ব্রিটেনে পেট্রল-ডিজেলের দাম আরও বেড়েছে

437

ওয়ানবাংলানিউজ: ব্রিটেনের পেট্রল স্টেশনগুলোতে পেট্রল-ডিজেলের দাম এখন অতীতের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। ইউক্রেন সংকটের কারণে এই জালানির মূল্য আরও বাড়তে পারে বলে ধারনা করছেন বাজার বিশ্লেষকেরা। প্রতি লিটার পেট্রলের দাম এখন ১পাউন্ড ৫১ পেন্স; ডিজেলের মূল্যও নতুন রেকর্ড ১পাউন্ড ৫৫ পেন্স ছুঁয়েছে। ৫৫ লিটারের একটি ফ্যামিলি কার আনলেডেড পেট্রল দিয়ে পূর্ণ করতে এখন খরচ হচ্ছে ৮৩ পাউন্ড। আর ডিজেলে খরচ হচ্ছে ৮৫ পাউন্ড।

পরিবারের খরচ চালাতে গিয়ে ব্রিটেনের দরিদ্র পরিবারগুলোকে এখন গাড়ির জ্বালানী, খাবার কেনা এবং ঘরের হিটিং ঠিক রাখার মতো বিষয়ে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নিতে হচ্ছে।

এদিকে ইউক্রেনে রাশিয়ান আগ্রাসনের জবাবে পশ্চিমা বিশ্ব রাশিয়ার বিরুদ্ধে নানা রকম অর্থনৈতিক শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। এর ফলে রাশিয়ার অর্থনীতি দুর্বল হবে এবং সামরিক শক্তি হ্রাস পাবে বলে আশা করছে পশ্চিমা শক্তি। তবে এ ধরনের অর্থনৈতিক অবরোধের কারণে কেবল রাশিয়া আক্রান্ত হবেনা, সারা বিশ্বের মানুষের ওপরই এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। দেখা যাক ব্রিটেনের ওপর কি প্রভাব পড়তে পারে—

বাড়িঘরের হিটিং খরচ বেড়ে যেতে পারেঃ

ইউরোপ এবং ব্রিটেনে ইতোমধ্যে শক্তি ও জ্বালানীর দাম বেড়ে গেছে। ইউক্রেন সংকট এই দাম আরও বাড়াবে বলে ধারনা করা হচ্ছে। গত সাত বছরের মধ্যে জ্বালানী তেলের দাম এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশী। ইনভেসটেক ব্যাংকিং গ্রুপের বিশ্লেষক মারটিন ইয়াং বিবিসিকে বলেন, ব্রিটেনে প্রত্যেক বাসাবাড়ির জ্বালানী খরচ বার্ষিক ৩হাজার পাউন্ড পর্যন্ত হয়ে যেতে পারে।

বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম অপরিশোধিত তেলের রপ্তানিকারক আর বিশ্বের সবচেয়ে বড় গ্যাস রপ্তানিকারক দেশ রাশিয়া। এই দুই কাঁচামাল ঘরবাড়ির হিটিং, উড়োজাহাজের জ্বালানী এবং গাড়ির জ্বালানীতে অপরিহার্য। ব্রিটেন অবশ্য রাশিয়া থেকে মাত্র ৬শতাংশ অপরিশোধিত তেল এবং ৫শতাংশ গ্যাস আমদানি করে থাকে। কিন্তু ইউরোপের দেশগুলো প্রায় অর্ধেক গ্যাসই আমদানি করে রাশিয়া থেকে। রাশিয়ার গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল একটা দেশও যদি কম গ্যাস পায়, তা অন্য দেশের সরবরাহের ওপরও প্রভাব ফেলে। এ কারণে রাশিয়া থেকে ব্রিটেনের তেল ও গ্যাসের আমদানি কম হলেও প্রভাব পড়ে একই রকম। ফলে দামও বাড়ে। ইউক্রেন সংকটে রাশিয়ার ওপর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা আরোপের ফলে তেল ও গ্যাস রপ্তানি কমিয়ে দিয়ে রাশিয়া পাল্টা শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে পারে বলে আশংকা করা হচ্ছে। আরও আশংকা আছেঃ উড়োজাহাজের জ্বালানীর মূল্য বেড়ে গেলে এয়ারলাইনগুলো টিকিটের দাম বাড়িয়ে দেবে। ফলে বাড়তি খরচের চাপ সাধারণ মানুষকেই বহন করতে হবে।

খাদ্য পণ্যের দাম বৃদ্ধিঃ

কৃষিকাজে ব্যবহৃত সার এর সবচেয়ে বড় উৎপাদনকারী ও সরবরাহকারি দেশ রাশিয়া। ইউক্রেন সংকটের কারণে সারের সরবরাহ বাধাগ্রস্ত হওয়ায় খাদ্য উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে। ফলে খাদ্যের দামও বেড়ে যেতে পারে। জেপি মরগান অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের প্রধান মার্কেট স্ট্রেটিজিস্ট কারেন ওয়ার্ড বলেন, রাশিয়া এবং ইউক্রেন কেবল ইউরোপের প্রধান তেল ও গ্যাস রপ্তানিকারক নয়, খাদ্য রপ্তানিতেও এই দুই দেশ গুরুত্বপূর্ণ। বিশ্বের গম উৎপাদনের এক চতুর্থাংশ হয় ইউক্রেন এবং রাশিয়ায়। এছাড়া বিশ্বে সূর্যমুখী ফুলের বীজ ও তেলের অর্ধেক উৎপাদন করে ইউক্রেন। বিশ্বে প্রচুর পরিমাণে খাদ্য শস্যও রপ্তানি করে ইউক্রেন। তাই বিশ্লেষকেরা আশংকা করছেন, ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে খাদ্য শস্য উৎপাদন বাধাগ্রস্ত হবে এবং বিশ্বব্যাপী গমের দাম দ্বিগুণ হয়ে যেতে পারে। ব্রিটেন যদিও ৯০শতাংশ গম দেশেই উৎপাদন করে, তারপরও গমে দাম বাড়তে পারে। কারণ কৃষিকাজে ব্যবহৃত সার রাশিয়া থেকেই কিনে ব্রিটেন।

মরগেজঃ

ব্রিটেনে ইতোমধ্যে মূল্যস্ফীতি ঘটেছে। এই মুহূর্তে মূল্যস্ফীতির হার সাড়ে পাঁচ শতাংশ। সেন্টার ফর একোনোমিক্স এন্ড বিজনেস রিসার্চ এর মতে, ইউক্রেন-রাশিয়া সংকট এর কারণে সরবরাহ ব্যবস্থা বাধাগ্রস্ত হওয়ায় ব্রিটেনের মূল্যস্ফীতি ১০ শতাংশে গিয়ে ঠেকতে পারে। মূল্যস্ফীতি বেড়ে গেলে ব্যাঙ্ক অফ ইংল্যান্ডের সুদের হারও বাড়বে। মূল্যস্ফীতি বৃদ্ধির সাথে সাথে ব্যাঙ্ক অফ ইংল্যান্ডের সুদের হার বাড়ানোর একটা সম্পর্ক আছে। সুদের হার বাড়লে ঋণ গ্রহণের ব্যয়ও বেড়ে যায়। ফলে মানুষ ঋণ না নিয়ে নিজেদের খরচ কমিয়ে দেয়। আর খরচ কমালে সে কেনাকাটাও কম করে। ফলে পণ্য এবং সেবার দাম বৃদ্ধি থেমে যায়। কিন্তু ঘর-বাড়ির মরগেজের সাথে ব্যাংক অফ ইংল্যান্ডের বেসিক সুদের হারের একটা সরাসরি সম্পর্ক আছে। সুদের হার বাড়লে মরগেজের রিপেমেনট এর অংকও বাড়বে। আর মরগেজ খরচ বেড়ে গেলে মরগেজ পরিশোধকারির গৃহস্থালির খরচের ওপর চাপ পড়ে।

পেনশনঃ

ইউক্রেনে রাশিয়ার হামলা শুরু হওয়ার সাথে সাথে রাশিয়ার শেয়ার বাজারে ধস নামে। ৪৫শতাংশ দরপতন হয় রাশিয়ান স্টক মার্কেটে। বিশ্বের অন্যান্য দেশের স্টক মার্কেটেও এর প্রভাব পড়ে। ব্রিটেনের ফুটসি-ওয়ান-হানড্রেড এ দরপতন হয় ৩শতাংশ; জার্মানির ডেক্স ইনডেক্সে দরপতন হয় প্রায় ৫শতাংশ। অনেকে মনে করছেন, স্টক মার্কেটের পতনের কারণে তাদের সরাসরি কোনো ক্ষতি হয়নি। কিন্তু মিলিয়ন-মিলিয়ন মানুষ আছেন, যাদের পেনশনের সঞ্চয়ের অর্থ এসব স্টক মার্কেটে বিনিয়োগ হয়ে থাকে।

গাড়ির মূল্য বৃদ্ধিঃ

মহামারিতে গাড়ি ক্রয়-বিক্রয়ের বাজার সরবরাহ ব্যবস্থায় বাধা এবং চিপ সংকটের কারণে এমনিতেই ধুঁকছিল। ব্রিটেনে ইউজড গাড়ির দাম বেড়ে গেছে। কিছুটা পুরনো গাড়ি এখন বিক্রি হচ্ছে নতুন গাড়ির দামে। গাড়ি তৈরিতে যে ধাতু ব্যবহৃত হয়, বিশ্বে তার সবচেয়ে বড় সরবরাহকারী দেশ রাশিয়া। পশ্চিমা বিশ্বের শাস্তিমূলক ব্যবস্থার পাল্টা পদক্ষেপ হিসেবে রাশিয়া যদি এই ধাতু সরবরাহ বন্ধ করে দেয়, তাহলে গাড়ি নির্মাণ কোম্পানিগুলোকে বিকল্প উৎস থেকে ধাতু সংগ্রহ করতে হবে। রাশিয়ার ভেতরেও ভক্সওয়াগেন, টয়োটা সহ আরও কিছু গাড়ি নির্মাণের কারখানা আছে। শাস্তিমূলক ব্যবস্থার কারণে সেগুলোতে গাড়ি তৈরি বাধাগ্রস্ত হতে পারে। ফলে গাড়ির উৎপাদন এবং সরবরাহ কমে যেতে পারে।