ঢাকা সংবাদদাতা: দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের আতঙ্ক, পলাতক সন্ত্রাসী মোক্তার হোসেন ওরফে ল্যাংড়া আমির খুঁজছে পুলিশ ও গোয়েন্দারা। অল্প সময়ের ব্যবধানে একাধিক ব্যক্তিকে প্রকাশ্যে গুলি করে চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেওয়ার পরপরই আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা সতর্ক হয়ে ওঠেন। তাকে ধরতে বিভিন্ন কৌশলে তার গতিবিধি নজরদারিতে রেখেছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। যদিও বিভিন্ন সংস্থার এমন নজরদারির মধ্যেই রাজধানী ঢাকা, মুন্সীগঞ্জ ও কেরানীগঞ্জের বিভিন্ন গোপন আস্তানায় নিয়মিত আসা-যাওয়া করছে সে। এমনকি তার সাবেক স্ত্রীদের ঠিকানা সংগ্রহ করে, তাদের গোপন আস্তানায় তলব করার নির্দেশনাও দিয়ে যাচ্ছে। মঙ্গলবার (১৮ জুলাই) দুপুরে তদন্ত সংশ্লিষ্ট ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশ ও ঢাকা জেলা পুলিশ কর্মকর্তারা এই তথ্য জানিয়েছেন।
ঢাকা জেলা পুলিশ সুপার শাহ মিজান শাফিউর রহমান জানান, ‘পলাতক সন্ত্রাসী ল্যাংড়া আমিরকে নিয়ে আতঙ্কিত হওয়ার কিছুই নেই। পুলিশ ও গোয়েন্দাদের কৌশলী নজরবন্দিতে আছে সে।’
নাম-পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক তদন্ত সংশ্লিষ্ট একজন পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, ‘ল্যাংড়া আমিরের একাধিক স্ত্রী আছে। তাদের একজনকে ‘লেংড়ি’ নামেই ডাকে আমির। গত কয়েকদিন ধরে সেই সাবেক স্ত্রীকে বিভিন্ন জায়গায় খোঁজ করেছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে। শুধু তাই নয়, আরও একাধিক নারী সদস্যকে সিন্ডিকেটে ভেড়ানোর চেষ্টা করছে আমির। আত্মগোপনের কৌশল হিসেবেই আমির আগের ঘনিষ্ঠ ৩ থেকে ৪ জন নারীকে খুঁজে বের করার নির্দেশনা দিয়ে যাচ্ছে।’
আমিরের আত্মগোপনের এমন কৌশল প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ঢাকা জেলা পুলিশ সুপার শাহ মিজান শাফিউর রহমান বলেন, ‘সাবেক স্ত্রী ও ঘনিষ্ঠজনদের সঙ্গে যোগাযোগের সব পথই বন্ধ। যোগাযোগ রক্ষা করার তথ্য ঠিক নয়।’ তবে শিগগিরই তাকে গ্রেফতার করা সম্ভব হবে বলে জানান তিনি।
উল্লেখ্য, ২০১২ সালের ১১ নভেম্বর সকালে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের শুভাঢ্যার পশ্চিমপাড়ায় বাসার গলির মুখ থেকে মা, বোন ও গাড়িচালককে গুলি করে শিশু পরাগ মণ্ডলকে অপহরণ করে আলোচনায় আসে আমির। এর আগেই অবশ্য তার বিরুদ্ধে হত্যা মামলা ছিল। পরাগ অপহরণের ১৪ দিনের মাথায় ২৩ নভেম্বর অপহরণ মামলার প্রধান আসামি মোক্তার হোসেন ওরফে ল্যাংড়া আমির টঙ্গীতে বন্দুকযুদ্ধে নিহত হয়েছে খবর বের হয়। পরে জানা যায়, মাথায় গুলিবিদ্ধ হলেও বেঁচে আছে আমির। সুস্থ হয়ে কারাগারে অবস্থানের একপর্যায়ে ২০১৬ সালের ১১ আগস্ট ঢাকার আদালতের হাজতখানা থেকে পুলিশকে ধোঁকা দিয়ে পালিয়ে যায়।
এরপর গত কয়েক মাসে তার রহস্যজনক গতিবিধি ও একাধিক ব্যবসায়ীর ওপর গুলিবর্ষণের ঘটনায় ব্যবসায়ীদের মধ্যে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। এছাড়া ডজনখানেক ব্যবসায়ীর ঠিকানায় চিরকুট পাঠিয়ে বিভিন্ন অঙ্কের চাঁদা দাবি করে। পুলিশকে মারারও হুমকি দিয়েছে সে ।
পুলিশের একজন কর্মকর্তা জানান, রাজধানী ঢাকা, কেরানীগজ্ঞ ও মুন্সীগঞ্জের কয়েকটি আস্তানা ধরে তাকে গ্রেফতারে চেষ্টা চলছে। আসলে সে কেরানীগঞ্জ এলাকায় থাকে না। মোটরসাইকেলে চেপে হেলমেট মাথায় দিয়ে কেরানীগঞ্জে এসে ঘটনা ঘটিয়ে চলে যায়। নিজে মোবাইল ফোন ব্যবহার করে না। আমিরের বাড়ি মুন্সীগঞ্জের মিরকাদিম এলাকায়। একসময় দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের পশ্চিমপাড়া এলাকায় জমির ব্যবসায় যুক্ত ছিল। এরপর হাসনাবাদ এলাকায় আবাস গড়ে তোলে। ঠিকমতো হাঁটতে পারে না বলে তার নামের সঙ্গে ‘ল্যাংড়া’ শব্দটি জুড়ে দিয়েছে এলাকাবাসী। তার চলাচলের একমাত্র বাহন মোটরসাইকেল। সহযোগীরা মোটরসাইকেল চালায়, আমির পেছনে বসে থাকে।’
পুলিশের কর্মকর্তারা বলেন, পুলিশের কাছ থেকে পালানোর পর চলতি বছরের মার্চ থেকে কেরানীগঞ্জ এলাকায় আবারও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড শুরু করে আমির। গত ২২ মার্চ চিকিৎসক দম্পতি আবু নোমান ও শাহানা নোমানের রিকশা থামিয়ে ২০ লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে চিরকুট দেয় ল্যাংড়া আমির। চিরকুট দেওয়ার সময় গুলি ছুড়ে আহত করে তাদের বহনকারী রিকশাচালককে।
এরপর গত ২২ মে দিনদুপুরে জিয়ানগর এলাকায় ব্যবসায়ী নুরুল ইসলামের রিকশা থামিয়ে একই কায়দায় তার পায়ে গুলি করে আমির। সর্বশেষ গত রবিবার (১৬ জুলাই) রাতে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জের হাসনাবাদ এলাকায় ব্যাবসায়ী শাহ আলমের বুকে গুলি করে সে।















