ওয়ানবাংলানিউজ: ইস্ট লন্ডন মসজিদের ফান্ডরেইজিং আগামী ১০ জুন শনিবার বিকেল ৩টা থেকে ফজর পর্যন্ত চ্যানেল এস-এ লাইভ ফান্ডরেইজিং অ্যাপিল অনুষ্ঠিত হবে। এবারের রামাদ্বানে বিভিন্ন ফান্ডরেইজিং অ্যাপিলের মাধ্যমে মসজিদ কর্তৃপক্ষ অর্ধ মিলিয়ন পাউন্ড সংগ্রহ করতে পারবেন বলে আশা করছেন। এবার ফান্ডরেইজিংয়ে নতুন তিনটি উদ্যোগ নিয়েছেন তারা। সেগুলি হচ্ছে: মসজিদ পরিচালনা ব্যয়, ওয়াকফ বা ল্যাগেসি ডনেশন ও আজীবন ক্বরজে হাসানা। ৬ জুন মঙ্গলবার লন্ডন মুসলিম সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এ তথ্য জানানো হয়।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন, ইস্ট লন্ডন মসজিদ ও লন্ডন মুসলিম সেন্টারের সেক্রেটারি আইয়ুব খান। শুরুতে স্বাগত বক্তব্য রাখেন নির্বাহী পরিচালক দেলওয়ার খান। বক্তব্য রাখেন চেয়ারম্যান মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান, ট্রাস্টি ড. মোহাম্মদ আব্দুল বারী, ইমাম ও খতীব শায়খ আব্দুল কাইয়ূম ও ট্রেজারার মুহাম্মদ আব্দুল মালিক। ইস্ট লন্ডন মসজিদের উদ্যোগে সংবাদ
সংবাদ সম্মেলনের মূল বক্তব্য হুবহু দেয়া হল:
সংবাদ সম্মেলনের মূল বক্তব্যে যাওয়ার আগে গত ৩ জুন শনিবার রাতে লন্ডন ব্রীজে সংঘটিত ন্যাক্কারজনক সন্ত্রাসী হামলার ঘটনায় তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছি। সন্ত্রাসী হামলায় নিহতদের পরিবার পরিজনের প্রতি আমাদের গভীর সমবেদনা। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ব্যক্তিদের দ্রুত সুস্থতা কামনা করি। সন্ত্রাসী, সন্ত্রাসীই। সন্ত্রাসীর কোনো ধর্ম নেই। যারাই সন্ত্রাস করে সমাজে অশান্তি সৃষ্টি করতে চায় তাদের প্রতিহত করা আমাদের সকলের দায়িত্ব। সন্ত্রাস প্রতিরোধে আমরা সকলের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করবো।

সাংবাদিকবন্ধুগণ, আপনাদের মধ্যে অনেকেই ইস্ট লন্ডন মসজিদে নিয়মিত নামাজ পড়ে থাকেন। সুতরাং রামাদ্বানে আমাদের বহুমুখী কার্যক্রম সম্পর্কে আপনারা ওয়াকেফহাল রয়েছেন। তবুও আমাদের বিভিন্ন কার্যক্রম সংক্ষেপে উল্লেখ করতে চাই। রামাদ্বানে ইস্ট লন্ডন মসজিদে মানুষের যাতায়াত বছরের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেকগুণ বেড়ে যায়। মূল মসজিদসহ লন্ডন মুসলিম সেন্টার ও মারিয়াম সেন্টারের হলগুলো মুসল্লিদের পদচারনায় মুখরিত হয়ে ওঠে। রামাদ্বান এলে যেনো ইবাদতের এক উৎসব সৃষ্টি হয়। প্রতিবারের মতো এবারও তারাবিহের নামাজের জন্য এসেছেন বিদেশী হাফিজগণ। এবার মদীনা শরীফ থেকে এসেছেন প্রখ্যাত আলেম শায়খ সাউদ নাফি আল আনাজী। তিনি রিয়াদের ইমাম মুহাম্মদ সাউদ ইসলামিক ইউনিভার্সিটি থেকে শরীয়াহ শাস্ত্রে উচ্চতর ডিগ্রীধারী।
মিশর থেকে এবার চতুর্থবারের মতো এসেছেন হাফিজ আহমদ রাজাব। রয়েছেন সোমালী বংশোদ্ভুত বৃটিশ হাফিজ ক্বারী জামাল মোহাম্মদ এবং আমাদের আল-মিজান ও লন্ডন ইস্ট একাডেমীর প্রাক্তণ ছাত্র মোহাম্মদ সাকির আহমদ। এছাড়াও রয়েছেন আমাদের নিয়মিত ইমাম হাফিজ আবু তাইয়্যেব। প্রতি বছরের মতো থাকছে ইতফারের আয়োজন। প্রতিদিন ৬শ মানুষ লন্ডন মুসলিম সেন্টারের গ্রাউন্ড ফ্লোরে ইফতার করে থাকেন।

স্থানীয় ব্যবসায়ীরা এই ইফতার স্পনসর করে থাকেন। জনপ্রতি দুই পাউন্ড করে অথবা পুরো একদিনের ইফতার ১২শ পাউন্ড দান করে এই ইফতার স্পনসর করা যায়। রামাদ্বানের শেষ ১০ দিনে ১০০ মানুষের জন্য রয়েছে ই’তেকাফের সুব্যবস্থা। গত ৩ জুন ছিলো ই’তেকাফের আবেদন জমা দেয়ার শেষ তারিখ। ইতোমধ্যে বিপুল সংখ্যক আবেদন জমা পড়েছে। আগামী ৯ জুন শুক্রবার লটারির মাধ্যমে ই’তেকাফের সিট বরাদ্দ দেয়া হবে। এসব ছাড়াও প্রতিদিন আসরের নামাজের পর বিভিন্ন ধরনের ইসলামিক আলোচনা চলছে। আমাদের মসজিদের ইমামগণ ছাড়া বিভিন্ন ইসলামিক স্কলার রামাদ্বান সম্পর্কে গুরুত্বপুর্ণ বয়ান পেশ করে থাকেন। ইস্ট লন্ডন মসজিদ ও লন্ডন মুসলিম সেন্টার পরিচালনায় দৈনিক মোটা অংকের অর্থ ব্যয় হয়ে থাকে। উপরন্তু মারিয়াম সেন্টার প্রতিষ্ঠা ও সিনাগগ ভবন ক্রয় বাবদ এখনও ৩.৩ মিলিয়ন পাউন্ড ক্বরজে হাসানা বাকি রয়েছে। এই ঋণ পরিশোধে বিভিন্নভাবে ফান্ডরেইজিং অব্যাহত রয়েছে।
গত ২৯ এপ্রিল দ্বিতীয়বারের মতো অনুষ্ঠিত হয়েছে রাইড ফর ইউর মস্ক। এই ক্যাম্পেইনের মাধ্যমে ৮ হাজারেরও বেশি ফান্ডরেইজ করা সম্ভব হয়েছে। আগামী ১৭ সেপ্টেম্বর রোববার পূর্ব লন্ডনের ভিক্টোরিয়া পার্কে অনুষ্ঠিত হবে ৬ষ্ঠ মুসলিম চ্যারিটি রান। এরপর হবে ইস্ট লন্ডন মস্ক ফুটবল টুর্নামেন্ট ২০১৭। সারা বছরই আমাদের বিভিন্ন কর্মতৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। রামাদ্বানে টিভি ফান্ডরেইজিং আমাদের জন্য একটি বাড়তি সুযোগ। প্রতি বছরই আমরা লাইভ অ্যাপিলে অংশগ্রহণ করে থাকি। এ বছর ১০ জুন শনিবার বিকেল ৩টা থেকে ফজর পর্যন্ত চ্যানেল এস-এ লাইভ ফান্ডরেইজিং অ্যাপিল অনুষ্ঠিত হবে। রামাদ্বানে বিভিন্ন ফান্ডরেইজিং অ্যাপিলের মাধ্যমে আমরা অর্ধ মিলিয়ন পাউন্ড সংগ্রহ করতে পারবো বলে আশা করছি।
এবারের ফান্ডরেইজিংয়ে আমরা নতুন কিছু উদ্যোগ গ্রহণ করেছি।
এগুলো হলো: মসজিদ পরিচালনা ব্যয়, ওয়াকফ বা ল্যাগেসি ডনেশন ও আজীবন ক্বরজে হাসান। এই তিনটি নতুন উদ্যোগ সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোকপাত করতে চাই। এক. মসজিদ পরিচালনা ব্যয় : মসজিদ পরিচালনায় পানি, গ্যাস, বিদ্যুৎ, পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা, মেরামত-রক্ষনাবেক্ষণ ও নিরাপত্তা এই ছয়টি খাতে বেশি অর্থ ব্যয় হয়ে থাকে। তাই এই ছয়টি খাতে আমরা পৃথক পৃথক ডনেশন আহবান করবো।
যেমন প্রতিদিন মসজিদের পানি ব্যবস্থাপনা বাবদ ৭৫ পাউন্ড, গ্যাস সরবরাহে ১০০ পাউন্ড, বিদ্যুৎ বাবদ ৩০০ পাউন্ড, মেরামত-রক্ষনাবেক্ষণ বাবদ ৩৭৫ পাউন্ড, সিকিউরিটি বাবদ ২৭৫ পাউন্ড এবং পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা বাবদ ৭০০ পাউন্ড ব্যয় হয়ে থাকে। কেউ যেকোনো একটি খাতে একদিনের খরচ বহন করতে পারেন। আবার ছয়টি খাতে একদিনের খরচ এক সাথেও দিয়ে দিতে পারেন।
এক্ষেত্রে ছয়টি খাতের জন্য ১,৮২৫ পাউন্ড দান করবেন। দুই. আজীবন ক্বরজে হাসানা: আমরা বিগত দিনগুলোতে স্বল্প মেয়াদী ক্বরজে হাসানা সংগ্রহ করেছি।
এবার ‘আজীবন ক্বরজে হাসানা’ চালুর উদ্যোগ গ্রহণ করেছি। উদাহরণসরূপ, কেউ তাঁর মৃত্যুর পর দাফন-কাফন করার জন্য ৪ থেকে ৫ হাজার পাউন্ড মসজিদে ক্বরজে হাসানা হিসেবে জমা রাখতে পারবেন। দাতা ব্যক্তির ইন্তেকালের পর জমাকৃত অর্থ দিয়ে তাঁর ফিউনারেল সার্ভিসের খরচ আদায় করা যেতে পারে। নতুবা পরিবারের কাছে জমাকৃত অর্থ ফেরত দেওয়া হবে।
তিন: ওয়াকফ বা ল্যাগেসি ডনেশন : মসজিদের জন্য কোনো সম্পদ উৎসর্গ করে দেওয়াকে আরবীতে ওয়াকফ বলা হয়ে থাকে। বাংলাদেশে এই পদ্ধতির দান জনপ্রিয় ও বহুলপ্রচলিত। লন্ডনে আমরা এই প্রথম ওয়াকফ পদ্ধতি চালুর উদ্যোগ গ্রহণ করেছি। এই পদ্ধতিতে বিত্তবান মানুষ নিজেদেরকে মসজিদের সাথে সম্পৃক্ত করতে পারবেন। যেমন: যিনি একাধিক বাড়ি-ঘর কিংবা দোকানের মালিক তিনি চাইলে মসজিদের নামে একটি প্রপার্টি ওয়াকফ বা উৎসর্গ করে দিতে পারেন। মসজিদ এটি বিক্রি করতে পারবে না। তবে ওয়াকফকৃত ঘর-বাড়ি থেকে প্রাপ্ত ভাড়া মসজিদের কাজে লাগাবে। যিনি সম্পদ দান করবেন তিনি মৃত্যুর পরও কবরে বসে সাদকায়ে জারিয়ার সওয়াব পেতে থাকবেন। এই তিনটি পদ্ধতিতে ফান্ডরেইজ করে আমরা মসজিদকে ঋমুক্ত করার চেষ্টা করছি।
প্রিয় সাংবাদিকবন্ধুণ, আপনারা জানেন ইস্ট লন্ডন মসজিদে আল মিজান প্রাইমারি স্কুল ও লন্ডন ইস্ট একাডেমী নামে দুটো শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পরিচালিত হয়ে আসছে। দুটো স্কুলই প্রতি বছর ভলো ফলাফল করছে। সাফল্যের ধারাবাহিকতায় আল-মিজান স্কুলে এ বছর থেকে ছেলেদের পাশাপাশি মেয়েদেরকে ভর্তির উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। তৃতীয় শ্রেনী থেকে ৬ষ্ঠ শ্রেণী পর্যন্ত মেয়েরা ভর্তি হতে পারবেন। অফস্ট্যাড এর শর্তাবলী পুরণ করতে পারায় মেয়েদের ভর্তির সুযোগ হয়েছে।
নিরাপত্তা ঃ বর্তমান সময়ে মসজিদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের কোথাও কোনো সন্ত্রাসী ঘটনা ঘটলে ইসলামোফোবিক হামলার ঘটনা ঘটতে শুরু হয়। ইস্ট লন্ডন মসজিদ যেহেতু বৃটেনের সবচেয়ে বড় মসজিদ এবং এখানে মানুষের যাতায়াতও অনেক বেশি তাই নিরাপত্তার ঝুঁকিও থাকে বেশি। তাই আমরা বার্ষিক প্রায় ১শ হাজার পাউন্ড ব্যয়ে চবিবশ ঘণ্টা সিকিউরিটির ব্যবস্থা করেছি।
৭ জন দক্ষ ও প্রশিক্ষিত সিকিউরিটি গোটা মসজিদের নিরাপত্তা রক্ষায় সার্বক্ষনিক নিয়োজিত রয়েছেন। আপনারা জানেন, ইস্ট লন্ডন মসজিদের কার্যক্রম দেশে বিদেশে প্রশংসিত হয়ে আসছে। বিভিন্ন সময় বিশিষ্ট ব্যক্তিগণ এই মসজিদ পরিদর্শনে এসে মসজিদের কার্যক্রম দেখে অভিভূত হয়েছে।
২০০১ ও ২০০৪ সালে প্রিন্স চার্লস দুই বার মসজিদ পরিদর্শনে আসেন। বিভিন্ন সময় বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রধানমন্ত্রী, প্রধান বিচারপতি, এমপিসহ রাস্ট্রের উচ্চপদস্থ ব্যক্তিবর্গ মসজিদ পরিদর্শন করতে এসেছেন। বৃটেনের সব সরকারের সময়ই মন্ত্রী ও এমপিগণ নিয়মিতই মসজিদ পরিদর্শনে আসেন। অতি সম্প্রতি মসজিদ পরিদর্শনে আসেন বৃটেনের রানীর একমাত্র কন্যা প্রিন্সেন্স এ্যান। তিনি প্রায় দুই ঘণ্টা মসজিদে অবস্থান করে মসজিদের বিভিন্ন কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করে অভিভূত হন।
এসময় তিনি তাঁর বিভিন্ন প্রজেক্টের সাথে মসজিদের প্রজেক্টের সমন্বয় সাধন করে কাজ করার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। এভাবেই বিভিন্নভাবে মসজিদের কার্যক্রম তুলে ধরার চেষ্টা করছি। প্রিয় সাংবাদিকবন্ধুগণ, দীর্ঘক্ষণ ধর্যধরে আমাদের বক্তব্য শোনার জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ জানিয়ে আজ এখানেই শেষ করছি। আপনারা ভালো থাকুন।















