১০ কোটি ৪ লাখ ভিউ! কোন জাদুতে মুগ্ধ করল সিরিজটি

33

একটি খুন, এক দম্পতি এবং দুজনের দুই রকম গল্প। কে সত্য বলছে, আর কে মিথ্যা? উত্তর খুঁজতে গিয়ে যত সামনে এগোনো যায়, ততই বদলে যায় চরিত্রগুলো সম্পর্কে ধারণা। নেটফ্লিক্সের রহস্য-থ্রিলার সিরিজ ‘হিজ অ্যান্ড হার্স’ এমনই এক গল্প নিয়ে শুরু হয়েছিল। মুক্তির কয়েক মাস পর দেখা গেল, দর্শকদের বড় একটি অংশকে শেষ পর্যন্ত পর্দায় আটকে রাখতে পেরেছে সিরিজটি।

নেটফ্লিক্সের ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসের হিসাব অনুযায়ী, ‘হিজ অ্যান্ড হার্স’ হয়েছে বছরের প্রথমার্ধের সবচেয়ে বেশি দেখা সিরিজ। জানুয়ারি থেকে জুন—এই ৬ মাসে সিরিজটির ভিউ ১০ কোটি ৪ লাখ। একই সময়ে নেটফ্লিক্সের সব ধরনের কনটেন্ট মিলিয়ে মোট দেখা হয়েছে ৯৭ বিলিয়নের বেশি ঘণ্টা।

ছয় পর্বের সিরিজটি মুক্তি পায় গত ৮ জানুয়ারি। অ্যালিস ফিনির ২০২০ সালের একই নামের উপন্যাস অবলম্বনে এটি নির্মাণ করেছেন উইলিয়াম ওল্ডরয়েড। তিনি ‘লেডি ম্যাকবেথ’ ও ‘ইলিন’-এর মতো কাজের জন্য পরিচিত। সিরিজের অন্যতম নির্বাহী প্রযোজক জেসিকা চ্যাস্টেইন; প্রধান দুই চরিত্রে অভিনয় করেছেন টেসা থম্পসন ও জন বার্নথাল।

খুনের তদন্তে মুখোমুখি স্বামী-স্ত্রী
গল্পের কেন্দ্রে আছেন আনা অ্যান্ড্রুজ ও জ্যাক হার্পার। আনা আটলান্টার একজন টেলিভিশন সংবাদ উপস্থাপক। ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনের নানা টানাপোড়েনে তিনি অনেকটাই নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছেন। এমন সময় নিজের বেড়ে ওঠার শহর ডালোনেগায় একটি হত্যাকাণ্ডের খবর তাঁর কানে আসে।

খবরটি আনার মধ্যে পুরোনো সাংবাদিক সত্তাকে জাগিয়ে তোলে। তিনি আবার ঘটনাটির পেছনে ছুটতে শুরু করেন। কিন্তু তদন্তের দায়িত্বে থাকা গোয়েন্দা জ্যাক হার্পারের সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক বিষয়টিকে জটিল করে তোলে। কারণ, জ্যাক আর কেউ নন, আনার যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন স্বামী।

এখানেই সিরিজের মূল খেলাটি শুরু। একই ঘটনার দিকে তাকিয়ে আনা ও জ্যাক যেন দুটি আলাদা গল্প বলছেন। একজন সাংবাদিক হিসেবে সত্য খুঁজছেন, অন্যজন গোয়েন্দা হিসেবে হত্যারহস্যের সমাধান করতে চাইছেন। কিন্তু তদন্ত যত এগোয়, ততই সন্দেহের তির দুজনের দিকেই ঘুরতে থাকে।

নেটফ্লিক্সের বিবৃতিতে, দুজনই মনে করেন অন্যজন এই হত্যাকাণ্ডের অন্যতম সন্দেহভাজন। ফলে এটি শুধু একটি খুনের তদন্ত নয়, একই সঙ্গে ভেঙে যাওয়া একটি দাম্পত্য সম্পর্কের ভেতরের গোপন কথাও খুঁজে বের করার গল্প।

‘হিজ অ্যান্ড হার্স’–এর দৃশ্য। আইএমডিবি
‘হিজ অ্যান্ড হার্স’–এর দৃশ্য। আইএমডিবি

টেসা থম্পসন ও জন বার্নথালের লড়াই
সিরিজটির অন্যতম আকর্ষণ টেসা থম্পসন ও জন বার্নথালের অভিনয়। ‘ক্রিড’, ‘থর’ ও ‘ওয়েস্টওয়ার্ল্ড’-এর মতো কাজের জন্য পরিচিত থম্পসন এখানে আনা চরিত্রে অভিনয় করেছেন। অন্যদিকে ‘দ্য পানিশার’, ‘দ্য বেয়ার’সহ বিভিন্ন কাজের জন্য পরিচিত বার্নথাল অভিনয় করেছেন জ্যাকের চরিত্রে।

আনা উচ্চাভিলাষী, বুদ্ধিমান ও দৃঢ়চেতা সাংবাদিক। নিজের পেশাগত অবস্থান পুনরুদ্ধারের পাশাপাশি পুরোনো শহরের হত্যাকাণ্ড তাঁকে ব্যক্তিগতভাবেও নাড়া দেয়। টেসা থম্পসন চরিত্রটির কঠোরতার পাশাপাশি তার ভেতরের ক্ষতও ফুটিয়ে তুলেছেন। নেটফ্লিক্সের এক সাক্ষাৎকারে থম্পসন আনা চরিত্রটিকে উচ্চাভিলাষী, তীক্ষ্ণ এবং কখনো কখনো কঠোর স্বভাবের নারী হিসেবে বর্ণনা করেছেন।

জ্যাকের চরিত্রে বার্নথালও সহজ কোনো গোয়েন্দা চরিত্র পাননি। তদন্তের পাশাপাশি নিজের অতীত, সম্পর্ক ও ভুল সিদ্ধান্তের ভার তাঁকে বহন করতে হয়। ফলে আনা ও জ্যাকের সম্পর্কই হয়ে ওঠে রহস্যের আরেকটি স্তর।

রটেন টমেটোজের সমালোচকদের সারাংশেও দুজনের অভিনয়কে সিরিজটির বড় শক্তি হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, সিরিজের রহস্যের প্রশ্নগুলো শেষ পর্যন্ত যতটা সন্তোষজনক উত্তর পায় না, তার চেয়ে বেশি আকর্ষণ তৈরি করে বার্নথাল ও থম্পসনের অভিনয়।

শুধু খুন নয়, সম্পর্কের গল্পও
‘হিজ অ্যান্ড হার্স’-এর গল্পে হত্যাকাণ্ডের পাশাপাশি রয়েছে বিশ্বাসভঙ্গ, পুরোনো সম্পর্ক, প্রতিশোধ, পারিবারিক দ্বন্দ্ব ও অতীতের নানা গোপন ঘটনা। আনা ও জ্যাকের দাম্পত্য সম্পর্ক কেন ভেঙে গেল, তাঁদের মধ্যে আসলে কী ঘটেছিল—এ প্রশ্নও ধীরে ধীরে রহস্যের অংশ হয়ে ওঠে।

তাঁদের চারপাশে থাকা চরিত্রগুলোর প্রত্যেকেরই কোনো না কোনো গোপন তথ্য রয়েছে। আনার মা অ্যালিস, জ্যাকের বোন জো, টেলিভিশন কর্মী রিচার্ড, লেক্সিসহ অন্য চরিত্রগুলোও তদন্তকে একাধিক দিকে নিয়ে যায়। ফলে দর্শককে বারবার নিজের ধারণা বদলাতে হয়।

অভিনয়ে আরও আছেন পাবলো শ্রেইবার, ক্রিস্টাল ফক্স, সুনীতা মণি, রেবেকা রিটেনহাউস ও মেরিন আয়ারল্যান্ড।

‘হিজ অ্যান্ড হার্স’–এর দৃশ্য। আইএমডিবি
‘হিজ অ্যান্ড হার্স’–এর দৃশ্য। আইএমডিবি

কেন এত দর্শক
সিরিজটির জনপ্রিয়তার পেছনে প্রথম কারণ সম্ভবত এর সহজ কিন্তু কার্যকর প্রশ্ন—খুনি কে?

তবে শুধু খুনের রহস্য নয়, প্রতিটি পর্বে নতুন তথ্য যোগ হওয়া এবং আগের ঘটনার অর্থ বদলে যাওয়া দর্শকদের পরের পর্বে নিয়ে যায়। ছয় পর্বের সীমিত সিরিজ হওয়ায় গল্পটিও খুব বেশি দীর্ঘ হয়নি। ফলে একসঙ্গে কয়েকটি পর্ব দেখে ফেলার প্রবণতা তৈরি হয়েছে।

দ্য গার্ডিয়ান সিরিজটিকে দ্রুতগতির, চমক–জাগানিয়া ও সহজে একের পর এক পর্ব দেখার মতো থ্রিলার হিসেবে বর্ণনা করেছে। তাদের মতে, এটি এমন ধরনের বিনোদন, যেখানে খুব বেশি মাথা না ঘামিয়েও দর্শক রহস্যের ভেতর ঢুকে পড়তে পারে।
আর নেটফ্লিক্সের নিজস্ব তথ্যই দেখাচ্ছে দর্শকের আগ্রহ কতটা ছিল। ২০২৬ সালের প্রথম ৬ মাসে ১০ কোটি ৪ লাখ ভিউ নিয়ে ‘হিজ অ্যান্ড হার্স’ ছিল নেটফ্লিক্সের সবচেয়ে বেশি দেখা সিরিজ। দ্বিতীয় স্থানে থাকা ‘ব্রিজারটন’ চতুর্থ মৌসুমের ভিউ ছিল ১০ কোটি ২ লাখ। অর্থাৎ দুটির ব্যবধানও খুব বেশি নয়।

সমালোচনাও আছে
দর্শকের বিপুল আগ্রহের সঙ্গে সমালোচকদের প্রতিক্রিয়া অবশ্য পুরোপুরি মেলেনি। রটেন টমেটোজে সিরিজটির সমালোচক স্কোর ৭১ শতাংশ, ৫২টি পর্যালোচনার ভিত্তিতে। দর্শক স্কোর ৬২ শতাংশ।
মেটাক্রিটিকে ২১ জন সমালোচকের পর্যালোচনার ভিত্তিতে সিরিজটির স্কোর ৫৪/১০০, অর্থাৎ প্রতিক্রিয়া ‘মিশ্র বা গড়পড়তা’। তবে একই তালিকায় ভ্যারাইটি ও আইজিএনের মতো কিছু সমালোচক উচ্চ নম্বর দিয়েছে। তারা বিশেষ করে টেসা থম্পসন ও জন বার্নথালের রসায়ন এবং গল্পের টান টান গতির প্রশংসা করেছেন।

অন্যদিকে হলিউড রিপোর্টার ও রজারএবার্ট ডটকমের পর্যালোচনায় গল্পের যুক্তি, অতিরিক্ত চমক এবং চরিত্রগুলোর সিদ্ধান্ত নিয়ে আপত্তি তোলার জায়গা আছে। রজারএবার্টের সমালোচনায় বলা হয়েছে, দুই প্রধান অভিনেতার প্রতিভা থাকা সত্ত্বেও দুর্বল সংলাপ ও অবিশ্বাস্য কিছু সিদ্ধান্ত তাঁদের অভিনয়কে যথেষ্ট জায়গা দেয়নি।
টাইমও সিরিজটির আবহ ও গল্প বলার ধরন নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। তাদের মূল্যায়নে, সিরিজটি এমন এক জায়গায় দাঁড়িয়েছে যেখানে এটিকে পুরোপুরি গম্ভীর থ্রিলার হিসেবেও নেওয়া কঠিন, আবার নিছক বিনোদন হিসেবেও পুরোপুরি উপভোগ করা কঠিন।

অন্যদিকে দ্য গার্ডিয়ানের মূল্যায়ন ছিল তুলনামূলকভাবে ইতিবাচক—তাদের কাছে এটি ‘চকচকে’, দ্রুতগতির এবং ‘বিঞ্জযোগ্য’ থ্রিলার। অর্থাৎ সমালোচকদের মধ্যে মূল বিভাজনটা গল্পের যুক্তি ও গভীরতা নিয়ে; কিন্তু সিরিজটি দর্শককে ধরে রাখতে পারছে কি না, সে জায়গায় অনেকেই একমত।

‘হিজ অ্যান্ড হার্স’–এর দৃশ্য। আইএমডিবি
‘হিজ অ্যান্ড হার্স’–এর দৃশ্য। আইএমডিবি

শেষ পর্যন্ত ‘হিজ অ্যান্ড হার্স’ কেন আলাদা
‘হিজ অ্যান্ড হার্স’ নতুন কোনো রহস্য-থ্রিলারের সূত্র আবিষ্কার করেনি। খুন, সন্দেহভাজন, গোপন সম্পর্ক, অতীতের ঘটনা এবং শেষ মুহূর্তের মোড়—সবই পরিচিত উপাদান। কিন্তু পরিচিত উপাদানগুলোকে ছয় পর্বে সাজিয়ে এমনভাবে পরিবেশন করা হয়েছে, যাতে দর্শক বারবার ভাবেন, ‘আসলে সত্যিটা কী?’
এর সঙ্গে যোগ হয়েছে টেসা থম্পসন ও জন বার্নথালের মতো শক্তিশালী দুই অভিনেতার উপস্থিতি। দুজনের চরিত্র একই ঘটনার দুই দিক তুলে ধরে। ফলে ‘হিজ’ আর ‘হার্স’ শুধু দুই পক্ষ নয়, একই সম্পর্কের দুই ভিন্ন স্মৃতি ও সত্যের প্রতিনিধিও হয়ে ওঠে।

নেটফ্লিক্সডটকম, আইএমডিবি ও স্ক্রিন র‍্যান্ট অবলম্বনে