পোস্টমর্টেম: সিলেট নির্বাচন

2746

এহসানুল হক জসিম : বলা চলে, পাশই করলেন আরিফুল হক চৌধুরী। পরাজয়ের গ্লানি মেনে নিতে হবে সরকার দলীয় প্রার্থী বদরউদ্দিন আহমদ কামরানকে। দু্ইটি কেন্দ্রের ভোটে অন্য কিছু হওয়ার সম্ভাবনা নেই আর। কারচুপি আর সরকারী প্রভাব বিস্তার না করলে আরিফুল হক চৌধুরী আরো বেশি ভোটে পাশ করতেন। ইয়েস, জামায়াত নেতা স্বতন্ত্র প্রার্থী এহসানুল মাহবুব জুবায়ের প্রার্থী থাকা সত্ত্বেও আরিফ-ই পাশ করলেন। একটু বিশ্লেষণ করি–

(১) এই তো ৪/৫ দিন আগেই সিলেট নিয়ে নির্বাচনী জরিপ ও বিশ্লেষণ করতে গিয়ে লিখেছিলাম, কারচুপি, কেন্দ্র দখল ও সরকারী হস্তক্ষেপের পরেও আরিফ পাবেন ৯০ হাজার ভোট। সিলেটে আরিফ ব্যাপক জনপ্রিয় ব্যাপক উন্নয়ন করার কারণে। বিগত কিছুদিনে সিলেটে যে ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছে, বাংলাদেশের আর কোন সিটিতে এতো উন্নয়ন হয়নি এত অল্প দিনে। রাজনৈতিক আদর্শ আর প্রতিনিধি নির্বাচন কোন কোন সময় ভিন্ন হয়। নির্বাচনে সিলেটের জনগণ উন্নয়নের স্বার্থে আরিফকে ভোট দিযেছে।

(২) আওয়ামী লীগ নেতা বদরউদ্দিন আহমদ কামরানকে নিরবে সিলেটবাসী ঘৃণা করে। উন্নয়ন না করেও হালকা বিষয়গুলো পালন করে এক সময় হয়তো সিলেটে তিনি জনপ্রিয় ছিলেন। কিন্তু জনগণের সাথে তিনি রসিকতা করতেন। জনগণ তো আর আগের মতো নেই যে, টুপি একটা মাথায় দেখলেই ভালো মানুষ মনে করে ভোট দিয়ে দেবে। অন্যদিকে, তার কয়েক টার্মে মানুষ দেখেছে- কামরান কোন উন্নয়ন করেননি। মানুষ এটা চিন্তা-ভাবনা করেছে।

(৩) কেন্দ্র দখল ও সরকারী হস্তক্ষেপে আরিফ ফেল-ই করতেন যদি জামায়াতের জুবায়ের নির্বাচনী লড়াইয়ে না থাকতেন। কিভাবে? ২০১৩ সালের নির্বাচনে সরকারী হস্তক্ষেপ ব্যর্থ করে দিয়ে এই আরিফ-ই তো ৩৫ হাজার ভোটের ব্যবধানে পাশ করেছিলেন। সেদিন বিএনপি-জামায়াত প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল। এবারও জামায়াত প্রতিরোধ গড়ে তুলে কিছু কেন্দ্রে। তবে নিজদের প্রার্থীর জন্য এই প্রতিরোধ। যদি জামায়াত প্রতিরোধ গড়ে না তুলতো তাহলে আরিফ আরো ৭/৮ হাজার ভোট কম পেতেন আর কামরান আরো ৭/৮ হাজার বেশি পেতেন কারচুপি করে। আরেকটু খোলাসা করি, ৩০/৩৫টি কেন্দ্রে জামায়াত প্রতিরোধ গড়ে তুলে। জামায়াতের কারণে এইগুলো দখল কিংবা ব্যাপকভাবে ভোট চুরি করতে পারেনি আওয়ামী লীগ। জামায়াত ভোট পাহারা দিতে গিয়ে বিএনপির আরিফেরও যদি ২০০/২৫০ করে ভোট রক্ষা হয় প্রতিটি কেন্দ্রে, তাহলে এই ৩০/৩৫টি কেন্দ্রে ৭/৮ হাজার তো রক্ষা পেল।

(৪) আওয়ামী লীগ নেতাদের প্রভাবশালী একটি অংশ ভেতরে ভেতরে কামরানের বিজয় চাননি। এই যেমন- অর্থমন্ত্রী মাল মুহিত, মিসবাহ সিরাজ। আরো অনেকে। এটা দলীয় রাজনীতির নানা হিসাব-নিকাশের কারণে। দলের এই প্রভাবশালীদের কারণে অনেক জায়গায় কারচুপি হলেও ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং হয়নি। অনেক জায়গায় দখল ও লুটোৎসব হলেও আবার অনেক জায়গায় হয়নি। কামরানকে জাতীয় নেতা হওয়া ঠেকানো দরকার ছিল ওই অংশের; হয়েছেও তাই।

(৫) কামরানের মতো আরিফেরও বিরোধি ছিলেন বিএনপির নেতা-কর্মীদের একটি বড় অংশ। অবশ্য আওয়ামী লীগের ওই নেতারা কামরানের বিরোধি ছিল ভেতরে ভেতরে। আর বিএনপি নেতারা আরিফের বিরোধিতা প্রকাশ্যে করেছেন। দলীয় নমিনেশন ঠেকাতে তারা ছিলেন বদ্ধপরিকর। আরিফ পাশ করেছেন বিএনপির কারণে নয়। তার জনপ্রিয়তা অতীতের চাইতে আরো বেড়েছিল। জনগণ বিএনপির প্রতিও ক্ষুব্ধ আন্দোলন-সংগ্রামে তাদের ব্যর্থতার কারণে, আরিফের প্রতি নয়। জনগণ আওয়ামী লীগের বিপক্ষে নিরবে বিপ্লব ঘটিয়েছে আরিফকে ভোট দিয়ে। নিরবে বিএনপিকে এই বার্তা-ই দিয়েছে– জনগণের জন্য কিছু করুন, তাহলে জনগণও কাছে থাকবে।

(৬) জামায়াত আর জুবায়েরের জন্য নির্বাচনী মাঠে স্পেস করে দেয় আওয়ামী লীগ অন্যকথায় সরকার। এটা হিতে-বিপরীত হয়েছে। তারা হয়তো মনে করেছিল, জুবায়ের আরিফের ভোট কাটবেন; সে সুযোগে নিরবে পাশ করবেন কামরান। জুবায়ের আরিফের ভোট না কেটে বরং কিছু ভোট রক্ষা করেছেন। অন্যদিকে জামায়াতকে স্পেস করে দেওয়ায় বিষয়টি জনগণ ভালোভাবে নেয়নি। যে জামায়াত দলীয় প্রতীক পর্যন্ত ব্যবহার করতে পারছেনা, সেই জামায়াত স্বতন্ত্র প্রতীক নিয়ে নির্বিঘ্নে রাজকীয় স্টাইলে নির্বাচনে মাঠে ছিল- জনগণ এটা ভালো চোখে নেয়নি। নিরবে এর জবাব দিযেছে। অন্যদিকে, কামরানের সাথে জামায়াতের কিছু সিনিয়র নেতার সুসম্পর্ক অনেক জামায়াত নেতা-কর্মীও ভাল চোখে নেয়নি।

যদি বলি জামায়াতের জুবায়ের নির্বাচনী মাঠে না থাকলে আরেকটু সরকারী প্রভাব খাটিয়ে কামরানই পাশ করতেন- একটু বেশি বলা হবে না তো? ব্যাখা দিই। সবাই ধরে নিয়েছিল (বিবিসি সহ) জুবায়ের পাবেন ৩০/৩৫ হাজার। সেটা কমবে আরিফের বাক্স থেকে। ফলে আওয়ামী লীগ জামায়াত প্রভাবাধিন কিছু কেন্দ্রে কারচুপি ও হিসাব পাল্টে দেওয়ার চিন্তা থেকে বিরত ছিল। তারা ভেবেছিল- যেহেতু ওই কেন্দ্রগুলোতে জুবায়ের কিছু ভোট পাবেন, সেটা ধানের শীষেরই কমবে; অতএব নো-টেনশন।

(৭) জামায়াতের শোচনীয় পরাজয় ঘটেেছে। মাত্র ১১ হাজার ভোট পেয়েছে। ৫.৭%। কিন্তু কেন? এর জবাব না দিয়ে বলি, সিলেট নির্বাচনের কারণে জামায়াত আবার রাজনীতিতে অনেকটা পিছিয়ে গেল। রাজনীতিতে আসলে অনেক দুরদর্শি হতে হয়। রাজনীতির জটিল-কূটিল পথে হাঁটতে থিংক ট্যাংক লাগে, বুদ্ধিজীবি লাগে, বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চা লাগে, নেতাদের দুরদর্শিতা লাগে, স্বল্পমেয়াদীর স্থলে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা লাগে। জনশক্তিবান্ধব সাংগঠনিক কাঠামোর পাশাপাশি জনবান্ধব কর্মসূচী ও জনবান্ধব চরিত্র লাগে। বাংলাদেশের ইসলামী দলগুলোর মধ্যে এসবের ঘাটতি রয়েছে।

(৮) এবার যারা নতুন ভোটার হয়েছে, বা আগেও ভোটার ছিল কিন্তু বয়সে তরুণ; কামরানকে অন্যকথায় নৌকায় ভোট দেয়নি দু:খে-ক্ষোভে। কোটা সংস্কার আন্দোলন ইস্যুতে আওয়ামী লীগ ও শেখ হাসিনার অবস্থানে যারপর নাই ক্ষুব্ধ ছাত্রসমাজ ও তরুণ প্রজন্ম। শিক্ষিত বেকার আর কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ুয়া ছাত্ররা কোটা আন্দোলনের কারণে তাদের নিরব ক্ষোভ প্রকাশ করেছে ধানের শীষে ভোট দিয়ে।

(৯) আওয়ামী লীগেরও অনেকে আরিফ তথা ধানের শীষে ভোট দিয়েছে নিরব ক্ষোভ থেকে। তাদের এ ক্ষোভ নানা কারণে। টাকা পয়সার অভাবে কিংবা খরচ না করার কারণে আওয়ামী লীগের অনেক ত্যাগীরাও বঞ্চিত হচ্ছেন নেতাদের দুর্নীতি, বাণিজ্য ইত্যাদি কারণে।

(১০) সিলেট সিটিতে তিন প্রকার ভোট রয়েছে। (১) আদি অধিবাসীদের ভোট, (২) সিলেটি সেটলারদের ভোট (যারা সিলেট নগরীর আদি অধিবাসী নন, সিলেট বিভাগের বিভিন্ন উপজেলা থেকে এসে সেটল হয়েছেন), আর (৩) নন-সিলেটি সেটলারটের ভোট। এই তিন প্রকারের মধ্যে তৃতীয় প্রকারের একটা অংশের ভোট পাননি আরিফ। অর্থাৎ তৃতীয় প্রকারের মধ্যে হকাররাও রয়েছে। তবে সংখ্যায় কম। মেয়র আরিফ হকার্স উচ্ছেদ করেছিলেন নগরীর ফুটপাত থেকে। এই কারণে হকাররা তাকে ভোট দিয়েছে কম। আর হকার্স উচ্ছেদের ফলে তৃতীয় প্রকারের বাকি অংশ এবং প্রথম ও দ্বিতীয় প্রকার ভোটাররা ব্যাপক খুশি হয়েছিল। নগরীর রাস্তা সম্প্রসারণ এবং আরো বিভিন্ন উন্নয়মূলক ইস্যুতে আরিফের অনমনীয় ভুমিকায় যাদের স্বার্থে আঘাত লেগেছিল সেই কিছু সংখ্যক নাগরিক ব্যতিত সাধারণ নাগরিকরা ব্যাপক খুশি ছিল। ফলে তারা আরিফের প্রতি ঝুঁকেছিল।

সিলেট নির্বাচন শেষ পর্যন্ত চমকই রয়ে গেলো। অভিনন্দন আরিফুল হক চৌধুরী, যদিও আপনি এখনও নির্বাচিত হন নাই। নির্বাচিত তো হচ্ছেনই। ব্যবধান যা, তার চাইতে সেই দুই কেন্দ্রে আর ক’টা ভোটই বেশি আছে? সিলেটের উন্নয়ন অব্যাহত রাখুন। ভুলে যান দু:খ-ক্ষোভ তিক্ততা।