আন্তর্জাতিক ডেস্ক: দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে অস্ত্র বিষয়ক বা আর্মস লিঙ্ক উন্নত করছে চীন। তারা অত্যাধুনিক নিঃশব্দ বিরোধী রাডার ব্যবস্থা সরবরাহ করেছে পাকিস্তানকে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও শ্রীলঙ্কাকে ফ্রিগেট বা রণতরী সরবরাহ দিচ্ছে। এর মধ্য দিয়ে চারদিক থেকে ভারতকে বেষ্টন করছে চীন। অনলাইন সাউথ চায়না মর্নিং পোস্টে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে এসব কথা বলা হয়েছে। ‘চাইনিজ শিপস অ্যান্ড রাডার বুস্ট নেভিস অব পাকিস্তান, বাংলাদেশ অ্যান্ড শ্রীলঙ্কা’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এসব কথা লিখেছেন সাংবাদিক লিউ ঝেন। তিনি জেনস ডিফেন্স উইকলি’কে উদ্ধৃত করেছেন। উল্লেখ্য, বিশ্বের সামরিক ও করপোরেট অ্যাফেয়ার্স নিয়ে রিপোর্ট করা ম্যাগাজিন জেনস ডিফেন্স উইকলি।
তারা রিপোর্টে উল্লেখ করেছে, গত ২৯ শে আগস্ট পাকিস্তানের মিয়াওয়ালি বিমান ঘাঁটি থেকে স্যাটেলাইটে যে ছবি ধারণ করা হয়েছে তাতে সনাক্ত করা হয়েছে চীনে তৈরি জেওয়াই-২৭এ নামের পর্যবেক্ষণযোগ্য রাডার। দীর্ঘ পাল্লার এই থ্রি ডি রাডার নিঃশব্দে চলাচলকারী বিমান যেমন এফ-২২’কে তার অবস্থানস্থল থেকে ৫০০ কিলোমিটার দূরে থাকতেই সনাক্ত করতে পারে। কারণ, এতে ব্যবহার করা হয় অত্যন্ত উচ্চ কম্পাঙ্কের তরঙ্গ। কোনো বাধা বা প্রতিবন্ধকতা একে আটকাতে পারে না। শত্রুপক্ষ থেকে আক্রমণ চালানো হচ্ছে এমন বিমানকে ঘায়েল করতে ভূমি থেকে আকাশে নিক্ষেপযোগ্য ক্ষেপণাস্ত্র পরিচালনার গাইড হিসেবে কাজ করে এই রাডার।
জেনস ডিয়েন্স উইকলির মতে, ৫ই জুন থেকে ২৯ শে আগস্টের মধ্যে পাকিস্তানের উত্তর-পূর্বের বিমানঘাঁটিতে পৌঁছেছে এই রাডার। ২রা সেপ্টেম্বর পর্যন্ত এটা পূর্ণাঙ্গ অপারেশনে যায় নি। জেওয়াই-২৭এ রাডার বেচা-কেনা নিয়ে কিছুই প্রকাশ্যে জানায় নি পাকিস্তান বা চীন। কিন্তু এ মাসের শুরুর দিকে সাংহাই শিপইয়ার্ডে এক অনুষ্ঠানে যোগ দিয়েছিলেন দুই দেশের প্রতিনিধিরা। এটা ছিল টাইপ-০৫৪এ গাইডেড মিসাইল ফ্রিগেটের দ্বিতীয় চালানকে কেন্দ্র করে।
পাকিস্তান নৌবাহিনীর জন্য চীনের জাহাজপ্রস্তুতকারক সিএসএসসি তৈরি করেছে তৃতীয় ও চতুর্থ জাহাজ। প্রথম দুটি টাইপ ০৫৪এ/পি তৈরির কাজ শুরু হয় ২০১৮ সালের ডিসেম্বরে। ২০২১ সালের মধ্যে তা পাকিস্তানকে বুঝে দেয়ার কথা রয়েছে। ২০০৭ সাল থেকে চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মি নেভি যেসব রণতরী নামিয়েছে তার মধ্যে প্রধান আকর্ষণ হলো টাইপ ০৫৪এ রণতরী। এরই মধ্যে এফ২২পি’র চারটি রণতরী রয়েছে পাকিস্তান নৌবাহিনীর কাছে। এর মধ্যে আগের টাইপ ০৫৩ এবং টাইপ ০৫৪ ভিত্তিক চীনা ডিজাইনের রয়েছে একটি। তিনটি নির্মাণ করা হয়েছে চীনে। সাংহাইভিত্তিক সামরিক ভাষ্যকার শি লাও বলেছেন, প্রতিপক্ষ ভারতীয় নৌবাহিনীর তুলনায় পাকিস্তানের নৌবাহিনী অধিকতর উন্নত সরঞ্জামে সজ্জিত হবে।
গত সপ্তাহের ছবিতে দেখা গেছে, চীনের পিপলস লিবারেশন আর্মির সদ্য অবসরে পাঠানো দুটি রণতরী টাইপ ০৫৩এইচ৩ পুটিয়ান এবং লিয়ানুঙ্গাং’কে সাংহাইয়ে নতুন করে সাজানো হয়েছে। এগুলো বাংলাদেশ নৌবাহিনীর রঙে পেইন্ট করা হয়েছে এবং নাম্বার বসানো হয়েছে। এগুলো কিনেছে বাংলাদেশ। এ বছরের শেষ নাগাদ তা বাংলাদেশের হাতে হস্তান্তর করা হতে পারে। এ ছাড়া শ্রীলঙ্কার নৌবাহিনীকে টাইপ ০৫৩এইচ২জি জাহাজ টোংলিং উপহার হিসেবে দিয়েছে চীন। এর নতুন নাম দেয়া হয়েছে পরাক্রমবাহু। এই জাহাজটিকে গত আগস্টে কমিশন দেয়া হয়েছে কলম্বোতে। ফলে ভারত মহাসাগরে চীনে তৈরি যুদ্ধজাহাজের সঙ্গে যুক্ত হয়েছে তা।
উল্লেখ্য, এই অঞ্চলে চীনের সামরিক শক্তি বৃদ্ধি দীর্ঘদিন ভারতের কাছে উদ্বেগের বিষয়। ভারত যাকে মুক্তোর মালা বা স্ট্রিং অব পার্লস বলে মনে করে, তা চারদিক থেকে ঘিরে ফেলছে চীন। আর তা করছে ভারত মহাসাগরে প্রতিবেশী দেশগুলোর সঙ্গে সম্পর্কের উন্নতি ঘটিয়ে। সাংহাই মিউনিসিপ্যাল সেন্টার ফর ইন্টারন্যাশনাল স্টাডির দক্ষিণ এশিয়া বিশেষজ্ঞ ওয়াং দেহুয়া বলেন, দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর সঙ্গে চীনের সামরিক সহযোগিতা নতুন কিছু নয়। এ ধারা চলছে বহু দশক ধরে। পাকিস্তান সহ এসব দেশকে চীন যেসব সহযোগিতা বা প্রস্তাব দিচ্ছে তা ভারতের জন্য বড় কোনো হুমকি নয়। কারণ, ভারতের হাতে যে পরিমাণ অস্ত্রশস্ত্র আছে চীনের তৎপরতায় সেই মাত্রায় পৌঁছাবে না। তিনি আরো বলেন, বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কা সহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে এর চেয়ে শক্তিশালী এবং দীর্ঘস্থায়ী সামরিক সম্পর্ক বিদ্যমান ভারতের। তিনি আরো বলেন, দক্ষিণ এশিয়াকে ভারত দেখে তার ব্যাকইয়ার্ড বা উঠোন হিসেবে। আর এ অঞ্চলে চীনের উপস্থিতিকে তারা দেখে আতঙ্ক হিসেবে। ভারতের এই মনোভাবের ইতি ঘটা উচিত।















