যুবলীগ শামীমের কত টাকা আছে?

333

ঢাকা সংবাদদাতা: টেন্ডারমুঘল শামীম। টাকা নিয়েই যার কারবার। টাকা দিয়ে জয় করতে চান সবকিছু। টেন্ডার পাওয়া, উর্ধতন কর্মকর্তাদের খুশি করা, মাসে মাসে নেতাদের মাসোহারা দিয়ে নিজের অবৈধ কাজকর্ম নির্বিঘ্নে চালিয়ে নেয়া- সবই টাকার মাধ্যমে সামাল দিতেন তিনি। ইতিমধ্যে সে ব্যাপারে তথ্য-প্রমাণও মিলেছে। তার কাছ থেকে উদ্ধার করা হয়েছে বিপুল পরিমান নগদ টাকা ও ব্যাংকের এফডিআরের নথি। কিন্তু এতো গেলো শুধু প্রকাশিত টাকা-পয়সার হিসাব। আসলে তার কত টাকা আছে? তা এখনও স্পষ্ট নয়। ব্যাংক-ব্যালেন্স, বিদেশ পাচার, স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তির এখনও কোন কূলকিনারা পাওয়া যায়নি। তবে এ ব্যাপারে অনুসন্ধান চলছে।

তার পাহাড়সম অর্থবিত্তের স্পষ্ট অনুমান করা যায় একটি বিষয়ে নজর দিলেই স্পষ্ট হয়ে যায়। খবরে প্রকাশ তিনি টেন্ডার পেতে শুধু দুই কর্মকর্তাকেই ঘুষ দিয়েছিলেন দেড় হাজার কোটি টাকা। এ খবর দিয়েছে, দৈনিক সমকাল। সংশ্লিষ্টদের মতে, একজন মানুষের কত টাকা থাকলে শুধু দুই কর্মকর্তাকেই দেড় হাজার কোটি টাকা ঘুষ দিতে পারেন।

শুক্রবার র‌্যাবের অভিযানে গ্রেপ্তারের পর জিজ্ঞাসাবাদে শামীম এই ঘুষ-বাণিজ্যের কথা স্বীকার করেছেন বলে দায়িত্বশীল সূত্রে জানা গেছে। শনিবার অস্ত্র, মাদক ও মুদ্রা পাচারের দায়ে তিনটি মামলা করা হয় তার বিরুদ্ধে। মামলায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য শনিবার তাকে ১০ দিনের রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ।

সমকালের প্রতিবেদনে বলা হয়, সরকারি বড় বড় প্রকল্পের কাজ বাগিয়ে নিতে শামীম ও সাঙ্গপাঙ্গোরা সংশ্নিষ্ট কর্মকর্তাদের কোটি কোটি টাকা ঘুষ দিতেন। এর মধ্যে দু’জন সাবেক প্রকৌশলীকেই তিনি ঘুষ দিয়েছেন দেড় হাজার কোটি টাকা। কাজ পেতে তিনি গণপূর্ত অধিদপ্তরের সদ্য সাবেক প্রধান প্রকৌশলী রফিকুল ইসলামকে সম্প্রতি ঘুষ হিসেবে দিয়েছেন ১১০০ কোটি টাকা। গণপূর্তের ঢাকা জোনের আরেক সদ্য সাবেক অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী আবদুল হাইকেও ঘুষ দিয়েছেন ৪০০ কোটি টাকা। তিনি জানান, প্রতি টেন্ডারে ৮ থেকে ১০ শতাংশ কমিশন দেয়া লাগতো তার। অনেক সময় নির্দিষ্ট কমিশনের পরও ঘুষ দিতে হতো। লাগামহীন ঘুষ-বাণিজ্যের কারণে কিছু প্রকল্পে তাকে লোকসানের মুখেও পড়তে হয়েছে।

সূত্রমতে, জিজ্ঞাসাবাদে শামীম দাবি করেছেন যে দুই প্রকৌশলী ছাড়াও যুবলীগের অন্তত দু’জন শীর্ষ নেতাকে মোটা অঙ্কের মাসোহারা দিতেন তিনি। অবশ্য কাজ পেতে ওই নেতাদের নাম ভাঙাতে হতো তার। তাদের নাম ভাঙিয়ে সরকারি প্রকল্পের কোটি কোটি টাকার কাজ বাগিয়ে নিতেন তিনি। এছাড়া আরও কয়েকজন বড় সরকারি কর্মকর্তাও শামীমের কমিশনভোগী ছিলেন। তাদের ব্যাপারেও তথ্য নিচ্ছেন গোয়েন্দারা।

আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা জানান, শামীম নিজেই কমিশনের অর্থ বণ্টন করতেন। অধিকাংশ সময় কমিশন হিসেবে নগদ টাকা দিতেন। মাঝেমধ্যে শামীমের দু’জন বিশ্বস্ত সহযোগীর মাধ্যমেও কমিশনের টাকা পৌঁছে দেয়া হতো। শামীম প্রভাবশালী সরকারি কর্মকর্তা ও কিছু নেতাকে ম্যানেজ করেই টেন্ডারমুঘলে পরিণত হতো।

একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানায়, গত বছরের ডিসেম্বরে গণপূর্তের প্রধান প্রকৌশলী রফিকুল ইসলাম অবসরে যান। তিনি দায়িত্বে থাকাকালীন সেখানে একচ্ছত্রভাবে ঠিকাদারি কাজ পেয়েছেন শামীম। তবে রফিকুল অবসরে যাওয়ার পরও গণপূর্তে শামীমের প্রভাব কমেনি। কমিশন দিয়ে তার প্রভাববলয় বজায় রাখেন তিনি। গণপূর্তে এমন কথা প্রচলিত আছে, ঠিকাদারি কাজ বাগিয়ে নিতে নানা দপ্তরে ‘তদবির’ করে রফিকুলকে প্রধান প্রকৌশলী বানিয়েছিলেন শামীম। এ ব্যাপারে বক্তব্য নেয়ার জন্য গণপূর্তের এই সাবেক প্রধান প্রকৌশলীর মোবাইল নম্বরে একাধিকবার ফোন করা হয়। কিন্তু তিনি ফোন রিসিভ করেননি।

জিজ্ঞাসাবাদে শামীম স্বীকার করেন, ঢাকার বাসাবো ও নিকেতনে তার অন্তত পাঁচটি বাড়ি রয়েছে। রাজধানীতে একাধিক ফ্ল্যাট আছে। গ্রামের বাড়ি নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁয় তার বাড়ি রয়েছে।

প্রভাবশালী ঠিকাদার হিসেবে পরিচিত শামীমের প্রতিষ্ঠান সরকারের অন্তত ২২টি বড় প্রকল্পের কাজ করছে। ঠিকাদারি কাজের দুনিয়ায় তিনি ছিলেন অঘোষিত ‘টেন্ডার কিং’। অল্প সময়ে তার বিপুল অর্থের মালিক বনে যাওয়ার বিষয়টি বিস্ময়কর। অভিযানে তার মা আয়শা হকের নামে থাকা ১৪০ কোটি টাকার এফডিআর পাওয়া যায়। ধারণা করা হচ্ছে, এগুলো অবৈধ পথে উপার্জন করা শামীমেরই অর্থ। কারণ তার মা সাধারণ গৃহিণী। তার অন্য কোনো ব্যবসা প্রতিষ্ঠান নেই।

সংশ্নিষ্ট সূত্রমতে, উত্তরার আশকোনায় প্রায় ৪৫০ কোটি টাকায় র‌্যাব সদর দপ্তর, ১৩ কোটি টাকায় পোড়াবাড়ীতে র‌্যাব প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, ৫০০ কোটি টাকায় আগারগাঁওয়ে রাজস্ব ভবন, ১৫০ কোটি টাকায় আগারগাঁওয়ে পঙ্গু হাসপাতালের নতুন ভবন, ৫০ কোটি টাকায় এনজিও ভবন, ১৫০ কোটি টাকায় নিউরোসায়েন্স হাসপাতাল, ১২ কোটি টাকায় পাবলিক সার্ভিস কমিশন, ৩০ কোটি টাকায় বিজ্ঞান জাদুঘর, ১৫০ কোটি টাকায় সচিবালয়ের সম্প্রসারিত ভবন, ১০ কোটি টাকায় বাসাবো বৌদ্ধ মন্দির, ১৫০ কোটি টাকায় হিলট্র্যাক্টস ভবন ও ১৫০ কোটি টাকায় মহাখালী শেখ রাসেল গ্যাস্ট্রোলিভার হাসপাতাল প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে শামীমের প্রতিষ্ঠান। এছাড়াও ঢাকা জেলা পুলিশ সুপারের কার্যালয়, ল্যাবরেটরি মেডিসিন ভবন, শহীদ সোহরাওয়ার্দী হাসপাতাল ও কেবিনেট ভবন নির্মাণসহ বেশ কিছু প্রকল্প চলমান রয়েছে। এসব প্রকল্পের কাজ পেতে মোটা অঙ্কের কমিশন দিয়েছেন শামীম। রূপপুরের কাজে ১০ শতাংশ কমিশন দিয়েছেন।

জানা যায়, গোলাম কিবরিয়া শামীমকে শুক্রবার নিকেতনের অফিস থেকে সাত দেহরক্ষীসহ আটক করে র‌্যাব। নিকেতনের যে অফিস থেকে শামীম র‌্যাবের হাতে ধরা পড়েন তার পুরোটাই আবাসিক এলাকা। আবাসিক ভবনগুলো প্রতিটিই ৬-৭ তলা, একটার সঙ্গে আরেকটা লাগোয়া। শুধু জি কে শামীমের ভবনটি (জি কে বি অ্যান্ড কোম্পানি প্রাইভেট লিমিটেড) চারতলা। ভবনটি থেকে কিছু দূরেই রয়েছে মসজিদ। এই ভবনের অফিসে কখনো সকালে, কখনো দুপুরে এমনকি গভীর রাতেও আসতেন জি কে শামীম। সকাল, দুপুর, বিকাল বা রাত যখনই শামীম নিকেতনে ঢুকতেন টের পেয়ে যেতেন আশপাশের সবাই। তার পাহারায় সবসময় তিনটি মোটরসাইকেলে সাতজন দেহরক্ষী থাকতেন।

শামীমের গাড়ির সঙ্গে থাকতো আরও দুটি কালো রঙের জিপ গাড়ি। সাইরেন বাজাতে বাজাতে রাস্তা দিয়ে গাড়িবহরসহ এগিয়ে যেতেন শামীম। তার গাড়ি গন্তব্যে (অফিসের সামনে) না পৌঁছানো পর্যন্ত রাস্তায় নামতে পারত না অন্য কোনো গাড়ি।