যুক্তরাজ্য বিএনপির কাউন্সিল: তারেক রহমানকে জড়িয়ে বিভ্রান্তিমূলক অপপ্রচার (প্রথম পর্ব)

732

ডক্টর এম মুজিবুর রহমান : শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রফেসর জয়নাল আবেদীন স্যার আমাদেরকে হাস্যরসের মাধ্যমে ‘জৈব রসায়ন’ পড়াতেন। রসায়নের জটিল টপিকস হালকা করার জন্য মাঝে মধ্যে কিছু উদাহরণ দিতেন যাতে সমাজের আর্থ সামাজিক বাস্তবতার চিত্র ফুঁটে উঠতো। ব্যাকটেরিয়াকে কিল করতে মেডিসিন (কেমিকাল কম্পাউন্ড) কিভাবে কাজ করে তা পড়াতে গিয়ে বলেছিলেন, আমাদের দেশে অনেক সময় জনপ্রিয় ডাক্তার হিসেবে পরিচিতি পাবার জন্য কেউ কেউ কারণে অকারণে এন্টিবায়োটিক্স প্রেসক্রাইব করে থাকেন। এতে করে ব্যাকটেরিয়ার (জীবাণু) সহনীয় মাত্রা বৃদ্বি পায় (হালের শিক্ষামন্ত্রীর দেয়া ঘুষের সহনীয় প্রেস্ক্রিনশন, যার মাধ্যমে দেয়া নেয়াকে সারাদেশে সবার মাঝে ছড়িয়ে দেয়া !)। তখন ধীরে ধীরে উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন মেডিসিন ব্যবহার করতে হয়। বাস্তবে এর পরিণতি খারাপের দিকে যায়।
মেডিসিনের সাথে ব্যাকটেরিয়ার এডাপটেশন বা টলারেন্স বুঝাতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন, দেশের ফুটপাতে যেসব মানুষ বাস করেন তাদেরকে রাস্তার মধ্যে খোলা জায়গায় হাড়ি পাতিল নিয়ে রান্না করে খেতে হয়। তাদের অবস্থানের প্রতি পূর্ণ শ্রদ্ধা রেখেই স্যার বলেছিলেন তাদেরকে যদি সোনারগাঁও বা শেরাটনের বিরিয়ানির প্যাকেট দেওয়া হয় তখন ঐ খাবার খেলে তাদের পেট খারাপ হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে । কথাটি শুনতে কেমন লাগলেও বাস্তবতা রয়েছে। কারণ যে কোনো প্রাণী মাত্রই খাদ্য অথবা পরিবেশের সাথে এডাপ্টেড হয়েই বেঁচে থাকে। কারণ শরীরের ইমিউন সিস্টেম তার আশপাশ পরিবেশের সাথে খাপ খাইয়ে পরিবর্তিত হয়ে যায়। তখন হটাৎ করে অন্য কিছু যা সকলের কাছে খুবই সাধারণ মনে হলেও ফুটপাতের মানুষদের জন্য এডাপ্ট করা কষ্টসাধ্য হতে পারে । সহজ কথায় যাকে আমরা বদহজম বলে থাকি। স্বাধীনতা ভোগ করার ক্ষেত্রে অনেকের কার্যকলাপ দেখে সায়েন্টিফিক এই উদাহরণটা মনে পরে গেলো। আর সিলেটি ভাষায় প্রবাদ আছে যে, হখলর পেঠ ঘি ভাত অজম ওয় না। কোটেশন দিলাম না। কারণ শব্দটা ‘হখল’ নয়, যা বলা হয় তা লিখতে চাই না।

অধিকার এবং দায়িত্ব একসঙ্গে চলে । দায়িত্ব বাদ দিয়ে অধিকার পাওয়া যায় না। গণতন্ত্র শুধু নিজের স্বার্থ আর পরিচয় তুলে ধরার ব্যাপার নয় বরং এটি অন্যদের অধিকারকেও সম্মান করে। প্রকৃত গণতন্ত্র অন্যের অধিকারের প্রতি সহনশীল, সহিষ্ণু ও শ্রদ্ধাশীল হতে শিখায় । বাকস্বাধীনতা হচ্ছে ততক্ষন অধিকার, যতক্ষণ অন্যের অধিকারকে খর্ব না করছে। আমরা জীবনের সর্বত্র এমন একটি পর্যায়ে চলে যাচ্ছি যখন প্রত্যেকেই শুধু নিজের প্রাপ্যটুকু অধিকার হিসেবে দেখছি কিন্তু আমাদের সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং জাতীয় অঙ্গীকার সমভাবে দেখি না । রাজনীতিকে গণমুখী করতে সাধারণ নাগরিক তথা তৃণমূলের ক্ষমতায়ন একটি শক্তিশালী হাতিয়ার। এটি গণতন্ত্রের বিকাশের প্রক্রিয়া এবং সরকারের বিভিন্ন পর্যায়ে জনগণের ক্ষমতার উত্থানকে নির্দেশ করে। ব্যক্তিগত স্বাধীনতা ও ক্ষমতায়ন ভোগ করার সাথে সাথে, যৌথ দায়িত্ব এবং জাতীয় উদ্বেগগুলোকে ভুলে যাওয়া উচিত নয়।

এ কথাগুলো সবার ক্ষেত্রেই প্রযোজ্য। কিন্তু একজন সাংবাদিক, ব্লগার বা যারা লেখালেখি করেন তাদের কথা আপাতত উল্লেখ করা হলো । একজন সত্যিকারের সাংবাদিক মন যা চায় তা তিনি লিখতে পারেন না। কারণ তিনি আইনের ঊর্ধ্বে নন। আবার তিনি বিবেকরও ঊর্ধ্বে নন। তার লেখার দায়-দায়িত্ব তাকে বহন করা ছাড়াও তার মিডিয়ার ওপরও বর্তায়। তাকে ভাবতে হয়, তিনি যা লিখছেন তা কি জনস্বার্থের পক্ষে?? অথবা তার লেখার কারণে কোনো নির্দোষ ব্যাক্তি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন না তো। এসব ভাবনা না থাকলে সহজেই বলা যায় তার লেখা পক্ষপাতদুষ্ট, অথবা স্বার্থ বাস্তবায়নের তাগিদে কারো হয়ে লিখছেন ! সাংবাদিক সত্য প্রকাশ করবেন। সত্য প্রকাশে তিনি হবেন অবিচল। কিন্তু তিনি কি তথ্য গোপন করতে পারেন? তিনি কি তথ্য বিকৃত করবেন? উত্তর নিশ্চয় হবে ‘না’।

পরিকল্পিতভাবে অনেকের বিরুদ্ধে মিথ্যা অপপ্রচার ও কুৎসা রটনা করা হয় এবং তা অন্যায়ভাবেই চলছে। তবে আওয়ামী লীগ আমলে সাংবাদিক বন্ধুরা ক্ষমতাসীনদের বিরুদ্ধে কোন কিছুই লিখার সাহস করে না। যারা তাদের বিরুদ্ধে কলম ধরেছে তাদের হাত গুঁড়িয়ে দেয়া হয়েছে। সীমাহীন নিপীড়নের স্বীকার হতে হয়েছে অনেককে। দেশে সংবাদপত্রের স্বাধীনতার নামে যেমন চলছে সীমাহীন পক্ষপাতদুষ্টতা। সমাজে উত্তেজনা সৃষ্টির অভিপ্রায়েও সংবাদ ‘রচনা’ বা ‘গল্প’ তৈরী করা হয় । যাদের মন অসুস্থ তাদের নজর উত্তেজনার দিকে। তারা সংবাদ পরিবেশনায় সুঁড়সুঁড়ি দিয়ে হীন স্বার্থ চরিতার্থ করতে চায়, কৃত্রিম আনন্দ পেতে চায়। কিন্তু এ কাজ সংবাদপত্রের নয়, সাংবাদিকের নয়। এসব সাংবাদিকতা নয়-এর নাম হলুদ সাংবাদিকতা। এ কাজ নীচ, হীন। দেশের মানুষ চান সত্য সংবাদ, আসল ঘটনা, রটনা নয়।

অনেকে মনে করেন ‘জনশ্রুতি রয়েছে’ বা ‘লোকে মনে করছে’ অথবা ‘এরকম শুনা যায়’ এ জাতীয় কিছু অস্পষ্ট, সন্দেহজনক এবং গোঁজামিল ধরনের শব্দাবলী ব্যবহার করে নিন্দাবাদমূলক বা উদ্দেশ্যমূলক রিপোর্ট বা সংবাদ নির্দোষ তথা বৈধ হয়ে যায়। এ ধারণা সঠিক নয়। দায় দায়িত্বহীন, হাওয়া থেকে পাওয়া অথবা আপন মস্তিষ্ক প্রসূত বানোয়াট, কাল্পনিক প্রতিবেদন তৈরি করা সৎ ও সত্যনিষ্ঠ সাংবাদিকতার বরখেলাপ। অনেক সময় অর্থলোভ, সরকারের দালালী ও কোনো কোনো ক্ষেত্রে ভয়ে, অভ্যন্তরীণ দলীয় রাজনীতিতে পক্ষপাতদুষ্টতা, বিদেশী প্রভাব ও পেশাগত অসততা সত্যতা বিনষ্টের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। সংবাদকর্মীকে সাংবাদিকতার আদর্শ-নিষ্ঠাকে জলাঞ্জলি দিয়ে কোন অবস্থাতেই অর্থ-সম্পদ আর ক্ষমতার লোভে অশুভ শক্তির দাবার গুঁটিতে পরিণত হওয়া সমাজ, কমিউনিটি ও রাষ্ট্রের জন্য শুভ নয় ।

আজকাল দেখা যায় কিছু মানুষের চিন্তার দৈন্যতা কত নিম্নস্তরে পৌঁছেছে তা কল্পনার অতীত । এর সাম্প্রতিক উদাহরণ ইউকে বিএনপি কাউন্সিল তথা কমিটি গঠন নিয়ে কিছু লেখালেখি। একদিকে নির্বাচনে গণতান্ত্রিক পদ্বতির নামে হঠাৎ করেই ব্রিটেনের রাজনৈতিক দলসমূহের অভ্যন্তরীণ গণতাত্রিক সিস্টেম চাপাইয়া দিতে চাইছেন। অপরদিকে ইউকে বিএনপি’র সমালোচনা করতে গিয়ে শেখ হাসিনার প্রতারণার নির্বাচনের সঙ্গে তুলনা এই দুটি ক্ষেত্রেই চিন্তার দৈন্যতা ফুঠে উঠেছে। অনেকে মনে করেন এসব কর্মকান্ড বর্তমান ফ্যাসিবাদ ও স্বৈরতন্ত্রকে দীর্ঘায়িত করার পক্ষাবলম্বন বৈ কিছু নয়।

বাংলাদেশের বৃহৎ এবং জনপ্রিয় রাজনৈতিক দল বিএনপি সমর্থিত ইউকে বিএনপি’র শাখা কমিটি যা একটি জেলা কমিটির সমমানের সংগঠন। দেশি ও বিদেশি ষড়যন্ত্রের পাতানো নির্বাচনের সাথে একটা দলের অভ্যন্তরীণ কমিটি গঠনের তুলনাকে বিস্তৃত না করে শুধু বলবো, কিসের মধ্যে কি, পান্তা ভাতে ঘি ! সত্যিই ইদানিং অনেকের অবস্থা দেখলে পান্তা ভাতে ঘি খাওয়ার কথা মনে পড়ে যায়। পান্তা ভাত যেমন ঘি দিয়ে খাওয়া যায় না, তেমনি রং ঢং মেখে, সঙ সেজে ফ্যাসিবাদ আর স্বৈরতন্ত্রকে হালাল করা যায় না। কিন্তু দুঃখের বিষয় এই কাজটাই অনেকে পাল্লা দিয়ে করছেন।

জাতীয় নির্বাচন যেখানে একটা দেশের সরকার পরিবর্তনের বিষয় থাকে, যারা তার সাথে ইউকে বিএনপির কমিটি গঠনকে একাকার করে হিসেবে মিলাতে চান তারা বুদ্বি ও চিন্তায় অপরিপক্ক অথবা নিজের বিচার বুদ্বি সপে দিয়েছে অন্যের কাছে। অপরদিকে যারা মনে করেন ইউকে বিএনপির সংগঠনের সদস্যদের একটা অভ্যন্তরীণ নির্বাচন ওয়েস্টমিনিস্টার স্টাইলে হবে -নিঃসন্দেহে তাদের বুদ্বি বিবেচনা নিয়ে সন্দেহ করার অবকাশ রয়েছে। নির্বাচনী প্রক্রিয়া এবং ইউকে বিএনপির কাউন্সিলে কতজন কাউন্সিলার উপস্থিত ছিলেন এবং তাদের মতামতের খবরটুকু নিলে এ নিয়ে আর বিভ্রান্তি ছড়ানোর অবকাশ থাকবে না বলে মনে করি। আপাতত দলের অভ্যন্তরীণ বিষয় নিয়ে এর বেশি কিছু লিখতে চাই না। যারা লিখছেন তাদের যদি এতোই ইন্টারেস্ট থাকে তাহলে অনুরোধ করবো দলীয় ফরম পূরণ করে সদস্য হন, সব প্রশ্নের উত্তর দলীয় ফোরামে পেয়ে যাবেন।

দলের নেতাকর্মীদের অভ্যন্তরীণ বিষয়াদি দলীয় ফোরামে আলাপ আলোচনা করে অধিকাংশ সদস্যের মতামতের আলোকে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা সম্ভব বলে আমি মনে করি। গণতন্ত্র কোনো ট্যাবলেট নয় যে, ঔষধ হিসেবে গিলে খাবো। এটা সহনশীল ও সহিষ্ণু পন্থায় অনুশীলনের ব্যাপার। কিন্তু যারা দলের সর্বোচ্চ নেতৃত্বকে বিতর্কিত করে বিভ্রান্তিমূলক লেখা লিখছেন, এদের ওয়েস্টমিনিস্টার স্টাইল হলো তাদের পছন্দমতো নেতারা বিএনপি’র নেতৃত্বে আসতে হবে। কি আজব তামাশা! সর্বোচ্চ নেতৃত্বকে নিয়ে বিভ্রান্তি ছড়াবেন, আবার নিজেদের পছন্দের মানুষজনকে এই দলের নেতৃত্ব পাইয়ে দিতে মরিয়া হয়ে থাকবেন । এ কোন ধরণের ভণ্ডামি । সাময়িক ফায়দা আর নেতৃত্বকে কব্জা করার অশুভ খেলা খেলতে গিয়ে ক্ষুধার্ত বাঘের পিঠে চড়ে বসছেন না তো? কারণ বাঘের পিঠে চড়ে থাকা যেমন নিরাপদ নয় তেমনি নিরাপদ নয় নেমে যাওয়াও । তাই আত্মবিশ্বাসী হয়ে নিজের কর্ম যোগ্যতা বাড়ানোর চেষ্টা করলে সময়ের ব্যবধানে রেজাল্ট বের করে আনা যায়। ক্ষুধার্ত বাঘ নিয়ে নাড়াচাড়া না করাই শ্রেয় । (বাকি অংশ দ্বিতীয় পর্বে )।
লেখক: শিক্ষক ও গবেষক। সাবেক সহকারী অধ্যাপক, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট।