যুক্তরাজ্যের বিমানবাহী রণতরীগুলোকে ‘খেলনা’ বললেন ট্রাম্প

53

ইরান যুদ্ধকে ঘিরে যুক্তরাষ্ট্র ও যুক্তরাজ্যের সম্পর্কের টানাপোড়েন নতুন মাত্রা পেয়েছে। ব্রিটিশ বিমানবাহী রণতরীগুলোকে ‘খেলনা’ বলে কটাক্ষ করেছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। আর তার এই মন্তব্য দুই মিত্র দেশের মধ্যে উত্তেজনা আরও বাড়িয়েছে। একই সঙ্গে যুদ্ধের সময় যুক্তরাজ্যের ভূমিকা নিয়েও তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন মার্কিন রিপাবলিকান এই প্রেসিডেন্ট।

সংবাদমাধ্যম বলছে, যুক্তরাজ্যের দুটি বিমানবাহী রণতরীকে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ‘খেলনা’ বলে উল্লেখ করেছেন এবং বলেছেন, ইরানের বিরুদ্ধে যুদ্ধে এগুলোর কোনও প্রয়োজন নেই। মন্ত্রিসভার বৈঠকে বক্তব্য দিতে গিয়ে তিনি ব্রিটিশ নৌবাহিনীর এইচএমএস কুইন এলিজাবেথ ও এইচএমএস প্রিন্স অব ওয়েলসকে কটাক্ষ করে বলেন, এগুলো ‘সেরা বিমানবাহী রণতরী নয়’।

এর আগেও ট্রাম্প ব্রিটেনের সশস্ত্র বাহিনী নিয়ে সমালোচনা করেছেন। চলতি বছরের জানুয়ারিতে তিনি দাবি করেছিলেন, আফগানিস্তানে ব্রিটিশ সেনারা ‘সম্মুখসমর থেকে কিছুটা দূরে ছিল’। এটা নিয়েও সেসময় তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা যায়।

দ্য টেলিগ্রাফ বলছে, যুক্তরাজ্যের ৯২০ ফুট দৈর্ঘ্যের ও ৬৫ হাজার টন ওজনের এই দুটি রণতরীর তুলনায় যুক্তরাষ্ট্রের জেরাল্ড আর ফোর্ড শ্রেণির বিমানবাহী রণতরীগুলো অনেক বড়। মার্কিন ওই রণতরীর ওজন প্রায় ১ লাখ টন এবং দৈর্ঘ্য ১১০০ ফুট।

যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যৌথ হামলার পর মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা বাড়লেও, ব্রিটেন এখনও এই দুটি রণতরী সেখানে মোতায়েন করেনি। ট্রাম্প বলেন, ‘যুক্তরাজ্য বলেছে, তারা তাদের বিমানবাহী রণতরী পাঠাবে। কিন্তু এগুলো আমাদের তুলনায় খেলনার মতো। আমাদের এগুলোর দরকার নেই।’

তিনি ন্যাটো জোটের অন্যান্য মিত্রদের দিকেও ইঙ্গিত করে বলেন, তারা যুদ্ধের শুরুতে এগিয়ে আসেনি। তার ভাষায়, ‘এখন তারা সাহায্য করতে চায়, যখন প্রতিপক্ষ প্রায় ধ্বংস হয়ে গেছে। তারা বলছে, ‘আমরা জাহাজ পাঠাতে চাই’। কিন্তু যুদ্ধ শেষ হওয়ার পর সেই সংঘাতে জড়াতে চাওয়া ঠিক নয়।’

ট্রাম্প অভিযোগ করেন, যুদ্ধের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রকে হামলা চালাতে সহায়তার জন্য ব্রিটিশ ঘাঁটি ব্যবহার করতে দেয়া হয়নি। চাগোস দ্বীপপুঞ্জে যুক্তরাষ্ট্র-যুক্তরাজ্যের যৌথ ডিয়েগো গার্সিয়া ঘাঁটির কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, সেখানে বি-২ বোমারু বিমান অবতরণের অনুমতি দেয়া হয়নি। তিনি বলেন, ‘আমাদের মিসৌরি পর্যন্ত ১৭ ঘণ্টা উড়ে যেতে হয়েছে, যেখানে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই কাজ শেষ করা যেত। এটি বড় ভুল ছিল।’

যুক্তরাজ্যের প্রধানমন্ত্রী স্যার কিয়ার স্টারমার সম্পর্কে ট্রাম্প বলেন, ‘তিনি ভালো মানুষ, কিন্তু যা করেছেন তা হতাশাজনক। তিনি আমাদের সাহায্য করতে চাননি।’

পরবর্তীতে অবশ্য যুক্তরাজ্য ‘প্রতিরক্ষামূলক’ অভিযানের জন্য তাদের ঘাঁটি ব্যবহারের অনুমতি দেয়। তেহরান থেকে ডিয়েগো গার্সিয়ার দিকে ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের পর যুক্তরাষ্ট্রকে এই অনুমতি দেয়া হয়।

প্রসঙ্গত, মধ্যপ্রাচ্য সংকটে যুক্তরাজ্যের প্রতিক্রিয়া ধীরগতির হওয়ায় ওয়াশিংটন-লন্ডন সম্পর্কেও চাপ তৈরি হয়েছে। ট্রাম্প স্টারমারকে ‘চার্চিল নন’ এবং ‘হতাশাজনক’ বলেও মন্তব্য করেছেন। চাগোস দ্বীপপুঞ্জ সংক্রান্ত চুক্তি নিয়েও তিনি সমালোচনা করেন।

অবশ্য যুক্তরাজ্য এখনও মধ্যপ্রাচ্যে তাদের বিমানবাহী রণতরী পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়নি। এর আগে ট্রাম্প সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ট্রুথ সোশ্যালে লিখেছিলেন, যুক্তরাজ্য যদি এখন রণতরী পাঠায়, তবুও তা আর প্রয়োজন নেই এবং যুক্তরাষ্ট্র বিষয়টি মনে রাখবে।

তিনি লিখেছিলেন, ‘যুদ্ধ জয়ের পর যারা যোগ দিতে চায়, তাদের আমাদের দরকার নেই।’

এদিকে যুক্তরাজ্য বর্তমানে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে হরমুজ প্রণালি থেকে ইরানের পেতে রাখা মাইন সরানোর পরিকল্পনায় নেতৃত্ব দিচ্ছে। এই উদ্যোগে যুক্তরাষ্ট্র ও ফ্রান্সসহ কয়েকটি দেশ যুক্ত রয়েছে। প্রণালিটি খুলে দিতে নৌবহর মোতায়েন করা হতে পারে।

বিশ্বের প্রায় ২০ শতাংশ তেল এই প্রণালি দিয়ে পরিবাহিত হলেও, এখনো মার্কিন নৌবাহিনী সেখানে প্রবেশ করেনি। অবশ্য ব্রিটিশ ডেস্ট্রয়ার এইচএমএস ড্রাগন পূর্ব ভূমধ্যসাগরে পৌঁছেছে। জাহাজটির লক্ষ্য সাইপ্রাসকে ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলা থেকে রক্ষা করা।

প্রায় ১ বিলিয়ন পাউন্ড মূল্যের এই জাহাজটি পোর্টসমাউথ থেকে রওনা হতে এক সপ্তাহ দেরি করে এবং সেখানে পৌঁছাতে প্রায় চার সপ্তাহ সময় নেয়। আর এই বিষয়টি যুক্তরাজ্যের সামরিক প্রস্তুতি নিয়েও প্রশ্ন তুলেছে।