নিউজ ডেস্ক: ১৮৩৩ সালের আগে ব্রিটেনে চা আসতো মূলত চীন থেকে। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এই দায়িত্বে ছিলো। এই বছরে সালে পরিস্থিতি পালটে যায় পুরোপুরি। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি চীন থেকে চা আমদানির একচ্ছত্র অধিকার হারায়। বিকল্প লাভজনক পন্থা হিসাবে ভারতকে বেছে নেওয়া হয়। একটা কমিটি গঠন করা হয় এবং চার্লস ব্রুস নামের এক ভদ্রলোককে দায়িত্ব দেওয়া হয় নার্সারি খোলার জন্য। কমিটির সেক্রেটারিকে চীনে পাঠানো হয় আশি হাজার বীজ নিয়ে আসার জন্য। কারণ, তখন পর্যন্তও তারা নিশ্চিত ছিলেন না যে চা গাছ ভারতেরই নিজস্ব উদ্ভিদ।
এই বীজগুলোকে লাগানো হলো কোলকাতার বোটানিকাল গার্ডেনে। বীজ থেকে চারা বের হলো। সেগুলো যখন একটু শক্তপোক্ত হলো, তখন সেগুলোকে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হলো আসামে।
ওইসব চারা লাগানো হলো সেখানে। আসামে আগে থেকেই দেশিয় চা গাছও ছিলো। কিন্তু, সেগুলোকে কেউ গুরুত্ব দেয়নি তখন। আসামের আবহাওয়া চরম ধরণের। গ্রীস্মকালে চরম গরম, শীতকাল ভয়াবহ ঠাণ্ডা। এই চরম আবহাওয়ার সাথে যুদ্ধে হেরে গেলো চীনের চা গাছের চারাগুলো। ওদের বদলে অবহেলিত দেশি গুলোই ফুলে ফেঁপে উঠতে লাগলো। এর মধ্যে বিপদ হলো আরেকটা। চিনে চা গাছের সাথে দেশিয় গাছের মিশ্রণে তৈরি হয়ে গেলো এক সংকর। এর মান খুবই অনুন্নত।
চাইনিজ চারার এই করুণ দশা দেখে দেশিয় গাছের দিকেই পুরোপুরি মনোযোগ দিলেন চার্লস ব্রুস। আসাম থেকে খাঁটি দেশিয় চা লন্ডনে গেলো ১৮৩৮ সালে। সেই চা সমাদরেই গৃহীত হলো। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি আসামে খবর পাঠালো এই বলে যে, বেশ কিছু গণ্যমান্য লোক এই চা খুবই পছন্দ করেছে।
এর পরই আসামে চা বাগানের হিড়িক পড়ে যায়। বাণিজ্যিকভাবে চা উৎপাদন শুরু হয়ে যায় ব্যাপকভাবে।
চা বাগানতো চালু হলো। এখন সমস্যা দাঁড়ালো কুলি-মজুর জোগাড় করা। আসামের প্রকৃতি সোনা ফলা। কৃষকদের কোনো গরজ নেই চা বাগানে কাজ করার। আর তাছাড়া চা বাগানে কাজ করাটাও বিপদসংকুল এবং শ্রমসাধ্য। এই জঙ্গল-ভূমির চারিদিকে বাঘ, চিতা, হায়েনার আনাগোনা। মাঝে মাঝে কিছু পাহাড়ি জংলী গোত্রের লোকেরাও এসে আক্রমণ চালায় পরম সহিংসতা নিয়ে। এই পরিস্থিতে স্থানীয় শ্রমিক পাওয়া দুরূহ হয়ে দাঁড়ালো।
সিদ্ধান্ত নেওয়া হলো শ্রমিক আনা হবে আসামের বাইরে থেকে। সাহেবরা দালালদের মাধ্যমে ভুলিয়ে ভালিয়ে মূলত বিহারের ছোট নাগপুর থেকে নিয়ে এলো কুলিদের। এর বাইরে উড়িষ্যা, মধ্যপ্রদেশ, অন্ধ্রপ্রদেশ থেকেও আনা হলো তাদের। এখানে আসার পরে তারা টের পেলো যে ভুলিয়ে ভালিয়ে মরণফাঁদে এনে ফেলা হয়েছে তাদের। ফেরার আর কোনো উপায় নেই। চাবুকের নীচে দাসশ্রম দেওয়া ছাড়া আর কোনো উপায় নেই তাদের। এই দাসশ্রম দিতে গিয়ে চরম বৈরি পরিবেশে অকাতরে জীবন দিয়েছে তারা। অন্যের চিত্ত আনন্দময় করার জন্য, অন্যের বিত্ত বৈভব বাড়ানোর জন্য, নিজের নিত্য বলি দিয়েছে তারা। সরকারী হিসাবে থেকেই জানা যায় যে, প্রথম তিনবছরের মধ্যে আসামে যে ৮৪,৯১৫ জন মজুর আমদানী করা হয়েছিলো তার ভিতর ৩১,৮৭৬ জনই অত্যাচার, নির্যাতন, অনাহার, অর্ধাহার আর মরণ ব্যাধির কবলে পড়ে পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছিলো।
এই রক্ত লাল ইতিহাস, এই বর্বরতার চিহ্ন, এই নিষ্ঠুরতার কাহিনি আজো বদলায়নি। ফাঁকি দিয়ে আসামে নিয়ে এসে যে ফাঁদে ফেলা হয়েছিলো দরিদ্র মানুষদের, তাদের বংশধরে একশো আশি বছর পরেও তা থেকে মুক্তি পায়নি। অতি সামান্য মজুরিতে নিজেদের শ্রম বিলোতে হচ্ছে এখনো তাদের। প্রাপ্য মজুরি চাইতে গেলে সইতে হচ্ছে অত্যাচার আর নির্যাতন। এদের জীবনই যেনো হয়েছে অকাতরে বিলিয়ে দিয়ে অন্যকে পুষ্ট করার জন্য।















