বিশাল আয়োজনে সাপ্তাহিক পত্রিকার ২১তম বর্ষপূর্তি উদযাপন

519

ওয়ানবাংলানিউজ : বিশাল আয়োজন আর তাতে কমিউনিটির সর্বস্তরের মানুষের জমজমাট উপস্থিতি। আনন্দ আড্ডায় ছড়িয়ে পড়া প্রাণের উচ্ছ্বাস। সব মিলিয়ে সাপ্তাহিক পত্রিকার ২১তম বর্ষপূতি উদযাপন হয়ে উঠলো এক সার্থক মিলনমেলা। আর এর মধ্যদিয়ে বিলেতে বাংলা গণমাধ্যমের যাত্রাপথে এক ঐতিহাসিক ঘটনারই সংযুক্তি ঘটলো। বিলেতে প্রথম কোনো বাংলা সংবাদ মাধ্যম হিসেবে সাপ্তাহিক পত্রিকাই কমিউনিটির সর্বস্তরের মানুষকে নিয়ে বর্ণাঢ্য আয়োজনে প্রতিষ্ঠাবার্ষিক উদযাপনের কৃতিত্ব দেখালো। গত ১৪ অক্টোবর রোববার পূর্ব লন্ডনের সুবিশাল ম্যাফেয়ার ভেন্যুতে অনুষ্ঠিত হয় সাপ্তাহিক পত্রিকার প্রতিষ্ঠাবার্ষিক উদযাপন আয়োজন। উল্লেখ্য, ১৯৯৭ সালে যাত্রা শুরু করা সাপ্তাহিক পত্রিকা গত ২৮ মে এর যাত্রার ২১ বছর পূর্ণ করে। নকশায় সৃজনশীলতা আর সংবাদে বস্তুনিষ্ঠতার জন্য সুপরিচিত পত্রিকার এই মাইলফলক উদযাপন করতেই ওই আয়োজন। কমিউনিটির বিশিষ্টজন, ব্যবসায়ী, লেখক, সংস্কৃতিকর্মী, রাজনীতিক, শিক্ষাবিদ ও গণমাধ্যমকর্মীসহ বিপুলসংখ্যক মানুষের প্রাণবন্ত উপস্থিতি জানান দিল ছাপা সংবাদপত্রের প্রতি পাঠকদের ভালবাসা এখনও আছে।

পত্রিকার এই উদযাপনের মূল স্লোগান ছিল ‘সাহসী পথ চলার একুশ’। বক্তাদের কণ্ঠেও উঠে এল সাহস নিয়ে পত্রিকার এগিয়ে চলার কথা। বাংলাদেশি কমিউনিটির ইতিহাস, ঐহিত্য ও কৃষ্টি রক্ষার পাশাপাশি অধিকার আন্দোলনে কমিউনিটিকে ঐক্যবদ্ধ রাখার বিষয়ে বাংলা গণমাধ্যমের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকার কথা উল্লেখ করেন বক্তারা। তারা বলেন, এসব কাজে সাপ্তাহিক পত্রিকা নিজস্ব স্বকীয়তা বজায় রাখার মাধ্যমে বিশেষ ভূমিকা পালন করে যাচ্ছে। সম্পাদকের বক্তব্যের পর পত্রিকার শুরু ও দীর্ঘ একুশ বছরের পথচলা নিয়ে প্রচারিত হয় একটি প্রামাণ্য চিত্র।

অনুষ্ঠানের প্রধান অতিথি ডেপুটি এটর্নি জেনারেল রবার্ট বাকল্যাণ্ড ব্রিটেনে বাংলাদেশি কমিউনিটির নানা অবদানের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, একটি জাতির সচেতনতার পাশাপাশি ক্ষমতাবানদের জবাবদিহিতার জন্য গণমাধ্যমের ভূমিকা অপরিসীম। আর একটি কমিউনিটি সংবাদপত্র বাড়তি দায়িত্ব হিসেবে কমিউনিটির সুখ, দুঃখ, আকাঙ্খা এবং অধিকারের কথা তুলে ধরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলে। এমপি রবার্ট জেমস বাকলেন্ড কিউসি ব্রিটেনে বাংলা সংবাদপত্রের ১শ বছরেরও বেশি সময়ের ইতিহাসের কথা জেনে বিষ্ময় প্রকাশ করেন। একটি সমৃদ্ধ কমিউনিটি হিসেবে ব্রিটেনের বিভিন্ন সেক্টরে ব্রিটিশ-বাংলাদেশীদের উজ্জল অবস্থানের প্রশংসা করে রবার্ট বাকলেন্ড বলেন, শিকড় সংস্কৃতি থেকে যারা অনুপ্রেরণা নেয়, বিশ্বসভায় অবস্থান তৈরীতে তাদের বেগ পেতে হয়না।

প্রথম আলোর নিয়মিত কলাম লেখক সাংবাদিক কামাল আহমদ গণমাধ্যমে বর্তমান সংকট ও সম্ভবনার কথা তুলে ধরে বক্তব্য রাখেন। তিনি বলেন, কমিউনিটির প্রয়োজনে সংবাদপত্র টিকিয়ে রাখতে হবে। আর বর্তমান সময়ে প্রযুক্তি নির্ভরতা, সেটিকে গ্রহণ করে সংবাদমাধ্যমগুলোকে টিকে থাকতে হবে। অনলাইনের এই যুগে সংবাদপত্রগুলোকে নিজস্ব ওয়েবসাইট তৈরি করে খবর ছাপার পাশাপাশি অডিও, ভিডিও আকারে সংবাদ উপস্থাপনের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ মিডিয়া হাউজ হিসেবে গড়ে তুলতে হবে। কমিউনিটির ব্যবসা, সংস্কৃতি, শিক্ষা বিষয়ে কিভাবে ভূমিকা রাখা যায় সেসব বিষয়েও ভাবার পরামর্শ দেন তিনি। কামাল আহমদ বলেন, সংবাদপত্রকে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান হিসেবে দাড় না করলে, কৃত্রিমভাবে বেশি দিন টিকিয়ে রাখা যাবে না।

পত্রিকার প্রতিষ্ঠাতা আহমেদ উস সামাদ চৌধুরী পত্রিকার সূচনালগ্নের কথা তুলে ধরে বক্তব্য রাখেন। তিনি বলেন, বিলেতে বাংলা সংবাদপত্র জগতে বৈচিত্র আনার লক্ষ্যেই তিনি পত্রিকার সূচনা করেছিলেন। এক সময় নিয়মিতভাবে পত্রিকা বাংলাদেশে যেতো সেখানকার পাঠকদের কাছে। তিনি বলেন, বর্তমানে বাংলা সংবাদপত্রের ক্রান্তিকাল চলছে। তবে সকলের সহায়তা থাকলে বাংলা সংবাদপত্র আরও দীর্ঘকাল টিকে থাকবে। যে কোনো প্রযোজনে তিনি সাপ্তাহিক পত্রিকার সঙ্গে থাকার ঘোষণা দেন। পত্রিকাটির সফল একুশ বর্ষপূর্তিতে সন্তোষ প্রকাশ করে বলেন, নিজের তৈরী করা একটি প্রতিষ্ঠানের সফলতা দেখার মধ্যে আলাদা একটি তৃপ্তি থাকে। সেই তৃপ্তিতে তৃপ্ত আমি আজকের অনুষ্ঠানে এসে।

ব্যারোনেস পলা মঞ্জিলা উদ্দিন মূলধারার রাজনীতিতে ব্রিটিশ-বাংলাদেশীদের উত্থানপর্বে বাংলা সংবাদপত্রের নিরলস ভূমিকা কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করেন তাঁর বক্তৃতায়। তিনি বলেন, শিকড় সংস্কৃতির সাথে সম্পর্কিত রেখে আমাদের প্রজন্মের পরের প্রজন্মও যাতে ব্রিটিশ মূলধারায় যার যার পছন্দের ক্ষেত্রে নিজেদের অবস্থান করে নিতে পারে, সে চেষ্টাও করে যাচ্ছে বাংলা সংবাদপত্রগুলো।

বিলেতের বাংলা সংবাদপত্রের সাথে পূর্বপ্রজন্মের সম্পর্কের কথা স্মরণ করে ব্রিটিশ পার্লামেন্টের প্রথম বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত এমপি রোশনারা আলী তাঁর বক্তৃতায় বলেন, বাংলা সংবাদপত্রের সাথে রয়েছে আমাদের পিতৃপ্রজন্মের আবেগী সম্পর্ক। এতে আমরা আমাদের বাবাদের স্পর্শ পাই। তিনি উদাহরণ দিতে গিয়ে ১৮ বছর বয়সে অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটিতে নিজের অধ্যায়নের সুযোগ লাভের স্মৃতিচারণ করেন। তিনি বলেন, ‘আজকের পত্রিকা সম্পাদক এমদাদুল হক চৌধুরী আমার সাফল্য নিয়ে এক রিপোর্ট স্টোরি করেন। একই সময় আমাকে নিয়ে ‘দ্যা টাইমস’-এ একটি প্রতিবেদন ছাপা হয়। আমার সাফল্যের স্টোরি সম্বলিত বাংলা সংবাদপত্রটি আমার বাবা আমাকে এনে দেখান। তখন তাঁকে ধন্যবাদ দিয়ে আমি জানতে চাই ‘বাবা আপনি কি আমাকে নিয়ে প্রচারিত ‘দ্যা টাইমস’ এর প্রতিবেদন দেখেছেন? বাবা জানালেন তিনি তা দেখেননি’। তিনি বলেন, টাইমস নয়, বাবার কাছে তখন তাঁর মেয়ের সাফল্যের খবর বাংলা পত্রিকায় প্রচারিত হয়েছে, এটিই ছিলো গুরুত্বপূর্ণ। এই পত্রিকাগুলোর সাথে সম্পৃক্ত তাদের আবেগ অনুভূতিই আমাদের কমিউনিটিকে নিয়ে এসেছে আজকের মর্যাদাপূর্ণ অবস্থানে। ব্রিটিশ পার্লামেন্টে প্রথম বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত এমপি হিসেবে তাঁর প্রবেশে ব্রিটেনের বাংলা সংবাদপত্রের ভূমিকার কথা স্মরণ করে রোশনারা বলেন, ব্রিটিশ পার্লামেন্টে নিজেদের কমিউনিটির একজন প্রতিনিধি প্রেরণে পত্রিকাসহ বাংলা সংবাদপত্রগুলো যে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে তা অবশ্যই কমিউনিটি ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
বক্তৃতায় সবাইকে পত্রিকার গ্রাহক হবার আহবান জানিয়ে আনোয়ার চৌধুরী নিজে এখন থেকে তিনি নিজে পত্রিকার গ্রাহক হবার ঘোষণা দেন।

অনুষ্ঠানের অন্যতম আকর্ষণ ছিল লেস্টার সিটির ফুটবলার হামজা চৌধুরীর উপস্থিতি। ঝাঁকড়া চুলের এই উদীয়মান ফুটবল তারকার পুরো নাম দেওয়ান হামজা চৌধুরী। বাবা-মা, স্ত্রীসহ পরিবারের অন্যান্য সদস্যকে সঙ্গে নিয়েই তিনি পত্রিকার অনুষ্ঠানে আসেন। মঞ্চে সিলেটের আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলে তিনি দর্শকদের মাত করে দেন। হামজা দেওয়ান চৌধুরী বলেন, বাংলাদেশের মধ্যে সবচেয়ে ভালো লাগে তাঁর দেশটির মানুষকে। বাংলাদেশের মানুষ অন্যের প্রতি যতœশীল ও অত্যন্ত মনখোলা মন্তব্য করে ব্রিটিশ মূলধারার বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত তারকা ফুটবলার হামজা চৌধুরী সিলেটিতে বলেন, ‘আমি কতবার গেছি বাংলাদেশো’, এরপরও বার বার যাইতাম চাই’।

চ্যানেল এস-এর প্রডিউসার ও জনপ্রিয় উপস্থাপক ফারহান মাসুদ খানের উপস্থাপনায় অনুষ্ঠানে বক্তব্য রাখেন লন্ডন বাংলা প্রেস ক্লাবের প্রতিষ্ঠাতা প্রেসিডেন্ট মুহিব চৌধুরী। এছাড়া বক্তব্য রাখেন লন্ডন বাংলা প্রেসক্লাবের প্রেসিডেন্ট সৈয়দ নাহাস পাশা, সী-মার্ক গ্রুপের চেয়ারম্যান ইকবাল আহমদ ওবিই, টাওয়ার হ্যামলেটস কাউন্সিলের মেয়র জন বিগস প্রমুখ। তাঁরা পত্রিকার প্রতিষ্ঠাবার্ষিকে শুভেচ্ছা জানানোর পাশাপাশি কমিউনিটির সেবায় পত্রিকার নানা অবদানের প্রশংসা করেন।

পত্রিকার সম্পাদক মোহাম্মদ এমদাদুল হক চৌধুরী আগত অতিথিদের স্বাগত জানিয়ে বক্তব্য রাখেন। তিনি পত্রিকার পাঠক, বিজ্ঞাপনদাতা, শুভানুধ্যায়ী সকলকে ধন্যবাদ জানান। তিনি বাংলা মিডিয়াকে কমিউনিটির ইন্স্যুরেন্স অভিহিত করে বলেন, এই মিডিয়া বেঁচে থাকলে এর অবস্থান শক্তিশালী হলে কমিউনিটির বিপদে-আপদে এবং প্রয়োজনে সোচ্চার ভূমিকা পালনে করতে পারবে। তাই কমিউনিটির মিডিয়ার সহায়তায় সকলকে এগিয়ে আসতে হবে। তিনি আরো বলেন, সকলের ভালবাসা ও সমর্থন নিয়ে পত্রিকা আরও বহুদূর পাড়ি দেয়ার স্বপ্ন দেখে।

অনুষ্ঠানে ছিলো আকর্ষণীয় পুরষ্কারের র‌্যাফল। র‌্যাফলের অর্থ থেকে একটি অংশ ইকবাল আহমদ ফাউন্ডেশনের দেওয়া হবে এবং তা বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর কল্যাণে ব্যয় হবে। র‌্যাফল ড্র’য়ের আকর্ষণীয় প্রাইজগুলোর মধ্যে ছিল অভিজাত ব্রাণ্ড লন্ডন ট্র্যাডিশনের সৌজন্যে পছন্দমত ডাফল কোর্ট বানিয়ে নেয়ার সুযোগ, হিলসাইড ট্রাভেলসের সৌজন্যে লন্ডন টু বাংলাদেশ রিটার্ন এয়ারটিকিট, ডেভরট-এর সৌজন্যে ইপোস সিস্টেম, টিলডার সৌজন্যে একটি পরিবারের পুরো বছরের জন্য ২১০ কেজি চাল, সুন্না মাস্কের সৌজন্যে পারফিউম সেট এবং লন্ডন টি একচেঞ্জের সৌজন্যে চার জনের ইভিনিং টি-এর পাশাপাশি আরও দুটি অভিজাত চা-এর বক্স।
অনুষ্ঠানের সংগীত পরিবেশন করেন খ্যাতনামা নজরুল সংগীত শিল্পী লুসি রহমান এবং রবীন্দ্রসংগীত পরিবেশন করেন স্বপন পাল। অনুষ্ঠানে অতিথিদের বক্তৃতার ফাঁকে পত্রিকার দীর্ঘ একুশ বছরের পথচলা নিয়ে প্রচারিত হয় কমিউনিটি নেতৃবৃন্দের শুভেচ্ছা ও মন্তব্য। এছাড়া অতিথিদের হাতে তুলে দেওয়া হয় পত্রিকার বিশেষ ম্যাগাজিন। সাপ্তাহিক পত্রিকার প্রধান সম্পাদক মোহাম্মদ বেলাল আহমদ সমাপনী বক্তব্যে উপস্থিত সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান। অনুষ্ঠানের প্রধান স্পন্স ছিল চালের জনপ্রিয় ব্রান্ড টিলডা। সহযোগী হিসেবে ছিল ক্যানারি ওয়ার্ফ গ্রুপ, দ্য ইকবাল ব্রোস, ইবকো ব্রাণ্ড, সামি স্টুডিও, লন্ডন টি একচেঞ্জ, দ্য রয়্যাল রিজেন্সি, প্রাইড অব এশিয়া, সুন্না মাস্ক, ফিরনাস এয়ারওয়েজ, ম্যাফেয়ার ভেন্যু, জেএমজি, এশিয়ারিক, লন্ডন ট্র্যাডিশন, হিলসাইড ট্রাভেলস, এ অ্যান্ড সি, শেফ অনলাইন এবং ৪০৩ হ্যারো লিমিটেড।