রাজবাড়ীর কাপড় বাজারে পুলিশের সামনে এক নারীকে লাথি ও ধাক্কা দেয়ার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। রোববার (৩০ আগস্ট) দুপুরে ভিডিওটি ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি নিয়ে নানা আলোচনা শুরু হয়।
শনিবার দুপুরে রাজবাড়ী কাপড় বাজারে এ ঘটনা ঘটে বলে জানায় রাজবাড়ীর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম এন্ড অপস) মো. শাসমুল হক।
ভিডিওতে দেখা যায়, এক নারী পুলিশ সদস্য ওই নারীকে হাত ধরে নিয়ে যাচ্ছেন। পেছনে রয়েছেন আরও দুজন পুরুষ পুলিশ সদস্য। এ সময় হঠাৎ এক যুবক ওই নারীকে লাথি দেন। পরে পেছনে থাকা এক পুলিশ সদস্য ওই যুবককে সরিয়ে দেন।
এরপর আরেক যুবক ওই নারীকে লাথি দেন। সঙ্গে সঙ্গে আরেক ব্যক্তি তাকে হাত দিয়ে ধাক্কা দেন। পুরো ঘটনাটি পুলিশের উপস্থিতিতেই ঘটতে দেখা যায়।
ভিডিওটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর পুলিশের উপস্থিতিতে এমন ঘটনা কীভাবে ঘটল, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন কাপড় বাজার ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কাদেরিয়া মার্কেটের তৃতীয় তলায় ওই নারীর দোকান রয়েছে। ওই দোকানের এক নারী কর্মচারী নিজে দোকান করার উদ্যোগ নেন। বিষয়টি নিয়ে ওই নারী কাপড় বাজার ব্যবসায়ী নেতাদের কাছে অভিযোগ দেন। শনিবার ওই নারী একই অভিযোগ নিয়ে কাপড় বাজার ব্যবসায়ী নেতা আব্দুল আজিজ মন্ডলের কাছে যান।
আজিজ মন্ডল বিষয়টির সুরাহা করতে অপারগতার কথা জানিয়ে বলেন, বাজার ব্যবসায়ী সমিতির নেতারা এর সমাধান দিতে পারেন। এরপর ওই নারী শতাধিক নারীসহ হ্যান্ড মাইক হাতে কাদেরিয়া মার্কেটের নীচতলায় মিছিল করেন। পরিবেশ ক্রমশ উত্তপ্ত হতে থাকলে কাপড় বাজারের ব্যবসায়ীরা ওই নারীর বিচার দাবিতে সব দোকান বন্ধ করে দেন। পরে তারা বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে থানায় যান। দুই ঘণ্টা বন্ধ থাকার পর খোলা হয় দোকানপাট।
এ বিষয়ে ওই নারীর সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, তিনি কাপড় বাজারে ১২ বছর ধরে ব্যবসা করেন। তার দোকানে এক বছরের বেশি কোনো কর্মচারী রাখতে পারেন না। নানাভাবে ফুঁসলিয়ে নিয়ে যায় অন্যরা। গত জুলাই মাসের ১৫ তারিখে তার দোকানের এক কর্মচারী মায়ের অসুস্থতার অজুহাতে চাকরি করবে না বলে জানায়। তিনি তাকে আগস্ট মাস পর্যন্ত কাজ করার অনুরোধ করেন। এই ঘটনার সাক্ষীও আছে। ২২ আগস্ট জানতে পারেন ওই কর্মচারী অন্য দোকানে শিফট করছে। এটা জানার পর ওই কর্মচারীকে ফোনে জানিয়ে দেন, তোমার দোকানে আসার দরকার নেই। ১০ তারিখে বেতন নিয়ে যেও।
তিনি অভিযোগ করেন, এরপর তার দোকানে হামলার ঘটনা ঘটে। হামলাকারী ব্যক্তিরা ওই কর্মচারীকে বেতন দেয়ার জন্য চাপ দেয়। বিষয়টি নিয়ে তিনি কাপড় বাজার ব্যবসায়ী নেতাদের কাছে গিয়ে জানান, এ বিষয়ে তিনি মামলা করবেন। কিন্তু ব্যবসায়ী নেতারা বলেন, তুমি কোনো মামলা করতে পারবে না। এর জের ধরে তার নারী সহকর্মীরা শনিবার দুপুরে কাপড় বাজারে মিছিল করে। ওই সময় কাপড় বাজারের ব্যবসায়ীরা তাদের ওপর হামলা চালায়।
ওই নারীর দোকানের কর্মচারী জানান, আমি তার দোকানের কর্মচারী ছিলাম। নিয়ম অনুয়ারি দুই মাস আগে চাকরি ছাড়ার কথা বলি। সে যে অভিযোগ করছে আমি অন্য দোকানে কাজ করছি এটা মিথ্যা। আমি নিজে দোকান দিয়েছি।
তার অভিযোগ, ওই নারী আমাকে অনৈতিক কর্মকান্ডের জন্য প্রস্তাব দিচ্ছিল। আমি রাজি হয়নি। এরপর থেকে আমাকে নানা প্রেশার দিচ্ছিল,তার কথা না শুনলে আমার সমস্যা হবে। পরে আমি চিন্তা করলাম নিজের সম্মান নষ্ট করে চাকরি করা যায় না। এরপর আমি চাকরি ছেড়ে দিই।
রাজবাড়ী বাজার ব্যবসায়ী কল্যাণ সমিতির আহ্বায়ক বেনজির আহমেদ জানান, ঘটনাটি শুনে তিনি কাপড় বাজার গিয়ে উভয়পক্ষকে নিবৃত্ত করার চেষ্টা করেন। ওই নারীর বিরুদ্ধে বহুদিন ধরে নানা অভিযোগ শুনছেন। নানাভাবে ওই নারী ব্যবসায়ীদের জ্বালাতন করতেন। ওই নারীর দোকানের এক কর্মচারী দোকান দেবে। কিন্তু তাকে দোকান দিতে দেবে না। এখান থেকেই ঝামেলার শুরু। কাপড় বাজারে মিছিল করার পর ব্যবসায়ীরা দোকান বন্ধ করে প্রতিবাদ জানায়। পরে রাজবাড়ী থানার পুলিশ এসে ওই নারীকে নিরাপত্তা হেফাজতে নেন। কাপড় বাজার ব্যবসায়ীদের নিয়ে তিনি থানায় গেলেও এ বিষয়ে লিখিত কোনো অভিযোগ দেয়া হয়নি বলে জানান তিনি। তবে, ওই নারীকে কাপড় বাজারে আর ব্যবসা করতে দেয়া হবে না- এমন সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে।
রাজবাড়ীর অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ক্রাইম এন্ড অপস) মো. শাসমুল হক জানান, কাপড় বাজারের ঘটনায় কোনো পক্ষই লিখিত অভিযোগ দেয়নি। নারীকে পুলিশ হেফাজতে থাকাবস্থায় লাঞ্ছিত করার বিষয়ে বলেন, আমরা ভিডিওটি এখনও দেখিনি। ভুক্তভোগী নারী এই বিষয়ে অভিযোগ দিলে পুলিশের পক্ষ থেকে যথাযথ পদক্ষেপ নেয়া হবে।















