প্রবাসে আবাস প্রবাসে নির্বাস

1049

ব্যারিস্টার মোহাম্মদ আব্দুস শহিদ: একদিকে চিকুনগুনিয়া আর অন্যদিকে রাজকন্যা! এ ছিল অনাকাঙ্ক্ষিত আরেকটি ঝামেলা। কে সেই রাজকন্যা? পরিচয় দেওয়ার আগে চিকুনগুনিয়া সম্পর্কে কিছু বলা দরকার। প্রকৃতপক্ষে এই রাজকন্যার পরিচয় দেওয়ার দরকার নাও হতে পারে।

চিকুনগুনিয়া! বাহ্ কী চমৎকার একটি নাম। অনেকটা কানা ছেলের নাম পদ্মলোচন। কেউ যদি না জানেন, নাম শুনে সঙ্গে সঙ্গে হয়তো ভালোবাসতে চাইবেন। তবে এটা একটা পচা রোগের নাম। সাংঘাতিক, অপরিষ্কার একটি রোগের এই নাম। আমাকে বলা হলো ঢাকায় চিকুনগুনিয়া। ভ্রমণ করা নিরাপদ নয়। বিস্বাদের ভালোবাসার চেয়ে স্বাদের বিরহই শ্রেয়। কিন্তু রাজকন্যার যদি চিকুনগুনিয়া হয়ে যায়, তবে তাকে তো আর পরিত্যাগ করা যায় না।

বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের এনরোলমেন্ট অ্যাডমিশন টেস্টে উপস্থিত হতে এক সংক্ষিপ্ত সফরে বাংলাদেশ আসার পূর্বমুহূর্তে ক্রমাগতভাবে অনেকগুলো বাধাবিপত্তি স্তূপীকৃত হচ্ছিল। সেই বাধাবাপত্তির অন্যতম একটি হলো এই চিকুনগুনিয়া। যার জন্য আমি মোটেই প্রস্তুত ছিলাম না। টিকিট কনফার্ম করার পরে ঝামেলা বললে উপযুক্ত বিশেষণ দেওয়া হবে বলে মনে হয় না। দ্বিধান্বিত অস্থিরতা আমার একেবারেই অপছন্দনীয়। ঢাকায় প্রতিটি ফ্যামিলিতে দু-একজন এই রোগে আক্রান্ত। নাজনীন বলল, ভাইয়া যদি ঢাকা ভ্রমণ এড়াতে পারেন তাহলে খুবই ভালো হয়। স্পন্দনহীন জীবনে আর যা হোক প্রবৃত্তি নেই এবং যেখানে নেই প্রবৃত্তি সেখানে সার্থকতা পানসে অবশ্যই। আমরা কে না চাই বন্ধনহীন জীবন। এই প্রতিবন্ধকতা, সেই অন্তরায়। নাহ, এবার আর থামা যাবে না। ঢাকা যেতেই হবে।

ঢাকা এয়ারপোর্টে আমাকে যিনি অভ্যর্থনা জানাতে এলেন, তিনি আমার বন্ধু জাহিদ। বিমানের বড় এক কর্মকর্তা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একসঙ্গে পড়ার সুবাদে বন্ধুত্বের বন্ধন যেন রক্তসম্পর্কের চেয়েও অনেক বেশি। এসেই হাতে হাত আর গলায় গলা মিলিয়ে দুই-একটা চুমুটুমু দিল নির্দ্বিধায়। চুমু দিয়ে অবশেষে বলল, শরীরটা খুবই অসুস্থ বন্ধু, কয়েকদিন যাবৎ চিকনগুনিয়ায় ভুগছি। দেখেন কী অবস্থা। করল কী! যে চিকুনগুনিয়াকে নিয়ে এত গুঞ্জন, এত উত্তেজনা, এত উদ্বেগ তা কত সহজে কাছে থেকে দেখা। যেন মেঘ না চাইতেই বৃষ্টি!
বললাম—চিকুনগুনিয়া সঙ্গে করে নিয়ে আসলে? এয়ারপোর্টে না আসলে কি হতো না?
—তা কি করে হয় বন্ধু, অনেক দিন পরে তুই দেশে এসেছিস।

—ও! তাই তুই অসুস্থতা নিয়েই এসেছিস? (ছোঁয়াচে কিনা কে জানে!) ভালোই করেছিস। তো চুমুটুমু না দিলে হতো না?
—অরে না কিছুই হবে না, ভয়ের কিছু নেই। আমার ঘরের সবাই অসুস্থ।

অনেক দিন পর এক বন্ধুকে কাছে পাওয়ার আনন্দ। ভয় মিশ্রিত ভালোবাসা। পরিবারের সদস্যরা, কাছের বন্ধু বান্ধবদের উপদেশ, পরামর্শ উপেক্ষা করে যে রাজকন্যার ভালোবাসায় সাত সমুদ্র তেরো যদি পেরিয়ে আসলাম, সে রাজকন্যা (আমার দেওয়া জন্মভূমির আরেকটি নাম, জন্মভূমির আরেকটি উপমা) যখন অসুস্থ, তার সংস্পর্শে আসা মাত্রই উদ্বেগ আর উৎকণ্ঠা। কিন্তু একদিকে চিকুনগুনিয়ার ভয় আর অন্যদিকে জন্মভূমির ভালোবাসা। আমার মতো আরও অনেকেই জন্মভূমির ভালোবাসাকে প্রাধান্য দিতেন। এবার দেখা যাক কেমন আছে সে রাজকন্যা। বস্তুত বলা প্রয়োজন রাজকন্যাকে আমরা কীভাবে রেখেছি! একজন প্রবাসীর চোখে দেখা জন্মভূমির পরিবর্তন।

দুই.
দোহার হামাদ ইন্টারন্যাশনাল এয়ারপোর্ট থেকে ঢাকা পৌঁছতে সময় লাগল ঠিক পাঁচ ঘণ্টা। ছোট একটি শহর দোহা। কিন্তু চমৎকার সুন্দর একটি এয়ারপোর্ট। এই এয়ারপোর্টের সৌন্দর্য বর্ণনা করতে বলতে পারি-ছিমছাম আর আধুনিকতার ছোঁয়ায় পরিকল্পিত এবং সুন্দরভাবে সজ্জিত ক্যানভাসে শিল্পীর তুলিকার অনুপম স্পর্শ যেন। কাতার এয়ারওয়েজ একটি পাঁচতারকা গ্রাহক অনুকূল সেবা দিয়ে আকাশ পথে ভ্রমণে ভিন্নতা নিয়ে আসার ফলপ্রসূ প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখছে বলে মনে হলো। দুর্ভাগ্য এই যে, এই ছোট দেশটি ও কাতার এয়ারওয়েজের বিরুদ্ধে কতিপয় ব্যর্থ প্রায় রাষ্ট্র উঠে-পড়ে লেগেছে। ষড়যন্ত্র চলছে কাতার এয়ারওয়েজের বিরুদ্ধে। কতিপয় আত্মম্ভরি আর স্বার্থান্বেষী দেশ তাদের আকাশ সীমায় কাতার এয়ারওয়েজের প্রবেশ নিষেধ করে শান্তির ঢোক গিলছে ইতিমধ্যে।

যা হোক, প্রবাসীর চোখে জন্মভূমির চিত্রে ফিরে আসি। এয়ারপোর্ট থেকে একটি ট্যাক্সি ভাড়া করা হয়ে গেল। উবার ট্যাক্সি। ভালো লাগল উবার ট্যাক্সি ঢাকায় দেখতে পেয়ে। ইউরোপ-আমেরিকাসহ প্রায় সারা বিশ্বে উবার ট্যাক্সি ইন্ডাস্ট্রিতে যুগান্তকারী সৃজনী বিপ্লব নিয়ে এসেছে। ইউরোপে যদিও এই সফটওয়্যার ভিত্তিক ট্যাক্সি কোম্পানিকে বল প্রয়োগে অপর্যাপ্ত হলেও বিরাট অঙ্কের ট্যাক্স আদায় করছে সরকার। দীর্ঘদিন যাবৎ এই ধরনের মার্কিন কোম্পানিগুলো (যেমন, গুগল, স্টারবাক ইত্যাদি) খুবই ন্যূনতম আয়কর দিয়ে আসছিল—বিদেশে ওদের দপ্তর অবস্থিত, এই অজুহাতে। কিন্তু বর্তমানে তাদের এই অজুহাত আর কাজ দিচ্ছে না। ইউরোপের বিভিন্ন দেশ তাদের ওপর চাপ প্রয়োগ করে আসছিল লভ্যাংশের একটি অংশ স্বেচ্ছায় অর্জিত দেশে ফেরত দিতে।

জানি না বাংলাদেশে তারা অর্জিত টাকার ওপর পর্যাপ্ত আয়কর দিচ্ছে কিনা। তাদের দপ্তর বাংলাদেশের ভেতর নেই। এই অজুহাতে হয়তো আয়করের আওতায় নাও আসতে পারে। সে ক্ষেত্রে তাদের সঙ্গে সরকার চুক্তি করে ভিন্ন পন্থায় দেশের অর্থনীতিতে অথবা যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির জন্য অবদান আদায় করতে পারেন বলে একজন আইনবিদ হিসেবে আমার ব্যক্তিগত অভিমত থাকবে বৈকি। হিসাব সহজ, তুমি যেথায় আয় করবে সে জায়গার উন্নতিতে নির্দ্বিধায় অবদান রাখবে। কিন্তু কে জানে সরকারের কোনো পর্যায় তাদের সঙ্গে কি চুক্তি হয়েছে এবং আদৌ কোনো চুক্তি আছে কিনা! আজকের আলোচ্য বিষয় কিন্তু এই উবারের আয়করের ওপর নয়। জানি না, যদি উচ্চ পর্যায়ের কেউ হয়তো লেখাটা পড়তে পারেন তাই ব্যাপারটা তাঁদের দৃষ্টগোচরে নিয়ে আসলাম।

ঢাকায় উবার ট্যাক্সি যেমন নতুন তেমনি নতুন ঠেকল অবাস্তব ও অবিশ্বাস্য রকমের ট্রাফিক জ্যাম। ঢাকার আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর থেকে সচিবালয়ের সামনে আসতে পাঁচ ঘণ্টা সময় লেগে গেল। আমরা যারা বাইরে থাকি, তাদের জন্য পাঁচ ঘণ্টা অনেক সময়। জীবনের পাঁচ ঘণ্টা মহামূল্যবান সময়। রাতে পাঁচ ঘণ্টা চলে গেলে হয়তো ঘুমের টাইম চলে যেত। কিন্তু দিনের বেলায় এই পাঁচ ঘণ্টায় কত হাজারো লোক হারাচ্ছেন কত শত কোটি টাকার ব্যবসা, তার হিসাব কে রাখেন। কত হারাচ্ছেন মহামূল্যবান ফিকির, আর কত শত শত পূর্বনির্ধারিত সাক্ষাতের সময় হারিয়ে যাচ্ছে গাড়িতে বসে। আমি অর্থনীতির ছাত্র নই। তাই অর্থনীতি বুঝি না। জানি না এই পাঁচ ঘণ্টায় দেশের অর্থনীতিতে কি প্রভাব আসবে। কাতার বাংলাদেশের থেকে ৩ হাজার ৯৫১ কিলোমিটার দূরে। ওখান থেকে ঢাকায় আসতে সময় লাগল মাত্র পাঁচ ঘণ্টা। আর ঢাকার এক জায়গা থেকে অন্য জায়গায় যেতে লাগল পাঁচ ঘণ্টা। অবিশ্বাস্য, কেবলই অবিশ্বাস্য! বিশ্বাস করতে কষ্ট হচ্ছিল।

দেশ সম্পর্কে ভালো ভালো চিন্তা করতে পছন্দ করি, দেশের ভালো দিক দেখতে পছন্দ করি। তাই পরিতাপের বিষয় হলেও মনের গহিনে লুকিয়ে রাখতেই পছন্দ করি। তারপরও হৃদয়ে যখন ব্যথা, তার নিশ্চয় একটি কারণ থাকে, আর যত তাড়াতাড়ি সেই ব্যথার কারণ নির্ণয় করা সম্ভব তত তাড়াতাড়ি সেই ব্যথা নিরাময়ের চিকিৎসা সম্ভব।

বিশ্বের অধিকাংশ দেশে শহরের সঙ্গে বিমানবন্দরের যোগাযোগের এক অনন্য মাধ্যম আধুনিক ট্রেন সার্ভিস। ঢাকার বিদ্যমান রেল যোগাযোগ একটু সম্প্রসারণ করে শহরের সঙ্গে বিমানবন্দরে যোগাযোগের এমন ব্যবস্থা করা কি যায় না?

প্রশাসনের বিকেন্দ্রীকরণ কি, এ নিয়ে আমাকে লেকচার দিতে হবে বলে মনে হয় না। প্রশাসন বিকেন্দ্রীকরণের ফায়দা কি তাও আমাকে বলতে হবে না। কারণ আমি বিশ্বাস করি সরকারের উচ্চপদস্থ অনেক কর্মকর্তা আছেন যারা এই নিয়ে চিন্তা করেন। আমার অনেক বন্ধু আছেন যারা সচিব, অতিরিক্ত সচিব, যুগ্ম সচিব বা উপসচিব। তাদের এই ব্যাপারে বিতর্ক করতে দেখেছি।

আমি শুধু বিদেশের আমার অভিজ্ঞতার কথা বলব। আর এই অভিজ্ঞতার কথা বলতে গিয়ে একটি উদাহরণ দিতে চাই। হোম অফিস নামে ইংল্যান্ডে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একটি বিভাগ আছে যারা বিদেশিদের ভিসা দেওয়ার কাজ করেন। তাদের অফিস ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে সমগ্র ব্রিটেন জুড়ে। এতে করে স্থানীয় জনগণ যেমন চাকরির সুযোগ পায় তেমনি মানুষের রাজধানী মুখো প্রবণতাও হ্রাস পায় অনেকাংশে। লিডস কলেজের ক্যাম্পাস (ছবিতে দেখুন) অন্য একটি শহর কিগলিতে অবস্থিত। এই ক্যাম্পাস যেমন অত্র এলাকার ছাত্রছাত্রীদের লেখাপড়ার প্রতি উৎসাহ জোগাবে, তেমনি আরেকটি সিটির উন্নয়নে এ পদক্ষেপ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করবে। ছবিটি সিটির একটি নামকরা কলেজের। তবে ক্যাম্পাস অন্য সিটিতে। আমাদের কি বিদেশের এ ধরনের পদক্ষেপ একবারও ভাবিয়ে তোলে না?

আগামী পর্বে বাংলাদেশ বার কাউন্সিল অ্যাডমিশন টেস্টের পদ্ধতি নিয়ে লেখার অভিপ্রায় রইল। আর প্রদত্ত ছবিটি এই অ্যাডমিশন টেস্টের সঙ্গে সম্পর্কিত। বার কাউন্সিল একটি আইনজীবীদের সংগঠন হওয়া সত্ত্বেও, অ্যাডমিশন টেস্ট শুধু মাত্র ঢাকায় নেওয়া হলো। আর এর কারণ খুবই রহস্যময়।

সূত্র: প্রথম আলো থেকে প্রাপ্ত