যেভাবে জঙ্গি হয়ে উঠল মেজরের ছেলে ইমতিয়াজ অমি

797

ঢাকা সংবাদদাতা: কিভাবে জঙ্গি হয়ে উঠল ইমতিয়াজ আহমেদ অমি? পুলিেশর কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের একজন কর্মকর্তার ভাষ্যে অমির বর্ণনা হুবহু তুলে ধরা হল এখানে।
১ মার্চ ২০১৬। আগে থেকেই কথিত হিজরতের জন্য প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছিল আহমেদ আজওয়াদ ইমতিয়াজ তালকুদার ওরফে অমিকে। নির্দেশনা অনুযায়ী ঘর ছাড়ার প্রস্তুতি নেয় রাজধানীর সানবীম স্কুলের এ-লেভেলের এই শিক্ষার্থী। তার আগে মা-বাবার উদ্দেশে একটি চিঠি লেখে সে। এরপর নিজের মোবাইল ফোনটি ভেঙে ফেলে বাসা থেকে বেরিয়ে যায়। সেই থেকে ৩৭২ দিন জঙ্গি আস্তানায় থাকার পর চলতি বছরের ৭ মার্চ পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয় সে।
বাসা থেকে বের হয়ে অজ্ঞাত এক নেতার নির্দেশে প্রথমে মোহাম্মদপুর যায় অমি। তখন এক ব্যক্তি তাকে কোনোদিকে না তাকিয়ে বাসে উঠতে বলে। মিরপুরের শাহ আলী মার্কেটের সামনে নামে তারা। সেখানে আরেক ব্যক্তির সঙ্গে রিকশায় ওঠে সে। আশেপাশের সড়ক যাতে চিনতে না পারে সেজন্য তার চোখে পড়ানো হয় বিশেষ একটি চশমা। তারপর তারা গিয়ে দাঁড়ায় একটি বাসার সামনে। ভেতরে গিয়ে অমি দেখে সমবয়সী আরও ৫-৬ জনকে। তাকে বলা হয়, নিজের ব্যক্তিগত তথ্য কারও সঙ্গে শেয়ার না করতে। নিজেও যেন কারও সম্পর্কে জানতে না চায়। এরপর তার নতুন নাম দেওয়া হয় ‘হায়দার’।
জঙ্গিবাদে জড়িয়ে ঘর ছাড়া অমি ৩৭২ দিন পর চলতি বছরের ৭ মার্চ কুমিল্লার চান্দিনা এলাকার একটি বাস থেকে পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়। এরপর তাকে অন্তত ছয়টি মামলায় গ্রেফতার দেখিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করে কুমিল্লা, চট্টগ্রাম ও ঢাকার কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিট। জিজ্ঞাসাবাদে সিটিটিসি কর্মকর্তাদের কাছে অমি বিভিন্ন জঙ্গি আস্তানায় থাকার কথা সবিস্তারে জানিয়েছে।
ঢাকার কাউন্টার টেরোরিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার আব্দুল মান্নান বলেন, ‘জিজ্ঞাসাবাদে অমি তার জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়ার পুরোকাহিনী বলেছে। তাকে জিজ্ঞাসাবাদ করে জঙ্গিদের মোটিভেশন প্রক্রিয়ার একটি স্পষ্ট ধারণা পাওয়া গেছে।’

বাবা-মাকে ‘শিক্ষা’ দিতে ঘর ছাড়ে অমি:
সিটিটিসি সূত্র জানায়, অমি জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছে, বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান সে। জন্ম ১৯৯৮ সালের ৬ জানুয়ারি। বাবা মেজর কবির আহমেদ তালুকদার। মায়ের নাম ইয়াসমিন হোসেন। ছোটবেলা থেকেই বাবা-মায়ের যথাযথ মনোযোগ না পাওয়ার অভিযোগ তার। বাবা-মা সারাক্ষণ ঝগড়া করতেন। এক পর্যায়ে অমির বাবা-মা দু’জনই আলাদা থাকা শুরু করেন। বাবা থাকতেন ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় আর মা থাকতেন গুলশানে। অমি নিজে কখনও মায়ের সঙ্গে, আবার কখনও বাবার সঙ্গে থাকতো। বাবা-মা দু’জনেরই খিটখিটে মেজাজের কারণে একা হয়ে পড়ে সে। জিজ্ঞাসাবাদে অমি জানায়, জঙ্গিবাদে তার জড়িয়ে পড়ার নেপথ্যে অন্যতম একটি কারণ হলো, বাবা-মায়ের মনোযোগ না পাওয়া। অমির ভাষ্য, বাবা-মাকে ‘শিক্ষা’ দেওয়ার জন্য সে ঘর ছাড়ে। কিন্তু জঙ্গি আস্তানায় গিয়ে বুঝতে পারে, এখান থেকে ফেরার আর কোনও পথ নেই। কারণ ফিরলেই পুলিশ তাকে ধরবে। এজন্যই আর ফেরা হয়নি তার। বোমা বহন করতে গিয়ে পুলিশের হাতে ধরা পড়ে সে।

যেভাবে জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়ে অমি:

২০১৪ সালের শেষের দিকের কোনও এক সময়। অমি তখন বাবার সঙ্গে ক্যান্টনমেন্ট এলাকায় থাকতো। ক্যান্টনমেন্ট এলাকার একটি মসজিদে নামাজ পড়ার পর পরিচয় হয় এক যুবকের সঙ্গে। সেই তরুণ হলো আশিকুর রহমান জিলানী। ঢাকার মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজির শিক্ষার্থী জিলানীর হাত ধরেই জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়ে অমি।পরবর্তীতে জিলানী আইএসের হয়ে যুদ্ধ করতে সিরিয়া গিয়ে নিহত হয়।

অমির ভাষায়, জিলানীকে তার খুব ভালো লাগে। একারণে বাবাকে বলে জিলানীকে প্রাইভেট টিউটর হিসেবে নিয়োগও দেয়। তারপর টিউশনির ফাঁকে ফাঁকে ইরাক-সিরিয়া-আফগানিস্তানে মুসলিমদের ওপর অত্যাচারের নানা বিষয় নিয়ে অমির সঙ্গে কথা বলে জিলানী। একপর্যায়ে অমিকে জঙ্গিবাদে মোটিভেটেড করে। ২০১৫ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি তুরস্ক হয়ে সিরিয়ায় চলে যায় জিলানী। এরপরও তার যোগাযোগ ছিল অমির সঙ্গে।
জিজ্ঞাসাবাদে অমি জানায়, ২০১৫ সালের ডিসেম্বরে বা ২০১৬ সালের শুরুর দিকে ধানমন্ডি লেক এলাকায় এক ব্যক্তির সঙ্গে দেখা করতে বলা হয় তাকে। সময় নির্ধারণ করা হয় সন্ধ্যা ৬টা। নির্ধারিত সময়ে টি-শার্ট, প্যান্ট ও জ্যাকেট পরা এক তরুণ আসে। সেও প্রায় অমির সমবয়সী। ধানমন্ডি লেকে বসে সেই তরুণের সঙ্গে কথা বলে অমি। তাকে জানানো হয়, মাস খানেক পরে তাকে জানানো হবে সে হিজরত করার জন্য উপযোগী কিনা। গোয়েন্দারা ধারণা করছেন, অজ্ঞাত সেই তরুণ হলো নব্য জেএমবি’র রাশেদ ওরফে র্যা শ। পরবর্তীতে ওই তরুণের নির্দেশনা মতোই ২০১৬ সালের ১ মার্চ ঘর ছাড়ে সে।

বিভিন্ন আস্তানায় ৩৭২ দিন

জঙ্গিবাদে জড়িয়ে পড়ে ঘর ছাড়ার পর ৩৭২ দিন দেশের বিভিন্ন এলাকার বিভিন্ন আস্তানায় ছিল আহমেদ ইমতিয়াজ অমি। ঘর ছাড়ার পর প্রথমে মিরপুরের আস্তানায় আক্বীদা ও মানহাজ বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় তাকে। মিরপুরের ওই আস্তানায় প্রশিক্ষণ শেষে অমিকে আইএসের বিভিন্ন প্রচারপত্র বাংলায় অনুবাদ করার দায়িত্ব দেওয়া হয়। সেসময় নাফিজ নামে এক তরুণের সঙ্গে তার পরিচয় হয়। নাফিজ ছিল ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থী। মিরপুরের ওই আস্তানা থেকে অমি ও নাফিজকে পাঠানো হয় পাবনায়। সেখানে আলম নামে এক তরুণও তাদের সঙ্গে থাকতো। শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ রক্ষা করতো নাফিজ।
অমি গোয়েন্দাদের জানায়, পাবনায় মাসখানেক থাকার পর আলম আস্তানা থেকে পালিয়ে যায়। এরপর নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে শীর্ষ নেতাদের নির্দেশে ওই আস্তানা ছেড়ে অমি ও নাফিজ চলে আসে ঢাকায়। মিরপুরের আরেকটি জঙ্গি আস্তানায় ওঠে তারা। ওই আস্তানায় আকাশ নামে এক জঙ্গি তার স্ত্রীসহ থাকতো। গত বছরের রমজান মাসে গুলশান হামলার দুই জঙ্গি রোহান ও নিবরাস তাদের আস্তানায় গিয়েছিল বলে জানায় অমি। সেখানে কিছুদিন থাকার পর তাদের পাঠানো হয় সিলেটের সুবিদবাজারে। সেখানে বসেই তারা জানতে পারে হলি আর্টিজান বেকারিতে হামলার খবর। সিলেট যাওয়ার পথে অমি নারায়ণগঞ্জে তামিম চৌধুরীর আস্তানায় গিয়েও থাকে কয়েকদিন দিন।
অমি জানায়, সিলেটের আস্তানায় মাহবুব নামে এক ব্যক্তি তাদের সঙ্গে থাকতো। মাহবুব একদিন তাকে ১৫ হাজার টাকা ও একটি মোবাইল দিয়ে পুরো সিলেট ঘুরে দেখতে বলে। এসময় অমি পোস্ট অফিসের মাধ্যমে বাড়িতে একটি চিঠিও পাঠিয়েছিল। তবে নিজের ঠিকানা দেয়নি সে। ওই চিঠিতে সে বাড়ি ফেরার ইচ্ছার কথা জানায়। তবে অমির ভয় ছিল, সে বাড়ি ফিরে গেলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাকে গ্রেফতার করতে পারে।
অমি জানায়, সিলেটে থাকার সময় তাদের ওপর সুনির্দিষ্ট কোনও নির্দেশনা ছিল না। একদিন সিলেট আস্তানার দায়িত্বশীল মাহবুব ও রাশেদ কোথাও বৈঠক করতে যায়। সেখান থেকে ফিরে এসে তাকে চট্টগ্রামে চলে যেতে বলে। চট্টগ্রামের পটিয়ার একটি আস্তানায় গিয়ে ওঠে সে। পটিয়ার আস্তানা থেকে নির্দেশনা অনুযায়ী বিভিন্ন জায়গায় বোমা পৌঁছে দেওয়া ছিল তার কাজ। পটিয়ায় কিছুদিন থাকার পর তাদের আস্তানা বদল করতে বলা হয়। তারপর তারা গিয়ে ওঠে চট্টগ্রামের মীরসরাইয়ে। সেখান থেকে দায়িত্বশীল ফরহাদের নির্দেশনায় সহযোগী হাসানসহ ঢাকায় বোমা নিয়ে যাওয়ার সময় পথে কুমিল্লার চান্দিনায় পুলিশের হাতে ধরা পড়ে সে।
কাউন্টার টেরোরিজম ইউনিটের একজন কর্মকর্তা জানান, তিনি এপর্যন্ত যত জঙ্গিদের জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন, তাদের মধ্যে এই অমি ছিল সবচেয়ে বুদ্ধিমান। তার ব্রেইন খুব শার্প। কোনও বিষয় অল্পতেই বুঝতে পারে। একারণেই নব্য জেএমবি’র শীর্ষ নেতারা তাকে কোনও অপারেশনে না পাঠিয়ে, তাকে দিয়ে বিভিন্ন কাজ করাতো। ধরা না পড়লে এই অমিই একসময় হয়তো নব্য জেএমবি’র শীর্ষ নেতা হয়ে যেত।