চাপা পড়ছে লিয়াকতের অপকর্ম

405

ঢাকা সংবাদদাতা: পুলিশের গুলিতে মেজর (অব.) সিনহা মোহাম্মদ রাশেদ খান হত্যার ঘটনায় টেকনাফের সাবেক ওসি প্রদীপ কুমার দাশ এখন ‘টক অব দ্য কান্ট্রি’। সারা দেশে ওসি প্রদীপকে নিয়ে ব্যাপক আলোচনা থাকলেও সিনহাকে গুলিবর্ষণকারী বাহারছাড়া তদন্ত কেন্দ্রের ইনচার্জ লিয়াকত হোসেনকে নিয়ে তেমন কোনো আলোচনা নেই।

প্রদীপে চাপা পড়ছে লিয়াকতের অপকর্ম। অনুসন্ধানে লিয়াকতের বিষয়ে বেরিয়ে আসছে চাঞ্চল্যকর নানা তথ্য। ওই তদন্ত কেন্দ্রে যোগদানের সাত মাসের মধ্যেই তিনি এলাকায় মূর্তমান আতঙ্ক হয়ে ওঠেন।

স্থানীয়দের অভিযোগ- মাদক ব্যবসায়ী ও মানবপাচারের অভিযোগ তুলে অনেকের কাছ থেকেই চাঁদা আদায় করতেন তিনি।

এছাড়া এলাকার বেশ কয়েকটি ফিশারিজ ঘাট থেকেও নিয়মিত মাসোহারা আদায় করতেন। পাশাপাশি প্রদীপের মতো টাকা নেয়ার পরও ক্রসফায়ারে দেয়ার অভিযোগ পাওয়া গেছে লিয়াকতের বিরুদ্ধেও।

এদিকে সোমবার সন্ধ্যায় এক প্রেস ব্রিফিংয়ে র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক লে. কর্নেল আশিক বিল্লাহ সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, হত্যাকাণ্ডের পর আইনজীবী এবং স্থানীয় পুলিশ কর্মকর্তাদের ফোনালাপের যেসব তথ্য ফাঁস হয়েছে প্রাথমিক তদন্তে সেসবের সত্যতা পাওয়া গেছে।

তদন্ত কর্মকর্তা বিষয়টি নিয়ে অত্যন্ত গুরুত্ব দিয়ে কাজ করছেন। এছাড়া দুই দফা জেলগেটের জিজ্ঞাসাবাদে কনস্টেবল সাফানুর করিম, কামাল হোসেন ও আবদুল্লাহ আল মামুন এবং এএসআই লিটন মিয়ার কাছ থেকে হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে।

সেসব তথ্য যাচাই করে দেখা হচ্ছে। রিমান্ডে এনে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে আরও তথ্য বেরিয়ে আসবে। তিনি বলেন, রোববার জামিন পাওয়ার পর সিনহার সহকর্মী শিপ্রা এখনও আপসেট অবস্থায় আছেন। এরই মধ্যে আমরা তাকে কিছু জিজ্ঞাসাবাদ করেছি। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে অত্যন্ত স্পর্শকাতর তথ্য দিয়েছেন তিনি।

শিপ্রা বলেছেন, এই ঘটনাটি তার জীবনের মোড় ঘুরিয়ে দিয়েছে। শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে হলেও তিনি এ হত্যাকাণ্ডের বিচার দেখে যেতে চান। ন্যায়বিচার পেতে তিনি শেষ পর্যন্ত লড়তে চান। শিপ্রা একটু স্বাভাবিক হলে তাকে বিশদভাবে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে বলে তিনি জানান।

অন্যদিকে টেকনাফে দীর্ঘদিনের পুলিশি অপকর্মের তথ্য পুলিশ পরিদর্শক হুমায়ূন কবিরের কাছে রয়েছে বলে তিনি (হুমায়ূন) নিজেই দাবি করেছেন। হুমায়ূন দীর্ঘদিন ধরে কক্সবাজার ডিবি পুলিশের ওসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি এখন নোয়াখালী ইনসার্ভিস ট্রেনিং সেন্টারে কর্মরত। ফেনীর সোনাগাজী, ফুলগাজী এবং লক্ষ্মীপুরের দু’টি থানাতেও ওসি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। সম্প্রতি কক্সবাজারের সার্বিক বিষয় নিয়ে হুমায়ূন পুলিশের আইজির সঙ্গে দেখা করতে চেয়েছিলেন। তিনি আইজিপির সঙ্গে দেখা করতে পারলে সিনহা হত্যাকাণ্ডের মতো মর্মান্তিক ঘটনা ঘটত না বলে এক ফেসবুক স্ট্যাটাসে উল্লেখ করেন।

এক প্রশ্নের জবাবে লে. কর্নেল আশিক বিল্লাহ জানান, সিনহা হত্যার মামলাটি র‌্যাবে আসার পর প্রাথমিকভাবে আমরা সব আসামিকে (কারাগারে আত্মসমর্পণ করা ৭ আসামি) ১০ দিনের রিমান্ডে নেয়ার আবেদন জানাই।

তিনজনকে ৭ দিন করে রিমান্ডে নেয়ার অনুমতি দেন। ১০ কর্মদিবসের মধ্যে ওই রিমান্ড কার্যকরের আদেশ দেন।

অন্য চারজনকে দুই দিনের জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদের অনুমতি দেন। আমরা চারজনকে জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদ করলেও রিমান্ড কার্যকর করতে এখনও কাউকে আমাদের হেফাজতে নেইনি।

কারণ সিফাত এবং শিপ্রা হলেন আমাদের মামলার মূল সাক্ষী। তাদের জিজ্ঞাসাবাদ না করে আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হলে সঠিক তথ্য উদঘাটনে প্রতিবন্ধকতা তৈরি হতে পারে।

এখন যেহেতু দু’জনই জামিন পেয়েছেন (একজন রোববার, অপরজন সোমবার) তাই তাদের আগে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। এরপর আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। এ কারণে ১০ কর্মদিবসের মধ্যে রিমান্ড মঞ্জুর হওয়াদের রিমান্ড কার্যকর করা সম্ভব হচ্ছে না।

তাই সোমবার আদালতে ওই ট্রাইফ্রেমটি বাতিল করার আবেদন করেছি। আদালত তা মঞ্জুর করেছেন। এখন যে কোনো সময় তাদের র‌্যাব হেফাজতে নিয়ে রিমান্ড কার্যকর করা যাবে।

এছাড়া অপর চার আসামিকে (যাদের জেলগেটে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়েছে) ফের ১০ দিনের রিমান্ডে নেয়ার আবেদন জানানো হয়েছে। আশা করছি আদালত বুধবার এ বিষয়ে একটি আদেশ দেবেন।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত ১৮ জানুয়ারি বাহারছাড়া তদন্ত কেন্দ্রে যোগদান করেন ইন্সপেক্টর লিয়াকত হোসেন। ওসি প্রদীপের প্রশ্রয়ে নিজেও এলাকায় গড়ে তোলেন শক্তিশালী সিন্ডিকেট।