হেফাজতের ১৫৪ মামলা: ৯ মাসেও শেষ হয়নি তদন্ত

138

ঢাকা সংবাদদাতা :: ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরকে কেন্দ্র করে দেশের বিভিন্ন স্থানে সহিংসতার ঘটনায় হেফাজতে ইসলামের নেতা-কর্মীদের বিরুদ্ধে করা ১৫৪ মামলার তদন্ত এখনো শেষ হয়নি। একাধিক মামলার বাদী বলছেন, মামলার অগ্রগতি সম্পর্কে তাঁরা কিছু জানেন না। তবে পুলিশ কর্মকর্তারা বলছেন, মামলাগুলোর তদন্ত প্রায় শেষ।

এদিকে সহিংসতার মামলায় ছয় জেলায় ১১০ মামলায় ১ হাজার ৩০৩ জনকে গ্রেপ্তারের কথা জানা গেছে। তাঁদের ৪৯০ জন জামিনে মুক্তি পেয়েছেন। এ ছাড়া আসামিদের মধ্যে ৯০ জন উচ্চ আদালত থেকে আগাম জামিন পেয়েছেন। বর্তমানে কারাগারে আছেন ৮১৩ জন।

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী ও বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি বাংলাদেশ সফরে আসেন গত মার্চে। সে সময় তাঁর সফরের বিরোধিতা করে মাঠে নামে হেফাজতে ইসলাম। ২৬ মার্চ রাজধানীর বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদ এলাকায় বিক্ষোভকে কেন্দ্র করে আওয়ামী লীগ ও পুলিশের সঙ্গে দফায় দফায় হেফাজতের নেতা-কর্মীদের সংঘর্ষ হয়। এই খবর ছড়িয়ে পড়লে ব্রাহ্মণবাড়িয়া, চট্টগ্রাম, নারায়ণগঞ্জ, মুন্সিগঞ্জ, কিশোরগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে মাঠে নামে হেফাজত। সংগঠনের নেতা-কর্মীরা সেদিন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ান। সংঘর্ষে ১৯ জন নিহত ও পুলিশসহ ৫০০ জন আহত হন।

হামলা-ভাঙচুর-অগ্নিসংযোগ করা হয় সরকারি-বেসরকারি স্থাপনায়। পুলিশ সদর দপ্তর সূত্র ওই সময়ের সহিংসতার ঘটনায় সারা দেশে ১৫৪টি মামলার কথা জানালেও কোন জেলায় কত মামলা হয়েছে, সে তথ্য দিতে পারেনি। পুলিশের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এসব মামলায় আসামি করা হয় এক লাখের বেশি ব্যক্তিকে। তবে কোনো মামলারই অভিযোগপত্র দেওয়া হয়নি।

মামলার অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চাইলে সম্প্রতি পুলিশ সদর দপ্তরের গণমাধ্যম ও জনসংযোগ শাখার সহকারী মহাপরিদর্শক (এআইজি) মো. কামরুজ্জামান বলেন, মামলাগুলোর তদন্ত চলছে।

আর মামলার বিষয়ে জানতে চাইলে হেফাজতের কেন্দ্রীয় ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মাওলানা সাজিদুর রহমান বলেন, ‘হেফাজতের বিরুদ্ধে করা সব মামলা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়ে আসছি আমরা। এ নিয়ে সরকারের সঙ্গে বেশ কয়েকবার বসেছি। আগামী দিনে সরকারের সঙ্গে আবারও বসব।’

রাজধানীতে ১৪ মামলায় কারাগারে ১৪০>>

রাজধানীতে ২৬ মার্চ সংঘর্ষের ঘটনায় মতিঝিল, পল্টন ও যাত্রাবাড়ী থানায় ১৪টি মামলা হয়। ১৪ মামলায় হেফাজতের ১৬৮ নেতা-কর্মীর নাম উল্লেখসহ মোট ১০ হাজার ১১৮ জনকে আসামি করা হয়। এর মধ্যে হেফাজতের সাবেক যুগ্ম মহাসচিব মামুনুল হককে আসামি করা হয় চারটিতে। এসব মামলায় গ্রেপ্তার ২০৬ জনের মধ্যে ৬৬ জন জামিনে মুক্তি পেয়েছেন।

ঢাকায় হেফাজতের বিরুদ্ধে ১৪ মামলার তদন্ত করছে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা বিভাগ (ডিবি)। এসব মামলার অবস্থা সম্পর্কে জানতে চাইলে ডিএমপি কমিশনার মোহা. শফিকুল ইসলাম সম্প্রতি বলেন, মামলার তদন্ত গুছিয়ে আনা হয়েছে। এখন ওপরের সঙ্গে কথা বলে অভিযোগপত্র দেওয়ার বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

চট্টগ্রামে ১১ মামলা>>

ঢাকার সংঘর্ষের প্রতিবাদে ২৬ মার্চ বিকেলে চট্টগ্রামের হাটহাজারীতে হেফাজতের নেতা-কর্মীরা বিক্ষোভে নামলে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়। একপর্যায়ে পুলিশ গুলি চালালে চারজন নিহত ও শতাধিক ব্যক্তি আহত হন। এর জেরে মাদ্রাসাছাত্ররা হাটহাজারী ও পটিয়া থানা ভবন, হাটহাজারী ডাকবাংলো, সহকারী কমিশনার (ভূমি) ও সদর ইউনিয়ন ভূমি কার্যালয়ে হামলা চালায়। এই ঘটনায় হাটহাজারী থানায় ১০টি ও পটিয়া থানায় ১টি মামলা হয়। এসব মামলায় আসামি করা হয় হেফাজতের তৎকালীন আমির জুনায়েদ বাবুনগরী, বিএনপির কেন্দ্রীয় নির্বাহী কমিটির সদস্য মীর হেলাল উদ্দিনসহ অজ্ঞাতপরিচয় ৫ হাজার ৩০০ জনকে।

পুলিশ সূত্র জানায়, মামলায় ১৩৩ জনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাঁদের মধ্যে ৪৩ জন জামিনে মুক্তি পেয়েছেন।

বেশি মামলা ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়>>

ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় ২৬, ২৭ ও ২৮ মার্চ সহিংসতায় ১৫ জন নিহত ও অন্তত ৫০০ আহত হন। ওই তিন দিনের হামলা-ভাঙচুরের ঘটনায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর থানায় পুলিশ বাদী হয়ে ১২টি, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে ৩৭টি, সরাইল থানায় পুলিশ বাদী হয়ে ২টি, আশুগঞ্জ থানায় পুলিশ বাদী হয়ে ১টি ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের পক্ষে ৩টি এবং আখাউড়া রেলওয়ে থানায় ব্রাহ্মণবাড়িয়া রেলওয়ের স্টেশনমাস্টার ১টি মামলা করেন।

এসব মামলায় হেফাজত ও বিএনপির নেতা-কর্মী ও সমর্থকদের ৪১৪ জনের নাম উল্লেখ করে ৩৮ হাজারের বেশি জনকে আসামি করা হয়। তাঁদের মধ্যে ৬৬৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। গ্রেপ্তার ব্যক্তিদের মধ্যে ৬০৮ জন হেফাজতের, ৫৪ জন বিএনপির ও ৩ জন জামায়াত-শিবিরের নেতা-কর্মী। তাঁদের মধ্যে ৩০০ ব্যক্তি জামিনে মুক্তি পেয়েছেন।

সরকারি দুটি প্রতিষ্ঠানে হামলার ঘটনায় করা দুটি মামলার বাদী নাম না প্রকাশ করার শর্তে বলেন, ঘটনার পরপর মামলার তদন্ত কর্মকর্তা কয়েক দিন এসেছিলেন। সাক্ষীদের বক্তব্য নিয়েছেন। এরপর আর কেউ আসেনি। বর্তমানে মামলার অগ্রগতি সম্পর্কে তিনি কিছুই জানেন না।

একটি মামলার তদন্ত করছেন সদর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মোসলেম উদ্দিন। তিনি বলেন, মামলার তদন্তের অগ্রগতি বেশ ভালো।

নারায়ণগঞ্জে জামিনে মুক্ত ৩২ জন>>

হেফাজতের ডাকা হরতালকে কেন্দ্র করে গত ২৮ মার্চ নারায়ণগঞ্জের সিদ্ধিরগঞ্জে সংগঠনের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ হয়। এ সময় বিক্ষোভকারীরা ১৮টি গাড়িতে অগ্নিসংযোগ করেন।

ওই ঘটনায় পুলিশ বাদী হয়ে চারটি, সাধারণ মানুষ বাদী হয়ে তিনটি ও র‌্যাব বাদী হয়ে সিদ্ধিরগঞ্জ থানায় একটি মামলা করে। মামলায় ৩০ থেকে ৩৫ জনের নাম উল্লেখ ছাড়াও প্রতিটি মামলায় অজ্ঞাতনামা আরও দেড় থেকে দুই হাজার ব্যক্তিকে আসামি করা হয়। এসব মামলায় পুলিশ হেফাজতের নারায়ণগঞ্জ জেলা কমিটির সাধারণ সম্পাদক বশীর উল্লাহ্সহ বিএনপি-জামায়াতের ৬০ জনকে গ্রেপ্তার করে। তাঁদের মধ্যে হেফাজতের ৫৫ জন। গ্রেপ্তার ৩২ জন জামিনে মুক্তি পেয়েছেন।

মুন্সিগঞ্জে ১০ মামলা>>

২৮ মার্চ হেফাজতের হরতালে মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখানে সহিংসতার ঘটনায় থানায় ১০টি মামলা হয়। এসব মামলায় অজ্ঞাতনামা ৪০০-৫০০ জন হেফাজত নেতা-কর্মীকে আসামি করা হয়। এঁদের মধ্যে ৩২ জন নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁদের মধ্যে ৮ জন জামিন পেয়েছেন। আর উচ্চ আদালত থেকে ৫৫ জন আগাম জামিন পেয়েছেন।

কিশোরগঞ্জে গ্রেপ্তার ৯৭, জামিন ৪১ জনের>>

২৮ মার্চ কিশোরগঞ্জে সদর উপজেলার গৌরী বাজারে হেফাজতের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে সংঘর্ষের ঘটনায় সদর থানায় সন্ত্রাসবিরোধী আইনে চারটি মামলা করা হয়। পুলিশের করা মামলায় হেফাজতের ৭৯ জনের নাম উল্লেখ ছাড়াও ৪ হাজার অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিকে আসামি করা হয়। পুলিশ এসব মামলায় ৯৭ জনকে গ্রেপ্তার করে। তাঁদের মধ্যে ৪১ জন জামিনে মুক্তি পেয়েছেন।

মামুনুল হক ঘেরাও, ৮ মামলা>>

গত ৩ এপ্রিল নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয়ের একটি রিসোর্টে হেফাজতের সাবেক যুগ্ম মহাসচিব মামুনুল হককে তাঁর কথিত স্ত্রীসহ ঘেরাও করা হয়। একে কেন্দ্র করে সহিংসতার ঘটনায় মামুনুল হকসহ হেফাজতের ৪৪৭ নেতা-কর্মীর নাম উল্লেখ ছাড়াও অজ্ঞাতনামা দেড় হাজার ব্যক্তির বিরুদ্ধে ৭টি মামলা করা হয়। ওই সব মামলায় ১১০ জনকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। আসামিদের মধ্যে ৩৫ জন নেতা-কর্মী উচ্চ আদালত থেকে আগাম জামিন পান। এ ছাড়া কথিত স্ত্রী মামুনুল হকের বিরুদ্ধে সোনারগাঁ থানায় একটি মামলা করেন।

জেলা পুলিশ সুপার জায়েদুল আলম বলেন, মামুনুল হকের বিরুদ্ধে তাঁর কথিত স্ত্রীর করা ধর্ষণ মামলার অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। অন্য সাত মামলার তদন্ত শেষ পর্যায়ে।

ওয়ানবাংলানিউজ / ৫ ডিসেম্বর ২০২১ / আল-আমিন