জাতিসংঘের তিন সংস্থার প্রধানকে পররাষ্ট্রমন্ত্রী; বাংলাদেশে নয় মিয়ানমারে যান

415

ঢাকা সংবাদদাতা: রোহিঙ্গা ইস্যুতে জাতিসংঘের তিন সংস্থার প্রধানকে কড়া জবাব দিয়েছেন পররাষ্ট্রমন্ত্রী একে আবদুল মোমেন।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে বৃহস্পতিবার তাদের সঙ্গে বৈঠকে মন্ত্রী সাফ জানিয়ে দেন, বাংলাদেশ নয়, মিয়ানমারে গিয়ে কাজ করেন। রোহিঙ্গা ফিরিয়ে নিতে তাদের ওপর চাপ প্রয়োগ করেন।

তিন সংস্থার প্রধান হলেন- জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থার হাইকমিশনার ফিলিপো গ্রান্ডি, আন্তর্জাতিক অভিবাসন সংস্থার মহাপরিচালক অ্যান্টনিও ভিটোরিনো এবং জাতিসংঘের মানবিক বিষয়ক আন্ডার-সেক্রেটারি জেনারেল মার্ক লোকক। ৩ দিনের সফর শেষে আজ তাদের ফিরে যাওয়ার কথা।

রোহিঙ্গাদের জন্য ভাসানচরে সাময়িকভাবে বাসস্থানের যে ব্যবস্থা করা হয়েছে, বৈঠকে জাতিসংঘের কর্মকর্তারা তার বিরোধিতা করেন।

এ বিষয়ে বৈঠক শেষে পররাষ্ট্রমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেন, আমরা জানিয়েছি, কিছু লোককে ভাসানচরে নিয়ে যেতে চাই। কারণ বলা হচ্ছে, আগামী বর্ষা মৌসুমে অনেক বৃষ্টিপাত হবে। তাতে ভূমিধস হলে অনেক লোক মারা যাবে এবং মারা গেলে আমরা এর জন্য দায়ী থাকব না। আপনারা যারা বাধা দিচ্ছেন তারা এর জন্য দায়ী থাকবেন।

মন্ত্রী বলেন- আমি বলেছি, আপনাদের এখানে কাজ নেই, মিয়ানমারে যান। আমি বেশ শক্তভাবে বলেছি। আপনারা ওখানে (মিয়ানমারে) বেশি জোর দেন, এখানে নয়।

আমি জিজ্ঞাসা করেছি, আপনারা কতবার সেখানে গেছেন, সেখানে আপনাদের কত লোক কাজ করেন? এখানে এক হাজারের বেশি লোক কাজ করেন, ওখানে বেশি কাজ করেন, এখান থেকে বিদায় হোন।

আপনারা মিয়ানমারকে কনভিন্স করেন, যাতে তারা তাদের লোক (রোহিঙ্গাদের) নিয়ে যায় এবং ওখানে একটি সহায়ক পরিবেশ তৈরিতে কাজ করেন। ২ হাজার ৫০০ কোটি টাকা খরচে ভাসানচরে ১ লাখ রোহিঙ্গার সাময়িক বাসস্থানের ব্যবস্থা করেছে সরকার। তবে জাতিসংঘসহ আরও কয়েকটি পশ্চিমা দেশ রোহিঙ্গাদের স্থানান্তরে বাধা দিচ্ছে।

তবে কোনো রোহিঙ্গাকে জোর করে ভাসানচরে নেয়া হবে না বলেও জানান মন্ত্রী। তিনি বলেন, আমরা জোর করে কাউকে ভাসানচরে নেব না।

তবে যারা যাবে তাদের জন্য একটি ভালো অবস্থান হবে। ওখানে গেলে রোহিঙ্গারা অর্থনৈতিক কাজকর্ম পাবে। মাছ ধরতে পারবে, গরু পালন করতে পারবে।

রোহিঙ্গারা কক্সবাজারে ঝামেলা তৈরি করছে উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, স্থানীয় জনগণ খুব আপসেট, এরা দিন দিন ঝামেলা সৃষ্টি করছে। আমরা বলেছি, ওদের সংখ্যা এত যে তারা আমাদের বনজঙ্গল সব উজাড় করে দিচ্ছে। পররাষ্ট্রমন্ত্রী তিন সংস্থার প্রধানকে রোহিঙ্গা সমস্যার স্থায়ী ও সুষ্ঠু সমাধানের জন্য বিশ্ব জনমত তৈরির আহ্বান জানিয়ে বলেন, এতবড় সংস্থার প্রধান আপনারা, আপনারা বিশ্বব্যাপী জনমত তৈরি করতে পারেন। আমার ধারণা, জনমত তৈরি করতে পারলে সবচেয়ে বড় অত্যাচারী শাসকেরও পতন হয়।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, তাদের এটাও বলেছি, মিয়ানমারের বেশিরভাগ ব্যবসা ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সঙ্গে, জাপান সেখানে বিনিয়োগ করেই চলেছে, ব্যাংকিং চালায় সিঙ্গাপুর।

আপনারা সেখানে চাপ দেন যাতে করে তারা মিয়ানমারকে চাপ দেয় তাদের লোক ফেরত নেয়ার জন্য। আমরা তাদের বলেছি, এটির দ্রুত সমাধান না করা গেলে যারা যুবক আছে তারা উগ্রবাদের দিকে ঝুঁকে পড়তে পারে।

এখানে উগ্রবাদ হলে গোটা অঞ্চলের জন্য খারাপ হবে। এটা হলে মিয়ানমারের দুঃখ আছে।

‘সমস্যা মিয়ানমার তৈরি করেছে, সমাধানও তাদের করতে হবে’ মন্তব্য করে মন্ত্রী বলেন, যুদ্ধ নয়, আমরা শান্তিপূর্ণ সমাধান চাই। আমাকে কেউ কেউ বলেছে, তোমরা যদি চাও তবে আমরা সেখানে কিছু একটা মহড়া করতে পারি।

এরা কারা জানতে চাইলে পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, অত্যন্ত পাওয়ারফুল লোক বলেছেন। এটি ব্যক্তি না দেশ জানতে চাইলে তিনি বলেন, দেশ। আমরা খুব একটা পাত্তা দেইনি। তারা বলেছেন, তোমরা চাইলে আমরা তোমাদের হয়ে ক্ষমতা দেখাতে পারি। আমরা বলেছি না, কারণ আমরা শান্তিপূর্ণভাবে সমাধান করতে চাই।

তিন সংস্থার প্রধানকে মন্ত্রী রাখাইনে কারা অস্ত্র সরবরাহ করছে সেটি খুঁজে বের করার পরামর্শ দিয়ে বলেন, এর ফলে কে বা কারা এর পেছনে আছে আমরা তা জানতে পারব। তিনি বলেন, বিভিন্ন জায়গায় সন্ত্রাসী ঘটনা ঘটছে এবং বিভিন্ন তথ্য আমরা পাই। কিন্তু মিডিয়াতে কখনও আসে না অস্ত্র কোন দেশের তৈরি, কোন কোম্পানির তৈরি বুলেটে লোকটা মারা গেছে। মন্ত্রী বলেন, এগুলো জানা গেলে সন্ত্রাস কমে যাবে।

পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, রোহিঙ্গারা যখন রাখাইনে ছিল তখন তাদের বাচ্চাদের শিক্ষার বিষয়ে জাতিসংঘ বা অন্য দেশগুলো কোনো কথা না বললেও বাংলাদেশে অবস্থিত রোহিঙ্গা বাচ্চাদের বাংলা শিক্ষার বিষয়ে তারা অনেক আগ্রহী। তিনি বলেন, অনেক বাচ্চা আছে এবং তাদের স্কুলে যাওয়া উচিত। এক্ষেত্রে তাদের উচিত হবে মিয়ানমারের ভাষা শেখা এবং দেশটির ইতিহাস জানা। বাংলাদেশে এ ধরনের কোনো ব্যবস্থা নেই। সুতরাং তাদের ফেরত যাওয়া উচিত এবং সেখানে তারা শিক্ষা গ্রহণ করুক।

বৈঠক শেষে জাতিসংঘের মানবিক বিষয়ক আন্ডার-সেক্রেটারি জেনারেল মার্ক লোকক সাংবাদিকদের বলেন, অত্যন্ত ফলপ্রসূ আলোচনা হয়েছে। কীভাবে রোহিঙ্গারা দ্রুত মিয়ানমারে ফিরে যেতে পারে সে ব্যাপারেও কাজ চলছে। তবে দেশটির সেনাবাহিনীর কারণে ফিরে যাওয়ার প্রক্রিয়াটি পিছিয়ে যাচ্ছে।