মনিরা শারমিন, জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) যুগ্ম আহ্বায়ক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদে (ডাকসু) সুফিয়া কামাল হল সংসদের নির্বাচিত সাবেক সাধারণ সম্পাদক। ২০১৩-১৪ সেশনে পড়াশোনা করেছেন একই বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ইনস্টিটিউটে। ছাত্রাবস্থায় নিজে সরাসরি কোনও রাজনৈতিক ছাত্র সংগঠনে সম্পৃক্ত হননি। তবে শিক্ষার্থীদের অধিকারভিত্তিক বিভিন্ন আন্দোলনে ছিলেন সামনের সারিতে।
বিশেষ করে ২০১৮ সালে কোটা সংস্কার ও নিরাপদ সড়ক আন্দোলনে তিনি সক্রিয় ভূমিকা রেখেছেন। সর্বশেষ ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলনের সময় নাহিদ-আসিফদের মাধ্যমে ছাত্রশক্তির সঙ্গে পরিচিত হন। এ সময় প্রতিদিন বিভিন্ন কর্মসূচিতে ছিলেন। তখন থেকে বিচরণ করেছেন জাতীয় রাজনীতিতে। ছুটে গেছেন তৃণমূলে। গঠন করেছেন ‘উঠানের রাজনীতি’ নামে একটি নিজস্ব প্ল্যাটফর্ম।
শেখ হাসিনার পতনের এক বছরে এসে প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির হিসাব মেলাচ্ছেন। তার মতে, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সবচেয়ে বড় কৃতিত্ব শহীদদের। কিন্তু এক বছরে শহীদদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা না করে সবচেয়ে বড় ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে সরকার। আর আহতদের পুনর্বাসনেও সরকারের গড়িমসি স্পষ্ট।
আন্দোলনের সেই বিভীষিকাময় স্মৃতি এবং আগামীর বাংলাদেশ কেমন হওয়া উচিত ও নারীদের রাজনীতিসহ সামগ্রিক বিষয়ে বাংলা ট্রিবিউনের সঙ্গে কথা বলেছেন তিনি।
বাংলা ট্রিবিউন: জুলাই আন্দোলনে সম্পৃক্ত হলেন কোন প্রেক্ষাপটে?
মনিরা শারমিন: আসলে নিজে সরাসরি কোনও ছাত্র রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলাম না। তবে শিক্ষার্থীদের ন্যায্য অধিকারের পক্ষে সব সময়ই সক্রিয় ছিলাম। আর জুলাই আন্দোলনে সম্পৃক্ত হয়েছি ২০১৮ সালের কোটা সংস্কার আন্দোলনের ধারাবাহিকতায়। মূলত বিবেকের তাড়নায়। কারণ একটি দেশের ১০০ জনের মধ্যে ৫৬ জনের নিয়োগ কোটার মাধ্যমে হচ্ছে। বিষয়টি আমার কাছে চরম বৈষম্য মনে হয়েছে। তাই এ নিয়ে শিক্ষার্থীদের দাবির সঙ্গে একাত্মতা পোষণ করেছি।
বাংলা ট্রিবিউন: অনেকে বলছেন কোটা সংস্কার আন্দোলনের আড়ালে সরকার পতনের পরিকল্পনা ছিল?
মনিরা শারমিন: বিগত ফ্যাসিবাদ ঢাবিতে যে ট্যাগিংয়ের রাজনীতি করেছে, সাধারণ শিক্ষার্থীরা তা স্বাভাবিকভাবে নিতে পারেনি। এছাড়া ভোটাধিকার হরণ, গুম-খুন ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে সরকারবিরোধী একটি মনোভাব তৈরি হয়। আর কোটা সংস্কার আন্দোলনে ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দলমত-নির্বিশেষে সবাই রাজপথে নেমে আসে। তবে ১৬ জুলাই রংপুরে আবু সাঈদ শহীদ হওয়ার পর থেকেই মূলত আমরা আর ঘরে বসে থাকতে পারিনি। এছাড়া বিভিন্ন প্রান্তে যখন শিক্ষার্থী, শ্রমিক, রিকশাচালক, এমনকি শিশুদের নির্মম হত্যার দৃশ্য দেখতে পাই, তখন আমরা নিজের জীবন বাজি রেখে সরকার পতনে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হই। এরই ধারাবাহিকতায় এক দফা আন্দোলনে শেখ হাসিনা পালিয়ে যেতে বাধ্য হন।
বাংলা ট্রিবিউন: জুলাই অভ্যুত্থানের তো এক বছর পূর্ণ হলো। এই সময়ের প্রাপ্তি ও অপ্রাপ্তি কী?
মনিরা শারমিন: আসলে আমরা চেয়েছিলাম একটি বৈষম্যহীন ও স্বাধীন মতামত প্রকাশের পরিবেশ। এ দুটি কিছুটা বাস্তবায়িত হয়েছে। এখন আর কোটা প্রথা নেই বললেই চলে। যে সাত শতাংশ আছে, তা স্বাভাবিক। আর মত প্রকাশের ক্ষেত্রেও কিছুটা স্বাধীনতা পেয়েছে মানুষ। আগের সরকারের আমলে একটি ফেসবুক পোস্ট দিতে একাধিকবার ভাবতে হতো। সরকারের বিপক্ষে একটি শব্দ লিখলেও হয়রানি করা হতো। অথচ বর্তমান অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে যে যার মতো স্বাধীন মতামত ব্যক্ত করতে পারছেন। এর বাইরেও দৃশ্যমান অনেক সাফল্যের কথা বলা যাবে। এগুলো যেমন ইতিবাচক দিক, তেমনই কিছু হতাশার দিকও রয়েছে। যে শহীদদের রক্তের বিনিময়ে আমরা নতুন বাংলাদেশ পেলাম, সেই শহীদদের একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা করতে পারেনি এ সরকার। আমি বলবো, এটা সরকারে চরম ব্যর্থতা। এছাড়া শহীদদের পরিবার এবং আহতদের পুনর্বাসনেও চোখে পড়ার মতো কোনও উদ্যোগ নেই। এর বাইরে সরকারের উচ্চ পর্যায়ে কিছু সমন্বয়হীনতা রয়েছে, যা অবশ্যই দুঃখজনক।
বাংলা ট্রিবিউন: জুলাই অভ্যুত্থানের সময় যে মজবুত ঐক্য ছিলে, এখন সেটার কিছুটা ব্যত্যয় ঘটেছে বলে মনে করেন?
মনিরা শারমিনের সাক্ষাৎকার নিচ্ছেন বাংলা ট্রিবিউনের রিপোর্টার মহসীন কবির
মনিরা শারমিন: বলতে দ্বিধা নেই, ফ্যাসিবাদ তাড়ানোর এই এক বছরে আমাদের মজলুমদের ঐক্যে কিছুটা ফাটল ধরেছে। সবাই নিজেদের ক্রেডিটবাজিতে ব্যস্ত। শহীদদের স্বপ্ন বাস্তবায়নের পরিবর্তে দলীয় এজেন্ডাকে প্রতিষ্ঠায় মরিয়া। যার বাস্তব দৃষ্টান্ত দেখা গেছে— জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের বৈঠকে। সেখানে শহীদদের আকাঙ্ক্ষার রাষ্ট্র বিনির্মাণের পরিবর্তে দলীয় আদর্শ প্রতিষ্ঠায় নিজেরা বিভেদে জড়িয়ে পড়েছে রাজনৈতিক দলগুলো। যা শহীদদের আত্মার কষ্টকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে বলে আমি মনে করি।
বাংলা ট্রিবিউন: ফ্যাসিবাদবিরোধীদের অনৈক্য পরাজিত শক্তিকে আবারও ডেকে আনবে বলে মনে করেন?
মনিরা শারমিন: আমি এমনটি মনে করি না। কারণ বিগত স্বৈরাচারের আমলে আমরা সবাই নিষ্পেষিত ছিলাম। সে সময় কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে রাজপথে নেমেছি। এখন হয়তো কিছু মতাদর্শগত ভিন্নতা আছে। তবে খুনি ও ফ্যাসিবাদী শক্তি মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে চাইলে, সবাই আবার ঘুরে দাঁড়াবে বলে আমার বিশ্বাস। তাই দেশের স্বার্থে নিজেদের মধ্যে কাদা ছোড়াছুড়ি বন্ধ করা জরুরি।
বাংলা ট্রিবিউন: একজন নারী হিসেবে রাজনীতিতে এসে কোনও চ্যালেঞ্জ দেখছেন?
মনিরা শারমিন: আমি হয়তো বলিষ্ঠভাবে ছাত্র রাজনীতি করিনি। তবে রাজনৈতিক চেতনাকে লালন করেছি সব সময়। বিভিন্ন আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় জাতীয় রাজনীতিতে পদার্পণ করেছি। চাকরি, সংসার অথবা সন্তান সামলিয়েও অনেক নারীকে রাজনীতিতে সময় দিতে হয়। আরও রয়েছে পারিপার্শ্বিক দৃষ্টিভঙ্গি। এসব বিবেচনায় অনেক সময় এ পথ চ্যালেঞ্জিং। তাই বলে ঘরে বসে থাকার সুযোগ নেই। কারণ, পৃথিবীর অগ্রগতিতে নারীদের অবদান শেষ করা যাবে না। আর আমাদের দেশের বাস্তবতায় ১৯৭১ থেকে ২০২৪ প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনেই নারীদের ভূমিকা ছিল গৌরবজনক। তাই আমি ব্যক্তিগতভাবে দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে রাজনীতি সচেতন করার জন্য একটি প্ল্যাটফর্ম নিয়ে কাজ করছি। সেটার নাম ’উঠানের রাজনীতি’। এর মাধ্যমে দেশের প্রান্তিক লেভেলের নারীদের রাজনীতির বিষয়ে আগ্রহী করার চেষ্টা করছি। তাদের বোঝাতে চাচ্ছি— একটি ভোটের কত মূল্য। ইতোমধ্যে চাঁপাইনবাবগঞ্জ, আমার নিজ জেলা নওগাঁ ও মৌলভীবাজারের শ্রীমঙ্গলসহ কয়েকটি জেলায় এ ধরনের আয়োজনে নারীদের পাশাপাশি পুরুষরাও এসেছেন। আমি মনে করি, ধীরে নারীরা আরও সচেতন হবে এবং চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করেই টিকে থাকবেন।
বাংলা ট্রিবিউন: জুলাই অভ্যুত্থানের এক বছরে রাষ্ট্র ও রাজনৈতিক দলগুলোর কাছে প্রত্যাশা কী?
মনিরা শারমিন: জুলাই অভ্যুত্থানের বর্ষপূর্তিতে রাষ্ট্রের কাছে প্রত্যাশা অবিলম্বে শহীদদের একটি পূর্ণাঙ্গ তালিকা প্রকাশ করতে হবে। তাদের পরিবার ও আহতদের পুনর্বাসন করতে হবে। কারণ তাদের রক্তের ওপরই এই সরকার দাঁড়িয়ে রয়েছে। আর রাজনৈতিক দলগুলোকে বলবো, নিজেরা কৃতিত্ব না নিয়ে জুলাই অভ্যুত্থানের সব কৃতিত্ব শহীদ ও আহতদের দিন। তাহলেই একটি নতুন বাংলাদেশের পথে আমরা একধাপ এগিয়ে যেতে পারবো। আগামীতে একটি বৈষম্যহীন বাংলাদেশ চাই।
















