ডক্টর এম মুজিবুর রহমান: গত ২১ ডিসেম্বর ২০১৭ বিলেতের জনপ্রিয় টিভি চ্যানেল এস এর ‘রিয়ালিটি উইথ মাহি’ অনুষ্ঠানে ‘প্রবাসে বাংলাদেশের দলীয় রাজনীতি’ নিয়ে আলোচনা। লাইভ অনুষ্ঠানে সময়ের সীমাবদ্বতার জন্য অনেক বিষয় নিয়ে বিস্তর আলোচনা করার সুযোগ থাকে না এবং বিষয়টি অগণিত প্রবাসীদের কর্মকান্ডের সাথে জড়িত বিধায় ধারাবাহিকভাবে এ বিষয়ে আলোচনা করার প্রত্যয়ে এই প্রয়াস। এ বিষয়ে পক্ষে বা বিপক্ষে যে কেউ যুক্তি ও তথ্যনির্ভর আলোচনায় শরিক হতে পারেন। যে কোনো মতামত পোস্ট করার পাশাপাশি ইনবক্সে পাঠালে কৃতার্থ হবো এবং আলোচনায় অংশগ্রহণ করতে সুবিধা হবে। যুক্তি ও তথ্যনির্ভর বস্তুনিষ্ঠ আলোচনা চিন্তা ও চেতনাকে পরিশীলিত ও সমৃদ্ব করবে বলে বিশ্বাস করি।
প্রথম পর্ব:
প্রাচীন গ্রিক থেকে আজ পর্যন্ত প্রত্যেক সমাজে রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব লক্ষ করা যায়। সাধারণ ভাষায় রাষ্ট্রপরিচালনার নিয়ম-রীতিপদ্ধতিকে রাজনীতি বলা হয়ে থাকে। অন্যকথায় রাজনীতি হলো ক্ষমতার পর্যালোচনা। রাজনীতি হচ্ছে এমন একটি প্রক্রিয়া, যার মধ্য দিয়ে মানুষ তার রাজনৈতিক আদর্শ অনুসারে নিজের সমাজকে বিন্যস্ত করে। শাসন ও শাসিতের মধ্যে সম্পর্ক স্থাপিত হয় রাজনীতির মাধ্যমেই।
একাডেমিক অর্থে রাজনীতি হচ্ছে সরকার পরিচালনার নিমিত্তে সমাজের ভিতর থেকে উদ্ভুত বিজ্ঞান ভিত্তিক সংস্কৃতি, যার দ্বারা একটা নির্দিষ্ট সংস্থা বা কর্তৃপক্ষ রাষ্ট্র পরিচালনা করে। রাজনীতির ইংরেজি “Politics”শব্দটি গ্রীক শব্দ “Politiká: Politika,” থেকে উৎপত্তি। যার সরল অর্থ, নগর বিষয়ক নীতিমালা বা বিষয, যার দ্বারা মানব গোষ্ঠী কর্তৃক পরিচালিত হয় রাষ্ট্র বা রাজ্য। যা সমাজের মানুষের মাঝে আন্ত সম্পর্ক সৃষ্টি করে ও ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষা করে।
রাজনৈতিক চিন্তার ইতিহাস খুঁজে পাওয়া যায় প্লেটোর রিপাবলিক, এরিস্টটল এবং কনফুসিয়াসের লেখনীতে। এরিস্টটলের মতে, ‘রাজনীতি হলো জনসেবা’ তিনি আরো বলেন, “জনজীবনের বিষয়বস্তু ও গতিপথ সংক্রান্ত যৌথ সিদ্ধান্ত গ্রহণে সর্বসাধারণের অংশগ্রহণই রাজনীতির সারবস্তু। বি.রাসের বলেন ক্ষমতা তিনপ্রকারের। অর্থনৈতিক ক্ষমতা, রাজনৈতিক ক্ষমতা এবং পেশী শক্তি। আর এই তিন ধরনের ক্ষমতার সমন্বিত বহি:প্রকাশই হলো রাজনীতি। আবার অনেকে বলেন, একটি সুষ্ঠু প্রক্রিয়ার মাধ্যমে ক্ষমতা ও সম্পদগুলো একটি জাতির মধ্যে সুষম বন্টন করার কৌশল হলো রাজনীতি।
জটিল ও একাডেমিক বিশ্লেষণের গভীরে না গিয়ে রাজনীতি (ইংরেজি: Politics) হলো এমন একটি প্রক্রিয়া যার মাধ্যমে কিছু ব্যক্তির সমন্বয়ে গঠিত কোন গোষ্ঠী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। যাদ্বারা রাজনীতি বলতে মূলত নাগরিক সরকারের কর্মকান্ডকেই বোঝানো হয়, তবে অন্যান্য অনেক সামাজিক প্রতিষ্ঠান, যেমন ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, অন্যান্য প্রতিষ্ঠানসমূহ যেখানে মানুষের মধ্যে পারস্পারিক সম্পর্ক বিদ্যমান, সেখানে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে রাজনীতি চর্চা করা হয়। রাজনীতি কর্তৃত্ব ও ক্ষমতার ভিত্তিতে গঠিত সামাজিক সম্পর্ক নিয়ে গঠিত। রাষ্ট্রবিজ্ঞান হচ্ছে শিক্ষার এমন একটি শাখা যা রাজনৈতিক আচরণ শেখায় এবং ক্ষমতা গ্রহণ ও ব্যবহারের উপায় সম্পর্কে আলোচনা করে।
মোটা দাগে একটি দেশের সকল বড় অর্জন রাজনীতির মাধ্যমেই অর্জিত হয় । ব্যক্তিকেন্দ্রিক উন্নয়ন, স্বচ্ছলতা বা সফলতা বিকশিত হবে না, রাষ্ট্র যদি সমষ্টিগতভাবে অগ্রগামী না হয়। আর এ জন্য দরকার রাজনীতি বা রাষ্ট্রীয় শাসন। কিন্তু এ রাজনীতি নিয়ে এখন অনেকের বিরক্তি ও উষ্মা লক্ষ্য করা যায়। সকলেই স্বীকার করেন যে, গত শতাব্দীর বড় অর্জন বাংলাদেশের স্বাধীনতা এসেছে রাজনীতির হাত ধরে। অনেকের মতে স্বাধীনতা উত্তর বাংলাদেশে সকল পর্যায়ে অযাচিত রাজনীতির ব্যবহার ও খবরদারিতে সামাজিক-রাষ্ট্রীয় শ্লীল-সুন্দর ব্যবস্থায় অরাজকতা ও অব্যাবস্থাপনা ভর করে দেশের জনগণের বিরাট একটা অংশের কাছে রাজনীতি বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। আবার অনেকের মতে রাজনীতি মোটেই বিরক্তির কারণ নয় কারণ বাংলাদেশের রাজনীতিতে বর্তমানে যে অস্থিতিশীল অবস্থা বিরাজ করছে তা রাজনীতিরই অংশ।
প্রবাসে বাংলাদেশের দলীয় রাজনীতি ও রাজনৈতিক কর্মকান্ডের ধরণ নিয়ে বিতর্ক রয়েছে। এর পক্ষে যেমন যুক্তি রয়েছে। তেমনি বিপক্ষেও অনেকে মতামত দিয়ে থাকেন। সাম্প্রতিক একটি ঘটনার দিকে আলোকপাত করা যায়। বাংলাদেশে গুম খুন আর মানবাধিকার নিয়ে বিনা ভোটের সরকারের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ছোট বোন শেখ রেহানার একমাত্র মেয়ে ব্রিটিশ লেবার পার্টির এমপি টিউলিপ সিদ্দিকের দ্বিমুখী চরিত্র ফাঁস করেছে বিলাতের প্রেস্টিজিয়াস টিভি চ্যানেল ফোর। শুধু তাই নয় বাংলাদেশের বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকারকে ‘ব্রুটাল গভর্নমেন্ট’ এবং ‘রেপ্রেসিভ রেজিম’ হিসেবেও আখ্যায়িত করেছে। বাংলাদেশের বর্তমান প্রেক্ষাপটে ওখানকার গণমাধ্যম বা সুশীল সমাজের পক্ষে এর একভাগও প্রচার করা বা এভাবে দেশের বাস্তব চিত্র তুলে ধরা সম্ভব নয়।
বর্তমান গ্লোবালাইজেশনের যুগে এখন রাষ্ট্রসমূহ একে অন্য থেকে আর বিচ্ছিন্ন নয়। মুক্ত বাজার অর্থনীতি, রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও অন্যান্য উপাদান বিশ্লেষণ করে একটি রাষ্ট্র অন্যদের সাথে গভীর সম্পর্কে অঙ্গাঅঙ্গিভাবে জড়িত। বাংলাদেশের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে আবার অনেকে মনে করেন ভোটারবিহীন নির্বাচনের মাধ্যমে গঠিত সরকারের অগণতান্ত্রিক কর্মকান্ডের পাশাপাশি, দেশে সকল দলের অংশগ্রহণে সরকারি দলের প্রভাবমুক্ত একটি বিশ্বাসযোগ্য নির্বাচনের পরিবেশ সৃষ্টিতে চাপ প্রয়োগ, পাশবিক গুম খুন ও নিপীড়নমূলক দমনপীড়ণকে বন্ধ্বুপ্রতিম এবং উন্নয়ন সহযোগী দেশসমূহ বিশেষ করে উন্নত ও পশ্চিমা বিশ্বে তথা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ছড়াইয়া দিয়ে বিশ্ব জনমত গঠনসহ ক্ষমতাসীন সরকারকে বাধ্য করতে বিদেশে রাজনৈতিক দলগুলোর এক্টিভিটির প্রয়োজন রয়েছে । অন্য দল ক্ষমতাসীন হলে এবং এরকম নিপীড়নমূলক কর্মকান্ড সংঘটিত হলে তার বিরুদ্বেও প্রবাসে রাজনৈতিক দলগুলো বিশ্ব জনমত সৃষ্টি করতে পারবে ।
তাই যতদিন দেশে মোটামোটিভাবে গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক রূপধারণ না করবে, ততদিন অন্তত রাজনীতিতে জবাবদিহিতামূলক একটা সিস্টেম দাঁড় করানো পর্যন্ত প্রবাস থেকেও এক্সটার্নাল প্রেসার গ্রুপ হিসেবে কাজ করা জরুরি এবং নৈতিক দায়িত্ব । অনেকে আবার প্রবাসে দেশের রাজনৈতিক দলের হয়ে কাজ করা সমর্থন করলেও রাজনৈতিক কর্মকান্ডের ধরণ নিয়ে ভিন্নমত পোষণ করেন। প্রবাসে দেশের রাজনৈতিক দলের হয়ে কাজ করা সমর্থন করলেও দেশের স্টাইলে রাজনৈতিক কর্মকান্ড বা কর্মসূচী না দিয়ে এমপি মন্ত্রীদের কাছে গ্রুপভিত্তিক লবি, সেমিনার সিম্পোজিয়ামের মাধ্যমে জনমত গঠন করার পক্ষপাতী। অন্যদের মতে লবি ও সেমিনার সিম্পোজিয়ামের পাশাপাশি র্যালি বা মানববন্দ্বন কর্মসূচীতে প্রবাসীদের স্বতঃস্পুর্ত অংশগ্রহণ বিশ্ব জনমত গঠনে বিশেষ ভূমিকা রাখে এবং দেশের মানুষ যারা র্যাব, পুলিশের দমন পীড়নে প্রকাশ্য কর্মসূচী করতে পারেন না, তাদের জন্য এসব কর্মসূচী উৎসাহব্যাঞ্জক । (চলবে……….)
লেখক: ডক্টর এম মুজিবুর রহমান
বিশিষ্ট কলামিস্ট, রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক সহকারী অধ্যাপক















