ওয়ানবাংলানিউজ ডেস্ক: ব্রিটেন তথা ইউরোপে স্মরনকালের ভয়াবহতম অগ্নিকান্ড ট্রাজেডী গ্রীনফেল টাওয়ার দুর্ঘটনার এক বছর হবে বৃহস্পতিবার ( ১৪ জুন)। ১৩ই জুন বুধবার দিবাগত রাত ১২টা ৫৪ মিনিটে ভবনের ৪র্থ তলার ১৬ নাম্বার ফ্লাটের রান্নাঘরের একটি ফ্রিজ থেকে আগুনের সুত্রপাত হয়েছিল বলে লন্ডন পুলিশের বরাতে জানা যায় । পশ্চিম লন্ডনের কেন্সিংস্টনে গ্রীনফেল টাওয়ার ট্রাজেডিতে প্রানহানি ঘটে বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত পরিবারের পাঁচ সদস্য সহ মোট ৭২ জনের। ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিলেন আরো প্রায় দেড় শতাধিক। ২৪ তলা বিশিষ্ট ঐ টাওয়ারে ১২৯ টি ফ্লাট ছিল। অনুসন্ধানে জানা যায়, অগ্নিকান্ডে নিহতদের বেশিরভাগই ছিলেন ২৩ টি ফ্লাটের বাসিন্দা।
আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে লন্ডন ফায়ার ব্রিগেডের ২৫০ জন ফায়ার ফাইটার ও ৪০টি ফায়ার ইঞ্জিনের টানা ৪৮ ঘন্টা পর্যন্ত সময় লেগেছিল। কিন্তু ততক্ষণে ৭২টি প্রান প্রদীপ নিভে যায়। টাওয়ার ও এর আশপাশের ভবনসহ মোট ১৫১টি বাড়ি ঘর ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছিল।
গ্রিনফেল টাওয়ারের বিয়োগান্তক এই ট্রাডেজির বর্ষপূর্তি উপলক্ষে নেওয়া হয়েছে নানা কর্মসূচী। তন্মধ্যে বার্ষিকীকে স্মরনীয় করে রাখতে পাবলিক তদন্ত এক সপ্তাহের জন্য স্থগিত করা হয়েছে। এছাড়া ১৪ই জুন বৃহষ্পতিবার দুপুর ১:৩০ টায় নিকটবর্তী সেন্ট ক্লেমেন্ট চার্চে অগ্নিকান্ডে নিহতদের আত্নার উদ্দেশ্যে এক মিনিট নিরবতা পালন এবং তাদের নাম পড়া হবে। ঐদিন সন্ধ্যায় নর্থ কেন্সিংস্টন কমিউনিটির সদস্যবৃন্দ একত্রিত হয়ে টাওয়ারের পাশে ২৪ ঘন্টা জাগ্রত থাকবেন।
বৃহষ্পতিবার রাত ১২টা ৫৪ মিনিট তথা আগুন লাগার সময়কাল থেকে গ্রিনফেল টাওয়ার সহ আশপাশের ১২ টি টাওয়ার ৫ দিন ব্যাপী প্রতিদিন ভোর পাঁচটা পর্যন্ত বিশেষ ভাবে আলোকোজ্জ্বল করা হবে। কর্মসূচিতে পরের দিন, সারা দেশের স্কুলগুলোতে “গ্রীন ফর গ্রেনফেল” উদযাপনে সকল মানুষ অংশ নেবে বলে প্রত্যাশা করা হচ্ছে।
এদিকে প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে অগ্নিকান্ডের ঘটনায় বর্ষপূর্তি সামনে রেখে ভিকটিম ও তাদের পরিবারের সদস্যদের সাথে দ্রুত দেখা করতে না পারার জন্য তিনি সবসময়ই দুঃখিত বলে জানিয়েছেন। ইভিনিং স্টেন্ডার্ডের বরাত দিয়ে বিবিসি জানিয়েছে, মিসেস মে আরো বলেছেন, ‘দুর্যোগ পরবর্তী প্রতিক্রিয়া যথেষ্ট ছিল না এবং যথা সময়ে যথাযথ পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি, যার জন্য তাঁর নিজের ব্যার্থতা রয়েছে বলেও তিনি মনে করেন।’
ঘটনার পরদিন প্রধানমন্ত্রী থেরেসা মে এ ঘটনায় পাবলিক তদন্তের আদেশ দিয়ে বলেছিলেন, “আমাদের জানতে হবে কি হয়েছিল এবং এর পুরোপুরি ব্যাখ্যাও আমাদের দিতে হবে”। কি হয়েছিল? কেন হয়েছিল? এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি হলে করনীয় কি? এই তিনটি বিষয়কে সামনে রেখে সেসময় তিনি সাবেক অবসর প্রাপ্ত বিচারপতি স্যার মার্টিন মোর বিকের নেতৃত্বে পাবলিক তদন্ত কমিটি গঠন করে দিয়েছিলেন।
ঘটনার ঠিক তিনমাস পর ১৪ই সেপ্টেম্বর মিঃ মার্টিন তদন্ত শুরু করেছিলেন এবং বলেছিলেন, “তদন্ত প্রক্রিয়াটি প্রতিক্রিয়াশীল নয়, এটি কাউকে শাস্তি প্রদান কিংবা ক্ষতিপূরণ প্রদান করা নয়। এটা কেবল সত্যের কাছে পৌঁছানো।”
স্যার মার্টিন ৩৫ জনের একটি দলের সহযোগিতায় কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন , যার মধ্যে একটি আইনি দল, বেসামরিক কর্মচারী এবং তিনজন পরামর্শদাতা রয়েছে। ইতিমধ্যে ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারের সদস্যদের সাক্ষাৎকার গত ২১শে মে থেকে ৯দিন ব্যাপী নেওয়া হয়েছে।
তদন্তের প্রথম পর্বের প্রতিবেদন এ বছরের অক্টোবর নাগাদ প্রকাশ করা হবে বলে আশা করছে দায়িত্বপ্রাপ্ত তদন্ত দল। দ্বিতীয় পর্ব নতুন বছরের শুরুতে এবং পূর্নাঙ্গ তদন্ত প্রদানমন্ত্রী থেরেসা মে এর হাতে হস্তান্তর করা হবে।
এদিকে অনুসন্ধানে সাত জন ক্ষতিগ্রস্থ ব্যক্তির কাছ থেকে পাওয়া তথ্যে জানা যায়, ছয় মাস বয়সী এক মৃত শিশুকে পাওয়া গেছে মায়ের হাতের মধ্যে। শিশুটির মা ফারাহ হামদানকে ১৯ ও ২০ তলার মধ্যখানে পাওয়া যায় । এসময় তার হাতেই ছিল তার ৬মাস বয়সী হতভাগ্য শিশু লিনা। একই সাথে লিনার ৮ বছর বয়সী বোনকে ২০ তলা থেকে উদ্ধার করা হলেও হাসপাতালে তার মৃত্যু হয়।
ক্ষতিগ্রস্থ বাংলাদেশী পরিবারের বক্তব্যঃ গ্রীনফেল টাওয়ারে নিজ পরিবারের চারজন সহ মারা যান বাংলাদেশের মৌলভীবাজার জেলার কমরু মিয়া। কমরু মিয়ার ভাগ্নে ও কমিউনিটি নেতা, কে এম অাবু তাহির চৌধুরী বলেন, গ্রীনফেল টাওয়ারের অগ্নিকান্ডের পর একটি প্রতারক চক্র নিহতদের স্বজন সেজে হাজার হাজার পাউন্ড হাতিয়ে নেয়। পুলিশ এখন এদের গ্রেফতার করছে। কমরু মিয়ার পরিবার সম্পর্কে স্মৃতিচারন করে তাহের চৌধুরী বমাদের সময় ডটকমকে বলেন,
“কমরু মিয়ার এক ছেলে যিনি ঐদিন ঘরে না থাকায় বেচেঁ গিয়েছিলেন। তিনি পরিবারের সবাইকে হারিয়ে নিঃস্বঙ্গ অবস্থায় শোকে কাতর”।
কমরু মিয়ার ভাতিজা অাবদুর রহিম বলেন, “অামরা প্রতিটি ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারের যথাযথ ক্ষতিপূরন এবং ন্যায় বিচার দাবী করছি। ভবিষ্যতে এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি যাতে না হয় সে বিষয়ে দায়িত্বশীল মহলের দৃষ্টি আকর্ষন করছি।”
সূত্র আমাদের সময়















