মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূতকে তলব, রোহিঙ্গা অনুপ্রবেশে চরম উদ্বেগ

626

ঢাকা সংবাদদাতা: মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে নতুন করে সহিংসতার প্রেক্ষিতে সীমানা অতিক্রম করে রোহিঙ্গাদের আবার বাংলাদেশে ঢোকার চেষ্টায় চরম উদ্বেগ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ। আজ শনিবার দুপুরে ঢাকায় নিযুক্ত মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূত (চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স) মিও মিন্ট থানকে তলব করে ‘চরম উদ্বেগের’ কথা জানিয়েছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

ঢাকায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগর বিষয়ক সচিব মাহবুব উজ জামান এ ব্যাপারে রাষ্ট্রদূতের হাতে বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে আনুষ্ঠানিক পত্র তুলে দেন। অনুষ্ঠিত এক বৈঠকে এ উদ্বেগ জানানোর পাশাপাশি মিয়ানমার বিজিপিতে হামলায় নিহতদের ঘটনায় নিন্দা জানিয়েছে বাংলাদেশ।

মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের ওপর হামলা সংক্রান্ত পরিস্থিতি নিয়ে বাংলাদেশের অবস্থান জানাতে বুধবার দুপুরে মিয়ানমারের রাষ্ট্রদূতকে তলব করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। বেলা সোয়া ৩টায় এ বৈঠক শুরু হয়ে ৪টার দিকে তা শেষ হয়।

বৈঠক শেষে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে পাঠানো এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়, আক্রান্ত ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলের নাগরিকদের বিশেষ করে নারী, শিশু ও বয়স্কদের সুরক্ষা ও আশ্রয়ের বিষয়টি নিশ্চিত করতে চ্যার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্সের মাধ্যমে মিয়ানমার সরকারকে অনুরোধ করেছে বাংলাদেশ। সন্ত্রাস মোকাবিলায় বাংলাদেশ মিয়ানমারের পাশে আছে বলেও জানিয়েছেন সচিব মাহবুব উজ জামান।

এদিকে সবশেষ পাওয়া খবরে মিয়ানমারের বর্ডার গার্ড পুলিশ (বিজিপি) সদস্যরা বাংলাদেশ ভূখণ্ড লক্ষ্য করে গুলি ছুড়েছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। আজ শনিবার দুপুর পৌনে ১টার দিকে বান্দরবান-মিয়ানমার সীমান্তের তুমব্রু বিজিপি ক্যাম্প থেকে এই গুলিবর্ষণের ঘটনা ঘটে।

এই ঘটনায় কেউ হতাহত না হলেও এর ফলে সীমান্তে নতুন করে উত্তেজনা দেখা দিয়েছে। দিনদুপুরে বাংলাদেশ ভূখণ্ড লক্ষ্য করে গুলিবর্ষণের ঘটনায় সীমান্ত এলাকার লোকজনের মধ্যে আতঙ্ক দেখা দিয়েছে।

স্থানীয়রা জানিয়েছেন, মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশের দিকে পালিয়ে আসা যেসব রোহিঙ্গা দুই দেশের মধ্যবর্তী শূন্যরেখায় অবস্থান করছে, মূলত তাদের লক্ষ্য করেই গুলি ছোড়ে বিজিপি। তবে বিজিবির ৩৪ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মনজুরুল হাসান খানের দাবি, বাংলাদেশ ভূখণ্ডের দিকে নয়, মিয়ানমারের ভেতরেই গুলি ছোড়ার ঘটনা ঘটেছে।

তবে যে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি মোকাবিলায় বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবির) পক্ষ থেকে সীমান্ত এলাকায় অতিরিক্ত সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।

স্থানীয়রা জানান, মিয়ানমারের তুমব্রু, বুচিডং, ঢেকিবনিয়াসহ বেশ কয়েকটি এলাকায় বিজিপি ক্যাম্পে রোহিঙ্গা বিচ্ছিন্নতাবাদী একটি সংগঠনের হামলার ঘটনার পর সীমান্ত এলাকায় উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে। নারী-শিশুসহ হাজার হাজার রোহিঙ্গা সীমান্তের কাঁটাতারের বেড়া অতিক্রম করে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। গতকাল শুক্রবার দিবাগত রাতে ভারি বৃষ্টিপাত হওয়ার কারণে ঘরবাড়ি ছেড়ে চলে আসা রোহিঙ্গারা সীমান্ত এলাকা থেকে সীমান্তের কাছাকাছি আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছে। এদিকে আজ সকাল থেকে রোহিঙ্গারা আবার সীমান্ত এলাকায় জড়ো হতে শুরু করেছে।

এই রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে প্রবেশ ঠেকাতে স্থানীয় জনগণকে সঙ্গে নিয়ে সীমান্ত এলাকায় কড়া প্রহরা অব্যাহত রেখেছে বিজিবি।

এ পর্যন্ত সীমান্ত এলাকা দিয়ে কোনো রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি বলে জানান বিজিবির ৩৪ ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মনজুরুল হাসান খান। তিনি জানান, সীমান্ত পরিস্থিতি এখন অনেকটা শান্ত।

মিয়ানমার সরকারের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, গত বৃহস্পতিবার রাতে রাখাইন রাজ্যে একসঙ্গে ২৪টি পুলিশ ক্যাম্প ও একটি সেনা আবাসে সন্ত্রাসী হামলার ঘটনা ঘটে।

এরপর ‘সন্ত্রাসীদের’ সঙ্গে দেশটির নিরাপত্তাকর্মীদের সংঘর্ষে মোট ৭১ জন নিহত হয়। এর মধ্যে ১২ জন নিরাপত্তাকর্মী ও ৫৯ জন ‘বাঙালি সন্ত্রাসী’ রয়েছেন বলে গতকাল শুক্রবার মিয়ানমারে রাষ্ট্রীয় পরামর্শদাতার কার্যালয় জানিয়েছে।

বার্তা সংস্থা এএফপি জানায়, ১২ নিরাপত্তাকর্মীকে হত্যা করা হয়েছে। এ ছাড়া ৫৯ জন ‘বাঙালি সন্ত্রাসীর’ লাশ সেখানে পাওয়া গেছে।

এই ঘটনার পর অনেক রোহিঙ্গা প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশের দিকে ছুটে আসছে। শুক্রবার বাংলাদেশে অনুপ্রবেশকালে সীমান্তের বিভিন্ন পয়েন্ট থেকে ১৪৬ জনকে পুশব্যাক করা হয়। অন্তত এক হাজার রোহিঙ্গাকে বাধা দেয় বিজিবি। সীমান্তে বিজিবির পক্ষ থেকে কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে।