লন্ডনে বাংলাদেশ হাইকমিশনের সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার ডেস্কের মাধ্যমে প্রবাসীদের নানানভাবে সহায়তা দেয়া হচ্ছে-সাইদা মুনা

1054

ওয়ানবাংলানিউজ ডেস্ক: মুজিববর্ষ উপলক্ষে লন্ডনস্থ বাংলাদেশ হাইকমিশনের উদ্যোগে প্রবাসী বাংলাদেশী কমিউনিটির নেতৃবৃন্দের সাথে ভার্চুয়্যাল সংলাপ করেছেন হাইকমিশনার সাইদা মুনা তাসনীম। গত বুধবার অনুষ্টিত এই সংলাপে হাইকমিশনার বিগত দুই বছরে সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতির চিত্র তুলে ধরে বলেন, ২০১৮ সালের তুলনায় ২০১৯ সালে হাইকমিশন ৩৫% বেশী পাসপোর্ট এবং ১০% বেশী এনভিআর ও জন্মনিবন্ধন সনদ ইস্যু করেছে। একই সময়ে উল্লেখযোগ্য হারে পাওয়ার অফ এর্টনি প্রদান করেছে। চলতি বছর মার্চ মাস থেকে অক্টোবর মাস পর্যন্ত হাই কমিশন লকডাউনের মধ্যেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক পাসপোর্ট, এনভিআর ও পাওয়ার অফ এর্টনি দিয়েছে।

তিনি বলেন, যুক্তরাজ্যে লকডাউন চলার সময়ও হাই কমিশন প্রতিটি উইং খোলা রেখে এবং স্বাস্থ্য বিধি মেনে সব ধরনের সেবা চালু রেখেছে। গত সাত মাসে ২৪/৭ দুইটি মোবাইল হেলপ লাইনে একুশ হাজার টেলিফোন কল রিসিভ করা হয়েছে। কোভিডের আগে যুক্তরাজ্য ও আয়ারল্যান্ডে ১৪ বার আঞ্চলিক কনস্যুলার সার্জারীর মাধ্যমে হাই কমিশন তার সেবা প্রবাসীদের দোরগড়ায় পৌঁছে দিয়েছে। ২০১৮ সালে এই ধরনের আঞ্চলিক সেবা প্রদানের সংখ্যা ছিল মাত্র চারটি।

হাইকমিশনার বলেন, তাঁর বিশেষ উদ্যোগে হাই কমিশনে একটি ডেডিকেটেড সোশ্যাল ওয়েলফেয়ার ডেস্ক খোলা হয়েছে। যার মাধ্যমে প্রবাসী দ্বৈত নাগরিকদের বাংলাদেশে পারিবারিক সমস্যা ও সম্পত্তি সংক্রান্ত জটিলতা নিরসনে সহায়তাসহ মুক্তিযোদ্ধাদের গেজেটে নাম অর্ন্তভূক্তি ও মুক্তিযোদ্ধা সনদ প্রাপ্তি ইত্যাদি বিষয়ে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা দেয়া হচ্ছে। বিগত দুই বছরে এ ধরনের দুইশত এর বেশী সহায়তা প্রদান করার ক্ষেত্রে হাই কমিশন বাংলাদেশে ৭৫০টি অফিসে যোগাযোগ করে প্রয়োজনীয় চিঠি পাঠিয়েছে।

যুক্তরাজ্যে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার সাইদা মুনা তাসনীম ‘‘গঁলরন ইধৎংযড় ঐরময ঈড়সসরংংরড়হবৎ’ং উরধষড়মঁব ড়হ ঝবৎারপব ঃড় ঃযব ঈড়সসঁহরঃু’’ শীর্ষক এক বিশেষ সংলাপে বঙ্গবন্ধুর আদর্শে অনুপ্রাণীত জনগণের সেবক হিসেবে ব্রিটিশ-বাংলাদেশী কমিউনিটিকে সর্বোচ্চ মানের সেবা প্রদানে তাঁর ও হাই কমিশনের দৃঢ় অঙ্গীকার পুন:ব্যক্ত করেন।
বাংলাদেশ হাই কমিশন লন্ডনে প্রথমবারের মতো আয়োজিত ব্যতিক্রমধর্মী এই অনুষ্ঠানে হাইকমিশনার কনস্যুলার, বাণিজ্যিক, কল্যাণ ও কোভিড দূর্যোগকালীন মানবিক সেবাসহ বিভিন্ন সেবা সম্পর্কে ব্রিটিশ-বাংলাদেশী কমিউনিটির নেতৃবৃন্দকে অবহিত করেন এবং তাঁদের সাথে অত্যন্ত খোলামেলা ও আন্তরিক পরিবেশে মতবিনিময় করেন।

গত বুধবার হাই কমিশনে আয়োজিত এই ভার্চুয়্যাল সংলাপে যুক্তরাজ্য ও আয়ারল্যান্ডে বসবাসকারী ব্রিটিশ-বাংলাদেশী কমিউনিটির নেতৃবৃন্দ, ব্যবসায়ী, সাংবাদিক, চিকিৎসক, আইনজীবী ও সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্বসহ তরুণ প্রজন্মের বিপুল সংখ্যক প্রবাসী অংশ গ্রহণ করেন। তারা গত দুই বছরে লন্ডন মিশনের কনস্যুলার সেবাসহ অন্যান্য সেবার মানের দৃশ্যমান উন্নতির প্রশংসা করে বলেন, হাই কমিশন বিগত দুই বছরে অনেক বেশি সক্রিয় ও জনমূখী হয়েছে, কমিউনিটির সাথে যোগাযোগ অনেক বেড়েছে এবং দূরত্ব কমেছে।

অনুষ্ঠানের সূচনা বক্তব্যে হাইকমিশনার সাইদা মুনা তাসনীম জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ও ৩ নভেম্বর জেল হত্যা দিবস উপলক্ষে শহীদ জাতীয় চার নেতার প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান। তিনি বলেন, ৪ নভেম্বরও স্বাধীন বাংলাদেশের ইতিহাসে আরেকটি বিশেষ দিন। ১৯৭২ সালের এদিনে বঙ্গবন্ধু গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের জনসেবামূখী সংবিধান স্বাক্ষর করে নিঃশর্ত সেবা প্রদানে প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের একটি দিকনির্দেশনা দিয়ে গেছেন। এ প্রসঙ্গে তিনি জাতির পিতার একটি বিখ্যাত উদ্বৃতি উল্লেখ করেন, ‘‘সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারিদের জনগণের সাথে মিশে যেতে হবে। তারা জনগণের খাদেম, সেবক, ভাই। তারা জনগণের বাপ, জনগণের ভাই, জনগণের সন্তান। তাদের এই মনোভাব নিয়ে কাজ করতে হবে।”

বঙ্গবন্ধুর সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি নির্দেশনার কথা উল্লেখ করে হাইকমিশনার বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীও বলেছেন, “আমরা জনগণের সেবক, জনগণের শাসক নই। জনসেবার জন্য জনপ্রশাসন।” বঙ্গবন্ধু ও মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর এ আদর্শ এবং দিকনির্দেশনা নিয়েই আমি লন্ডন হাই কমিশনে ‘ঝবৎারপব রিঃয ধ ংসরষব ্ ফরমহরঃু’ কর্মসংস্কৃতি চালু করেছি। যাতে হাই কমিশনের প্রতিটি কর্মকর্তা-কর্মচারী সব সময় হাসিমুখে ও দক্ষতার সাথে সেবা প্রদান করেন। হাইকমিশনার লন্ডন মিশনের সেবা সম্পর্কে নিয়মিত দিকনির্দেশনা দেয়ার জন্য পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ. কে. আব্দুল মোমেন-এর প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।

তিনি বলেন, দ্রুত সেবা প্রদানের জন্য কোভিডের আগে হাই কমিশনের কনস্যুলার উইংয়ে ইলেক্ট্রনিক টোকেন পদ্ধতি ও একাধিক সার্ভিস ডেস্ক চালুসহ অভ্যর্থনা কক্ষে ফটোকপি, কম্পিউটার ও পাসপোর্ট সাইজ ছবি তোলার মেশিন বসানো হয়েছিল। কোভিডের কারণে সেবা গ্রহিতারা এখন এসব সুবিধা ভোগ করতে পারছেন না। তবে বয়স্ক এবং শারিরীক প্রতিবন্ধীদের বিশেষ সার্ভিস দেয়া অব্যাহত রয়েছে। যারা হাই কমিশনে আসতে পারছেন না এমন অসুস্থ্য ও অক্ষম ব্যক্তিদের বাড়ীতে গিয়ে হাই কমিশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীর সেবা দিচ্ছেন।

হাইকমিশনার বিশেষভাবে উল্লেখ করেন বর্তমানে কনস্যুলার সেবা গ্রহণের ক্ষেত্রে সব ধরনের ফি ক্রেডিট কার্ড, ডেভিড কার্ড ও পোস্টাল অর্ডারে নেয়া হচ্ছে বিধায় হাই কমিশনে নগদ লেনদেনের কোন সুযোগ নেই। তিনি উল্লেখ করেন বিগত দুই বছরে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করায় হাই কমিশনের সেবার গুগল রেটিং আগের ১.৮ থেকে বর্তমানে ৩.৬-এ উন্নীত হয়েছে।
হাইকমিশনার বলেন, কোভিডের কারণে স্বাস্থ্য বিধি মেনে চলার বাধ্যবাধকতা থাকায় বর্তমানে সেবা গ্রহিতাদের এ্যাপয়েন্টমেন্ট দেয়ার সংখ্যা কমানো হয়েছে, যাতে তারা হাই কমিশন থেকে নিরাপদে সেবা গ্রহণ করতে পারেন। কিন্তু প্রতিদিনই যতসংখ্যক সেবা গ্রহিতা এ্যাপয়েন্টমেন্ট নিয়ে আসছেন প্রায় সমপরিমাণ এ্যাপয়েন্টমেন্ট ছাড়া আসছেন। এদের প্রত্যেককেই হাই কমিশন সেবা দিচ্ছে। এছাড়া কনস্যুলার হেলপ লাইন ও কোভিড জরুরী হেলপ লাইন চালু করে সপ্তাহে প্রতিদিন ২৪ ঘন্টা জরুরী সেবা এবং কোভিড বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক প্যানেল গঠন করে যারা এনএইচএস থেকে স্বাস্থ্য সেবা পাচ্ছেন না হাই কমিশন তাদের স্বাস্থ্য সেবা দেয়ার ব্যবস্থা করেছে। যুক্তরাজ্যে প্রথম লকডাউনের সময় মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে হাই কমিশন দুইটি বিশেষ প্রত্যাবসন বিমানের মাধ্যমে প্রায় তিনশত আটকেপড়া বাংলাদেশীদের দেশে পাঠানোর ব্যবস্থা করেছে। তিনি বলেন, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে বাংলাদেশ হাই কমিশন লন্ডন ‘‘মুজিববর্ষ কনস্যুলার সেবা সপ্তাহ” পালনের পরিকল্পনা গ্রহণ করেছিলো তা কোভিড-এর কারণে স্থগিত রয়েছে। পরিস্থিতির উন্নতি হলে এ সেবা সপ্তাহ পালন করা হবে।

মতবিনিময় অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন যুক্তরাজ্যে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম সংগঠক সুলতান মাহমুদ শরীফ, লন্ডন ভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান স্টাডি সার্কেলের প্রেসিডেন্ট সৈয়দ মোজাম্মেল আলী, কমিউনিটি ব্যক্তিত্ব সৈয়দ সাজিদুর রহমান ফারুক, কাউন্সিলর পারভেজ আহম্মদ, গ্রেটার সিলেট ডেভেলাপমেন্ট ও ওয়েলফেয়ার কাউন্সিলের সভাপতি ব্যারিস্টার আতাউর রহমান, ব্যারিস্টার আবুল কালাম চৌধুরী, বাংলাদেশ ক্যাটারার্স এসোসিয়েশনের সভাপতি এম, এ মুনিম, কমনওয়েল্থ জার্নালিস্ট এসোসিয়েশনের সহ-সভাপতি সৈয়দ নাহাস পাশা, লন্ডন বাংলা প্রেস ক্লাবের সভাপতি মোঃ এমদাদুল হক চৌধুরী, ইউকে বিসিসিআই এর প্রেসিডেন্ট নাজমুল ইসলাম নুরু, ব্রিটিশ-বাংলাদেশ চেম্বার অব কমার্স ও ইন্ডাস্ট্রিজের পরিচালক মাহতাব মিয়া।

হাই কমিশনের সেবা সম্পর্কে তাঁরা বিভিন্ন পরামর্শ প্রদান করেন। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হচ্ছে সেবা গ্রহিতাদের মতামত গ্রহণের ব্যবস্থা চালু করা, হাই কমিশনের কর্মচারীদের জন্য কাস্টমার সার্ভিস ট্রেনিং এর ব্যবস্থা করা, টেলিফোন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন এবং লন্ডনে বাংলাদেশ ক্যালচারাল সেন্টার স্থাপন। এছাড়া কমিউনিটির নেতৃবৃন্দ কনস্যুলার উইংয়ে সেবা গ্রহিতাদের স্থান সংকুলানের তীব্র সংকটের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করে তার সমাধানে অবিলম্বে পার্শ্ববর্তী ভবনটি ক্রয়ের ব্যবস্থা নেয়ার প্রস্তাব করেন। এ প্রসঙ্গে হাইকমিশনার বলেন, মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে এ সম্পর্কে একটি প্রস্তাব ঢাকায় পাঠানো হয়েছিল কিন্তু কোভিডের কারণে উদ্ভুত পরিস্থিতিতে বর্তমানে ভবন ক্রয়ের বিষয়টি স্থগিত রয়েছে। পরিস্থিতির উন্নতি হলে এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করা হবে।