ওয়ানবাংলানিউজ: লন্ডনের পূর্বাঞ্চলের শ্যাডওয়েলে “অতিরিক্ত জনাকীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ” এক ফ্ল্যাটে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় দুই বাড়িওয়ালাকে ৯০,০০০ পাউন্ডের বেশি জরিমানা করা হয়েছে।
২০২৩ সালের মার্চ মাসে শ্যাডওেলের কর্নওয়াল স্ট্রিটের ম্যাডডকস হাউসে আগুন লাগে, যা দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। এতে ৪১ বছর বয়সী মিজানুর রহমান গুরুতর আহত হয়ে হাসপাতালে ভর্তি হন এবং পরে মৃত্যুবরণ করেন।
তদন্তে বেরিয়ে আসে, তিন কক্ষের ছোট্ট এই ফ্ল্যাটে প্রায় ২২ জন লোক বসবাস করছিলেন, যা অত্যন্ত অস্বাস্থ্যকর ও বিপজ্জনক ছিল।
বিচার ও আদালতের পর্যবেক্ষণ
স্নেয়ার্সব্রুক ক্রাউন কোর্টে বিচারক এমা স্মিথ বলেন,
“বাড়িওয়ালারা আইন এবং বাসিন্দাদের নিরাপত্তার প্রতি সম্পূর্ণ অবহেলা দেখিয়েছে। তারা কেবল নিজেদের আর্থিক লাভের জন্য মানুষকে চরম ঝুঁকির মুখে ফেলে দিয়েছে।”
কোর্টে বলা হয়, ফ্ল্যাটটির জরুরি নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল না, এবং এটি দীর্ঘদিন ধরে অতিরিক্ত জনাকীর্ণ অবস্থায় চলছিল।
আগুনের কারণ ও তদন্তের ফলাফল
🛑 আগুনের সূত্রপাত হয় একটি ত্রুটিপূর্ণ লিথিয়াম-আয়ন ই-বাইক ব্যাটারির বিস্ফোরণের মাধ্যমে, যা চার্জে দেওয়া ছিল।
🛑 আগুন দ্রুত পুরো ফ্ল্যাটে ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে ঘরগুলোতে অস্বাভাবিকভাবে বেশি মানুষ থাকায় বাঁচার জন্য যথেষ্ট জায়গা ছিল না।
🛑 ফ্ল্যাটের গ্যাস সংযোগ ও ইলেকট্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা ছিল না, যা আরও বিপজ্জনক পরিস্থিতি তৈরি করেছিল।
অপরাধ ও শাস্তি
বাড়িওয়ালা দম্পতি সোফিনা বেগম (৫২) ও আমিনুর রহমান (৫৫) নয়টি আবাসন আইন লঙ্ঘনের দায় স্বীকার করেছেন।
সোফিনা বেগমের অপরাধ:
✅ লাইসেন্স ছাড়া অবৈধভাবে অতিরিক্ত বাসিন্দাদের বসবাসের অনুমতি দেওয়া
✅ চারটি ভিন্ন হাউজিং লাইসেন্সের শর্ত লঙ্ঘন
✅ গ্যাস সার্টিফিকেট সরবরাহে ব্যর্থতা
✅ সঠিক তদারকি না করা
⚖️ আদালতের রায়:
🔹 £৭৮,০৪৯ কনফিসকেশন অর্ডার
🔹 £১০,০০০ জরিমানা
🔹 £২,০০০ প্রসিকিউশন ফি পরিশোধের নির্দেশ
আমিনুর রহমানের অপরাধ:
✅ অবৈধভাবে বাসিন্দাদের থাকার অনুমতি দেওয়া
✅ প্রয়োজনীয় নথিপত্র প্রদানে ব্যর্থতা
✅ সঠিক মেরামত ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত না করা
⚖️ আদালতের রায়:
🔹 £২,০০০ জরিমানা
🔹 £৪০,২৭৫ কনফিসকেশন অর্ডার, তবে তিনি মাত্র £১.০১ পরিশোধ করবেন কারণ তার আর্থিক সামর্থ্য নেই।
বিচার চলাকালে বাড়িওয়ালাদের প্রতিরক্ষা বক্তব্য
বাড়িওয়ালাদের আইনজীবী হারুন মাতিন বলেন,
“আমার মক্কেলরা জানতেন যে এখানে নির্ধারিত সংখ্যার চেয়ে বেশি মানুষ বাস করছে, তবে তারা আসল সংখ্যা জানতেন না। অনেকে নিজেরাই রুম ভাড়া নিয়ে সাবলেট দিতেন, যা বাড়িওয়ালারা নিয়ন্ত্রণ করতে পারেননি।”
তবে প্রসিকিউটর জেমা গিলেট বলেন,
“এই ফ্ল্যাট দীর্ঘদিন ধরেই ভয়াবহভাবে জনাকীর্ণ ছিল। নিরাপত্তার অভাবের কারণে একজনের মৃত্যু হয়েছে, এবং বাড়িওয়ালারা সম্পূর্ণ দায় এড়ানোর চেষ্টা করছেন।”
ভুক্তভোগীদের প্রতিক্রিয়া
আগুন থেকে বেঁচে যাওয়া নাসমুশ শাহাদাত বলেন,
“আমরা খুশি যে এই অসাধু বাড়িওয়ালারা শাস্তি পেয়েছে, তবে আমাদের ন্যায়বিচার এখনো পাইনি।”
তিনি আরও বলেন,
“আমাদের সম্পদ নষ্ট হয়েছে, মানসিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছি, আমাদের প্রিয় বন্ধুকে হারিয়েছি। আমরা জানতে চাই, টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিল এই জরিমানার অর্থ কীভাবে ব্যবহার করবে।”
ভুক্তভোগীদের আইনজীবী ড্যানিয়েল কুপার বলেন,
“আমরা জানতে চাই, এই জরিমানার অর্থ ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য ব্যবহার করা হবে কি না।”
কাউন্সিলের বক্তব্য ও ভবিষ্যৎ পদক্ষেপ
টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলের মুখপাত্র বলেন,
“আদালতের দেওয়া জরিমানার টাকা ট্রেজারিতে জমা হয়। তবে কনফিসকেশন ফান্ডের ৫০% হোম অফিসে এবং ১২.৫% আদালতের ট্রাইব্যুনালে যায়। বাকি অর্থ কাউন্সিলের আইন প্রয়োগের জন্য ব্যবহৃত হয়।”
টাওয়ার হ্যামলেটসের নির্বাহী মেয়র লুতফুর রহমান বলেন,
“এ ধরনের বাড়িওয়ালারা মানুষকে বিপদের মুখে ঠেলে দিচ্ছে। আমরা তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিচ্ছি, এবং এই মামলা থেকে পরিষ্কার যে অপরাধী বাড়িওয়ালাদের কোনো ছাড় দেওয়া হবে না।”
সংক্ষেপে মূল বিষয়গুলো
✅ অতিরিক্ত জনাকীর্ণ ফ্ল্যাটে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ড, এক ব্যক্তির মৃত্যু
✅ বাড়িওয়ালারা ৯০,০০০ পাউন্ডের বেশি জরিমানা ও কনফিসকেশন অর্ডার পেয়েছে
✅ তদন্তে ফ্ল্যাটের গুরুতর নিরাপত্তাহীনতার প্রমাণ মিলেছে
✅ ভুক্তভোগীরা জরিমানার অর্থ ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তায় ব্যবহারের দাবি জানিয়েছেন
✅ কাউন্সিল ও সরকার অবৈধ বাড়িওয়ালাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে
এটি লন্ডনের আবাসন সংকট ও অনিয়ন্ত্রিত বাড়িভাড়া ব্যবস্থার একটি ভয়াবহ উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা আরও কঠোর নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছে। 🚨















