ঢাকা সংবাদদাতা: ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা বিএনপির একটি সফল সম্মেলন পরিসমাপ্তি হলেও কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় সিন্ডিকেটদের দৌরাত্ম্যে বিএনপি’র দলীয় গণতন্ত্র ও গঠনতন্ত্র উপেক্ষিত হয়ে কমিটি আটকে আছে। ৫ ই আগস্ট গণঅভ্যুত্থান পরবর্তীতে হুট করে গড়ে ওঠা জেলার বুর্জোয়া সিন্ডিকেট ও কেন্দ্রের গুপ্ত সিন্ডিকেটের চক্রান্তে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার বিগত ১৭ বছরের ত্যাগী ও নির্যাতিত নেতাকর্মীদের কোণঠাসা করে ফেলার চক্রান্ত চলছে। সেই সাথে জেলার দলীয় গণতন্ত্র ও গঠনতন্ত্র মোতাবেক সম্মেলনের মাধ্যমে গঠিত সব ইউনিট কমিটিগুলোকে পাশ কাটিয়ে সিন্ডিকেটদের পছন্দমত কমিটি বাগিয়ে আনার চূড়ান্ত চক্রান্ত চলছে বিগত কয়েক মাসে।
এভাবে নেতৃত্ব নিয়ে অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব তীব্র আকার ধারণ করেছে জেলাটিতে। ১৪টি সাংগঠনিক ইউনিটের সম্মেলনের মাধ্যমে ১৩টির কমিটি গঠন হলেছে। শুধু বিজয়নগর ইউনিটের সম্মেলন এখনো অনুষ্ঠিত হয়নি।
জেলা বিএনপির ১৪ টি ইউনিটের নেতৃবৃন্দ বলছে, দলীয় গঠনতন্ত্র লঙ্ঘন করে কেন্দ্র থেকে কমিটি চাপিয়ে দেয়ার চেষ্টা হয়েছে ও চলছে।
দলের ভীষণ দুঃসময়ে ২০২০ সালে বিএনপির সিনিয়র নেতা জেলা আহবায়ক মরহুম জিল্লুর রহমানের হাত ধরে জেলা বিএনপির ইউনিট কমিটি গুলো পুনর্গঠনের কাজ শুরু হয়। তার মৃত্যুর পর এডভোকেট এম এ মান্নান ও সিরাজুল ইসলাম সিরাজের নেতৃত্বে আহ্বায়ক কমিটি গঠিত হয়। আন্দোলন ও সাংগঠনিক কাজকে সামনতালে এগিয়ে নেন তারা। কুমিল্লা বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত কেন্দ্রীয় নেতাদের উপস্থিতিতে গঠিত হওয়া সবগুলো ইউনিটের সফল সম্মেলন সম্পন্ন করেন তারা।
বিএনপির দলীয় গণতন্ত্র ও গঠনতন্ত্র মোতাবেক যখনই জেলা বিএনপির সম্মেলন আহ্বান করা হচ্ছিল তখনই স্থানীয় বুর্জোয়া সিন্ডিকেট কেন্দ্রের গোপন সিন্ডিকেটের যোগাসাজোসে বিভিন্ন সন্ত্রাসী কার্যক্রমের মাধ্যমে বাধা আসে। যা বিএনপি ত্যাগী ও তৃণমূল নেতাকর্মীরা সাহসের সাথে মোকাবেলা করে একটি সফল জেলা সম্মেলনের পরিসমাপ্তি করেন। সম্মেলনে প্রধান অতিথি হিসেবে ভার্চুয়ালি উপস্থিত ছিলেন বিএনপি’র ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান। তাই সম্মেলনে শেষ মুহূর্তে বাধ্য হয়ে উপস্থিত থাকেন বুর্জোয়া সিন্ডিকেটের হাফিজুর রহমান কচি মোল্লা, জহিরুল হক খোকন এবং দীর্ঘদিন এলাকায় অনুপস্থিত থাকা ইঞ্জিনিয়ার খালেদ হোসেন মাহবুব শ্যামল।

নেতাকর্মীদের অভিযোগ, পূর্বেও তাঁরা আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠমহলের সঙ্গে যোগাযোগ করে সংগঠনকে বিভক্ত করার চেষ্টা করেছিল।
একটি সফল জেলা সম্মেলনের পর সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য ও ষড়যন্ত্রকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে বিভিন্ন কেন্দ্রীয় নেতাদের উপস্থিতিতে জেলা সদরে এক মহাসমাবেশ করা হয়। যার মধ্যমনি ছিলেন কবীর আহমেদ ভূঁইয়া। এভাবে দলীয় গণতন্ত্র ও গঠনতন্ত্রের পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সকল জাতীয়তাবাদী কর্মীরা।
বিএনপির এক নেতা বলেন, জেলার সম্মেলন নিয়ে নানাবিধ চক্রান্তের কারণে আমরা ভোটার হয়েও ভোট দিতে পারছি না। কোন চক্রান্ত কারে যদি আমাদের ভোটাধিকার কেড়ে নেয়, হুট করে কোন কমিটি যদি চাপিয়ে দেওয়া হয় তাহলে কঠোর আন্দোলনে নামা ছাড়া উপায় থাকবে না।’
এদিকে জেলা বিএনপির আহবায়ক কমিটির অন্যতম সদস্য কবীর আহমেদ ভূঁইয়া বলেন, ‘এ পর্যন্ত দলীয় শৃঙ্খলা মোতাবেক যতগুলো কমিটি হয়েছে সব কমিটিকেই সমর্থন করেছি। আমি সব সময় দলের মধ্যে গণতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ পরিবেশ চাই ।’
জেলা বিএনপির একাধিক নেতা বলেন, “যদি কাউন্সিলরদের ভোটাধিকার নিশ্চিত না করে কমিটি ঘোষণা করা হয়, তাহলে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এখন বড় ধরনের সংঘর্ষের আশঙ্কা আছে।”
ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা বিএনপির চলমান সংকট ও সমাধান শুধু একটি জেলা ইউনিটের অভ্যন্তরীণ বিরোধ নয়;বরং জেলা সম্মেলন নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে টানা হেচরার কারণে এটি এখন জাতীয় মনোযোগ আকর্ষণের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। সবাই এখন তাকিয়ে আছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার কমিটি গঠনে বিএনপির গঠনতন্ত্র ও গণতন্ত্র বিজয়ী হবে নাকি সিন্ডিকেটের খপ্পরে পড়ে দলীয় গণতন্ত্রের কবর রচনা করে বুর্জোয়া কমিটি গঠনা করা হবে?
সিন্ডিকেটর দৌড়াত্ম্যে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের সিদ্ধান্ত গ্রহণের দুদুল্যমানতার কারনে দলের প্রতি বিশ্বাসযোগ্যতা, আগামীতে আন্দোলন সংগ্রামে তৃণমূল নেতাদের অংশগ্রহণ এবং দলের মধ্যে গণতান্ত্রিক চর্চার প্রশ্নও উঠে আসছে। দীর্ঘদিন ধরে মাঠপর্যায়ে গড়ে ওঠা সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে ব্রাহ্মণবাড়িয়া বিএনপি উজ্জীবিত খাকলেও
অনৈতিকভাবে নেতৃত্ব দখলের প্রতিযোগিতা জেলা বিএনপিকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে। এর ফলে একদিকে যেমন মাঠপর্যায়ে হতাশা সৃষ্টি হবে, অন্যদিকে বিএনপি বিরোধী রাজনীতির সুযোগ নিবে বিএনপি বিরোধীরা।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা বিএনপির কমিটি গঠন এখন জাতীয় আকর্ষণের কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে। এই সিদ্ধান্তটি দিয়ে বিএনপি’র অভ্যন্তরীণ গণতন্ত্র ও গঠনতন্ত্রকে মূল্যায়ন করতে কলম নিয়ে বসে আছে নিন্দুক ও সমালোচকরা। তাই বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের সিদ্ধান্তের জন্য এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তও বটে। কেননা সম্মেলনে দেয়া বক্তব্যে তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা সম্মেলনের ব্যাপারে দায়িত্ব নিয়েছিলেন। জেলা বিএনপির বিভিন্ন ইউনিটের তৃণমূল নেতাকর্মীসহ সারা দেশের বিএনপির নেতাকর্মীরাও তাকিয়ে আছেন ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা বিএনপির কমিটি গঠনে কারা বিজয়ী হয়, সিন্ডিকেট নাকি দলীয় গণতন্ত্র? এখন বুর্জোয়া সিন্ডিকেট বিজয়ী হলে এই সমালোচনার ব্যাপক প্রভাব পড়বে জাতীয় নির্বাচনেও। এই সংকট তখন ব্রাহ্মণবাড়িয়ার গণ্ডি পেড়িয়ে বড় ধাক্কা হয়ে দাঁড়াতে পারে জাতীয় রাজনীতিতে।














