ওয়ানবাংলানিউজ ডেস্ক: বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা ও প্রবীন সাংবাদিক ও লেখক, একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি যুক্তরাজ্য শাখার সভাপতি ও যুক্তরাজ্য ওয়াকার্স পার্টির সভাপতি ইসহাক কাজল আর নেই। সোমবার লন্ডন সময় বিকেল ৫.২৫ মিনিটে গ্রেটার লন্ডনের রমফোর্ড কুইন্স হাসপাতালে তাঁর মেয়ে এবং দীর্ঘদিনের সাংবাদিক সহকর্মী সৈয়দ নাহাস পাশার হাতে হাত রেখে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। ইন্না লিল্লাহ ই ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। তাঁর বয়স হয়েছিলো ৭২ বছর। মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী ও ছেলে, মেয়ে, নাতি নাতনী, আত্মীয় স্বজন এবং রাজনৈতিক ও সাংবাদিকতা অঙ্গনের সহকর্মীসহ অসংখ্য গুনগ্রাহী রেখে গেছেন।
প্রবীণ এই সাংবাদিকের মৃত্যুতে কমিউনিটতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে, বিশেষ করে লন্ডন বাংলা প্রেসক্লাব সদস্যদের মধ্যে। ক্লাব সদস্যরা ব্যক্তিগতভাবে বিভিন্ন স্যোশাল মিডিয়ায় মৃত্যু সংবাদ তুলে ধরার পাশাপাশি স্মৃতিচারণ করে মরহুমের সাথে বিভিন্ন সময়ে তুলা ছবি একের পর এক প্রকাশ করছেন।
প্রবীন সংবাদিক ইসহাক কাজল সাংবাদিকতার পাশাপাশি ওয়াকার্স পার্টির সভাপতি হিসেবে কমিউনিটিতে বেশ সোচ্চার ছিলেন। তিনি দেশের সমকালিন রাজনীতি নিয়ে লেখনিসহ সভা সমাবেশে বেশ সোচ্চার ছিলেন। কিন্তু বিগত চার বছরেরও বেশি সময় ক্যানসারের সাথে যুদ্ধের পর অবশেষে মৃত্যুর কাছে হার মানতে বাধ্য হন একাত্তরের রনাঙ্গন কাপাঁনো বীর এই মুক্তিযোদ্ধা।
১৯৪৮ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারী বৃহত্তর সিলেটের মৌলভীবাজার জেলার কমলগন্জ উপজেলার পতনউষা ইউনিয়নের ব্রাম্মনউষার গ্রামে জন্ম গ্রহন করেন ইসহাক কাজল। পতনউষা বালক প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে প্রাথমিক শিক্ষা, নয়াবাজার কৃষ্ণচন্দ্র উচ্চবিদ্যালয় থেকে মাধ্যমিক ও সিলেট মদনমোহন কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক ও স্নাতক ডিগ্রী অর্জন করেন তিনি।
রাজনৈতিক জীবনের সূচনায় ছাত্রলীগের সদস্য থাকাকালীন ১৯৬২ এর শিক্ষা আন্দোলন, ৬৬র ৬দফা ও ৬৯ এর গণঅভ্যুত্থানসহ বাঙালির স্বাধীকার আন্দোলনের প্রতিটি পর্বে অংশ নেন ইসহাক কাজল। ১৯৭১ সালে দেশকে শত্রুমুক্ত করতে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়ে শত্রুর খোঁজে রনাঙ্গনে বিরামহীন সাড়ে নয় মাস অতিবাহিত করেন বীর এই মুক্তিযোদ্ধা। যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে ইসহাক রাজল উপলব্দি করেন, স্বাধীনতা এসেছে কিন্তু শ্রমজীবী মানুষের মুক্তি আসেনি। এ উপলব্দি তাঁকে আবারও মাটি ও মানুষের কাছে নিয়ে যায়। স্বাধীনতার পর তিনি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন।
৭৫ এর ১৫ই আগষ্ট জাতীর জনক বঙ্গবন্ধু হত্যার পর পুলিশী হয়রানীর শিকার হয়ে দীর্ঘদিন আত্মগোপনে থাকতে হয় ইসহাক কাজলকে। পরিনামে শিক্ষকতার চাকুরীটিও হারাতে হয় তাঁকে। পরবর্তীতে শ্রমজীবী মানুষের মুক্তির আকাঙ্কায় ওয়ার্কার্স পার্টিতে যোগ দেন ইসহাক কাজল।
১৯৭৬ সালে ১মাস ৭ দিন কারাবরণ করেন তিনি। এরশাদ বিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দেয়ার কারনেও একাধিক মামলার সম্মুখিন হয়ে দেশত্যাগ করে চার বছর কুয়েতে কাটাতে হয় তাকে। এরপর ২০০০ সালের ২১শে এপ্রিল যুক্তরাজ্যে চলে আসেন ইসহাক কাজল।
প্রবীন মুক্তিযোদ্ধা সাংবাদিক ইসহাক কাজল একজন জনপ্রিয় লেখক ও সাংবাদিক হিসেবেও সুপরিচিত। বাংলা একাডেমী পুরস্কারপ্রাপ্ত এ লেখকের লিখিত ও সম্পাদিত গ্রন্থের সংখ্যা প্রায় ২১টি। সিলেট প্রেস ক্লাব ও লন্ডন বাংলা প্রেস ক্লাব নির্বাহী কমিটিতেও বিভিন্ন সময় দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। ১৯৮৫-৮৬ সালে সিলেট প্রেস ক্লাবের কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য ও পরবর্তীতে লন্ডন বাংলা প্রেস ক্লাবে তিন মেয়াদে নির্বাচিত তথ্য ও গবেষণা এবং এক মেয়াদে প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন তিনি। মৃত্যুর আগ পর্যন্ত ব্রিটেনের প্রাচীনতম বাংলা সাপ্তাহিক জনমতের পলিটিক্যাল এডিটর এবং যুক্তরাজ্য ওয়াকার্স পার্টির সভাপতির দায়িত্ব পালন করছিলেন ইসহাক কাজল। পাশাপাশি যুক্তরাজ্য একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সম্মানিত সভাপতি হিসেবেও ছিলেন অধিষ্ঠিত।















