ওয়ানবাংলানিউজ: পূর্ব লন্ডনের বেথনাল গ্রীনের ডারবিশায়ার স্ট্রিটের অক্সফোর্ড হাউজে ৪ঠা নভেম্বর, সোমবার বিকেল সাড়ে ৫টায় আয়োজিত এই নাগরিক স্মরণসভায় রাষ্ট্রের পক্ষে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন যুক্তরাজ্যে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাই কমিশনার সাইদা মুনা তাসনিম। প্রধান বক্তা হিসেবে বক্তব্য রাখবেন, ষাটের দশকের ছাত্র আন্দোলনের তুখোড় ছাত্রনেতা, অধ্যাপক মোজাফফর আহমদের দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক সহযোদ্ধা, ঐক্য ন্যাপ সভাপতি, জাতীয় নেতা পঙ্কজ ভট্টাচার্য। অসুস্থ শরীর নিয়েও অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকতে সম্মতি জ্ঞাপন করেছেন প্রয়াত মোজাফফর আহমদের স্নেহধন্য ছাত্র, রাজনীতির সেই স্বর্ণোজ্জোল দিনগুলোর প্রত্যক্ষ সাক্ষী কিংবদন্তী সাংবাদিক আবদুল গাফ্ফার চৌধুরী। ব্রিটেনে মুক্তিযুদ্ধের প্রবীন সংগঠক সুলতান শরীফসহ রাজনীতি ও বিভিন্ন অঙ্গনের অগ্রণী ব্যক্তিবর্গও স্মরণসভায় কথা বলবেন সদ্য প্রয়াত প্রবীন রাজনীতিক অধ্যাপক মোজাফফর আহমদকে নিয়ে।
স্মরণ সভ সফল করতে ব্রিটেনে মুক্তিযুদ্ধের প্রবীন দুই সংগঠক সুলতান মাহমুদ শরীফ ও মাহমুদ এ রউফকে যথাক্রমে প্রধান উপদেষ্টা ও আহবায়ক করে এর আগে রাজনীতি ও বিভিন্ন অঙ্গনের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের সমন্বয়ে গঠন করা হয় ‘অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ নাগরিক স্মরণসভা কমিটি, যুক্তরাজ্য’। স্মরণ অনুষ্ঠান উপলক্ষে এই কমিটির উদ্যোগে একটি ম্যাগাজিন প্রকাশ ছাড়াও বিভিন্ন কর্মসূচী গ্রহন করা হয়।
উল্লেখ্য, গত ২৩শে আগষ্ট ৯৭ বছর বয়সে ঢাকায় শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন বার্ধক্য আক্রান্ত কিংবদন্তী এই রাজনীতিক।
আমাদের রাজনৈতিক ইতিহাসে অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ ছিলেন এক কিংবদন্তীতূল্য নাম। ‘অধ্যাপক মোজাফফর, মার্কা তাঁর কুঁড়েঘর’। ‘কুড়েঘরের মোজাফফর’ নামে সারা দেশে ছিলো তাঁর ব্যাতিক্রমী এক পরিচিতি। শোষনহীন একটি সমাজ প্রতিষ্ঠার প্রত্যয়ে তিনি লড়ে গেছেন আজীবন। ষাটের দশক থেকে শুরু করে স্বাধীনতা পরবর্তী বঙ্গবন্ধুর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত মূলধারার রাজনীতিতে তিন শীর্ষনেতার একজন ছিলেন অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান, কমরেড মনি সিং ও অধ্যাপক মোজাফফর আহমদকে কেন্দ্র করেই তখন আবর্তিত হতো রাজনীতি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃতী ছাত্র মোজাফফর আহমদ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকতার লোভনীয় চাকুরী ছেড়ে বাংলা ভূখন্ডের শোষিত মানুষের ভাগ্যন্নোয়নের লক্ষ্যে রাজনীতিতে যোগ দিয়েছিলেন।
দীর্ঘদিন বিভিন্ন কলেজে শিক্ষকতা করার পর শেষমেশ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে অধ্যাপনা করেন ১৯৫২ থেকে ১৯৫৪ সাল পর্যন্ত। তাঁর রাজনৈতিক জীবন অত্যন্ত বর্ণিল। রাজনীতি অঙ্গনে তাঁর শুভসূচনা হয় ১৯৩৭ সালের দিকে। ১৯৫২ সালের মহান ভাষা আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন তিনি। ১৯৫৪ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতির অধ্যাপনা ছেড়ে দিয়ে সম্পূর্ণভাবে রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত হয়ে যান অধ্যাপক মোজাফফর। ১৯৫৪ সালের সাধারণ নির্বাচনে নিজ জেলা কুমিল্লার দেবিদ্বার আসনে মুসলিম লীগের শিক্ষামন্ত্রীকে পরাজিত করে তিনি তাক লাগিয়ে দেন রাজনীতির ময়দানের সবাইকে। আওয়ামী লীগের বিরোধিতা সত্ত্বেও ১৯৫৭ সালের ৩রা এপ্রিল পূর্ববঙ্গ প্রাদেশিক পরিষদে ন্যাপ এর প্রতিনিধি নেতা হিসেবে অধ্যাপক মোজাফফর আঞ্চলিক স্বায়ত্তশাসনের প্রস্তাব উত্থাপন করেন। সামরিক শাসক আইয়ুব সরকার তার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা ও হুলিয়া জারি করে ১৯৫৮ সালের দিকে। তাকে ধরিয়ে দিলে পুরস্কার প্রাপ্তির ঘোষণা পর্যন্ত করা হয়। আত্মগোপনে থাকা অবস্থায় তিনি আইয়ুব শাসনের বিরুদ্ধে আন্দোলন সুসংগঠিত করেন। দীর্ঘ আট বছরব্যাপী আত্মগোপনে থাকার পর ১৯৬৬ সালে প্রকাশ্য রাজনীতিতে প্রত্যাবর্তন করেন মোজাফফর আহমদ। প্রগতিশীল জাতীয়তাবাদী বাম রাজনৈতিক দল ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) ১৯৬৭ সালের ৩০ নভেম্বর রংপুর জেলায় অনুষ্ঠিত এক কাউন্সিল অধিবেশনের পর চীনপন্থী ও মস্কোপন্থী-এ দুই শিবিরে বিভক্ত হয়ে পড়ে।
চীনপন্থী ন্যাপের সভাপতি হন মাওলানা ভাসানী এবং মস্কোপন্থী ন্যাপের সভাপতি হন সীমান্ত প্রদেশের খান আব্দুল ওয়ালী খান। মস্কো শিবিরে পূর্ব পাকিস্তান ন্যাপের সভাপতি ছিলেন অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ। এ অংশ মোজাফফর ন্যাপ নামেও পরিচিত ছিল। অবিভক্ত পাকিস্তান ন্যাপের যুগ্ম সম্পাদকও ছিলেন তিনি। ১৯৬৯ সালে আইয়ুব সরকারবিরোধী আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়ে তিনি কারাবরণও করেছেন।
বাঙালি জাতির স্বাধীকার ও গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে, মুক্তিযুদ্ধে তিনি ছিলেন রাজনীতির সামনের সারিতে। বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার তথা মুজিব নগর সরকারের ছয় সদস্যের যে উপদেষ্টা পরিষদ গঠিত হয়েছিলো, তাঁদের মধ্যে একজন ছিলেন অধ্যাপক মোজাফফর আহমদ। তিনি স্বাধীনতার পক্ষে আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ের লক্ষ্যে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে সফর করেন। সে সময় তিনি জাতিসংঘে বাংলাদেশ সরকারের প্রতিনিধিত্ব করেন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন ন্যাপ, সিপিবি ও ছাত্র ইউনিয়ন থেকে নিজস্ব উনিশ হাজার মুক্তিযোদ্ধা সংগঠনে অধ্যাপক আহমদের ছিলো অবিস্মরণীয় ভূমিকা। মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে তৎকালীন পরাশক্তি সোভিয়েত ইউনিয়নের সমর্থন আদায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন অধ্যাপক মোজাফফর আহমেদ।















