সুইন্ডন বেঙ্গলি কালচারাল সোসাইটির দ্বিতীয় বর্ষের শারদীয় দুর্গোৎসবে হাজারো দর্শনার্থী ও ভক্তের সমাগম, ব্রিটিশ সরকারের মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, বিশিষ্ট প্রশাসনিক ব্যক্তিত্ব, স্থানীয় কাউন্সিলর, বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণ এবং মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক পরিবেশনায় সম্প্রীতি ও ঐক্যের অনন্য দৃষ্টান্ত।

সুইন্ডন, উইল্টশায়ার | ১৬–২০ অক্টোবর ২০২৬
যুক্তরাজ্যের সুইন্ডন শহর পাঁচ দিনব্যাপী পরিণত হয়েছিল এক বর্ণিল উৎসবের মিলনমেলায়। ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য, ঐতিহ্যবাহী বাঙালি সংস্কৃতি, আনন্দ-উচ্ছ্বাস এবং অসাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির আবহে সুইন্ডন বেঙ্গলি কালচারাল সোসাইটি (SBCS) সফলভাবে সম্পন্ন করেছে তাদের দ্বিতীয় বর্ষের শারদীয় দুর্গোৎসব।
গত ১৬ অক্টোবর শুক্রবার থেকে ২০ অক্টোবর মঙ্গলবার পর্যন্ত সুইন্ডন শহরের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত ভেন্যু থ্রিতে (Venue 3) অনুষ্ঠিত হয় পাঁচ দিনব্যাপী এই মহোৎসব।

সুইন্ডন ছাড়াও উইল্টশায়ার, গ্লুচেস্টারশায়ার এবং আশপাশের বিভিন্ন শহর থেকে হাজার হাজার ভক্ত, দর্শনার্থী ও পরিবার এই উৎসবে অংশগ্রহণ করেন।
বর্ণিল আলোকসজ্জা, সুসজ্জিত পূজামণ্ডপ, ঐতিহ্যবাহী বাঙালি পোশাক, পূজা-অর্চনা, পুষ্পাঞ্জলি, মনোমুগ্ধকর সাংস্কৃতিক পরিবেশনা এবং স্বেচ্ছাসেবকদের অসাধারণ আন্তরিকতায় এবারের আয়োজন হয়ে ওঠে এক অবিস্মরণীয় উৎসব।

এই বিশাল আয়োজন সফল করতে দুই শতাধিক স্বেচ্ছাসেবক নিরলসভাবে কাজ করেছেন। পূজার সার্বিক ব্যবস্থাপনা, ধর্মীয় অনুষ্ঠান, সাংস্কৃতিক আয়োজন, অতিথি আপ্যায়ন, মণ্ডপসজ্জা, খাবার প্রস্তুত ও পরিবেশন থেকে শুরু করে প্রতিটি ক্ষেত্রে তাঁদের অবদান ছিল অনন্য।
এবারের দুর্গোৎসবের অন্যতম উল্লেখযোগ্য অর্জন ছিল ছয় হাজারেরও বেশি বিনামূল্যে প্রসাদ ও খাবার প্রস্তুত এবং পরিবেশন। পাঁচ দিনব্যাপী এই আয়োজনে ভক্ত ও দর্শনার্থীদের জন্য ঐতিহ্যবাহী বাঙালি প্রসাদ, দুপুরের খাবার এবং রাতের খাবারের ব্যবস্থা করা হয়।

ব্রিটিশ সরকারের মন্ত্রী, সংসদ সদস্য, স্থানীয় প্রশাসনের উচ্চপদস্থ প্রতিনিধি, কাউন্সিলর, ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব, সমাজকর্মী, বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক, ধর্মীয় ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন এবং স্থানীয় ব্যবসায়ীদের সহযোগিতা এই উৎসবকে আরও সমৃদ্ধ করেছে।
পাঁচ দিনের পূজা, সংস্কৃতি ও আনন্দের মহামিলন
শুক্রবার, ১৬ অক্টোবর – মহাষষ্ঠী: আনন্দঘন শুভ সূচনা
শুক্রবার মহাষষ্ঠী পূজার মধ্য দিয়ে শুরু হয় পাঁচ দিনব্যাপী শারদীয় দুর্গোৎসব।

সকাল থেকেই ভক্তরা পূজামণ্ডপে সমবেত হয়ে দেবী দুর্গার চরণে পুষ্পাঞ্জলি নিবেদন করেন এবং পরিবার, সমাজ ও বিশ্বের শান্তি, সমৃদ্ধি, সুস্বাস্থ্য ও মঙ্গল কামনা করেন।
নারী-পুরুষ ও শিশুরা ঐতিহ্যবাহী বাঙালি পোশাকে সজ্জিত হয়ে পূজামণ্ডপে উপস্থিত হন। তাঁদের আনন্দ-উচ্ছ্বাসে পুরো মণ্ডপে সৃষ্টি হয় উৎসবমুখর পরিবেশ।
পূজা শেষে ভক্তদের মাঝে পরিবেশন করা হয় সুস্বাদু ঐতিহ্যবাহী বাঙালি প্রসাদ। এর মধ্য দিয়েই শুরু হয় পাঁচ দিনের আনন্দঘন মহোৎসব।
শনিবার, ১৭ অক্টোবর – মহাসপ্তমী: বিশিষ্ট অতিথি, শিশুদের প্রতিযোগিতা ও বর্ণাঢ্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান
মহাসপ্তমীর দিনটি ছিল ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান, শিশুদের সৃজনশীল কর্মকাণ্ড এবং মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক পরিবেশনায় পরিপূর্ণ।

এদিনের অন্যতম আকর্ষণ ছিল ব্রিটিশ সরকারের পরিবহনবিষয়ক মন্ত্রী ও সংসদ সদস্য দ্য রাইট অনারেবল হেইডি আলেকজান্ডার এমপির উপস্থিতি।
তিনি পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করেন এবং স্থানীয় বাঙালি ও হিন্দু সম্প্রদায়ের সদস্যদের সঙ্গে উৎসবের আনন্দ ভাগাভাগি করেন।
এদিন শিশুদের জন্য আয়োজিত চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা ছিল বিশেষ আকর্ষণ। শত শত শিশু এই প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে তাদের সৃজনশীলতা ও বাঙালি সংস্কৃতির প্রতি ভালোবাসার প্রকাশ ঘটায়।
সন্ধ্যায় শুরু হয় বর্ণাঢ্য সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। ঐতিহ্যবাহী বাঙালি নৃত্য, সংগীত, আধুনিক পরিবেশনা এবং শিশু-কিশোরদের মনোমুগ্ধকর অংশগ্রহণ দর্শকদের মুগ্ধ করে।
অনুষ্ঠান শেষে উপস্থিত সবাইকে বিনামূল্যে সুস্বাদু নৈশভোজ পরিবেশন করা হয়।
রবিবার, ১৮ অক্টোবর – মহাষ্টমী: ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অনন্য সমন্বয়
দুর্গাপূজার অন্যতম পবিত্র ও তাৎপর্যপূর্ণ দিন মহাষ্টমী পালিত হয় গভীর ধর্মীয় ভাবগাম্ভীর্য ও উৎসাহ-উদ্দীপনার মধ্য দিয়ে।
সকাল থেকেই বিপুলসংখ্যক ভক্ত পূজামণ্ডপে সমবেত হয়ে দেবী দুর্গার চরণে পুষ্পাঞ্জলি নিবেদন করেন।
পূজা-অর্চনা, মন্ত্রোচ্চারণ, ভক্তিমূলক সংগীত এবং ভক্তদের উপস্থিতিতে পুরো পরিবেশ হয়ে ওঠে আধ্যাত্মিক ও আনন্দমুখর।
এদিনের বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সুইন্ডনের মেয়র কাউন্সিলর নিল হপকিন্স।
তিনি স্থানীয় সম্প্রদায়ের সদস্যদের সঙ্গে উৎসবে অংশগ্রহণ করেন।
সন্ধ্যায় অনুষ্ঠিত হয় আরও একটি মনোজ্ঞ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। ঐতিহ্যবাহী বাঙালি সংগীত, নৃত্য এবং শিশু ও বড়দের অংশগ্রহণে পুরো অনুষ্ঠান হয়ে ওঠে প্রাণবন্ত।
ধর্মীয় আচার, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য এবং সামাজিক সম্প্রীতির সমন্বয়ে মহাষ্টমী ছিল এবারের দুর্গোৎসবের অন্যতম স্মরণীয় দিন।
সোমবার, ১৯ অক্টোবর – মহানবমী: নৃত্য, সংগীত ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের বর্ণাঢ্য পরিবেশনা
মহানবমীর দিনটি ছিল ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের পাশাপাশি সাংস্কৃতিক প্রতিভা বিকাশের এক অসাধারণ আয়োজন।
এদিন বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ডেম সারা রোজ ট্রটন ডিসিভিও, উইল্টশায়ারের মহামান্য রাজার প্রতিনিধি (লর্ড-লেফটেন্যান্ট)।
সন্ধ্যার সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে পরিবেশিত হয় ভরতনাট্যম, ভারতীয় শাস্ত্রীয় নৃত্য, বলিউড নৃত্য, ঐতিহ্যবাহী বাঙালি নৃত্য, সংগীত এবং শিশু-কিশোরদের দলীয় পরিবেশনা।
শিশু ও তরুণ প্রজন্মের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ ছিল বিশেষভাবে প্রশংসনীয়।
এই আয়োজনের মাধ্যমে নতুন প্রজন্মের কাছে বাঙালি সংস্কৃতি, ঐতিহ্য ও মূল্যবোধ তুলে ধরার ক্ষেত্রে সুইন্ডন বেঙ্গলি কালচারাল সোসাইটির অঙ্গীকার আরও সুদৃঢ় হয়েছে।
রঙিন শাড়ি, পাঞ্জাবি এবং ঐতিহ্যবাহী পোশাকে সজ্জিত নারী, পুরুষ ও শিশুদের উপস্থিতি পুরো উৎসবকে করে তোলে আরও বর্ণিল ও আকর্ষণীয়।
মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর – বিজয়া দশমী: আবেগঘন বিদায় ও আনন্দের মহোৎসব
মঙ্গলবার বিজয়া দশমীর মধ্য দিয়ে সমাপ্ত হয় পাঁচ দিনব্যাপী শারদীয় দুর্গোৎসব।
এদিন দেবী দুর্গাকে প্রতীকী বিদায় জানানোর মুহূর্তে পূজামণ্ডপে সৃষ্টি হয় এক আবেগঘন পরিবেশ।
ভক্তরা দেবী দুর্গার চরণে প্রার্থনা জানান এবং আগামী বছর আবার মায়ের আগমনের প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।
বিজয়া দশমীর অন্যতম আকর্ষণ ছিল ঐতিহ্যবাহী সিঁদুর খেলা। বাঙালি নারীরা ঐতিহ্যবাহী শাড়িতে সজ্জিত হয়ে সিঁদুর খেলায় অংশগ্রহণ করেন।
সিঁদুর খেলার পাশাপাশি সংগীত, নৃত্য, ঐতিহ্যবাহী ধামাইল এবং ডিজে পরিবেশনায় বিদায়ের আবেগের সঙ্গে মিশে যায় আনন্দ-উচ্ছ্বাস।
এদিনের বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন সুইন্ডন বরো কাউন্সিলের লিডার কাউন্সিলর গ্যারি সামনার।
উৎসবের শেষ দিনে উপস্থিত সবাই একে অপরকে বিজয়ার শুভেচ্ছা জানান এবং আগামী বছর আবার মিলিত হওয়ার প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।
বিশিষ্ট অতিথি, স্থানীয় কাউন্সিলর ও বিভিন্ন সামাজিক-সাংস্কৃতিক সংগঠনের ব্যাপক সমর্থন
এবারের দুর্গোৎসবের অন্যতম উল্লেখযোগ্য দিক ছিল স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব, সমাজকর্মী এবং বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের ব্যাপক অংশগ্রহণ ও সহযোগিতা।
পাঁচ দিনব্যাপী উৎসবে বিভিন্ন পর্যায়ের স্থানীয় কাউন্সিলর, কমিউনিটি লিডার, ধর্মীয় সংগঠনের প্রতিনিধি, সমাজকর্মী এবং সাংস্কৃতিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
তাঁদের অংশগ্রহণ ও সহযোগিতা এই উৎসবকে শুধু একটি ধর্মীয় আয়োজনের মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখেনি; বরং এটি পরিণত হয়েছে বিভিন্ন ধর্ম, সংস্কৃতি ও সম্প্রদায়ের মানুষের মিলনমেলায়।
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ছিল ব্রিটিশ সরকারের মন্ত্রী ও সংসদ সদস্য হেইডি আলেকজান্ডার, সুইন্ডনের মেয়র কাউন্সিলর নিল হপকিন্স, উইল্টশায়ারের লর্ড-লেফটেন্যান্ট ডেম সারা রোজ ট্রটন এবং সুইন্ডন বরো কাউন্সিলের লিডার কাউন্সিলর গ্যারি সামনারের উপস্থিতি।
এ ছাড়াও অসংখ্য স্থানীয় কাউন্সিলর, ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব, সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধি, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব ও সমাজকর্মীদের উপস্থিতি উৎসবের গুরুত্বকে আরও বাড়িয়ে তোলে।
সুইন্ডন বেঙ্গলি কালচারাল সোসাইটি সকল স্থানীয় কাউন্সিলর, ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন, সমাজকর্মী, স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠান, ব্যবসায়ী, পৃষ্ঠপোষক এবং শুভানুধ্যায়ীদের প্রতি আন্তরিক কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছে।
তাঁদের সম্মিলিত সহযোগিতা প্রমাণ করেছে যে ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক উৎসব পারস্পরিক শ্রদ্ধা, বন্ধুত্ব, সম্প্রীতি এবং সামাজিক ঐক্য গড়ে তোলার এক শক্তিশালী মাধ্যম।
ছয় হাজারেরও বেশি বিনামূল্যে প্রসাদ ও খাবার পরিবেশন: এক অনন্য মানবিক উদ্যোগ
এবারের দুর্গোৎসবের অন্যতম বড় সাফল্য ছিল পাঁচ দিনব্যাপী ছয় হাজারেরও বেশি বিনামূল্যে প্রসাদ ও খাবার প্রস্তুত এবং পরিবেশন।
ঐতিহ্যবাহী বাঙালি নিরামিষ প্রসাদ, দুপুরের খাবার এবং রাতের খাবার সম্পূর্ণ বিনামূল্যে পরিবেশন করা হয়।
অভিজ্ঞ শেফ, স্থানীয় রেস্টুরেন্টের সহযোগী, রান্নাঘরের সমন্বয়কারী এবং স্বেচ্ছাসেবকরা প্রতিদিন ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত অক্লান্ত পরিশ্রম করেন।
এই খাবার শুধু আহারের ব্যবস্থা ছিল না; বরং এটি ছিল ভক্তি, মানবিকতা, উদারতা ও নিঃস্বার্থ সেবার এক অনন্য প্রকাশ।
সুইন্ডন বেঙ্গলি কালচারাল সোসাইটির বিশ্বাস, দুর্গোৎসব সবার জন্য উন্মুক্ত হওয়া উচিত। ধর্ম, বর্ণ, আর্থিক অবস্থা বা সামাজিক পরিচয় নির্বিশেষে প্রত্যেক মানুষ যেন এই উৎসবে অংশগ্রহণ করতে পারেন, সেটিই সংগঠনের অন্যতম লক্ষ্য।
বিনামূল্যে প্রবেশ এবং খাবারের ব্যবস্থা সেই অঙ্গীকারের বাস্তব প্রতিফলন।
দুই শতাধিক স্বেচ্ছাসেবক: দুর্গোৎসবের সফলতার মূল চালিকাশক্তি
এবারের পাঁচ দিনব্যাপী বিশাল আয়োজনের পেছনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন দুই শতাধিক নিবেদিতপ্রাণ স্বেচ্ছাসেবক।
তাঁদের অক্লান্ত পরিশ্রম, আন্তরিকতা, নিষ্ঠা এবং নিঃস্বার্থ সেবার কারণেই এই উৎসব সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে।
স্বেচ্ছাসেবকদের অবদান শুধু রান্না ও খাবার পরিবেশনের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না।
পূজার সার্বিক পরিকল্পনা ও সমন্বয়, ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান, মণ্ডপসজ্জা, মঞ্চ প্রস্তুতি, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, শিশুদের বিভিন্ন কার্যক্রম, অতিথি আপ্যায়ন, দর্শনার্থীদের ব্যবস্থাপনা, রান্নাঘর পরিচালনা, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা এবং অন্যান্য আনুষঙ্গিক কার্যক্রমে তাঁরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
অনেক স্বেচ্ছাসেবক উৎসব শুরুর কয়েক সপ্তাহ আগে থেকেই প্রস্তুতিমূলক কাজে যুক্ত ছিলেন। মণ্ডপসজ্জা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মহড়া, শিল্পীদের সমন্বয়, প্রয়োজনীয় সামগ্রী সংগ্রহ এবং সার্বিক ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে তাঁরা নিরলসভাবে কাজ করেছেন।
পাঁচ দিনের উৎসব চলাকালে অনেকেই সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত কাজ করেছেন, যাতে প্রতিটি অনুষ্ঠান সুন্দর ও সুশৃঙ্খলভাবে সম্পন্ন হয়।
বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য ছিল নারী স্বেচ্ছাসেবকদের অসাধারণ অবদান। পূজার নৈবেদ্য প্রস্তুত, রান্নাঘরের কার্যক্রম, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, অতিথি আপ্যায়ন এবং বিভিন্ন সাংগঠনিক কাজে তাঁদের ভূমিকা ছিল প্রশংসনীয়।
শিশু ও তরুণ প্রজন্মও বিভিন্ন কার্যক্রমে অংশগ্রহণ করে ভবিষ্যতের স্বেচ্ছাসেবী নেতৃত্বের সম্ভাবনা তুলে ধরেছে।
এ ছাড়াও সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের সমন্বয়কারী, নৃত্যপরিচালক, অভিভাবক, শিল্পী, মঞ্চ ব্যবস্থাপক এবং নেপথ্যে কাজ করা স্বেচ্ছাসেবকদের অবদান ছিল অনস্বীকার্য।
দুই শতাধিক স্বেচ্ছাসেবকের সম্মিলিত প্রচেষ্টা প্রমাণ করেছে, একটি সম্প্রদায় যখন ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করে, তখন বড় আয়োজনও সফলভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব।
বাঙালি সংস্কৃতি ও নতুন প্রজন্মের প্রতিভার অসাধারণ প্রদর্শনী
দুর্গোৎসব ২০২৬ শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠানেই সীমাবদ্ধ ছিল না; এটি হয়ে উঠেছিল বাঙালি ও ভারতীয় সংস্কৃতির এক বর্ণাঢ্য প্রদর্শনী।
পাঁচ দিনব্যাপী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানে পরিবেশিত হয় ভারতীয় শাস্ত্রীয় নৃত্য, ঐতিহ্যবাহী বাঙালি সংগীত, বলিউড নৃত্য, একক ও দলীয় সংগীত, শিশুদের পরিবেশনা এবং প্রাণবন্ত ধামাইল নৃত্য।
বিশেষভাবে প্রশংসিত হয় শিশু-কিশোরদের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণ।
চিত্রাঙ্কন প্রতিযোগিতা, সংগীত ও নৃত্যানুষ্ঠানের মাধ্যমে নতুন প্রজন্ম তাদের প্রতিভা তুলে ধরার সুযোগ পায়।
এসব আয়োজন যুক্তরাজ্যে বেড়ে ওঠা বাঙালি শিশুদের নিজস্ব সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচিত হতে এবং সেই ঐতিহ্যকে ধারণ করতে উৎসাহিত করেছে।
ক্রমেই বড় হচ্ছে সুইন্ডনের দুর্গোৎসব
২০২৫ সালে প্রথমবারের মতো আয়োজিত দুর্গোৎসবের সাফল্যের ধারাবাহিকতায় ২০২৬ সালের আয়োজন ছিল আরও বড়, বর্ণিল ও ব্যাপক।
এবারের উৎসবে আরও বিস্তৃত অঞ্চল থেকে দর্শনার্থীদের আগমন, সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের অংশগ্রহণ ছিল বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য।
এই আয়োজন প্রমাণ করেছে, ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য একটি বহুসাংস্কৃতিক সমাজে পারস্পরিক বোঝাপড়া, বন্ধুত্ব ও সামাজিক সম্প্রীতি বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সুইন্ডন বেঙ্গলি কালচারাল সোসাইটি ভবিষ্যতে স্থানীয় প্রশাসন, বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় সংগঠন, ব্যবসায়ী এবং স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা আরও জোরদার করতে চায়।
সংগঠনটির দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য হলো সুইন্ডনের দুর্গোৎসবকে যুক্তরাজ্যের এই অঞ্চলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বার্ষিক ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক উৎসব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করা।
সুইন্ডন বেঙ্গলি কালচারাল সোসাইটির পক্ষ থেকে আন্তরিক কৃতজ্ঞতা
সুইন্ডন বেঙ্গলি কালচারাল সোসাইটির একজন মুখপাত্র বলেন:
“আমাদের দুর্গোৎসব শুধু একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান নয়; এটি ভালোবাসা, ঐক্য, মানবিকতা, সংস্কৃতি, বন্ধুত্ব ও সম্প্রীতির এক মহামিলন।
আমরা অত্যন্ত গর্বিত যে আমাদের দ্বিতীয় বর্ষের এই আয়োজনে সুইন্ডন, উইল্টশায়ার, গ্লুচেস্টারশায়ারসহ বিভিন্ন অঞ্চল থেকে হাজার হাজার মানুষ অংশগ্রহণ করেছেন।
পাঁচ দিনব্যাপী এই বিশাল আয়োজন সফল করা সম্ভব হতো না আমাদের দুই শতাধিক অসাধারণ স্বেচ্ছাসেবকের অক্লান্ত পরিশ্রম, পৃষ্ঠপোষকদের উদার সহযোগিতা, শিল্পীদের প্রতিভা, শেফদের নিষ্ঠা এবং সমগ্র কমিউনিটির আন্তরিক সমর্থন ছাড়া।
ছয় হাজারেরও বেশি মানুষের জন্য বিনামূল্যে প্রসাদ ও খাবার পরিবেশন করতে পারা আমাদের জন্য এক অসাধারণ অর্জন। আমরা বিশ্বাস করি, দুর্গোৎসবের আনন্দ ও আশীর্বাদ সবার জন্য উন্মুক্ত থাকা উচিত।
আমরা বিশেষভাবে কৃতজ্ঞ স্থানীয় কাউন্সিলর, ধর্মীয় ব্যক্তিত্ব, কমিউনিটি লিডার, সমাজকর্মী, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠন এবং স্বেচ্ছাসেবী প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রতি, যাঁরা আমাদের পাশে থেকে এই আয়োজনকে সফল করতে সহযোগিতা করেছেন।
আমাদের সকল স্বেচ্ছাসেবক, বিশেষ করে নারী, তরুণ প্রজন্ম এবং পরিবারগুলোর প্রতি জানাই আন্তরিক ধন্যবাদ। তাঁদের নিঃস্বার্থ সেবা, ত্যাগ ও ভালোবাসাই আমাদের সফলতার মূল ভিত্তি।
আমাদের লক্ষ্য খুবই সহজ—এই উৎসব সবার জন্য। এখানে সবাই স্বাগত। আমরা চাই, প্রত্যেক মানুষ যেন দুর্গাপূজার আনন্দ, আশীর্বাদ এবং আতিথেয়তার অভিজ্ঞতা নিয়ে বাড়ি ফিরে যান।
আমরা বিশেষভাবে গর্বিত আমাদের শিশু ও তরুণ শিল্পীদের নিয়ে, কারণ তারাই আমাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের ভবিষ্যৎ।
মা দুর্গাকে বিদায় জানালেও আমাদের হৃদয়ে রয়ে গেছে অসংখ্য সুন্দর স্মৃতি ও কৃতজ্ঞতা। আগামী বছর আরও বড়, আরও সুন্দর এবং আরও বর্ণাঢ্য আয়োজন নিয়ে ফিরে আসার প্রত্যাশা রাখছি।”
শুভ বিজয়া – আবার দেখা হবে আগামী বছর!
পাঁচ দিনব্যাপী উৎসবের সমাপ্তিতে সুইন্ডনের বাঙালি সম্প্রদায়ের হৃদয়ে ছিল আনন্দ, আবেগ, কৃতজ্ঞতা এবং আগামী বছরের প্রত্যাশা।
দুর্গোৎসব ২০২৬ প্রমাণ করেছে, ধর্মীয় বিশ্বাস, সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য, স্বেচ্ছাসেবা এবং সম্মিলিত সামাজিক উদ্যোগ মানুষের মধ্যে ঐক্য ও সম্প্রীতির বন্ধনকে আরও দৃঢ় করতে পারে।
অসংখ্য রঙিন স্মৃতি, হাসিমুখ, নতুন বন্ধুত্ব এবং মা দুর্গার আশীর্বাদ নিয়ে সুইন্ডন বেঙ্গলি কালচারাল সোসাইটি আগামী ২০২৭ সালে আবারও সবাইকে স্বাগত জানানোর অপেক্ষায় রয়েছে।
বাঙালির চিরন্তন আবেগঘন উচ্চারণ—
“আসছে বছর আবার হবে!”
আয়োজনে: সুইন্ডন বেঙ্গলি কালচারাল সোসাইটি (SBCS)















