সিলেট সংবাদদাতা: আমীরুল খান একজন লেখক ও সাংবাদিক। সিলেটের অনেকেরই সুপ্রিয় বন্ধু, সদা হাস্যজ্জল, বিশিষ্ট সাংবাদিক ও লেখক আমিরুল খান বাংলাদেশ সময় দুপুর ১২-৩০ মিনিটে স্ট্রোক জনিত কারণে আজ নিজ বাসায় ইন্তেকাল করেছেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। মৃত্যুর আগেরদিন তার ফেইসবুকে একটি পোস্ট দেন। যা পড়ে তার বন্ধু-স্বজনসহ অনেকেই এখনো কাঁদছেন। তার মতো মানবিক মানুষগুলো দুনিয়া থেকে দ্রুতই প্রস্থান করেন। তার ফেইসবুক পোস্টটি এখানে হুবহু তুলে ধরা হল।
নিঠুর জীবন!!
====///====
একে তো বারমুখো মানুষ তার উপর লকডাউন। বাসায় থাকতে থাকতে শরীর মনে জং ধরে যায়। তাই রাতের খাবারের পর গভীর রাত অবধি মহল্লা জুড়ে চক্কর! গলীর এমাথা থেকে ওমাথা। আস্তে করে গা ঘেঁষে রিক্সা এসে দাড়ায়।আনমনে বলি ভাই আমি কোথাও যাব না।এমনি এমনি হাটছি! ড্রাইভার সালাম দেয় স্যার ভাল আছেন? ওয়াসালাম!চোখ তুলে খুব পরিচিত কেউ মনে হল না। আমি আপনাকে চিনি! মাঝে কদিন মেইল নিয়ে আপনার অফিসে গেছি। ভাল করে দেখি।আরে ও হ্যা তাইতো! এখন কে নতুন একটা ছেলে আসে। তুমি কি কর? এই তো!রিক্সা দেখাল। প্রথম করোনার ধাক্কায়ই চাকুরী নাই নতুন করে চাকুরী পাওয়া দুষ্কর।তাই এ পেশায়। মিষ্টি হাসি এখনো আছে তবে ম্রিয়মান। কি সুন্দর ফিটফাট চেহারা শরীর ছিল ছেলেটার। উত্তরাঞ্চলের আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলে! সেই সন্ধ্যা রাতে বেরিয়েছি এখন অব্দি যে কজন সোয়ারী পেয়েছি তা দিয়ে বাজার করি ক্যাম্নে।ঘরে মা বৌ বাচ্চারা হয়ত অপেক্ষা করছে..কি করে বাসায় যাই তাই অলিগলিতে ঘুরছি। যদি ভুল করেও কোন সওয়ারী চলে আসে। ওর গলার স্বরে এমন কিছু ছিল যে কেঁপে কেঁপে উঠছি।শরীরের প্রতিটি রোমকূপ জুড়ে ভয়ের তীব্র শীতল স্রোত। আমার সন্তানরা যদি এভাবে উপোস থাকে অপেক্ষা করে!বাবা তুমি কখন আসবে? আর ভাবতে পারছি না।
এই লকডাউনে ছিন্নমূল দরিদ্র মানুষের কত কষ্টের গল্প শুনি দেখি। কিন্তু এভাবে সামনে এসে দাঁড়ায়নি। এক অফিসের বড়কর্তা কথায় কথায় সেদিন বলেছিলেন লকডাউনে যেভাবে হোক অন্তত একসপ্তাহ চলার মত সঙ্গতি নাকি সবার আছে! শুধু শুধু মানুষ ওজর খুজে,লকডাউন না মানার জন্য।খুব করে মন চাইছিল উনাকে ডেকে এনে দেখাই,দেখে যান কেমন আছে ওরা।বড় বড় চাকুরী করেন তাই নিশ্চিত জীবন। সঞ্চয় আপনাদের মানায়।ছেলের জন মেয়ের জন্য নিজের ও স্ত্রীর সুন্দর ভবিষ্যত পরিকল্পনা। যে আয়ে তিনবেলা আধ পেটা খাওয়া যায়না সে এক সপ্তাহের জন্য সঞ্চয় করবে কেমন করে। ওঁরা বাঁচবে কেমন করে। অবস্থা যেমন ই হোক না কেন।ধনী অথবা দরিদ্র।একজন পিতার কাছে তার সন্তান স্ত্রীর জন্য নূন্যতম খাবার দিতে না পারার কষ্ট সমান!
কেমন যেন ঘোরের মধ্যে হাটছি তো হাটছি।এই ছেলেটার কান্নাজড়িত কণ্ঠ হয়ত বহুদিন তাড়িয়ে বেড়াবে। ঠিক জানি না কদিন পর ভুলেও যেতে পারি। চারদিকে এত কষ্টের ছড়াছড়ি এত গল্প।আমার মত খেয়ে পরে মধ্যবিত্তরা কেবল আহা উহু ছাড়া তেমন একটা কিছু করতে পারে না। যারা পারে তারা মঙ্গল চাঁদের দূরত্বে। নাগাল পাওয়া দুষ্কর। কি আশ্চর্য এই দেশের লকডাউন কোন চিন্তাভাবনা পূর্বপরিকল্পনা নাই।পরিকল্পনার বিশাল একটা অংশ বিশেষ শ্রেণী নিয়ে।ওদের যেন ক্ষতি না হয় প্রণোদনা, নতুন ঋণ, কিস্তি মওকুফ,শুল্ক রেয়াত হেনতেন কতকিছু।শুধু করোনা কালীন দু বছরে সরকারের বিভিন্ন খাতে যে সীমাহীন দূর্নীতি লুট হয়েছে তা দিয়ে ইচ্ছে করলে পুরো জনগোষ্ঠীকে খাওয়ানো যেত!ঐ যে একটু আগে বললাম উনারা হচ্ছেন সেই বিশেষায়িত শ্রেণী। কিচ্ছুটি করার বা বলার জো নেই।পুরো দেশের নিঃস্ব অসহায় ছিন্নমূল মানুষ উপোস করতে করতে মরে গেলেও কারো কিছু আসে যায় না!
আমীরুল হোসেন খান
০৫/০৭/২০২১
https://m.facebook.com/story.php?story_fbid=4387821557917642&id=100000695245978















