স্বাধীনতার ঘোষক শহীদ জিয়া, জাতি রাষ্ট্র গঠনে আজো প্রেরণা

    203

    ড. এম মুজিবুর রহমান: এক: ১৯৭২ সালের ২৬ মার্চ ‘বার্থ অব অ্যা নেশন’ (‘একটি জাতির জন্ম’) শীর্ষক একটি নিবন্ধ শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের স্বাক্ষরসহ শেখ মুজিবুর রহমানের জীবদ্দশায় প্রথম তৎকালীন দৈনিক বাংলা পত্রিকায় এবং পরবর্তীতে ১৯৭৪ সালে সাপ্তাহিক বিচিত্রার স্বাধীনতা দিবস সংখ্যায় পুণঃপ্রকাশিত হয়। যেখানে শহীদ জিয়া লিখেছিলেন, ‘স্কুল জীবন থেকেই পাকিস্তানিদের দৃষ্টিভঙ্গির অস্বচ্ছতা আমার মনকে পীড়া দিতো। আমি জানতাম, অন্তর দিয়ে ওরা আমাদের ঘৃণা করে। স্কুল জীবনেই বহুদিনই শুনেছি আমার স্কুল বন্ধুদের আলোচনা। ….বাঙালিদের বিরুদ্ধে একটা ঘৃণার বীজ উপ্ত করে দেওয়া হতো স্কুল ছাত্রদের শিশু মনেই। …..সেই স্কুল জীবন থেকেই মনে মনে আমার একটা আকাঙ্খাই লালিত হতো, যদি কখনো দিন আসে, তাহলে এই পাকিস্তানিদের অস্তিত্বেই আমি আঘাত হানবো। স্বযত্নে এই ভাবনাটিকে আমি লালন করতাম। আমি বড় হলাম। সময়ের সাথে সাথে আমার কিশোর মনের ভাবনাটাও পরিণত হলো। জোরদার হলো। পাকিস্তানি পশুদের বিরুদ্ধে অস্ত্র ধরার, দূর্বারতম আকাঙ্খা দূর্বার হয়ে উঠতো মাঝে মাঝেই। উদগ্র কামনা জাগতো পাকিস্তানের ভিত্তি ভূমিটাকে তছনছ করে দিতে। কিন্তু উপযুক্ত সময় আর উপযুক্ত স্থানের অপেক্ষায় দমন করতাম সেই আকাঙ্খাকে।’

    তিনি আরও লিখেছেন, ‘আমি টেলিফোনে সবার সাথে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও তাদের ধরতে পারিনি, তাই টেলিফোন অপারেটরের মাধ্যমে বার্তা পাঠানোর চেষ্টা করি। সময় খুবই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। আমি ব্যাটালিয়নের অফিসার, জুনিয়র কমিশন্ড অফিসার এবং সৈন্যদের ডাকি। আমি তাদের উদ্দেশে ভাষণ দেই। তারা সবকিছু জানত। সংক্ষেপে আমি সবকিছু বলি এবং যুদ্ধের নির্দেশ দেই। তারা সবাই সর্বসম্মতভাবে আমার আদেশ পালন করতে রাজি হয়। আমি একটি সামরিক পরিকল্পনা তৈরি করি।’

    ‘এটি ছিল ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ, রাত ২:১৫ মিনিট। বাঙালির হৃদয়ে রক্তাক্ষরে লেখা একটি দিন। বাংলাদেশের মানুষ চিরদিন এই দিনকে স্মরণ করবে। তারা ভালোবেসে এই দিনটিকে মনে রাখবে। তারা কখনো দিনটিকে ভুলবে না। ক-খ-ন-ও না।’

    উপরের নিবন্ধ থেকে লক্ষ্য করা যায় শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান সুযোগের অপেক্ষায় ছিলেন। যারা বলেন তিনি হঠাৎ কিভাবে আসলেন, তাদেরকে স্মরণে রাখা উচিত তিনি পাকিস্থানের সার্বভৌমত্ব রক্ষার শপৎ নিয়ে মিলিটারিতে যোগদান করেন। কিন্তু যখন বাংলাদেশের স্বাধীনতার প্রেক্ষাপট তৈরী হলো এবং তৎকালীন আওয়ামী লীগ প্রধান শেখ মুজিবুর রহমান দ্বায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলেন। তখন ‘উই রিভোল্ট’ বলে প্রথম বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিলেন তৎকালীন মেজর জিয়া। বিদ্রোহ ঘোষণা করার পর তিনি আর পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ‘মেজর’ না, হয়ে উঠলেন দিক নির্দেশনাবিহীন জাতির স্বাধীনতা যুদ্ধের ত্রাতা।

    ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে পাকিস্তান সরকারের বিরুদ্ধে ‘উই রিভোল্ট’ বলে প্রথম বিদ্রোহ ঘোষণা করেছিলেন মেজর জিয়া। শুধু বিদ্রোহ ঘোষণাই করেননি, নিজে অস্থায়ী রাষ্ট্রপ্রধানের দ্বায়িত্ব নিয়ে স্বাধীনতা যুদ্ধের ঐতিহাসিক ঘোষণাটিও পাঠ করেছিলেন তিনি ।

    এখানে উল্লেখ্য আন্দোলন সংগ্রামের মাধ্যমে স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্টা ও আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায়ের জন্য কয়েকটি উপাদান অপরিহার্য। ১) একটি নির্দিষ্ট ভূ খন্ড ২) স্বাধীনতার ঘোষণা ৩) একজন নেতা ও ৪) একটি সরকার। পশ্চিম পাকিস্তান থেকে আমাদের একটি পৃথক ভূখণ্ডের নিশানা ইতিমধ্যে ছিল। তাই জিয়াউর রহমান অত্যন্ত বিচক্ষনতার সাথে আনুষ্ঠানিকভাবে স্বাধীনতা যুদ্ধ শুরু করার জন্য যৌক্তিকভাবে নিজে অস্থায়ী রাষ্ট্রপ্রধানের দ্বায়িত্ব নিয়ে স্বাধীনতার ঘোষণাটি নিজের হাতে লিখে পাঠ করেন ।

    বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের দলিলপত্র, তৃতীয় খণ্ডে বর্ণিত জিয়ার স্বাধীনতার ঘোষণাটি এভাবে উল্লেখ আছে।
    “Dear fellow freedom fighters, I, Major Ziaur Rahman, Provisional President and Commander-in-Chief of Liberation Army do hereby proclaim independence of Bangladesh and appeal for joining our liberation struggle, Bangladesh is independent. We have waged war for liberation war with whatever we have. We will have to fight and liberate the country from occupation of Pakistan Army. In Sha Allah, victory is ours.

    সেই দুঃসময়ে বাংলাদেশের মানুষ ছিল দিশেহারা, দিকনির্দেশনাহীন। ঠিক ঐ সময়ে মেজর জিয়ার প্রত্যয়দীপ্ত বলিষ্ঠ কণ্ঠের ঘোষণা ছিল তুর্যধ্বনির মতো। প্রথম ঘোষণায় তিনি নিজেকে বাংলাদেশের প্রভিশনাল প্রেসিডেন্ট উল্লেখ করে স্বাধীনতার ঘোষণাটি পাঠ করেছিলেন। তাঁর এ ঘোষণা ১৯৭১ সালের ২৮ মার্চ ভারতের ‘দি স্টেটসম্যান’ পত্রিকায় প্রকাশিত হয়।

    প্রবাসী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদের রাজনৈতিক সচিব মঈদুল হাসান তরফদার লিখেন, ‘২৭ মার্চ সন্ধ্যায় ৮-ইবির বিদ্রোহী নেতা মেজর জিয়াউর রহমান বাংলাদেশকে স্বাধীন ঘোষণা করেন। মেজর জিয়া তার প্রথম বেতার বক্তৃতায় নিজেকে ’রাষ্ট্রপ্রধান’ হিসেবে ঘোষণা করলেও পরদিন স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের পরামর্শক্রমে তিনি শেখ মুজিবের নির্দেশে মুক্তিযুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার কথা প্রকাশ করেন।’ (মূলধারা : ৭১, পৃষ্ঠা ৫)। এখানে উল্লেখযোগ্য যে, মেজর জিয়া শেখ মুজিবের নির্দেশে যুদ্ধে অবতীর্ণ হওয়ার কথা বললেও নিজেকে রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে আগেকার ঘোষণা সংশোধন করেননি।

    মেজর রফিক-উল-ইসলাম বীর উত্তম, মুক্তিযুদ্ধের এক নম্বর সেক্টর কমান্ডার (১১ জুন থেকে ১৬ ডিসেম্বর ১৯৭১) তার লেখা A Tale of millions গ্রন্থের ১০৫-১০৬ পৃষ্ঠায় লিখেছেন : ২৭ মার্চের বিকালে তিনি (মেজর জিয়া) আসেন মদনাঘাটে এবং স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। প্রথমে তিনি নিজেকে রাষ্ট্রপ্রধানরূপে ঘোষণা করেন। পরে তিনি শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন। কেন তিনি মত পরিবর্তন করেন তার ব্যাখ্যাও দিয়েছেন মেজর রফিক-উল ইসলাম। একজন সামরিক কর্মকর্তা নিজেকে রাষ্টপ্রধানরূপে ঘোষণা দিলে এই আন্দোলনের রাজনৈতিক চরিত্র (polical character of the movement ) ক্ষতিগ্রস্থ হতে পারে এবং স্বাধীনতার জন্য এই গণ-অভ্যুত্থান সামরিক অভ্যুত্থান রূপে চিত্রিত হতে পারে, এই ভাবনায় মেজর জিয়া পুনরায় ঘোষনা দেন শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে। এই ঘোষণা শোনা যায় ২৮ মার্চ থেকে ৩০ মার্চ পর্যন্ত। (RafiO-ul-Islam, A Tale of millions, Dhaka. BBI, ১৯৮১)।

    ৩ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার মেজর কে এম সফিউলস্নাহ বীরউত্তম, তাঁর Bangladesh at war (Dhaka Academy Publishers, 1989) গ্রন্থে , ৪৩-৪৫ পৃষ্ঠায় যা লিখেছেন: মেজর জিয়া ২৫ মার্চের রাতে পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর বিরুদ্ধে সদলবলে বিদ্রোহ ঘোষণা করেন, তার কমান্ডিং অফিসার জানজুয়া ও অন্যদের প্রথমে গ্রেফতার এবং পরে হত্যা করে, পাকিস্তান বাহিনীর বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। পরে ২৬ মার্চে তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর মোকাবিলার জন্য সবাইকে আহ্বান করেন। এই ঘোষণায় তিনি নিজেকে রাষ্ট্রপ্রধানরূপে ঘোষণা করেন।

    মেজর কে এম সফিউল্লাহ আরো লিখেন, জিয়াউর রহমান তার ঘোষণায় আরো বলেন, ‘আমরা বিড়াল-কুকুরের মতো মরব না, বরং বাংলা মায়ের যোগ্য সন্তানরূপে (স্বাধীনতার জন্য) প্রাণ দেব। ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্ট, ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস এবং গোটা পুলিশ বাহিনী চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, সিলেট, যশোর, বরিশাল, খুলনায় অবস্থিত পশ্চিম পাকিস্তানি সৈনিকদের ঘিরে ফেলেছে। ভয়ঙ্কর যুদ্ধ অব্যাহত রয়েছে। মেজর সফিউল্লাহর মতে, এই ঘোষণা দেশে এবং বিদেশে স্বাধীনতা সংগ্রামীদের উদ্দীপ্ত করে। যারা ব্যক্তিগত ও বিচ্ছিন্নভাবে যুদ্ধে রত ছিলেন এই ঘোষণা তাদের নৈতিক বল ও সাহসকে বহুগুণ বাড়িয়েছে। অন্যরাও এই যুদ্ধে শামিল হন।

    মুক্তিযোদ্ধা মেজর জেনারেল সুবিদ আলী ভূঁইয়া লিখেছেন, জিয়াউর রহমান নিজেকে অস্থায়ী রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবেই স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন। কিন্তু পরে আরেকটি ঘোষণা দেন যে, এটা শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষ থেকে। এছাড়াও ড. আজিজুর রহমান, এম আর সিদ্দিকী, মেজর (অব.) রফিকুল ইসলাম এবং অন্য আরো অনেকেই তাদের লিখিত বক্তব্যে বলেছেন, জিয়া প্রথম দিনের ভাষণে অস্থায়ী রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে ঘোষণা করেন।

    লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রধান কর্নেল অলি আহমদ, বীর বিক্রম, অক্সফোর্ড ব্রুকস বিশ্ববিদ্যালয়ে তাঁর পিএইচডি অভিসন্দর্ভের অনুবাদ গ্রন্থে রাষ্ট্র বিপ্লব: সামরিক বাহিনীর সদস্যবৃন্দ এবং বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ (ঢাকা, অন্বেষা প্রকাশন, ২০০৮) বলেছেন, মেজর জিয়া ছিলেন আমাদের নেতা এবং বাংলাদেশের প্রথম অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি (মুখবন্ধ)। সেই ঐতিহাসিক ঘোষণার সময় তিনি মেজর জিয়ার সঙ্গেই ছিলেন।
    জিয়া একাত্তরের ২৬ মার্চ রাত ৭টা ৪৫ মিনিটে চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে প্রথম স্বাধীনতার ঘোষণা দেন। চট্টগ্রাম বন্দরে নোঙ্গররত অবস্থায় একটি জাপানি জাহাজ থেকে অস্ট্রেলিয়া রেডিওতে জিয়ার ঘোষণার বার্তাটি পাঠানো হয়। অস্ট্রেলিয়া রেডিও জিয়ার ঘোষণাটি প্রথম প্রচার করে। এরপর বিবিসিতে প্রচারিত হওয়ার পর তা পর্যায়ক্রমে ছড়িয়ে পড়ে গোটা বিশ্বে।

    স্বাধীনতার ঘোষণা নিয়ে মুক্তিযুদ্ধ গবেষণা কেন্দ্রের প্রকাশিত ‘মুক্তিযুদ্ধের পূর্বাপর’ গ্রন্থে দেয়া সাক্ষাত্কারে বীর মুক্তিযোদ্ধা মুক্তিযুদ্ধের উপ-প্রধান সেনাপতি এয়ার ভাইস মার্শাল (অব.) এ কে খন্দকার বলেন, মেজর জিয়া কালুরঘাট বেতার কেন্দ্রে এসে প্রথম যে ঘোষণাটি দিলেন, সে ঘোষণায় তিনি নিজেকেই বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি হিসেবে ঘোষণা করেছিলেন।

    স্বাধীনতার ঘোষণা পত্রে বলা হয় পরবর্তী সংবিধান প্রণয়ন না হওয়া পর্যন্ত শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট হিসেবে থাকবেন। বঙ্গভবনের তথ্য অনুসারে শেখ মুজিবুর রহমানের প্রেসিডেন্টের মেয়াদের শুরু দেখানো হয়েছে ১৯৭১ সালের ১০ এপ্রিল। স্বাধীনতার ঘোষণা দেয়া হলো ২৬ মার্চ। যদিও আওয়ামী লীগের তৎকালীন নেতৃত্বের ব্যর্থতা ঢাকতে ২৬ মার্চ থেকে ১০ এপ্রিল পর্যন্ত স্বাধীনতার ঘোষণাপত্রে রেট্রসপেক্টিভ ইফেক্ট দিয়ে শেখ মুজিবুর রহমানকে প্রেসিডেন্ট দেখানো হয়েছে। বলা হয়ে থাকে এই ঘোষণাপত্রের উপর ভিত্তি করেই ২৬ মার্চ থেকে রেট্রসপেক্টিভ ইফেক্ট দিয়ে শেখ মুজিবুর রহমানকে প্রেসিডেন্ট দেখানো হয়েছে। এতে করে মহান মুক্তিযুদ্ধে শেখ মুজিবুর রহমানের একটা কৃত্রিম আবহ তৈরির ব্যর্থ চেষ্টা চালানো হয়েছে এতোকাল ।

    তাই ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ থেকে কৃত্রিমভাবে রেট্রসপেক্টিভ ইফেক্ট দিয়ে কাউকে প্রেসিডেন্ট বানাতে গেলে তখন পুরো মুক্তিযুদ্ধকেই প্রশ্নের মুখোমুখি করা হতে পারে। আর এমনিতেই বাংলাদেশ-পাকিস্তানের মধ্যে সংগঠিত স্বাধীনতার সংগ্রামকে ভারত ও পাকিস্তান দুই দেশই তাদের মধ্যকার যুদ্ধ বলে অভিহিত করতে চায়। কয়েক বছর পূর্বে ভারতের গুন্ডে ছবিতে এ নিয়ে যখন বিতর্ক সৃষ্ঠি হয় তখন জুলাই ২৪ গণ অভ্যূত্থানে ক্ষমতাচ্যূত আওয়ামী লীগকে প্রতিবাদ করতে দেখা যায় নাই। এমনকি ভারতের প্রধানমন্ত্রী গত বছর বিজয় দিবসে আমাদের মহান স্বাধীনতা সংগ্রামকে ভারত ও পাকিস্তানের যুদ্ধ বলে অভিহিত করেছেন।

    তাই বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামে আমাদের বিরত্বগাথাকে নিরবিচ্ছিন্ন করতে যুক্তি, বাস্তবতা ও সাংবিধানিকভাবে অস্থায়ী রাষ্ট্রপ্রধান হিসেবে ২৬ মার্চ শহীদ জিয়ার স্বাধীনতার ঘোষণাকে প্রতিষ্টিত করতে পারলে সব বিতর্কের অবসান করা সম্ভব। এর মাধ্যমে অবসান হতে পারে আমাদের মুক্তিযুদ্ধ ও স্বাধীনতা সংগ্রামের বহুল বিতর্কিত অধ্যায়ের। আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে মাথা উঁচু করে শ্রদ্ধা ও গৌরবের সাথে সম্মান জানাতে পারবো স্বাধীনতা যুদ্ধের সকল স্তরের জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তানদের। আর ঐক্যবদ্ধভাবে গণতান্ত্রিক ও কল্যানকামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে বীর শহীদদের পবিত্র রক্তের ঋণের কিছুটা হলেও শোধ করার চেষ্টা করার পাশাপাশি তাদের বিদেহী আত্মা পেতে পারে শান্তি।

    দুই:
    রাজনীতি, অর্থনীতি ও সমাজনীতিতে শহীদ জিয়া বাংলাদেশের জনগনের সামনে তুলে ধরেছিলেন বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের যাদুকরী দর্শন। বাংলাদেশী জাতিয়তাবাদের দর্শন দেশের ধর্ম- বর্ণ- গোত্র- নৃ গোষ্ঠী তথা আপামর সকল মানুষ কে অভিন্ন প্লাটফরমে এনে দাঁড় করিয়েছিল । আমাদের জাতীয় জীবনে আত্মপরিচয়ের যে সংকট সৃষ্টি হয়েছিল- দেশটা কেন? কাদের জন্য? এদেশের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য কী? গন্তব্য কী? স্বপ্ন কী? – এর সব কিছুর উত্তর ও সমাধান তিনি তাঁর রাজনৈতিক দর্শন বাংলাদেশী জাতিয়তাবাদের মধ্যে সংস্থাপন করেন। ফলে বাংলাদেশ বিভেদ ও হানাহানির বাইরে জাতীয় ঐক্য ও সংহতি তৈরির জন্য একটা সুনির্দিষ্ট পাটাতন লাভ করে। শহীদ জিয়ার বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের দর্শনেই আমাদের জাতিসত্ত্বার সঠিক স্বরূপটি আবিস্কৃত হয়, যা আমাদের ভৌগলিক জাতিসত্ত্বার সুনির্দিষ্ট পরিচয় দান করে। বিশ্ব মানচিত্রে আমাদের আত্মপরিচয় উদ্ভাসিত হয়ে উঠে। শহীদ জিয়ার বাংলাদেশী জাতিয়তাবাদের দর্শন আমাদের স্বাধীনতা ও সার্বভৌমত্ব টিকিয়ে রাখারও সাহসী অঙ্গীকার। সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয় শহীদ জিয়ার রাজনৈতিক দর্শন ও দিক-নির্দেশনা। তাঁর প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক দল বিএনপি দেশের স্বাধীনতা পরবর্তীকালে জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে সর্বাধিক সময় রাষ্ট্র ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ছিল।

    ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট তৎকালীন প্রেসিডেন্ট শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে নিহত হওয়ার পর তাঁরই সহকর্মী বাকশাল নেতা খন্দকার মোশতাক আহমদ ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হন। পরবর্তী সময়ে নানা রাজনৈতিক পট-পরিবর্তন ও ঘটনাপ্রবাহের পরিপ্রেক্ষিতে সিপাহী-জনতার ঐক্যবদ্ধ অভ্যুত্থান ঘটে। দেশের সেই চরম ক্রান্তিকালে সিপাহী-জনতার মিলিত প্রয়াসে জিয়াউর রহমান নেতৃত্বের হাল ধরেন। রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয়ে তিনি দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, বাক-ব্যক্তি স্বাধীনতা, সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিশ্চিত করেন। দেশকে অর্থনৈতিকভাবে স্বাবলম্বী করার কার্যকরী উদ্যোগের পাশাপাশি দেশের সার্বভৌমত্বের প্রতীক সেনাবাহিনীতে ফিরিয়ে আনেন শৃঙ্খলা ও ঐক্য। বিশ্ব মানচিত্রে একটি মর্যাদাবান জাতির উত্থানে গোটা জাতির মধ্যে একটি নতুন উদ্দীপনার সৃষ্টি করে তাদেরকে জাগিয়ে তুলতে তিনি সফল হয়েছিলেন। তাঁর স্বল্পকালীন শাসনকার্য পরিচালনায় তিনি যে গভীর দেশপ্রেম, সততা, কর্তব্যনিষ্ঠা ও দূরদর্শিতার পরিচয় দিয়েছিলেন তা আজও কেউ অতিক্রম করতে পারেনি। শুধু দেশে নয়, ইরাক-ইরান যুদ্ধসহ মধ্যপ্রাচ্য ও বিশ্বের নানা সঙ্কটে তিনি অগ্রণী ভূমিকা পালন করেন। এমনকি তার রাজনৈতিক বিরোধীরাও মৃত্যুর পর তাঁর সততা নিয়ে কোনো প্রশ্ন উত্থাপন করতে পারেনি। শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এ কারণেই এ দেশের সর্বস্তরের জনগণের অন্তরে স্থায়ী আসন করে নিয়েছেন।

    বিএনপি’র জনসমর্থন নিয়ে তার নিন্দুকেরাও দ্বিমত পোষণ করবে না। শহীদ জিয়ার জনপ্রিয়তা, মিলিটারি ও সিভিলিয়ানসহ প্রতিটি সেক্টরে তাঁর দূরদর্শী চিন্তা-চেতনা সর্বোপরি তাঁর বিচক্ষণ রাজনীতি চার দশক পরে এসে আরো শাণিত ও যুগোপযোগী হিসেবে সকলের কাছে সমাদৃত। শহীদ জিয়ার শাহাদাতের পর বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া একমাত্র নেত্রী যিনি বাংলাদেশের প্রতিটি নির্বাচনে পাঁচটি করে আসন থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে প্রতিবারই নির্বাচিত হয়েছেন । বাংলাদেশে তৃণমূল রাজনীতির অবিসংবাদিত নেতা ও বাংলাদেশী জাতীয়তাবাদের এ সময়ের অগ্রপথিক তারেক রহমান প্রবাসে থেকেও দলকে যেভাবে সুসংগঠিত ও ঐক্যবদ্ধ রেখেছেন তা বিরল। বিএনপি’র কালজয়ী আদর্শ সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ । সেই ১৯৭৮ সাল থেকে আজ অবধি আপামর মানুষের সমর্থনে এতটুকু চিড় ধরেনি । দু’একটি ব্যতিক্রম ছাড়া নানা ঘাত প্রতিঘাতের মধ্যেও প্রতিটি নেতা কর্মী রয়েছেন অবিচল। তবে রাজনীতি বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, একবিংশ শতকের চ্যালেঞ্জ, আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক আগ্রাসী ও উগ্রবাদী শাসকদের মোকাবেলায় দলে মেধাবী, সাহসী ও চৌকস তরুণদের উৎসাহিত করা দরকার। মেধাহীন, বাকসর্বস্ব রাজনীতির বিপরীতে জ্ঞানভিত্তিক রাষ্ট্র ও সমাজ বিনির্মাণে কার্যকরী উদ্যোগ আজ সময়ের দাবি।

    এখানে উল্লেখ্য, খুব সুচতুরভাবে একটি মিথ প্রচার করা হয় যে, বিএনপি সব সময় এন্টি আওয়ামী লীগ সেন্টিমেন্ট নিয়ে ক্ষমতায় গিয়েছে এবং রাজনীতিতে ঠিকে আছে। অনেকেই ভুলে যান যে, বিএনপি যদি শুধু এন্টি আওয়ামী লীগ সেন্টিমেন্টের উপর ভর করে ঠিকে থাকতো তাহলে বিএনপিকে কপি করে গড়ে উঠা এরশাদ সাহেবের পার্টিও সেই জায়গা দখল করে নিতে পারতো। বিশ্ব রাজনীতি বিশেষ করে মুসলিম গণতান্ত্রিক দেশসমূহের রাজনীতি পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে অর্ধ শতাব্দী পূর্বে ঘোষিত শহীদ জিয়ার রাজনীতি ছিল কতটা বিচক্ষণ ও দূরদৃষ্টিসম্পন্ন । ধর্মীয় মূল্যবোধের প্রতি শ্রদ্ধা রেখে গণতান্ত্রিক কাঠামোর উপর রাজনীতির ভিতকে শক্ত করে দাঁড় করিয়ে একটি আত্মসম্মানবোধসম্পন্ন জাতি গঠনের রাজনীতির প্রবক্তা শহীদ জিয়া। শুধু নেগেটিভ ভোটের উপর দাঁড়িয়ে কোনো দল এতো জনসমর্থন ধরে রাখতে পারে না। তাই বিএনপি’র কালজয়ী আদর্শ বর্তমান বিশ্ব রাজনীতির প্রেক্ষাপটেও অতুলনীয়। তবে সময়ের সাথে রাজনীতির গতি প্রকৃতি পরিবর্তিত হবে এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু রাজনীতির গতি প্রকৃতিকে পরিবর্তনের খাতিরে আপামর জনসাধারণের আকাঙ্খার বিপরীতে যেনো রাজনীতির গতি চলে না যায় সেদিকে খেয়াল রাখা দরকার । নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চল হিসেবে বাংলাদেশের মানুষ কোনো উগ্রপন্থাকে কখনোই সমর্থন করে নাই, আবার অধিকার আদায়ের আন্দোলনে কখনো পরাজিত হয় নাই। শুধু প্রয়োজন সাহস, যোগ্যতা ও দক্ষতার ভিত্তিতে সংগঠিত করে আত্মমর্যাদার লড়াইয়ে জাগ্রত করা।

    তবে মধ্যস্বত্বভোগী নামে একটা গোষ্ঠী যাতে দলে কখনোই মাথা ছাড়া দিতে না পারে তার দিকে খেয়াল রাখা প্রয়োজন । সুশীল, বুদ্ধিবৃত্তিক সর্বোপরি মিডিয়া জগতের সৃষ্টিশীল মানুষ যারা বিএনপি নামক বট গাছে মাঝে মধ্যে একটু পানি ঢালবেন তাদেরকে আস্থায় রেখে উৎসাহিত করা । একটি বৃহৎ দলে বিভিন্ন স্বার্থবাদী, মধ্যস্বত্বভোগী গোষ্ঠী মাথাচাড়া দিয়ে উঠার চেষ্ঠা করতেই পারে। বাককসর্বস্ব ও বাগাড়ম্বর রাজনীতির বিপরীতে কর্মসূচিভিত্তিক, গণমূখী এবং মেধার রাজনীতির বিকাশ জরুরি। দলীয় অভ্যন্তরীণ রাজনীতিকে প্রাতিষ্টানিকরণের মাধ্যমে এদের লাগাম টেনে ধরা সম্ভব বলে মনে করেন অনেকে। আর এতে করেই সম্ভব বর্তমান ভূ-রাজনীতি ও আঞ্চলিক সাম্রাজ্যবাদের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করে আধুনিক ও কল্যাণকামী রাষ্ট্র গঠনের নেতৃত্ব দেয়া।

    আওয়ামী ফ্যাসিবাদী দখলদারী শাসনে প্রিয় মাতৃভূমি বাংলাদেশ নিপতিত ছিল এক গভীর ষড়যন্ত্র ও চক্রান্তের কবলে। মুক্তিযুদ্ধের মূলমন্ত্র, সাম্য-মানবিক মর্যাদা-সামাজিক সুবিচার ছিল সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। দেশে শুধু গণতন্ত্র, ভোটাধিকার, মানবাধিকার কিংবা মানুষের স্বাধীনতাই ভুলুন্ঠিত হয়নি, বাংলাদেশের স্বাধীনতা সাবভৌমত্ব ছিল হুমকির সম্মুখীন। খোদ বাংলাদেশটা নিয়েই যেন ভাগ বাটোয়ারার হাট বসেছিল । এই বেচাকেনার হাটে বিক্রেতার প্রধান ভূমিকায় ছিলেন ভারতে পালিয়ে যাওয়া ফ্যাসিবাদী শাসক লেন্দুপ হাসিনা এবং তার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ ।

    ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধ ও জুলাই ২৪ গণ অভ্যুত্থানসহ গণতন্ত্র ও অধিকার প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে যারা হতাহত হয়েছেন, শহীদি মৃত্যুকে আলিঙ্গন করেছেন, হাত পা চোখ কান হারিয়ে যারা এখনো জীবনযুদ্ধে লড়াই করছেন, সবার প্রতি জানাই অসীম শ্রদ্ধা ভালোবাসা আর অশেষ কৃতজ্ঞতা। আগে যারা আত্মস্বার্থ ত্যাগ করে জাতীয় স্বার্থের জন্য লড়াই করেছেন, তাদের জায়গায় এখন আত্মস্বার্থ কায়েমকারীরা জায়গা করে নিয়েছে। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার সময় আমাদের যে জাতীয় অঙ্গীকারগুলো ছিল তা আজো সুদূর পরাহত। জাতীয় অঙ্গীকার বাস্তবায়নের জন্য ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে শরিক ছাত্র-জনতা, রাজনৈতিক দলসমূহ ও জাতীয় নেতৃবৃন্দের মধ্যে সহনশীলতা ও সহিষ্ণুতা ধরে রাখতে হবে ।

    জুলাই ২৪ এর জন আকাঙ্খা ও মুক্তিযুদ্বের অঙ্গীকার সাম্য, মানবিক মর্যাদা ও সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার মাধ্যমে একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্র ও সমাজ গঠনে প্রয়োজন জনগণের সরকার। এর মাধ্যমে আমরা পেতে পারি একটি মর্যাদাবান দেশের নাগরিকের সম্মান। তাই বাংলাদেশের মর্যাদাবান উত্থানে সকলকে স্ব স্ব স্থানে ভূমিকা রাখা জরুরি। মর্যাদাবান নাগরিকরা উচ্ছিষ্টভোগী হতে চান না, আপন ভাগ্য জয় করবার অধিকার ও সুযোগ চান। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার ৫৪তম বার্ষিকী এবং মহান স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবসে একটি ন্যায়ভিত্তিক সমাজ বিনির্মাণ ও আইনের শাসন প্রতিষ্ঠায় মহান মুক্তিযুদ্ধের অঙ্গীকার ও জুলাই গণ অভ্যুত্থানের জন আকাঙ্খা ধারণ করে এগিয়ে যাওয়া হোক সকলের দৃঢ় প্রত্যয় ।

    লেখকঃ সংবাদ বিশ্লেষক, সাবেক সহকারী অধ্যাপক শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট।
    ২৬ মার্চ ২০২৫, লন্ডন ।