ব্যারিস্টার মোহাম্মদ আব্দুস শহিদ : “তোমার সামনে যে বিপদ অপেক্ষা করছে, তুমি সম্ভবত তার জন্য মোটেও প্রস্তুত নও।” মিশেল এর কথা শুনে তার দিকে প্রশ্ন ছুড়ে দিলাম : আমার জন্য বিপদ? সেটা কিরকম? আকাশ পথে ভ্রমনের পুরোটাই তো আর আনন্দের নয়। দীর্ঘ ভ্রমন হলে ২/৪ ঘন্টা পরই ধীরে ধীরে বিরক্তি ধরে। আমার অন্তত সেরকমটাই হয়। এদিকে মিশেল কথা বলতে শুরু করে আর যেন থামতে চাচ্ছিলো না। আমেরিকান এয়ার লাইন্সের এই প্লেনটি অল্প কিছুক্ষনের মধ্যেই নিউজার্সি এয়ারপোর্টে ল্যান্ড করবে। অবতরণের কাছাকাছি এমন সময়ে এই মেয়ে কথার ঝুড়ি খুলে বসেছে যেন। সমস্ত পথ তো সে ঘুমিয়েই এলো।
গত ৬ ঘন্টা আকাশ পথে পুরোটা সময় মিশেল আমার পাশের সিটে ঘুমিয়ে ছিল । আকাশ ভ্রমনে দূর্ঘটনা এতোই কম যে অগ্রাহ্য করলে অতিরঞ্জিত হবেনা। কিন্তু অনেকেই আকাশ যানে ভ্রমন করতে অস্বস্থি বোধ করে বা ভয় পায়। কেউ কেউ আবার নিদ্রাকর্ষক পানীয় বা ঘুমের অষুধ খেয়ে সমস্ত পথ ঘুমিয়ে কাটায়। মিশেল দু:খ্য প্রকাশ করে বললো সে ঘুমের বড়ি খেয়ে গত ছয় ঘন্টা ঘুমিয়েছে তাই তার ব্যবহারের কারনে বা বসার তার উপর নিয়ন্ত্রন থেকে না থাকলে ভুলগুলো মাফ করতে বললো। লন্ডনের হিথরো বিমান বন্দর থেকে আমেরিকার নিউজার্সি যাচ্ছিলাম ২৫ শে ডিসেম্বর ২০১৬।
লন্ডন টাইম সকাল ১০ টায় আমাদের ফ্লাইট। আমাদের গন্তব্য লন্ডন থেকে নিউজার্সি এবং নিউজার্সি থেকে ওড়িগন প্রদেশের পোর্টল্যান্ড এয়ারপোর্টে । এই যাত্রায় আমার বড় বোনের দুই ছেলেও আমার সাথে আমেরিকা ঘুরতে যাচ্ছে। আগের রাত ক্রিস্টমাস ইভ থাকায় ঘুমাতে গিয়েছি অনেক রাতে। ভেবেছিলাম বিমানে ঘুমাবো। কিন্তু সে আশার গুড়ে বালি। আকাশ পথে ভ্রমন আমার মোটেই পছন্দের না। আকাশের উপর দীর্ঘসময় থাকতে আমার কেমন যেন ভয় লাগে। তার উপর আগের রাতে দেরীতে ঘুমাতে যাবার কারনে সকাল ছয়টার জায়গায় বড় বোনের ডাকে ঘুম ভেঙেছে সকাল সাতটায়।
ঘুম থেকে উঠে কিছুটা কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পরেছিলাম। সকাল ৭টায় আমার এয়ারপোর্টে পৌছবার কথা। যাত্রার ন্যূনতম ৩ঘন্টা আগে বিমানবন্দরে পৌছতে হয়, এটাই সাধারণ নিয়ম। যাই হোক, লাগেজটা গুছিয়ে নিয়ে। পাসপোর্ট-টিকেট হাতে তড়িঘড়ি বেড়িয়ে পড়লাম। ইংল্যান্ডে বড়দিনের ছুটিতে যখন বেশীরভাগ মানুষ ঘরবন্দী । বাইরে কনকনে ঠান্ডা। চারিদিকে সাদা তুষারের স্তুপ। আমার বড় ভাগনা ড্রাইভ করে আমাদেরকে হিথরো এয়ারপোর্টে পৌছে দিল। গাড়ি শূণ্য রাস্তা। ট্রাফিকজ্যামের বালাই নেই। মনে হলো আহা লন্ডনের রাস্তা-ঘাট যদি সবসময় এরকম থাকতো। হিথ্রো বিমান বন্দর আমার বাড়ি থেকে মাত্র ৫২ মাইল দূরে। রাস্তায় কোন ট্রাফিক জ্যাম না থাকলে এক ঘন্টায় অনায়াসে পৌছে যাওয়া যায়।
ট্রাফিক জ্যাম থাকলে অবশ্য দুই ঘন্টা নিয়ে টান দেয়। জীবনের কত যে মূল্যবান সময় আমরা ট্রাফিকজ্যামে আটকে পার করি তার হিসেব মেলানো ভার। মনে পড়লো আমার এক বন্ধুর কথা , কথা প্রসঙ্গে সে বলছিল ঢাকায় নাকি নয়া পল্টন থেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত যেতে প্রায় ৩ ঘন্টা লেগে যায়। লন্ডন পৃথিবীর অন্যতম উন্নত একটি দেশের রাজধানী হওয়া সত্বেও যানজট ঢাকার চাইতে কোন অংশে কম না। আন্ডারগ্রাউন্ড ট্রেন বা পাতাল রেল না থাকলে এই শহরের ট্রাফিকজ্যাম যে কী পরিমান হতো সেটা ভাবেলেই ভয় লাগে।
যাই হোক, সময়ের অনেক আগেই বিমান বন্দরে পৌছে গেলাম। ইচ্ছে ছিল সেলফ চেক ইন করে সহজেই অটোমেটিক ব্যারিয়ার অতিক্রম করে ভেতরে ঢুকে যাবো। কিন্তু হায় ! গেইট পার হবার সময় ব্যাং ব্যাং শব্দ করে উঠলো সয়ংক্রিয় ডিটেকটর! শুধু আমার বেলায় না আমার দুই ভাগনাও আটকে গেলো প্রবেশ রোধক বেস্টনীতে।
অন্য যাত্রীরা সহজেই পার হয়ে যাচ্ছে। কিছুতেই বুঝতে পারছিলাম না কেবল আমাদের বেলায়ই কেন এই অঘটন! এখন কি হবে? আমাদের কি তাহলে আমেরিকা যাওয়া হবেনা! কয়েকদিন আগে এক বন্ধু ভয় ঢুকিয়ে দিয়েছিল এই বলে যে, মুসলমানদের জন্য যুক্তরাস্ট্র ভ্রমন এখন আর আগের মতো সহজ নয় । একটু বুঝে-শুনে যেও! ডিজিটাল ব্যারিয়ার কি শুধু বেছে বেছে মুসলিম নাম ধারীদেরই আটকে দিচ্ছে ? নাকি অন্য ধর্মাবলম্বীরাও আমাদের মতো ভূক্তভোগি? বুকে আমেরিকান এয়ার লাইন্সের ব্যাজ লাগানো দুজন কর্মকর্তা আমাদের কাছে এসে বললেন : দু:খিত, প্লেনে উঠার আগে আপনাদের দেহ তল্লাশী করতে হবে। আমি জানতে চাইলাম, এটা কি শুধু বিশেষ ভাবে আমাদের জন্যই? এক অফিসার জানালেন : কোন প্রশ্ন করা যাবেনা! মনে পড়লো আমার ছোট ভাইয়ের কথা, যার আমন্ত্রনে আমাদের এই মার্কিন মুল্লুক ভ্রমন। সে আগে-ভাগেই বলে রেখেছিল আসবার সময় এয়ারপোর্টে কিছু অবাস্তবিক এবং অবাঞ্চিত পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হবে হয়তো। এই সময় ঠোঁটে ঠোঁট চেপে মুখ বন্ধ করে রাখতে হবে।
যদিনা তোমাকে কিছু খেতে হয়। ভাইয়ের কথা মনে হতেই বোবার মতো চুপ করে রইলাম এবং স্বেচ্ছায় শরীর তল্লাশীর জন্য প্রস্তুত হয়ে গেলাম। কিভাবে তল্লাশী হলো, কতোটুকু তল্লাশী হলো এখানে তার বর্ণনা দেওয়া সম্ভব নয়। প্রিয় পাঠক, আপনারা শুধু চোখ বন্ধ করে দৃশ্যটি আপনাদের মতো করে কল্পনা করতে পারেন। আমার এই লেখার শিরোনাম হয়তো আপনাদের ইঙ্গিত করছে – একটি ভ্রমন কাহিনী এবং অভিজ্ঞতা লিখতে গিয়ে তো আমি পুরো নীতির সমালোচনা করতে পারিনা অথবা করবোও না। এখানে শুধু এতটুকু বলে রাখি, আমার জীবন চলার পথের অভিজ্ঞতা থেকে একটি সহজ সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পেরেছি যে, উক্ত অভিজ্ঞতা সহজে বলা যাবেনা – অথবা বললেও হয়তো পুরোটা বুঝানো যাবেনা।
কারন অভিজ্ঞতাটা অর্জনের বিষয়, এটা প্রকাশ করা সহজ নয়। শেষ করেও হবেনা শেষ। কবি অথবা চিত্রশিল্পীরাই পারেন তাদের অভিজ্ঞতা পুরোপুরি প্রকাশ করতে। তারা নিজেরা তাদের কাজ নিয়ে এতটাই পরিতৃপ্ত হন যে তারা তৃপ্তি সহকারে মনে করেন – পুরো অভিজ্ঞতাটা নির্ভজাল ভাষায় তুলে ধরতে পেরেছেন। বাস্তবে অল্পসংখ্যক লোকই তাদের ভাষা বুঝতে পারে। কিন্তু যেটা সত্য তা হলো – প্রত্যেকেই সে তার নিজের মতো করেই বুঝে নেয়।
সেক্ষেত্রে কেউই ঠকেনা। আমি তো চিত্রশিল্পীও নই , কবিও নই! যাই হোক, শেষ পর্যন্ত দেহ তল্লাশী শেষ করে বিমান ছাড়ার মাত্র ৫ মিনিট আগে প্লেনে উঠে নিজেকে দু:স্বপ্ন থেকে সদ্য বাস্তবে ফিরে আসা একজন বলে মনে হচ্ছিল। প্লেনের সিটে বসেই উদ্বিগ্ন পরিবারের সদস্যদেরকে এসএমএস পাঠালাম: ”আমরা শেষ পর্যন্ত আমেরিকা যাচ্ছি ! “ মহাকাশটা কতো বিশাল , কতো প্রসস্ত! কোথায় যে এর শেষ হয়েছে কে জানে! দুচোখ মেঘের সমুদ্র সাঁতরাতে সাঁতরাতে অনেকদূর পর্যন্ত গিয়ে এক জায়গায় থেমে থাকে। অসীম আকাশ যেনো থেমে নেই। সীমিত গন্ডি শুধু মানুষের। সৃষ্টিকর্তা মানুষের চোখ দুটিকে যদি আরো দূর দেখার জ্যোতি দিতেন তাহলে হয়তো এই আকাশে ভেসে ভেসে দেখতে পেতাম এর প্রান্তিকের সৌন্দর্য।
আগেই বলেছি আকাশ ভ্রমনে একটি ভয় সবার মধ্যেই থাকে, আর তা হলো আকাশ যানটি যদি যান্ত্রিক গোলোযোগের কারনে দূর্ঘটনায় পতিত হয়। সবাই জানি তাহলে আর প্রানে বাঁচার আশা নেই। আমার মধ্যেও এই ভয় প্রচন্ড রকম কাজ করছিল। প্লেন প্রচন্ড টারবুলেন্সের মধ্যে চলার সময় আমার মধ্যে এই ভয়টি আরো প্রকট হয়ে ওঠে। বাস্তবে ১৯০৩ সালে উড়োজাহাজ আবিস্কারের পর থেকে স্থল পথের যানবাহনের তুলনায় প্লেন অনেক কম দূর্ঘটনা কবলিত হয়েছে।
আমরা সৃস্টিকর্তার দেওয়া নির্ধারিত জীবনের প্রতিটি মুহূর্ত অতিক্রম করছি। এটা আমার দৃঢ় বিশ্বাস যে , আমাদের বেঁচে থাকা একটি দূর্ঘটনা, বরং পৃথিবী ছেড়ে চলে যাওয়াটাই বাস্তব। এর সুদৃঢ় প্রমান হলো চোখের সামনে আমার বাবা এবং আত্নীয়-স্বজন , বন্ধু-বান্ধবদের অনেকেই আজ দুনিয়াতে বেঁচে নেই। ফিরে আসি আমার পাশের সিটে বসা মেয়েটির প্রসঙ্গে। মিশেল ওর নাম। যার সাথে আমার কথা হচ্ছিলো। গত ৬ ঘন্টা সে ঘুমিয়ে কাটিয়েছে। ঘুম থেকে জেগেই সে বললো: I took a sleeping pill as i don’t like plane journey. সম্ভবত তার মনেও ভয় ছিল যে যদি প্লেন দূর্ঘটনায় পতিত হয় তাহলে আর উপায় নাই। একটু হেসে বললাম: প্লেন এক্সিডেন্ট হলে তো যারা ঘুমিয়ে থাকবে তারা বাঁচার চেষ্টাও করতে পারবে না। শুনে সে’ও হাসলো।
মিশেল অমেরিকার নাগরিক। বয়স হবে ২৬ থেকে ২৮ এর মধ্যে। ব্যবসার কাজে প্রায়ই তাকে একা একা লন্ডন- প্যারিস- ফ্রানকফুট আসা – যাওয়া করতে হয়। এবার জরুরী মিটিং থাকায় ক্রিস্টমাস ইভ পর্যন্ত লন্ডনে থেকে ক্রিস্টমাস ডে দেশে ফিরে যাচ্ছে। কথা প্রসঙ্গে মিশেল বললো : তোমাকে কিন্ত নিউজার্সি এয়ারপোর্টে কঠিন সিকিউরিটি চেক এর সম্মুখিন হতে হবে। আমার হিথ্রোতে একবার সিকিউরিটি চেক হয়েছে শুনে বললো : নিউজার্সি তে আবারও হবে। ইদানিং আমেরিকার বিভিন্ন বিমান বন্দরে প্রবেশকালে মুসলমানদের কঠিন সব প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হচ্ছে।
বেশ লজ্জ্বিত হয়ে মিশেল বললো: দূর্ভাগ্যবশত এটাই এখন আমার দেশের স্বাভাবিক নিয়মে পরিণত হয়েছে।
আমি জানতে চাইলাম এটা কেনো হচ্ছে ? মিশেল আমার প্রশ্নের উত্তর এড়িয়ে গিয়ে বললো : মানুষের প্রতি মানুষের ঘৃণা পৃথিবীটাকে বিভাজিত করে রেখেছে। তার দৃষ্টিতে – পৃথিবীর সব মানুষ যদি এক ধর্মে বিশ্বাস করতো তাহলেও পৃথিবীতে শান্তি আসতো না । তখন দেখা দিতো শ্রেনী বিভাজন, বর্ণ বিভাজন। প্রতিটি মানুষ সমান নয়। কারো কাছে অর্থ আছে , কারো কাছে নেই। কারো প্রতিপত্তি আছে আবার কেউ কেউ প্রতিপত্তিহীন। ভোগ করার আনন্দ ত্যাগ করা সহজ বিষয় নয়। বিত্ত আর পতিপত্তি একটি অন্যটির সাথে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। প্রথমটি পাওয়ার পর মানুষ দ্বিতীয়টি পাওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে ওঠে। কিন্তু দ্বিতীয়টি তো সহজলভ্য নয় এর জন্য জনসমর্থন খুবই আবশ্যক।
চলবে
barrshahid@gmail.com















