বিশ্বনাথে কিশোরীকে জোরপূর্বক বিয়ে দিলেন প্রবাসী পিতা: ধর্ষণের অভিযোগ : গ্রেফতার-১

2130

বিশ্বনাথ প্রতিনিধি: জোরপূর্বক কলেজ পড়ুয়া ১৬ বছরের কিশোরীকে বিয়ে দেওয়া ও একটি কক্ষে আটকে রেখে ধর্ষণ করার অভিযোগে সিলেটের বিশ্বনাথ থানায় যুক্তরাজ্য প্রবাসী পিতাকে প্রধান অভিযুক্ত করে মামলা দায়ের করেছেন মদন মোহন কলেজের ব্যবসায়ী বিভাগের একাদশ শ্রেণীর ১ম বর্ষের ওই শিক্ষার্থী। বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ দমন আইন ও ধর্ষণের অভিযোগে কিশোরীর থানায় দায়ের করা মামলা নং ২৭ (তাং ১৯.১২.১৯ইং)।
কিশোরীকে প্রবাসী পিতা কর্তৃক জোরপূর্বক বিয়ে দেয়া ও অতঃপর একটি কক্ষে আটকে রেখে সেই কলেজ পড়–য়া শিক্ষার্থীকে ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোরপূর্বক ধর্ষন করার অভিযোগ পেয়ে বুধবার রাতে থানা পুলিশ অভিযান চালিয়ে উপজেলার দৌলতপুর ইউনিয়নের মাঝগাঁও (সিংগেরকাছ) গ্রামের মুক্তার আলীর পুত্র ও মামলার ২য় অভিযুক্ত বদরুল আলম (২৯)’র বসতঘর থেকে বাদীকে উদ্ধার এবং জোরপূর্বক স্বামী হওয়া বদরুল আলমকে গ্রেফতার করে থানায় নিয়ে আসে।
মামলার অভিযুক্তরা হলেন- বিশ্বনাথ উপজেলার মাঝগাঁও (সিংগেরকাছ) গ্রামের মৃত আবদুল মুতলিবের পুত্র বাদীর পিতা আবদুল ওয়াজির বাবুল (৫০), একই গ্রামের মুক্তার আলীর পুত্র পুলিশের হাতে আটককৃত বদরুল আলম (২৯), সিলেটের দক্ষিণ সুরমা থানার কিজিরপুর গ্রামের ইয়াকুব আলীর পুত্র রাজিব (৩০), সিলেট শহরের হাওয়াপাড়া এলাকার বাসিন্দা মৃত করিম উল্লার ছেলে দিলোয়ার হোসেন (৪৪)। এছাড়া আরো ৪/৫ জনকে অজ্ঞাতনামা অভিযুক্ত করা হয়েছে।
লিখিত অভিযোগে বাদী উল্লেখ করেছেন, মামলার প্রধান অভিযুক্ত যুক্তরাজ্য প্রবাসী আবদুল ওয়াজির বাবুল হচ্ছেন বাদীর পিতা। আর বাদীর জানা মতে তার পিতা ৬/৭টি বিয়ে করেছেন। আবদুল ওয়াজির বাবুলের দ্বিতীয় স্ত্রীর সন্তান হচ্ছেন বাদী। বিয়ের পর বাদীর মাতাকে তার পিতা কোনো দিন তার (প্রবাসী) বাড়িতে নিয়ে যাননি। বাদীর জন্ম তার নানার বাড়িতে হয়। বাদীর বয়স যখন ৫-৬ বছর, তখন তার মায়ের সঙ্গে পিতার বিয়ের বিচ্ছেদ ঘটে। বর্তমানে বাদী সিলেট মদন মোহন কলেজের ব্যবসায়ী বিভাগের একাদশ শ্রেণীর ১ম বর্ষের শিক্ষার্থী হিসেবে লেখাপড়া করছেন। বাদীর পিতা মাঝে মধ্যে মোবাইলে যোগাযোগ করে তার (বাদীর) খোঁজ খবর নেন।

গত ৩১ অক্টোবর বাদীর পিতা লন্ডন থেকে সিলেট নগরীর হাওয়া পাড়া আর্ক হোম হাওয়ারে উঠেন। ওই দিন সকালে বাদীকে তার পিতা আবদুল ওয়াজির বাবুল জানান তিনি লন্ডন থেকে দেশে এসেছেন এবং আজকেই তোমাকে (বাদীকে) বাসায় নিয়ে আসব। আর ওই দিন সন্ধ্যায় বাদীর পিতা ও অপর অভিযুক্ত রাজিব অজ্ঞাত আরো ৩ জন একটি নোহা গাড়ি নিয়ে বাদীর নানার বাড়ি সুনামগঞ্জ জেলার ছাতক থানার পাইগাঁও গ্রামে গিয়ে বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে বাদীর নানা-নানীকে বুঝিয়ে তাকে (বাদীকে) লন্ডন নিয়ে যাবেন এজন্য কিছু কাগজপত্র প্রস্তুত করতে হবে বলে আশ্বাস দিয়ে বাদীকে নিয়ে আসেন তার পিতা। গত ৫ নভেম্বর সকালে বাদীকে তার পিতা জানান, তোমার লন্ডন যাওয়ার সময় হয়ে গেছে, কিছু কেনা কাটার প্রয়োজন, তুমি আমার সঙ্গে মার্কেটে যাবে। বাদী তার পিতার সরলমনে তিনি মার্কেটে যান এবং সেখানে কিছু কাপড় কেনা কাটা করেন। গত ১০ নভেম্বর দুপুরে বাদীর পিতার আতœীয়-স্বজন ও সহযোগি লোকজনসহ অভিযুক্ত বদরুল আলমকে নিয়ে বাদীর পিতার বাসায় আসেন। এসময় বাদীর পিতা বাদীকে বলেন তোমাকে লন্ডন নিতে হলে, তোমাকে বিবাহ দিতে হবে।

এছাড়া লন্ডন যাওয়া যাবে না। তখন বাদী তার পিতাকে বলেন তার বিয়ের বয়স হয়নি। তাই তিনি এখন বিয়ে করবেন না। এক পর্যায়ে বাদী তার পিতার পায়ে ধরে বিয়ে না দেওয়ার অনুরোধ করেন। কিন্তু বাদীর কোন কথা না শুনেই উল্টো ক্ষিপ্ত হয়ে বাদীর পিতা বাদীর ব্যবহৃত মোবাইল ফোন নিয়ে নেন। যাতে বাদী এব্যাপারে কারো সাথে যোগাযোগ করতে না পারেন। এক পর্যায়ে বাদীকে অবরুদ্ধ করে বাদীর পিতা অভিযুক্ত বদরুল আলমসহ অন্য অভিযুক্তরা বিভিন্নভাবে বাদীকে প্রলোভন দেখিয়ে চাপ প্রয়োগ করে বাদীকে বিবাহ করতে বাধ্য করা হয়। আর ১০ নভেম্বর কাজী ডেকে এনে জোরপূর্বক অভিযুক্ত বদরুল আলমের সঙ্গে সিলেট নগরীর একটি হোটেলে বাদীকে বিয়ে দেয়া হয়।

ওই রাতে বাদীকে অভিযুক্ত বদরুল আলম তার বাড়ি বিশ্বনাথের মাঝগাঁও (সিংগেরকাছ) গ্রামের বসত ঘরে নিয়ে আসে। এসময় অভিযুক্ত রাজিব ও দিলোয়ার হোসেন বাদীকে বলেন তোমার বিয়ে হয়েছে তাই বদরুল আলমের সঙ্গে এ রুমে তোমাকে থাকতে হবে। এই বলে অভিযুক্ত বদরুল আলম ছাড়া অন্যান্য অভিযুক্তরা রুম থেকে বের হয়ে যায়। ওই রাত আনুমানিক দেড়টার দিকে অভিযুক্ত বদরুল আলম বাদীর সঙ্গে শারীরিক মেলামেশা করতে চাইলে বাদী তাতে অনিহা প্রকাশ করেন। এক পর্যায়ে বাদীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোরপূর্বক বাদীকে ধর্ষণ করে অভিযুক্ত বদরুল আলম।

এরপর ১১ থেকে ১৭ নভেম্বর পর্যন্ত ওই রুমে বাদীকে আটকে রেখে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে অভিযুক্ত বদরুল আলম প্রতি দিনে-রাতে একাধিক বার জোরপূর্বক ধর্ষণ করে। বিষয়টি বাদী তার নানা-নানীকে মোবাইল ফোনে জানান। পরে বাদীর নানা-নানী অভিযুক্ত বদরুল আলমের বাড়িতে আসেন। এসময় বাদীর সঙ্গে তার নানা-নানীর দেখা করলেও তাদের তাৎক্ষনিক বাড়ি থেকে বের করে দেয়া হয়। গত বুধবার পুণঃরায় বাদীর নানা-নানী অভিযুক্ত বদরুল আলমের বাড়িতে আসলে তাদের অশ্লীল ভাষায় গালি-গালাজ করা হয়। এক পর্যায়ে বিশ্বনাথ থানা পুলিশকে খবর দিলে পুলিশ অভিযুক্ত বদরুল আলমের বসত ঘর থেকে বাদীকে উদ্ধার ও বদরুল আলমকে আটক করে থানায় নিয়ে আসে। অভিযুক্তরা বাদী অপ্রাপ্ত বয়স্ক হওয়া শর্তেও জেনে শুনে বাদীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে জোরপূর্বক বিবাহ দেয়াসহ আটক রেখে ধর্ষণ করা হয় বলে বাদী এজাহারে উল্লেখ করেছেন।

ধর্ষণের শিকার হওয়া কিশোরীকে উদ্ধার ও অভিযুক্ত বদরুল আলমকে গ্রেফতারের সত্যতা স্বীকার করে বিশ্বনাথ থানার অফিসার ইন-চার্জ (ওসি) শামীম মুসা ও থানার এসআই মিজানুর রহমান মিজান বলেন, এঘটনায় কিশোরী বাদী হয়ে ৪ জনের নাম উল্লেখ করে ও আরো ৪/৫ জনকে অজ্ঞাতনামা অভিযুক্ত করে বিশ্বনাথ বাল্যবিবাহ প্রতিরোধ দমন আইনে ও ধর্ষণের অভিযোগে মামলা দায়ের করেছেন। আর গ্রেফতারকৃত বদরুল আলমকে বৃহস্পতিবার দুপুরে আদালতের মাধ্যমে জেলহাজতে প্রেরণ করা হয়েছে।