শ্বাসকষ্ট ,ডায়াবেটিস, হার্ট ডিজিজ, কেন্সার বা অন্যান্য সংক্রামক অসুখ বিসুখ আছে তাদের জন্য বেশি সতর্কতা অবলম্বন করা অতীব জরুরীl পরিসংখ্যানে দেখা যায় ৮০ বছরের উপরে যাদের বয়স, মৃত্যু ঝুঁকি তাদেরই সবচেয়ে বেশি (২১.৯%) তবে নয় বছর পর্যন্ত যাদের বয়স তাদের প্রাণহানীর খবর এখনো পাওয়া যায়নি l বয়স দশ থেকে ৩৯ বছর পর্যন্ত মৃত্যুর হার তুলনামূলক ভাবে কম যা প্রতি হাজারে দুজন l সূত্র WHO
কে এবং কিভাবে আক্রন্ত হতে পারেন ?
যে কেউ আক্রান্ত হতে পারেন এবং তা সংক্রমিত হতে পারে মূলত দুভাবে l সরাসরি আক্রান্ত ব্যক্তি থেকে বা কুনো বাহনের মাধ্যমে যেমন আক্রান্ত রুগীর হাঁচির মাধ্যমে বাতাসে বা জীবাণু লেগে আছে কুনো একটা জিনিসের মাজে, তা থেকে; যেমন মোবাইল স্ক্রীন, কিবোর্ড, দরোজার হ্যান্ডেল গাড়ীর স্টিয়ারিং ইত্যাদি l কিন্তু কিছু কিছু লোকজনের আক্রান্ত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি থেকে যায় যেমন স্বাস্থ্য সেবা প্রদানকারী দল l ডাক্তার, নার্সসহ সকল হাসপাতাল ও স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে কর্মরত ব্যাক্তিরা, এমনকি পরিচ্ছন্নতা কর্মীও। আছেন যারা সরাসরি মানুষের বা মানুষের ব্যবহৃত দ্রব্যের সংস্পর্শে আসেন। যেমন বিউটি পার্লার, ফিজিওথেরাপি, কেয়ারগিভার , স্কুল কলেজ মাদ্রাসার ছাত্রছাত্রীরা ও শিক্ষক বৃন্দ l
প্রথম কি করা উচিত এবং কখন ডাক্তারে যাবেনঃ
শতকরা আশিজনের উপসর্গ খুবই মৃদু mild যার জন্য হাসপাতালে যাবার প্রয়োজন হয় না, ঘরে থেকেই পুরোপুরি সুস্থ হচ্ছেনl
ইতিমধ্যে বিশ্বের ১৮৬ টি দেশে দেশে ছড়িয়ে পড়া করোনাভাইরাসে আপনার আক্রান্ত হওয়া খুব অস্বাভাবিক নয় এবং আক্রান্ত হলে আপনি কি করবেন? সর্দি কাশী হলেই যে আপনার করোনা তা কিন্তু সঠিক নয় l করোনা ছাড়াও আরো অনেক কারন রয়েছে সর্দি কাশি হবার l নির্ভরযোগ্য পরিসংখ্যানে দেখা যায় শুধু এলার্জিজনিত কারনে শতকরা চল্লিশজনের সর্দি হতে পারেl সুতরাং সর্দি কাশি হলেই আপনাকে ডাক্তারের কাছে না গিয়ে ঘরে থেকে বিশ্রাম নেবার পাশাপাশি যা করতে পারেন:
১l লবন গরম পানি দিয়ে গড়গড়া রোজ তিন/ চারবার l
২l প্রচুর পরিমান পানি এবং লেবু শরবত যাতে শরীরে পানির ঘাটতি না থাকে বরং hydrated থাকেl
৩l পরিমিত স্বাস্থ্যকর খাবার l
৪ l প্রয়োজনে মোবাইল ফোনে আপনার ডাক্তারের সাথে আলাপ করতে পারেনl
কিছু ঔষধ কাউন্টার থেকে এনেও ব্যবহার করতে পারেন তবে মনে রাখবেন যেকোনো কিছুতেই ব্যক্তি বিশেষে এলার্জিক রিএকশন হতে পারে এমনককি স্বাভাবিক খাবারেও l তাই যে কোনো বিরূপ প্রতিক্রিয়া উপলব্দি করলে ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া খুবই দরকারl
বয়স্ক হলে, সর্দি ও কাশির জন্যে ট্যাবলেট সিটিরিজিন (Cetirizine) ১০ মিলিগ্রাম রোজ ১টা l শিশু হলে ছয় মাস থেকে এক বছর আধা চামচ সিরাপ রোজ একবার এবং এক থেকে পাঁচ বছর আধা চামচ রোজ দুই বার এবং ছয় থেকে দশ বছর পর্যন্ত ১ চামচ করে দুই বার দেওয়া যেতে পারেl দশ বছরের ওপরে যাদের বয়স তাদেরকে রোজ একটা ট্যাবলেট/বা দু চামচ সিরাপ দেয়া যেতে পারেl সিটিরিজিন সিরাপ প্রতিদিন খাওয়াতে পারেন সাত থেকে দশ দিন l যারা বয়স্ক তারা অতিরিক্ত জ্বর হলে প্যারাসিটামল ট্যাবলেট ৫০০ মিলিগ্রাম ১টা বা দুইটা করে রোজ তিনবার ভরা পেটে খেতে পারেন এবং শিশুদের ক্ষেত্রে এক বছর পর্য্যন্ত আধা চামচ করে তিন বার দেওয়া যেতে পারে l তবে এক বছরের উপরের শিশুকে ছয় বছর পর্যন্ত অতিরিক্ত জ্বর হলে এক থেকে দুই চামচ এবং বয়স ছয় থেকে বার হলে দুই থেকে চার চামচ পর্যন্ত রোজ তিন বার দেয়া যেতে পারেl শিশুদের ক্ষেত্রে ডাক্তারের পরামর্শ নেয়া উত্তমl
কিন্তু যদি জ্বর মাত্রাতিরিক্ত হয়, ক্রমাগত কাশি এবং শ্বাসকষ্টসহ অন্যান্য উপসর্গ থাকে যার তীব্রতা বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই সাতদিন পরে সাধারণত লক্ষ করা যায় তখন আপনাকে ডাক্তারের সরনাপন্ন হয়ে ব্যবস্থা নিতে হবে l চিকিৎসক আপনার অবস্থা অনুযায়ী চিকিৎসা দিতে পারবেন যেমন শ্বাস কষ্টের জন্য অক্সিজেন এবং ব্রঙ্কোডাইলেটর, ইনহ্যালেড বা সিস্টেমিক স্টেরইড তা ছাড়াও রয়েছে অনেক ব্যবস্থা সুতরাং আপনার ঘাবড়িয়ে যাবার কিছু নাইl
তবে একটা কথা ভুলবেন না যা নিজের এবং অন্যের মঙ্গলার্থে l সর্দি কাশি হলে আপনি অন্যদের থেকে নিজেকে সরিয়ে রাখবেন (Isolation/quarantine) যাতে করোনা হোক বা না হোক স্বাভাবিক Flu হলেও যাতে জীবাণুটা আপনার প্রিয়জন বা অন্যের কাছে চলে না যায়/ সংক্রমিত না হয় l
বেশিরভাগ মেডিকেল সাইন্টিস্ট সর্দি জ্বর হলে ১৪ দিন আলাদা থাকার পরামর্শ দিচ্ছেন যা মানা অতীব জ্বরুরিl তবে সর্দি জ্বরে আক্রান্ত না হলেও এই সংকটময় সময়ে নিজেকে নিরাপদে রাখা অতীব জ্বরুরিl
ইউনিসেফ এর কিছু তথ্য নীচে দেয়া হলো যা অত্যন্ত দরকারী l মাস্ক ব্যাবহার করা আপনার এবং অন্যের জন্যে উত্তম l
করোনাভাইরাস মাটিতে অবস্থান করে, এটি বাতাসে ছড়ায় না। তবে আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচির সাথে বাতাসে ভর করে আপনি তাৎক্ষণিকভাবে সংক্রমিত হতে পারেন তাই সতর্ক থাকতে হবে। কোনো ধাতব তলে বা বস্তুতে করোনা পড়লে প্রায় ১২ ঘণ্টা জীবিত থাকতে পারে। তাই সাবান দিয়ে হাত ধুলেই যথেষ্ট হবে। করোনাভাইরাস কাপড়ে ৯ ঘণ্টা জীবিত থাকতে পারে। তাই কাপড় ধুয়ে রোদে দুই ঘণ্টা রাখলে ভাইরাসটি মারা যাবে। করোনাভাইরাস হাত বা ত্বকে ১০ মিনিটের মতো জীবিত থাকতে পারে।
তাই অ্যালকোহল মিশ্রিত জীবাণুনাশক হাতে মেখে নিলে ভাইরাসটি মারা যাবে। গরম আবহাওয়ায় করোনাভাইরাস বাঁচে না। ৭০ ডিগ্রি সেলসিয়াসের তাপমাত্রাই ভাইরাসটিকে মারতে পারে। কাজেই ভালো না লাগলেও বেশি বেশি গরম পানি পান করুন।
আইসক্রিম থেকে দূরে থাকুন। লবণ মিশ্রিত গরম পানি দিয়ে গারগল করলে গলা পরিষ্কার হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে টনসিলের জীবাণুসহ করোনাভাইরাস দূর হবে। এছাড়া ফুসফুসে সংক্রমিত হবে না। করোনা ভাইরাস প্রতিরোধে নাকে, মুখে আঙ্গুল বা হাত দেয়ার অভ্যাস পরিত্যাগ করতে হবে। কারণ, মানব শরীরে জীবাণু ঢোকার সদর দরজা হলো নাক-মুখ-চোখ।
এই মুহূর্তে কি চিকিৎসা:
উপরুক্ত ব্যবস্থার পাশাপাশি বর্তমানে আমাদের চিকিৎসায় রয়েছে হার্ড ইম্মিউনিটিঃ কিছু কিছু ভাইরাসের যেমন Influenza A এবং influenza B ভাইরাসের প্রতিষেধক বা চিকিৎসা (Tamiflu) আছে কিন্তু করোনার কুনো ভ্যাকসিন এখনো আমাদের জানা নাই সুতরাং পুরো চিকিৎসাটাই নির্ভর করছে মূলত আমাদের শরীরের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতার ওপর, (control & elimination) নইলে ওই ভাইরাস থেকে নিরাপদ দূরত্বে থাকতেই হবে l রোগ প্রতিরোধের পুরো ব্যবস্থাকে আমরা ইম্মিউন সিস্টেম বলিl আর সহজ কথায় যার ইম্মিউন সিস্টেম যত শক্তিশালী সে তত নিরাপদ l তার মানে এ ধরনের রোগীরা ওই ভাইরাস মুকাবিলায় নিজ শরীরে এক ধরনের সৈনিক তৈরী করতে সক্কম হয় যাকে আমরা ভাইরাস স্পেসিফিক এন্টিবডি বলিl যা ওই ভাইরাস কে ধ্বংস করতে সক্কম হয়l
কিন্তু যাদের ইমিউন সিস্টেম দুর্বল বা কুনো কারনে ভাইরাসের কাছে হার মেনে নেয় তখন আমাদের সেলের (cell) কন্ট্রোল ওই ভাইরাস নিয়ে যায় এবং সেল কে ধ্বংস করে দেয় lএ সকল ক্ষেত্রে আমাদের ভ্যাকসিন বা ঔষদের প্রয়োজন l আর ভ্যাকসিন বা ঔষধ আবিষ্কারের পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত হার্ড ইমমুনিটিই মূলত আমাদের চিকিৎসা যা অবশ্যই ভ্যাকসিন ছাড়া মোটেই উদ্বেগমুক্ত নয়l
হার্ড ইম্মিউনিটিঃ একটি সম্প্রদায়ের একাংশকে টিকা প্রদানের মাধ্যমে পুরা সম্প্রদায়ের সমগ্র জনগণ কে রোগের হাত থেকে রক্ষা করা সম্ভব যা হার্ড ইমিউনিটি (Herd immunity) নামে পরিচিত। যেহেতু এই ভাইরাসের ভেকসিন নাই সুতরাং শতকরা ষাট জন ব্রিটেনবাসী এই রোগী আক্রান্ত হতে হবে যা তাদের মধ্যে ইম্মিউনিটি ডেভেলপ করবে । তখন দেশের অধিকাংশ মানুষ ইম্মিউনাইজড হয়ে যাবে আর তারা করোনা ছড়াবে না এতে করে বাকী শতকরা চল্লিশজনের আক্রান্ত হওয়ার ঝুকিও কমে যাবে l
করোনা থেকে বাচতে চাইলে সতর্কতার পাশাপাশি অন্যতম উপায় আল্লাহর দেওয়া ইম্মিউন সিস্টেম যা করোনা মোকাবিলার জন্য যথেষ্ট এবং তা রোবাষ্ট বা শক্তিশালী রাখার জন্য স্বাস্থ্যসম্মত খাবারের পাশাপাশি মনোবল l মনোবল ভেংগে গেলে ইম্মিউন সিস্টেম করোনা ভাইরাসের সাথে যুদ্ধে হেরে যেত পারে এবং তখনই সমস্যা। আপনি যখন ঘাবড়ে যাবেন তখন আপনার শরীরে এড্রেনালিনসহ কিছু কেমিকেল রিলিজ হবে যা আপনার ইম্মিউন সিস্টেমকে দুর্বল করে দিবে। ইম্মিউন সিস্টেম হলো রোগ প্রতিরোধের জন্য আমাদর শরীরে আল্লাহর দেওয়া সৈনিকেরা। বিজ্ঞানের শিক্ষার্থীদর কাছে রক্তের শ্বেত কনিকা নামে পরিচিত। মনে রাখবেন আল্লাহ তালা এমন কুনো রোগ দেন না যার কুনো চিকিৎসা নাই তবে তারই হুকুমে মানবদের যথোপোযুক্ত ঔষধ বের করতে কখনো তাড়াতাড়ি বা কখনো একটু দেরী হয় সুতরাং পূর্ণ ভরসা রাখা অবশ্যই দরকার আল্লাহর ওপর যিনি পরম দয়ালু, সর্বশক্তিমান এবং সবকিছুর মালিক l
ঈমানদারদের ভয় নাই
দিও না দুর্বল করে,
ইম্মিউন সিস্টেম দিয়েছে মহান
বাঁচতে করোনা মোকাবিলা করে।
ডিজিটাল করোনা আতঙ্ক ও করণীয়
ডাক্তার মোঃ শানুর আলী মামুন
এমবিবিএস এমএসসি এলার্জি (ইউ, কে)
এলার্জি বিশেষজ্ঞ















