লন্ডনের গ্রীষ্মে হৃদয়স্পর্শী শুভেচ্ছা: শুক্রবার, ১৩ জুন ২০২৫, লন্ডনের আকাশ যেন ছিল অন্যরকম এক রৌদ্রোজ্জ্বল। তাপমাত্রা ২৯ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছুঁয়েছিল, যা এই শহরের জন্য বিরল এক উষ্ণতা। সকালের সূর্য যখন রাস্তায় পড়ছিলো সোনালি আভা হয়ে, তখন ডরচেস্টার হোটেলের সামনে স্বতঃস্পুর্তভাবে জড়ো হয়েছিলেন যুক্তরাজ্য বিএনপি, জোনাল কমিটি, অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মী, কমিউনিটির সর্বস্তরের প্রবাসীসহ কয়েক হাজার ব্রিটিশ-বাংলাদেশি। তাদের মুখে চিরাচরিত কোনো স্লোগান ছিল না, ছিল না কোনো উত্তেজনা—শুধু গভীর প্রতীক্ষা আর একটুখানি আশা। সবাই অপেক্ষায় ছিলেন তারেক রহমানকে স্বাগত জানানোর জন্য।

লন্ডনের পার্ক লেনের হোটেল ডোরচেস্টারের উজ্জ্বল আলোকছায়ায় শুধু একটি রাজনৈতিক বৈঠক ছিল না—তা ছিল বাংলাদেশের ভবিষ্যতের সম্ভাবনার প্রতিচ্ছবি। যে দু’জন ব্যক্তিত্ব সেদিন মুখোমুখি হলেন—তাঁদের একজন অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টা, নোবেল শান্তি পুরস্কারজয়ী, বিশ্বের সম্মানিত অর্থনীতিবিদ ড. মুহাম্মদ ইউনূস, অপরজন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় রাজনীতিক তারেক রহমান, যিনি নির্বাসিত থেকেও বাংলাদেশের রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে অবিচল থেকে দিকনির্দেশনা দিয়ে যাচ্ছেন তাঁর দল ও জনগণকে। এছাড়াও তারেক রহমান —দেশান্তরে থাকা এক সংগ্রামী নেতার প্রতিকৃতি, যিনি শিগগিরই হয়তো নতুন যুগের রাষ্ট্রনায়ক হয়ে উঠবেন।

যখন প্রফেসর ড. ইউনূস স্বয়ং রুম থেকে বেরিয়ে এসে অভ্যর্থনা জানান তারেক রহমানকে, সে মুহূর্ত যেন সময়কে থামিয়ে দিল। ক্যামেরার ঝলকানি, রিপোর্টারদের ভিড়, ফ্ল্যাশ আর ফিসফাসের মধ্যেও সেখানে নেমে এসেছিল এক নিঃশব্দ সম্মান। ডান হাতে করমর্দন করলেন ড. ইউনূস, কিন্তু একবারে থেমে থাকেননি, দুইবার বাম হাত তুলে তারেক রহমানের ডান হাতে রাখলেন। এই মৃদু সংস্পর্শে ছিল স্নেহ, ছিল অভিভাবকত্ব, ছিল এক বিশেষ বার্তা: “আমি আছি, তুমি একা নও।” সেই মুহূর্তটি আমাদের চোখে শুধু রাজনৈতিক সাহচর্যের প্রতীক ছিল না; তা ছিল এক অভিজাত, সজ্জন, রাষ্ট্রভাবনার পরিপক্ক রূপ, যেখানে দলীয় স্বার্থের ঊর্ধ্বে উঠে দেশ ও মানুষের ভবিষ্যৎকে প্রাধান্য দেয়া হয়।

এই বৈঠকে ছিল না বিরোধী পক্ষকে তাচ্ছিল্য করার ভাষা। ছিল না “ক্ষমতায় আসতেই হবে” বা “আমরাই একমাত্র পথ”—এই চেনা রাজনৈতিক ধ্বনি। ছিল তারেক রহমানের হৃদয়ছোঁয়া সূচনা, ”আপনি কেমন আছেন?” –উত্তরে ড. ইউনূস “এই চলছে কোনরকম, টেনেটুনে!”
এই সংক্ষিপ্ত সংলাপটুকু হয়তো আজকের শিরোনাম নয়, কিন্তু যে আবেগ, যে আত্মিক সম্পর্ক এই কথার পেছনে কাজ করেছে, তা বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে বিরল। তারেক রহমান যখন বললেন, “আম্মা আপনাকে সালাম জানিয়েছেন।” ড. ইউনূসের জবাব ছিল সরল কিন্তু প্রগাঢ়: “উনাকেও আমার সালাম দিবেন।” এই কথোপকথনের প্রতিটি শব্দ যেন ছিল মানবিকতার জ্যামিতিক প্রকাশ। এখানে কোনো স্ক্রিপ্ট লেখা ছিল না, কোনো পিআর টিমের সাজানো সংলাপ ছিল না। ছিল মন থেকে উঠে আসা সংবেদন, ছিল স্বকালের ক্লান্ত রাষ্ট্রব্যবস্থার বাইরে গড়া এক মানবিক পরিসর।
তারেক রহমানের প্রশ্ন ছিল পরিপূর্ণ শ্রদ্ধার, আর ড. ইউনূসের উত্তর ছিল অভিজ্ঞতার মাধুর্যে মোড়ানো। দুজনের আচরণ ছিল রাষ্ট্রনায়কসুলভ—নির্মল, সৌম্য ও সুনীতির প্রতিচ্ছবি।
যেখানে রাজনীতি মানে অভিযোগ, দোষারোপ আর পেছনে টানার খেলা, সেখানে এই সংলাপ এক নতুন রাজনৈতিক সৌজন্যের সংজ্ঞা রচনা করল।
একটি ভবিষ্যতের প্রতিশ্রুতি:
তারেক রহমান জানেন, বাংলাদেশের মানুষ আজ ক্লান্ত — গুম-খুন, দুর্নীতি, দমন-পীড়ন আর গণতন্ত্রহীনতা আর ভোটাধিকার বঞ্চিত । তিনি জানেন, ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য নয়, দেশকে বাঁচানোর জন্য নেতৃত্ব প্রয়োজন। নেতৃত্ব, যেখানে সংলাপের স্থান থাকবে সংঘাতের চেয়ে বেশি; যেখানে একটি করমর্দনের মধ্যে থাকবে একটি জাতির পুনরুজ্জীবনের আকাঙ্ক্ষা। এই বৈঠকে তা-ই হলো। ভবিষ্যতের নির্বাচন, সংস্কার ও বিচারব্যবস্থার প্রয়োজনীয় অগ্রগতি, এসব নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা হলো। যৌথ বিবৃতিতে বলা হলো—রমজানের আগেই নির্বাচন সম্ভব, যদি প্রস্তুতি সম্পূর্ণ হয়। এটা শুধু সময়সূচি নয়, একটি আত্মবিশ্বাসের প্রকাশ: আমরা প্রস্তুত, যদি নীতিনিষ্ঠ নেতৃত্ব পাই।
আজকের তারেক রহমান আর কেবল জিয়া-খালেদার সন্তান নন, তিনি এই প্রজন্মের রাজনৈতিক প্রতিভূ। ২০০৭-এর পর থেকে রাজনৈতিক নিপীড়ন, মামলা, প্রবাস—সবকিছু পেরিয়ে তিনি এখন সংযত, প্রজ্ঞাবান ও সমঝোতার কণ্ঠস্বর। তিনি জানেন, সহনশীল রাজনীতিই আগামীর পথে সবচেয়ে কার্যকর হাতিয়ার।
“আম্মা আপনাকে সালাম জানিয়েছেন।”—এ কথাটি শুধু সৌজন্য নয়। এটি ছিল একটি পরিণত শিষ্টাচারের প্রতিচ্ছবি। যেখানে রাষ্ট্রনায়ক হবার দৌড়ে থাকা কেউ রাজনৈতিক ভুমিকা নয়, ব্যক্তিগত সম্পর্কের আভিজাত্য দিয়ে শুরু করেন কথোপকথন। সেটাই দেখায় তার মানবিক দৃষ্টিভঙ্গি। যে কণ্ঠে এমন কোমলতা থাকে, যে হৃদয়ে এমন শিষ্টাচার থাকে, সে মন রাষ্ট্র পরিচালনায় দম্ভ নয়, দায়িত্ব দেখাবে। এই ছোট্ট বাক্যে উঠে এসেছিল দেশপ্রেম, পারিবারিক শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক মূল্যের সম্মিলন।
দেশের জনগণ রাজনৈতিক বিভাজনের অনেক বেদনা দেখেছে । যখন তারেক রহমান, ড. ইউনূসের মতো একজন ব্যক্তিত্বের সঙ্গে এমন সৌজন্যতার দৃষ্টান্ত রাখেন, তখন আশা জাগে। মনে হয়, হ্যাঁ, নেতৃত্ব যদি এমন হয়, তবে বাংলাদেশ বদলাতে পারে। আজকের বাংলাদেশে নতুন রাজনীতির যে ভাষা দরকার, তার এক ঝলক দেখা গেলো লন্ডনের বৈঠকে। আমরা অনেকেই রাজনীতির বোদ্ধা নই, হয়তো রাজনীতিও ততোটা বুঝি না। কিন্তু মা বুঝি, ঘর বুঝি, বাংলাদেশ বুঝি। এই দেশ যেন আর বিভক্ত না হয়, হিংস্র না হয়, সেই স্বপ্ন দেখি।
লন্ডনের সেই সকালটা বাংলাদেশের জন্য এক সন্ধিক্ষণ রচনা করলো । তাদের করমর্দনে লুকিয়ে ছিল একটি জাতির সম্ভাবনা। সেই দৃশ্য প্রমাণ করে, আমাদের রাজনীতি এখনও সুস্থ হতে পারে, মানুষ ও মূল্যবোধের ওপর দাঁড়িয়ে আবার গড়ে উঠতে পারে নতুন বাংলাদেশ।
এই করমর্দন শুধু দুই হাতের নয়, এটি ছিল দুই দৃষ্টিভঙ্গির মেলবন্ধন—যার মধ্যে লুকিয়ে আছে বাংলাদেশের নতুন ভোরের সম্ভাবনা।
জনগণের আশা ও আলোর ইঙ্গিত:
বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে কিছু মুহূর্ত থাকে যা কেবল সময়ের নয়, জাতির ভবিষ্যতেরও দিকনির্দেশক হয়ে ওঠে। ঠিক তেমনই একটি মুহূর্ত উপহার দিয়েছে লন্ডনের ডোরচেস্টার হোটেলে অনুষ্ঠিত বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও ড. মুহাম্মদ ইউনূসের রুদ্ধদ্বার বৈঠক। রাজনৈতিক উত্তাপ, অনিশ্চয়তা ও দ্বিধা-দ্বন্দ্বে জর্জরিত বাংলাদেশ যখন একটি সুষ্ঠূ নির্বাচনের স্বপ্ন দেখছে, তখন এই বৈঠক যেন আশার দীপ্ত আলো হয়ে ধরা দিয়েছে জনগণের হৃদয়ে। দুই নেতার এই সাক্ষাৎ ছিল কেবল একটি কূটনৈতিক শিষ্টাচার নয়, বরং ছিল একটি গভীর রাষ্ট্রচিন্তার প্রতিফলন। দুই ভিন্ন পরিসরের নেতার মধ্যে ঘটে যাওয়া দেড় ঘণ্টার এই আলোচনায় উঠে এসেছে নির্বাচন, সংস্কার এবং ন্যায়বিচারের মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ প্রসঙ্গ—যা আগামী দিনের রাষ্ট্র নির্মাণে অনিবার্য।
তারেক রহমান এই বৈঠকে দলের পক্ষ থেকে যে প্রস্তাবনা দিয়েছেন—২০২৬ সালের রমজানের আগেই একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন—তা শুধুমাত্র রাজনৈতিক সমঝোতার প্রস্তাব নয়, এটি একটি রাষ্ট্রনায়কোচিত দায়িত্ববোধের বহিঃপ্রকাশ। একজন পরিপক্ব, দায়িত্বশীল ও গণতন্ত্রপ্রিয় নেতার মতোই তিনি দেখিয়েছেন, নির্বাচন নিয়ে নয়, বরং দেশের ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁর ভাবনা কতটা গভীর। তিনি শুধু বিএনপির অবস্থান উপস্থাপন করেননি, বরং বাংলাদেশের গণতন্ত্রকে স্থিতিশীল করতে একটি যৌক্তিক সময়রেখা দিয়েছেন। তাঁর এই প্রস্তাবে সম্মতি দিয়েছেন অধ্যাপক ইউনূস নিজেও, যা এই বৈঠককে এক ঐতিহাসিক মোড় ঘোরানোর সম্ভাবনার দ্বারপ্রান্তে দাঁড় করিয়েছে।
বৈঠকের পরে যেভাবে বিএনপি এবং সরকারের দায়িত্বশীলরা একসাথে যৌথ সংবাদ সম্মেলনে অংশগ্রহণ করেছেন, তা শুধু সৌহার্দ্যপূর্ণ পরিবেশ নয়, বরং একটি দায়িত্বশীল রাজনৈতিক সংস্কৃতির ইঙ্গিত দেয়। তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি যে, কোনো সংঘাত নয়, বরং সমঝোতা ও যুক্তির পথে হাঁটতে চায়—এই বৈঠক তার উজ্জ্বল প্রমাণ।
একজন নেতার ভবিষ্যৎ মূল্যায়ন হয় তার দূরদৃষ্টি, সংযম, রাষ্ট্রীয় সংকট মোকাবেলার দক্ষতা এবং জাতীয় ঐক্যের প্রতি দায়বদ্ধতায়। এই বৈঠক প্রমাণ করেছে, তারেক রহমান কেবল রাজনীতিবিদ নন—তিনি ভবিষ্যতের একজন সম্ভাবনাময় রাষ্ট্রনায়ক, যিনি সংবেদনশীল সময়েও রাষ্ট্রকে স্থিতিশীলতার দিকে এগিয়ে নিতে পারেন।
বাংলাদেশ আজ সংকটে। একদিকে রাজনৈতিক উত্তেজনা, অন্যদিকে ভূ-রাজনীতির টানাপোড়েন ও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জ। এই প্রেক্ষাপটে একজন দায়িত্ববান নেতা যেমন সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন, তেমনই নিরপেক্ষ ও শান্তিপূর্ণ উপায়ে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের প্রস্তাব দিয়েছেন তারেক রহমান। তাঁর এই অবস্থান দেশের মানুষকে আশা দিয়েছে—বিশ্বাস জন্মেছে, আবারও বাংলাদেশ গণতন্ত্রের পথে হাঁটবে।
তাই সহজেই বলা যায়, এটি শুধু একটি বৈঠক ছিল না, ছিল একটি নতুন সম্ভাবনার উন্মোচন। তারেক রহমানের নেতৃত্বগুণ আজ দেখিয়ে দিয়েছে—বাংলাদেশের রাজনীতিতে তিনিই হতে পারেন ভবিষ্যতের স্থিতিশীলতা ও উন্নয়নের প্রতীক। এই সংলাপ রাজনীতিতে একটি নতুন মাত্রা যোগ করেছে, যেখানে দলীয় অবস্থান নয়, বরং রাষ্ট্রের বৃহত্তর স্বার্থই মুখ্য হয়ে উঠেছে।
উপসংহার:
তারেক রহমানের নেতৃত্বে বিএনপি আজ কেবল সরকারের গঠনমূলক বিরোধিতা করছে না—তারা ভবিষ্যতের জন্য রূপরেখা দিচ্ছে। লন্ডনের এই ঐতিহাসিক বৈঠক সেই রূপরেখার প্রথম ধাপ হতে পারে, যদি তা আন্তরিকতা ও জাতীয় স্বার্থে বাস্তবায়ন করা হয়। একজন রাষ্ট্রনায়কের দায়িত্ব সময়ের স্রোতের বিপরীতে গিয়েও দেশকে সঠিক পথ দেখানো—তারেক রহমান আজ সেই পথে হাঁটছেন। আর এই পথই আমাদের গণতন্ত্র ও জাতীয় ঐক্যের নতুন সূর্যোদয়ের প্রতীক হয়ে উঠবে।
ড. এম মুজিবুর রহমান
লেখক: সংবাদ বিশ্লেষক, সাবেক সহকারী অধ্যাপক, শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট।















