বিমানের লন্ডন রুটের কার্গো সেক্টরে অসমন্বয়হীনতা; লোকসান প্রতি মাসে দেড় কোটি টাকা

679

ঢাকা সংবাদদাতা : বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের লন্ডন রুটে কার্গো ব্যবসায় ধ্বস নেমেছে। যার ফলে প্রতি মাসে লোকসান গুণতে হচ্ছে দেড় কোটি টাকারও বেশি। গত এক যুগ ধরে বিমানের অন্যতম লাভজনক এই রুটে কার্গো সেক্টরের একচেটিয়া ব্যবসা করে বিমানের আয়ের খাতে শক্তিশালী অবস্থান সৃষ্টি হয়েছিল, তা এখন মুখ থুবড়ে পড়েছে। সেই সুযোগে তিল তিল করে গড়ে উঠা সম্ভাবনাময় এই ব্যবসাটি চলে যাচ্ছে বিদেশী এয়ারলাইন্সগুলোর দখলে।
অভিযোগ উঠেছে, এই লোকসানের নেপথ্যে বিমানের নতুন ইউকে কান্ট্রি ম্যানেজার হারুন খাঁনের অদক্ষতা এবং ভুল নীতির বাস্তবায়ন। যার ফলে হাতছাড়া হতে চলেছে, বিপুল সম্ভাবনাময় এই কার্গো সেক্টর। শুধু তাই নয় কোটি কোটি টাকা লোকসান হওয়ার পরেও বিমানের উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নজরে বিষয়টি না আসায় অনিশ্চয়তার পথে ধাবিত হচ্ছে বিমানের আয়ের এই সম্ভাবনাময় সেক্টরটি।
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, গত ২০১৮ সালের আগষ্ট, সেপ্টেম্বর ও অক্টোবর মাসে যেখানে বিমানের কার্গো সেলস ছিলো বাংলাদেশী মুদ্রায় যথাক্রমে ৪ কোটি ২২ লাখ টাকা, ৪ কোটি ৬৬ লাখ টাকা ও ৪ কোটি ৩২ লাখ। সেখানে এ বছর ২০১৯ সালের একই সময়ে তা নেমে দাঁড়িয়েছে যথাক্রমে ২ কোটি ৮২ লাখ, ৩ কোটি ৯ লাখ ও ৩ কোটি টাকা। গড়ে প্রতি মাসে কার্গো সেলস কমে গেছে গড়ে দেড় কোটি টাকা, যা বছরে প্রায় ১৮ কোটি টাকা।
নতুন কান্ট্রি ম্যানেজার লন্ডনে আসার পর থেকে এভাবে প্রতি মাসেই নিয়মিত ভাবে লোকসান হচ্ছে বিমানের লন্ডন রুটের কার্গো শাখায়। অথচ বিগত বছরগুলোতে ধারাবাহিকভাবে কার্গো সেক্টরে বিমানের ব্যবসায়িক উন্নতি হচ্ছিলো।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বিমানের ঢাকা অফিসের এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, বিমানের কার্গো শাখায় লাভজনক এই রুটের হঠাৎ এমন লোকসান মেনে নিতে পারছেন না লন্ডন অফিসের কর্মকর্তারা। তারা খুবই হতাশ নতুন কান্ট্রি ম্যানেজার হারুন খানের সাম্প্রতিক কার্গো বিধ্বংসী কর্মকান্ডে। ঢাকা অফিস বিষয়টি জানতে পেরে, ম্যানেজার হারুন খানকে বর্তমান কর্মস্থল লন্ডন থেকে বিমানের প্রধান কার্যালয়ে জরুরী তলব করা হয়েছিলে। সেখানে কার্গো সেলস কমে যাওয়ার বিষয়ে তার কাছে ব্যাখ্যা চাওয়া হলে তিনি কোন সদুত্তর দিতে পারে নি বলে একটি সূত্র জানায়।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নতুন কান্ট্রি ম্যানেজার বিমানের লন্ডন অফিসে হিসেবে নিয়োগ লাভের পূর্বে মালয়েশিয়ায় বিমানের কান্ট্রি ম্যানেজার ছিলেন। গত বছর জৈষ্ঠ্যতা লংঘন করে পোস্টিং দেওয়া হয় লন্ডন অফিসে। বিমানের কার্গো সম্পর্কে দক্ষতা এবং সার্বিক ধারণা বলতে গেলে তাঁর একেবারেই নেই। তিনি লন্ডন অফিসে এসেই বিভিন্ন অসঙ্গতিপূর্ন নিয়ম চালু করে এই সেক্টরে অস্থিরতা তৈরী করেছেন। বিমানের ইতিহাসে যেখানে কমপক্ষে তিন মাস পর কার্গো মূল্য পরিবর্তনের নিয়ম চালু থাকলেও কান্ট্রি ম্যানেজার হারুণ খান নিজ ক্ষমতাবলে এক মাসেই তিনবার কার্গো মূল্য পরিবর্তন করে বৃটেনের কার্গো মার্কটের চরম অস্থিতিশীল পরিস্থিতি সৃষ্টি করে।
বাংলাদেশী মালিকানাধীন কার্গো প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের নিয়মিত বরাদ্দকৃত কার্গো স্পেস কমিয়ে আনারও অভিযোগ রয়েছে। যার ফলে ফ্লাইটের দিন লন্ডন থেকে কার্গো অনেক খালি গেলেও এ নিয়ে কোন নজরদারী নেই বিমান কর্তৃপকক্ষের। দীর্ঘদিন ধরে সফলভাবে ব্যবসা পরিচালনা করে আসা যুক্তরাজ্যের শীর্ষ কার্গো প্রতিষ্ঠানগুলো বিমানকে কার্গো সরবরাহ করে আসছে। প্রতিবছর কোটি কোটি টাকার রাজস্ব পাচ্ছে বাংলাদেশ সরকার। অথচ আজ থেকে একযুগ আগেও ব্যক্তিগত জিনিসপত্র তথা হাউজ হোল্ড কার্গো বলতে তেমন কোন ধারণাই ছিলো না কমিউনিটির মানুষের কাছে। বিলেতে কার্গো ব্যবসায়ীদের সহযোগিতায় বর্তমানে যুক্তরাজ্যসহ ইউরোপে একটি বিশাল কার্গো বাজার তৈরী হয়েছে। এতে উপকারভোগী হচ্ছে দেশের বিমান, কাস্টমস এবং বিলেতের প্রবাসী বাংলাদেশীরা।
২০০৯ সালে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইন্সের লন্ডন স্টেশনের জন্য কার্গো জিএসএ নিয়োগ করে। কিন্তু জিএসএ নিয়োগ করলেও কার্গো ব্যবসা প্রসারে এই জিএসএ এককভাবে কোন ভূমিকা রাখতে পারেনি। কমিউনিটির কার্গো ব্যবসায়ীরা নিজস্ব প্রচেষ্টায়, মিডিয়াতে প্রচার ও প্রসার করে কার্গো ব্যবসাকে এই পর্যায়ে নিয়ে এসেছেন। প্রায়ই ১০টি কার্গো প্রতিষ্ঠান সফলভাবে ব্যবসা পরিচালনা করে আসছিলো। ২০১১ সালে বিমান বহরে বোয়িং ট্রিপল সেভেন যুক্ত হলে, লন্ডন রুটে কার্গো ব্যবসা দ্বিগুন হয়ে যায়। ২০১৩ সালে লন্ডন রুটে ৪টি ফ্লাইট চালু হলে, কার্গো স্পেস বৃদ্ধি পায় এবং কার্গো ব্যবসা ইউকেসহ ইউরোপ পর্যন্ত বিস্তৃতি লাভ করে। কিন্তু গত বছর ২০১৮ সালে হঠাৎ করে বিমান কর্তৃপক্ষ জিএসএ বাতিল করে। জিএসএ নিজস্ব দায়িত্বে নেওয়ার ফলে এটি আমলাতন্ত্রিক জটিলতায় পড়ে। এছাড়াও রয়েছে রাজনৈতিক প্রভাব ও ম্যানেজারদের ক্ষমতার অপব্যবহার।
ব্রিটেনে দশ লক্ষাধিক ব্রিটিশ বাংলাদেশির বসবাস। এই বিপুল সংখ্যক প্রবাসীকে কেন্দ্র করে বিলেতের প্রায় প্রত্যেকটি শহরে গড়ে উঠেছে ছোট বড়ো অনেকগুলো কার্গো, ট্রাভেল এজেন্সী ও মানি ট্রান্সফার প্রতিষ্ঠান। ব্রিটেন এবং ইউরোপ মিলে রয়েছে কয়েক শতাধিক কার্গো ব্যবসা। এসকল ব্যবসা প্রতিষ্ঠান তিলে তিলে বিমানের কার্গো সেক্টরকে গড়ে তুলেছেন, লাভের মুখ দেখিয়েছে বিমানকে। প্রবাসীরা তাদের স্বজনদের কাছে বিলেত থেকে অনেক নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্র পাঠাচ্ছেন। দেশে যাওয়ার সময় অতিরিক্ত ব্যাগেজ সহজেই পাঠানোর সুযোগ সৃষ্টি হওয়ায় বেড়েছে এর চাহিদা।
ব্রিটিশ বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্সের প্রেসিডেন্ট বশির আহমেদ বলেন, বিমান ব্রিটেনের মূলধারার জিএসএ দ্বারা এতোদিন পরিচালিত হওয়ায়, অতীতে দুর্নীতি ও অনিয়মের ঘটনা হয়নি বলে আমি মনে করি। বর্তমানে বিমান কর্তৃপক্ষ জিএসএ পরিবর্তন করায় এই সমস্যা সৃষ্টি হচ্ছে। অতীতের নিয়মেই বিমানকে ফিরে যাওয়া উচিত। তাহলে রাজনৈতিক প্রভাব, ম্যানেজারদের ক্ষমতার অপব্যাবহার কমে আসবে ও কার্গো ব্যবসায় শৃঙ্খলা ফিরে আসবে।
তিনি আরো বলেন, বিমান বাংলাদেশের কতিপয় কর্মকর্তাদের গাফলতি ও দূরদর্শিতার অভাবে বিমানের তৈরী করা এই ব্যবসা অন্য দেশীয় এয়ারলাইন্সের দিকে চলে যাচ্ছে। যা ভবিষ্যতে বিমানের আর্থিক ক্ষতির কারণ হয়ে দাড়াতে পারে।
লন্ডন রুটের যাত্রী সেবার মান ও বিমানের ব্যবসা বৃদ্ধির জন্য প্রধানমন্ত্রী বিশেষ নির্দশেনা থাকলেও কান্ট্রি ম্যানেজার হারুন খানের অদক্ষতা ও গাফলতির কারণে সেবার মান বৃদ্ধি পাওয়া দূরে থাক উল্টো ক্ষুন্ন হচ্ছে সুনাম, গুণতে হচ্ছে কোটি কোটি টাকার লোকসান। পাশাপাশি বিমানের লাভজনক এই রুটের দখল চলে যাচ্ছে বিদেশী এয়ারলাইন্সের কাছে।
বৃটেনে বিমান বাংলাদেশ অনুমোদিত ট্রাভেল এজেন্সীগুলোর সংগঠন বাটা‘র প্রেসিডেন্ট হেলাল খান বলেন, সুস্থ ব্যবস্থপনা ফিরিয়ে না আসলে বিমানের ব্যবসা একদিন ধীরে ধীরে শূণ্যের কৌটায় চলে আসবে। আর তাই শীঘ্রই বিমান কতৃপক্ষের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। পাশাপাশি বিমানের এই লোকসানের জন্য দায়ী কর্মকর্তাদের চিহ্নিত করে শাস্তির আওতায় আনা প্রয়োজন।
এ বিষয়ে বিমান বাংলাদেশ এর ইউকে কান্ট্রি ম্যানেজার হারুন খানের মুঠোফোনে বেশ কয়েকবার চেষ্টা করা হলেও রিসিভ করেন নি। সবশেষ তার মোবাইলে এসএমএস দিয়ে প্রতিক্রিয়া জানার চেষ্টা করা হলেও কোন জবাবা মেলে নি।
উল্লেখ্য, ২০২০ সালের জানুয়ারী থেকে লন্ডনের পাশাপাশি ম্যানচেষ্টার থেকে সরাসরি আরো ৩টি ফ্লাইট চালু করতে যাচ্ছে বিমান বাংলাদেশ। এই ফ্লাইট চালু হলে কারগো স্পেস বৃদ্ধি পাবে, তবে বিমানের লন্ডন অফিসের অসমন্বয়হীনতার কারণে এর আগেই এই কার্গো সেক্টর বিমানের কাছ থেকে হাতছাড়া হচ্ছে বলে মনে করেন অনেকে।

সূত্র: নয়াদিগন্ত