প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে স্মরণ: গুলজার আহমেদ ছিলেন স্বাধীন জাতীরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অন্যতম কুশিলব

392

ওয়ানবাংলানিউজ ডেস্ক: ষাটের দশকের কিংবদন্তী ছাত্রনেতা, মহান মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক গুলজার আহমেদ ছিলেন একটি স্বাধীন জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অন্যতম কারিগর। এই মহান কর্মকান্ডের জন্য সরকারী সীলমোহরকৃত কোন কাগুজে সার্টিফিকেট না পেলেও মুক্তিযুদ্ধ প্রজন্মের স্মরণ ও স্মৃতিতর্পন থেকে বারবার উচ্চারিত তাঁর এই নাম অবশ্যই খুঁজে নেবে ইতিহাস নিজের প্রয়োজনেই। আর এভাবেই তিনি বেঁচে থাকবেন প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে।

গুলজার আহমেদের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত এক ভার্চুয়াল স্মরণসভায় এমন মন্তব্য করেছেন প্রয়াত এই মু্ক্তিযোদ্ধা রাজনীতিকের এক সময়ের রাজনৈতিক সহযোদ্ধা, হাতেগড়া কর্মী ও অনুসারীরা।

২৬ নভেম্বর, বৃহস্পতিবার অনুষ্ঠিত এই স্মরণসভায় সম্পৃক্ত হয়েছিলেন সারা বিশ্বে ছড়িয়ে থাকা প্রয়াত নেতার রাজনৈতিক অনুসারী ও সুহৃদরা। প্রধান অতিথি হিসেবে গুলজার আহমেদকে নিয়ে স্মৃতি তর্পণ করেন তাঁর অন্যতম রাজনৈতিক সহযোদ্ধা, বাংলাদেশের বাম প্রগতিশীল রাজনীতির সর্বজন শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিত্ব, মুক্তিযোদ্ধা রাজনীতিক, ঐক্যন্যাপ সভাপতি জাতীয় নেতা পংকজ ভট্টাচার্য। বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের সুপরিচিত আইনজীবী, প্রয়াত গুলজার আহমেদের এক সময়ের রাজনৈতিক অনুসারী এডভোকেট তবারক হোসেইনের সভাপতিত্বে ও সাবেক ছাত্রনেতা, সাংবাদিক সৈয়দ আনাস পাশার সঞ্চালনায় অনুষ্ঠিত স্মরণসভায় সূচনা বক্তব্য রাখেন প্রয়াত নেতার এক সময়ের রাজনৈতিক অনুসারী সৈয়দ রকিব (লন্ডন)। সংযুক্ত হয়েছিলেন গণতন্ত্রী পার্টির কেন্দ্রীয় সভাপতি ব্যারিষ্টার আরশ আলী (বাংলাদেশ), রফিকুর রহমান লজু (সিলেট), অধ্যাপক সৈয়দ মুজিবুর রহমান (যুক্তরাষ্ট্র), মাহমুদ এ রউফ (লন্ডন), হাবিব রহমান (লন্ডন), আওয়ামী লীগ নেতা দেওয়ান গৌস সুলতান (লন্ডন), সুব্রত বিশ্বাস (নিউইয়র্ক), ঐক্যনাপের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য আব্দুল মোনায়েম নেহরু (ঢাকা), সাবেক ছাত্র ইউনিয়ন নেত্রী বেগম বিলকিস সর্দার (যুক্তরাষ্ট্র), জালালাবাদ এসোসিয়েশন ঢাকার সাবেক সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ জগলুল পাশা (ঢাকা), ডাঃ এনামুল চৌধুরী (যুক্তরাষ্ট্র), আব্দুল ওদুদ চৌধুরী (যুক্তরাষ্ট্র), লেখক ও মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক গবেষক তাজুল মোহাম্মদ (কানাডা), ডা: মানস কান্তি দাস (যুক্তরাষ্ট্র), মুক্তিযোদ্ধা সাংবাদিক ও লন্ডন বাংলাদেশ হাই কমিশনের সাবেক প্রেস মিনিষ্টার আবু মুসা হাসান (লন্ডন), কাশেম আলী (যুক্তরাষ্ট্র), যুক্তরাজ উদীচী সভাপতি হারুনুর রশীদ (লন্ডন), যুক্তরাজ্য সিপিবি’র সাবেক সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ এনামুল ইসলাম, সাবেক ছাত্রনেতা রুহুল কুদ্দুস বাবুল (সিলেট), রাহেলা বেগম (যুক্তরাষ্ট্র), বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা আমান উদ্দিন (লন্ডন), এম এ মান্নান (লন্ডন), প্রয়াত গুলজার আহমেদের দুই মেয়ে ফাহমিদা পপি হক ( যুক্তরাষ্ট্র) ও ফারজানা সুপি (ঢাকা), প্রবীন সাংবাদিক বাহাউদ্দিন আহমদ (যুক্তরাষ্ট্র), দৈনিক প্রথম আলো’র উত্তর আমেরিকা বুরো চীফ সাংবাদিক ইব্রাহিম চৌধুরী খোকন, ডা: আবুল খান সামাদ (যুক্তরাষ্ট্র), সাবেক ছাত্রনেতা ব্যারিষ্টার সৈয়দ আবু আকবর ইকবাল (লন্ডন) ও সাবেক ছাত্রনেতা সৈয়দ হাসান প্রমূখ।

বক্তারা তাদের স্মৃতিচারণে প্রয়াত গুলজার আহমেদকে সমাজ প্রগতি আন্দোলনের কর্মী তৈরীর একজন শীর্ষ কারিগর হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেন, তাঁর হাতে গড়া অনেক রাজনৈতিক কর্মী এখন বিভিন্ন ক্ষেত্রে সম্মানজনক অবস্থানে অধিষ্ঠিত।

প্রধান অতিথির বক্তৃতায় পংকজ ভট্টাচার্য গুলজার আহমেদকে ইতিহাসের নায়ক আখ্যায়িত করে বলেন, তিনি ছিলেন একটি স্বাধীন জাতিরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অন্যতম কুশিলব। ষাটের দশকে প্রগতিশীল রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের মধ্যে প্রচন্ড জনপ্রিয় এই রাজনীতিককে আমি কাছ থেকে দেখেছি, কাজ করার সুযোগ হয়েছে তাঁর সাথে। কর্মীবান্ধব এই রাজনীতিক ছিলেন আত্মপ্রচার বিমূখ, সংকটে সমাধান বের করতে তিনি ছিলেন পারদর্শী। প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে প্রয়াত নেতার রাজনৈতিক সহকর্মী ও অনুসারীদের এমন একটি স্মরণসভায় সম্পৃক্ত হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করায় উদ্যাক্তাদের ধন্যবাদ দিয়ে তিনি বলেন, ‘আপনারা ঐতিহাসিক একটি কাজ করলেন, বাঙালীর স্বাধীকার আন্দোলনের এক প্রচারবিমূখ কুশিলবকে মৃত্যুর এক বছর পর হলেও আমাদের সম্মান জানানোর সুযোগ করে দিলেন’।

গণতন্ত্রী পার্টির কেন্দ্রিয় সভাপতি ব্যারিষ্টার আরশ আলী বলেন, ‘গুলজার আহমদ শুধু ব্যক্তি নন, তিনি ছিলেন একটি প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠান থেকে তৈরী হয়েছে প্রগতিশীল রাজনীতির অগনিত নেতাকর্মী।’

প্রয়াত এই নেতার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহকর্মী রফিকুর রহমান লজু বলেন, ‘গুলজার আহমদ বৃহত্তর সিলেটের নেতা হলেও, তিনি ছিলেন তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের বাম রাজনীতির অন্যতম এক গুরুত্বপূর্ণ নেতা। ষাটের দশকে আইয়ুব বিরোধী আন্দোলনের সময় গোপন কমিউনিষ্ট পার্টির ছাত্র আন্দোলন বিষয়ক তিন সদস্য বিশিষ্ট কমিটির এক সদস্য ছিলেন গুলজার আহমেদ। কমিটির বাকী দুই সদস্য ছিলেন কমরেড মোহাম্মদ ফরহাদ ও আহমেদ জামান।’ তিনি জানান, সারা দেশের প্রগতিশীল নেতাকর্মীদের মধ্যে তিনি ছিলেন তুমুল জনপ্রিয়। এ বিষয়ে উদাহরণ দিতে গিয়ে রফিকুর রহমান লজু বলেন, ‘৬৪ সালে আমি ও গুলজার ভাই ডিগ্রী পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়ার পর ৬৬ সালে আবার পরীক্ষা দিতে চাইলে এমসি কলেজের তৎকালীন প্রিন্সিপাল সলমান চৌধুরী আমাদের সেই সুযোগ দিতে রাজি হলেন না। বাধ্য হয়ে আমরা ফরিদপুর রাজেন্দ্র কলেজের তৎকালীন অধ্যক্ষ এ কে এম হায়দারের তত্বাবধানে সেখান থেকে পরীক্ষা দেই। ঐসময় ফরিদপুর যাওয়ার পর গুলজার আহমেদ ফরিদপুর এসেছেন এমন খবর ছড়িয়ে পড়লে রাজনৈতিক নেতাকর্মীরা তাকে দেখতে জড়ো হতে থাকে। পরে নেতাকর্মীদের চাপে বাধ্য হয়ে গুলজার ভাইকে সেখানে একটি বিশাল সংবর্ধণা নিতে হয়, যে স্টেইজে আমিও ছিলাম তাঁর সাথে’।

ঐক্যন্যাপের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য আব্দুল মোনায়েম নেহরু নিজেকে গুলজার আহমেদের হাতেগড়া কর্মী পরিচয় দিয়ে বলেন, মহান মুক্তিযুদ্ধে আমি ও গুলজার ভাই এক সাথেই ছিলাম। ঐসময় মেঘালয়ের বালাটের মইলাম ইয়ুথ ক্যাম্পের ইনচার্য ছিলেন তিনি, যে ক্যাম্পে তরুণ মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষন দেয়া হতো।’ মৃত্যুর পর তাকে রাষ্ট্রিয় মর্যাদা না দেয়ায় তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করে জনাব নেহরু বলেন, মুক্তিযোদ্ধা তৈরী করলেন যে নেতা, কাগুজে সার্টিফিকেটের অজুহাতে বাঙালীর অন্যতম শ্রেষ্ট সেই সন্তানকে মৃত্যুর পর রাষ্ট্রিয় মর্যাদা দেয়া হলোনা, এরচেয়ে বড় লজ্জা আর আমাদের জন্য কি হতে পারে।’ তিনি বলেন, ‘দেশ প্রেমিকরা আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতির লোভে দেশের সেবা করেন না। গুলজার ভাইও এইসব স্বীকৃতির ধার ধারতেন না বলেই জীবিত থাকাকালীন সার্টিফিকেটের প্রয়োজন মনে করেননি।