গোলাম সারওয়ারের মরদেহ দেশে ফিরেছে : দাফন কাল

496

ঢাকা সংবাদদাতা: দৈনিক সমকাল সম্পাদক গোলাম সারওয়ারের মরদেহ দেশে ফিরেছে। গতকাল মঙ্গলবার রাত ১০টা ৫০ মিনিটে কফিনবন্দি হয়ে দেশে ফেরে তার নিথর দেহ। সিঙ্গাপুর থেকে গোলাম সারওয়ারের মরদেহের সঙ্গে তার স্ত্রী সালেহা সারওয়ার, কন্যা সুষমা নাইম রতœা, জামাতা মিয়া নাইম হাবিব, দুই ছেলে গোলাম শাহরিয়ার রঞ্জন ও গোলাম সাব্বির অঞ্জন একই বিমানে দেশে ফিরেছেন।

সমকালের প্রকাশক এ. কে. আজাদ বিমানবন্দরে প্রিয় সম্পাদকের মরদেহ গ্রহণ করেন। এ সময় সমকালের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মুস্তাফিজ শফিসহ সিনিয়র সাংবাদিকরা উপস্থিত ছিলেন। বিমানবন্দরে শোকার্ত সহকর্মী-স্বজনরা গোলাম সারওয়ারের মরদেহ উত্তরার বাস ভবনে নিয়ে যান। ১৯৭৭ সাল থেকে গোলাম সারওয়ার উত্তরা এলাকায় বসবাস করে আসছেন। মরদেহ বাসায় পৌঁছানোর পর স্বজনরা কান্নায় ভেঙে পড়েন। উত্তরা এলাকার বাসিন্দারা প্রিয় মানুষটিকে এক নজর দেখার জন্য রাতের আঁধার ভেঙেই বাসায় ভিড় জমায়। অনেকে কান্নায় ভেঙে পড়েন। সেখান থেকে মরদেহ বারডেমের হিমঘরে নিয়ে যাওয়া হয়। রাতে সেখানেই রাখা হয়।

আজ বুধবার দুপুর দেড়টায় হেলিকপ্টারে করে তার মরদেহ বরিশালের বানারীপাড়ায় নেয়া হবে। পরিবারের বড় সন্তান গোলাম সারওয়ারকে আদর করে তার মা ডাকতেন দুলাল বলে। গ্রামের মানুষের কাছে তিনি প্রিয় দুলাল হয়েই আছেন। দুপুর আড়াইটায় বানারীপাড়া সরকারি মডেল ইনস্টিটিউশন মাঠে গোলাম সারওয়ারের প্রথম জানাজা হবে। একাত্তরের রণাঙ্গনের যোদ্ধা গোলাম সারওয়ার মুক্তিযুদ্ধের পর কয়েক মাস এই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের প্রধান শিক্ষক ছিলেন। জানাজা শেষে তাকে আবারো ঢাকায় ফিরিয়ে আনা হবে। রাতে আবারো মরদেহ বারডেমের হিমঘরে রাখা হবে।

আগামীকাল বৃহস্পতিবার সকাল ৯টায় গোলাম সারওয়ারের মরদেহ প্রিয় কর্মস্থল সমকাল কার্যালয় নেয়া হবে। বেলা ১১টা থেকে সাড়ে ১২টা পর্যন্ত সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য মরদেহ কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে রাখা হবে। এরপর বাদ জোহর জাতীয় প্রেসক্লাবে শেষ শ্রদ্ধা নিবেদন ও জানাজা শেষে গোলাম সারওয়ারকে রাজধানীর মিরপুরে শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে নিয়ে যাওয়া হবে। সেখানেই বাদ আসর তার মরদেহ দাফন করা হবে।

দেশের প্রথিতযশা এই সম্পাদক সিঙ্গাপুরের একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় গত সোমবার রাত ৯টা ২৫ মিনিটে মারা যান। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৭৫ বছর। তার মৃত্যুতে রাষ্ট্রপতি, প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার, বিরোধীদলীয় নেতাসহ সাংবাদিক, সাহিত্যিক, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি ও রাজনৈতিক দলের নেতারা শোক প্রকাশ করে তার বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করেন। শোকসন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানান তারা।

শোক প্রকাশ করেছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট ও বিকল্পধারা বাংলাদেশের সভাপতি প্রফেসর ডা. একিউএম বদরুদ্দোজা চৌধুরী। শোক প্রকাশ করেছেন বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, জাতীয় পার্টি (জাফর) ভারপ্রাপ্ত সভাপতি ড. টিআইএম ফজলে রাব্বি চৌধুরী ও মহাসচিব মোস্তফা জামাল হায়দারসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা। শোক ও দুঃখ প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি), জাতীয় প্রেস ক্লাব, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটি- ডিআরইউ, বাংলাদেশ ক্রাইম রিপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন, বরিশাল বিভাগ সাংবাদিক সমিতিসহ অনেক ব্যক্তি ও সংগঠন। এদিকে গোলাম সারওয়ারের মৃত্যুতে শোকবই খোলা হয়েছে দৈনিক সমকাল কার্যালয়ে। আগামী বৃহস্পতিবার পর্যন্ত এ শোকবই খোলা থাকবে। গতকাল সকাল থেকে শোকবইয়ে সই করেন- শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক আবেদ খান, সাংবাদিক নেতা মনজুরুল আহসান বুলবুল, বাংলাদেশ প্রেস কাউন্সিলের চেয়ারম্যান বিচারপতি মো. মমতাজ উদ্দিন আহমেদ ও সচিব শ্যামল চন্দ্র কর্মকার, ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সভাপতি সাইফুল ইসলাম, জ্যেষ্ঠ সাংবাদিক মোজাম্মেল হোসেন মঞ্জু, বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের কমিউনিকেশন এক্সিকিউটিভ ফারজানা আক্তার তিশা প্রমুখ। এছাড়াও প্রেস ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের চেয়ারম্যান গোলাম সারওয়ারের মৃত্যুতে প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকেও খোলা হয়েছে একটি শোকবই।

বাবা মরহুম গোলাম কুদ্দুস মোল্লা ও মা মরহুম সিতারা বেগম দম্পতির জ্যেষ্ঠ সন্তান গোলাম সারওয়ার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগ থেকে স্নাতক সম্মানসহ এমএ ডিগ্রি অর্জন করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রাবস্থায় ১৯৬২ সালে চট্টগ্রামের দৈনিক আজাদীর বিশ্ববিদ্যালয় সংবাদদাতা হিসেবে তার সাংবাদিকতা পেশার সূচনা। মহান মুক্তিযুদ্ধে তিনি সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করেন নিজ এলাকা বানারীপাড়ায়। কর্মজীবনে তিনি দৈনিক সংবাদের পর দৈনিক ইত্তেফাকে দীর্ঘ ২৭ বছর বার্তা সম্পাদকের দায়িত্ব পালন করেন। সত্তরের দশকের প্রথমার্ধে দৈনিক ইত্তেফাকের বার্তা সম্পাদকের দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তিনি সাপ্তাহিক পূর্বাণীর নির্বাহী সম্পাদক হিসেবে কাজ করেন। পূর্বাণীতে তারই সম্পাদনায় এদেশে প্রথম ম্যাগাজিন আকারে বৃহদায়তনের ঈদসংখ্যা প্রকাশের রীতি শুরু হয়। এসব কৃতিত্বের ধারাবাহিকতায় তিনি দেশের দুটি সেরা দৈনিক যুগান্তর ও সমকাল-এর প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক হিসেবে নজিরবিহীন সাফল্য অর্জন করেন। এদেশের সংবাদপত্রের সাফল্য ও পেশাদারিত্বের এক উজ্জ্বল প্রতীক গোলাম সারওয়ার।