ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রতিনিধি: ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৪ (কসবা–আখাউড়া) আসনে বিএনপির প্রাথমিক মনোনয়নপ্রাপ্ত ৯০ বছর বয়সী মুশফিকুর রহমান জনসংযোগ মঞ্চেই বেঘোরে ঘুমাচ্ছেন। ১৫ নভেম্বর শনিবারও এই দৃশ্য দেখা গেছে। বার্ধক্যজনিত অসুস্থতার কারণে মুশফিকুর রহমান তার দুচোখ ভালো করে খুলতে পারেন না। কোমর সোজা করে দাঁড়াতে পারেন না। কিছুটা পথ একেবারে মন্থর গতিতে হাঁটতে পারলেও পরে দুজন তাকে ধরে হাটাতে হয়। সহকারীদের খেয়াল রাখতে হয় কখন তিনি মাচিতে পরে যান। ভোটারদের সাথে কথা বলার সময় হাতে মাইক ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে পারেন না। এমনকি শোনা যাচ্ছে যাত্রাপথ কয়েক ঘন্টা দীর্ঘ হলে বাথরুম সেফটি পোশাক পড়তে হয় তাকে। এভাবেই চলছে কসবা আখাউড়ার ধানের শীষের প্রাথমিক মনোনয়ন প্রাপ্ত প্রার্থী মুশফিকুর রহমানের নির্বাচনী প্রচারণা। মুশফিকুর রহমানের সহকারীরা এম্বুলেন্সের প্রাথমিক সরঞ্জামাদি আলাদা গাড়িতে করে নিয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছেন। যাতে করে তাদের এমপি প্রার্থীর জীবন বাঁচানো যায়। ভোটের মাঠে সরেজমিনে এসব দৃশ্য দেখা গেছে।
তবে এমন প্রার্থীকে ভোট দিতে উৎসাহ পাচ্ছেন না বলে সাফ জানিয়ে দিচ্ছেন ভোটাররা। কেননা মুশফিকুর রহমান ইতিমধ্যে ‘অচল প্রার্থী’ হিসেবে এলাকায় পরিচিতি পেয়েছেন।
মুশফিকুর রহমানের খয়ের খাওয়া গুটিকয়েক ব্যক্তি ছাড়া অধিকাংশ মানুষের মতামত হলো, নির্বাচন পরবর্তী সেবার জন্য যে প্রার্থীকে তারা নিয়মিত তাদের কাছে পাবেন না ও জনগনের সমস্যার সমাধানের জন্য ‘সার্জারি মিটিং’ করার মত শারীরিক সক্ষমতা যিনি রাখেন না তাকে মূল্যবান ভোট দেয়া যায় না।
মুশফিকুর রহমান বিএনপি প্রার্থী হিসেবে বহাল থাকলে জনগণের রায় বিএনপি’র বিপরীতে থাকা জামাত প্রার্থীর দিকে ঝুঁকে যাবে।
বিএনপির নেতাকর্মীরা আশঙ্কা প্রকাশ করছেন যে,
কসবা আখাউড়া আসনে বিএনপি’র এই অচল প্রার্থী বদল না হলে জামায়াত ইসলামী সে আসনটিতে অটো বাস বলে ধরে নেয়া হচ্ছে। জামাত অলরেডি সারাদেশে অচল মুশফিকুর রহমানকে নিয়ে নানাবিধ ট্রল শুরু করেছে।
এদিকে বিএনপির এমন মনোনয়নকে ঘিরে দলটির নেতাকর্মীদের মধ্যে সমালোচনার ঝড় উঠেছে। কসবা আখাউড়ার বিএনপির নেতাকর্মীরা চরম হতাশায় ভুগছেন।
মূলত কসবা আখাউড়ার জনপ্রিয় নেতা আলহাজ্ব কবীর আহমেদ ভূঁইয়াকে মনোনয়ন বঞ্চিত করতে একটি গোষ্ঠীর সুদক্ষ পরিচালনায় সম্প্রতি মুশফিকুর রহমানকে কানাডা থেকে বাংলাদেশে নিয়ে আসা হয়। তার নির্বাচনী এলাকায় কোনরূপ জনসংযোগ না করেই ঢাকা থেকে মনোনয়ন বাগিয়ে নিয়ে আসেন। মনোনয়ন প্রাপ্তির পর অসুস্থ মুশফিকুর রহমানকে নিয়ে গণসংযোগ শুরু করা হয়।
✨✨✨
যেসব কারণে ভোটের দৌড়ে বিএনপির এই প্রার্থী অনেক পেছনে অবস্থান করছেন।
প্রায় ১৭ বছর পর কানাডা থেকে দেশে ফিরে আসা এই প্রবাসী নেতা মুশফিকুর রহমানের মনোনয়ন স্থানীয় রাজনীতিতে বিস্ময়, হতাশা ও ক্ষোভ সৃষ্টি করেছে। দীর্ঘদিন ধরেই পরিবারসহ তিনি কানাডায় স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। এলাকাবাসীর অভিযোগ-‘এলাকার সঙ্গে দীর্ঘ ১৭ বছর মুশফিকুর রহমাননের কোনো সম্পর্ক নেই।
২০০৮ সালে আওয়ামী লীগের প্রার্থী অ্যাডভোকেট শাহ আলমের কাছে বিপুল ভোটে পরাজয়ের পর তিনি সক্রিয় রাজনীতি থেকে সরে যান। ২০১৪ সালের জাতীয় নির্বাচনের পূর্বে তিনি দেশেই ফিরেননি। ফলে বিএনপির প্রার্থী শূন্যতায় আওয়ামী লীগের আনিসুল হক বিনা ভোটে নির্বাচিত হয়।
২০১৮ সালের নির্বাচনে বিএনপি তাকে মনোনীত করলেও মনোনয়নপত্রে ইচ্ছাকৃত ভুল করে তিনি প্রতিদ্বন্দ্বিতা থেকে সরে দাঁড়ান। সে সময় তৎকালীন আইনমন্ত্রী আনিসুল হকের সঙ্গে তাঁর আঁতাতের অভিযোগ ওঠে, যা আজও স্থানীয় রাজনীতিতে আলোচনায় রয়ে গেছে। অভিযোগের কোনোটিই তিনি প্রকাশ্যে অস্বীকার বা ব্যাখ্যা করেননি।
বিএনপির চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া মুশফিকুর রহমানকে দেশ টিভির অনুমোদন দিয়েছিলেন। বিএনপির ক্ষমতা থেকে সরে যাওয়ার পর পরই আওয়ামী লীগ নেতা সাবের হোসেন এর সাথে আতাঁত করে দেশ টিভির মালিকানা হস্তান্তর করেম। এই দেশ টিভি পরে বিএনপির প্রধান বিরোধী মুখপাত্র হিসেবে দীর্ঘদিন কাজ করেছে।
বার্ধক্য জনিত কারনে শারীরিক অসুস্থতা সত্বেও
২০২৬ সালের জাতীয় নির্বাচন ঘনিয়ে আসতেই হঠাৎ তিনি দেশে ফিরে আসেন তিনি। এবং বিভিন্ন কৌশলে মনোনয়ন সংগ্রহ করেছেন বলে দলের একাধিক সূত্র জানিয়েছে। তাঁর এই প্রত্যাবর্তন এবং প্রাথমিক মনোনয়নকে অনেকেই ‘সিন্ডিকেটের খেলা’ ও ‘অস্বাভাবিক প্রভাবের ফল’ হিসেবে দেখছেন।
এলাকার সাধারণ মানুষের ক্ষোভ প্রধানত তাঁর বয়স ও শারীরিক অক্ষমতা ঘিরে। ৯০ বছর বয়সী এই নেতা নিজে নিজে হাঁটতেও অন্যের সহায়তা নেন বলে স্থানীয়দের দাবি। জনসম্মুখে অসংলগ্নভাবে কথা বলায় তাঁর নেতৃত্বদানের সক্ষমতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। ফলে সাড়ে ছয় লাখ মানুষের একটি গুরুত্বপূর্ণ আসনে তাঁকে মনোনীত করা-এলাকাজুড়ে হাস্যরস ও তীব্র সমালোচনার জন্ম দিয়েছে।
নেতা–কর্মীদের ক্ষোভের আরও বড় কারণ-দলের পরীক্ষিত নেতৃত্বকে উপেক্ষা করা। বিগত কঠিন সময়ে কসবা–আখাউড়ার রাজপথে যিনি নেতা–কর্মীদের পাশে ছিলেন, সেই কবীর আহমেদ ভূইয়াকে বিবেচনায় না রেখে দীর্ঘদিন এলাকা–বিচ্ছিন্ন একজন প্রবীণ প্রবাসীকে মনোনয়ন দেওয়াকে অনেকেই ‘অন্যায়’ এবং ‘অপমান’ হিসেবে দেখছেন। এসব ক্ষোভ থেকেই সম্প্রতি হাজার হাজার নেতা–কর্মী ‘কাফনের কাপড়’ পরে কসবা এবং আখাউড়ায় গণমিছিল বের করেন, যা জাতীয় পর্যায়েও ব্যাপক আলোচনার সৃষ্টি করেছে।
বিগত সময়ে মুশফিকুর রহমানকে ঘিরে নানা বিতর্কও রয়েছে। তাঁর ব্যক্তিগত সহকারী আরিফ বর্তমানে ২৫০ কোটি টাকার দুর্নীতি মামলায় কারাগারে আছেন। মুশফিকুর রহমান এমপি থাকাকালে ১০% কমিশন নেওয়া, ‘দেশ টিভি’ অবৈধভাবে বিক্রি, দলীয় প্রয়োজনে কখনো না এসে ব্যক্তিগত স্বার্থে দলকে ব্যবহার করা-এসব অভিযোগ দীর্ঘদিন ধরে স্থানীয়ভাবে ঘুরে বেড়াচ্ছে। পাশাপাশি তিনি কসবা-আখাউড়ার কোথাও ভোটার নন বলেও জানা গেছে।
এলাকার রাজনীতিতে এখন নতুন করে একটি অভিযোগ জোরালো হয়েছে-৫ জনের একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট কসবা-আখাউড়ার রাজনীতি নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রাখতে এই মনোনয়নের পেছনে ভূমিকা রেখেছে। স্থানীয় রাজনৈতিক মহলের দাবি, এই সিন্ডিকেট বিএনপি নেতাকর্মীদের হতাশায় ডুবিয়ে সাড়ে ছয় লাখ মানুষের ভবিষ্যৎ নিয়ে খেলছে।
মুশফিক সিন্ডিকেটের কৌশলে দলের প্রাথমিক মনোনয়ন বাগিয়ে নিয়ে আসে। এসব সিন্ডিকেটের কার সাজি শেষ পর্যন্ত বুমেরাং হচ্ছে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বোদ্ধারা।
পরিস্থিতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, এলাকার সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতাদেরও অনেকেই মনে করছেন-দলের উচিত এই আসনটি পুনর্বিবেচনা করা। নইলে ব্রাহ্মণবাড়িয়া-৪ আসনটি হাতছাড়া হওয়ার ঝুঁকি অত্যন্ত বেশি।















